টুকিটাকি

জীবনে কেন বন্ধু চাই?

নিয়ন আলোয়- neon aloy

পড়তাম চটগ্রাম গভার্নমেন্ট হাইস্কুলে (চিটাগাং কলেজের বিপরীতে)। আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন তুহিন ভাই। টানা ফার্স্ট ছিলেন। মা ছিলেন চট্টগ্রামের সবচেয়ে নামী স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। সেই আন্টি ছেলেকে কারো সাথে মিশতে দিতেন না। তুহিন ভাই ক্লাস নাইনে রেজাল্ট খারাপ করার পরে তাকে যে পরিমাণ মেন্টাল টর্চার করা হয়, তা এখনো ভুলতে পারি নাই। সেই অসম্ভব ভালো তুহিন ভাই, যার এসএসসিতে বোর্ডস্ট্যান্ড করার কথা, পেলেন টেনেটুনে ফার্স্ট ডিভিশন। তারপর, টর্চার আরো বাড়লো।  দু’বছর পরে দেখেছি, শুকিয়ে হাড় জিরজিরে হয়ে গেছেন, ওনাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এভাবেই একমাত্র ছেলেটিকে শেষ করে দেয়া হয়। কোটি কোটি টাকার সম্পদ তাদের। কী হলো শেষ পর্যন্ত?

জাহিদের বন্ধুরা সবাই বুয়েট, মেডিকেল থেকে পাশ করেছে, কিন্তু ও আর পড়াশুনা করতে পারেনি। খুব ভালো কলেজে পড়লেও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেনি। সারাক্ষণ ইংলিশ নভেল পড়া, সিনেমা দেখাই তার কাজ। গুণের মধ্যে শুধু দুইটা, ইংরেজি বললে বুঝা যায় না সে দেশি না বিদেশি আর মানুষের সাথে যোগাযোগের অসীম ক্ষমতা। এই করে করে বয়সটা ২৮ হয়ে গেছে। বিয়ে করা দরকার! মেয়ে দিবে কে?

না!! ছোটোবেলার এক বন্ধু একটা গাড়ি বেচাকেনার কোম্পানিতে সেলসে কাজ দিয়ে দিলো। বিয়েটা যেন করতে পারে! মাত্র ৫ বছরেই সেই ছেলেটিকে কোম্পানি শুধু ৪৪ লাখ টাকার ব্র্যান্ড গাড়িই নয়, বেতন বাড়িয়ে দেয় ৮ গুণ। ঐ যে কমিউনিকেশন স্কিলস, ওটার জন্য তো বুয়েটে, মেডিকেলের সার্টিফিকেট লাগে না, ওটাই হচ্ছে তার সাফল্যের চাবিকাঠি। ছোট্ট একটা শুরু, বন্ধুর ছোট্ট একটু হাত বাড়িয়ে দেয়া, কোথায় নিয়ে গেলো তাকে!

টানা ১৮ বছর ব্যবসা করে হঠাৎ বিপর্যয় আতিক রহমানের। মধ্যে বয়সে এই ক্রাইসিস যে কীরকম ভয়াবহ ক্রাইসিস তা অনেকেই জানেন, হার্ট অ্যাটাক তো এই বয়সেই হয়! তাই না! সমস্যা নেই, এই বিপর্যয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রুমমেট নোমান রহমান!

রাজনীতিতে জড়িয়ে এক বছর পিছিয়ে পড়ে সহপাঠিদের তুলনায় মঞ্জু ভাই। বুয়েটে পিছিয়ে থাকা এক ভীষণ মানসিক যন্ত্রণা, কিন্তু মঞ্জু ভাইকে প্রতিদিন জিপি অফিস থেকে সঙ্গ দিতেন তারই রুমমেট আজাদ। ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাওয়া মঞ্জু ভাইকে আরও বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে দেয় আজাদ। আজাদের সেই প্রতিদিনের সঙ্গ না পেলে বুয়েট থেকে হয়তো পাশ করাই হতো না আজকের সফল ব্যবসায়ী মঞ্জু ভাইয়ের।

আসলে বন্ধুদের খুব দরকার। বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি দরকার বন্ধুদের। বন্ধুর সঙ্গ, বন্ধুর ভালবাসা, বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দেয়া যে কতভাবে জীবনকে এগিয়ে দেয়, তা আমরা অনেকেই জানি।

কিন্তু যাদের বন্ধু নেই? কেন তাদের বন্ধু থাকে না? কেন তাদের বন্ধু হয় না? কারণ হতে পারে পরিবারের মিশতে না দেয়া অথবা আরও অনেক।

একদিন অফিসে চিঠি পেলেন, আপনার চাকুরির মেয়াদ আর বাড়ছে না। কাকে বলবেন, “এই একটা চাকুরি দেখিস তো!!” বন্ধু কী বলবে? “আরে দূর, চাকুরি ১ গেছে ১০টা পাবি, চল শায়লার বাসায় ঘুরে আসি”। না হলে বলবে, “বান্দরবন ঘুরে আসি!” না হলে বলবে, “দোস্তো, সিভিটা পাঠাইয়া দে!”

ডিভোর্স, ব্রেক আপা, উন্নয়নের সাথে এগুলো বাড়ে এবং বাংলাদেশে তা বিপদজনক হারেই বাড়ছে। এই সময়ে মনোজগতের যে ভাঙচুর চলে, তখন কার কাছে যাবেন? কাকে বলবেন? এই সময়ে সবচেয়ে বেশি মানসিক সাপোর্ট লাগে। একটা বন্ধু থাকলে এই বিপর্যস্ত সময়ে আপনাকে ভেঙ্গে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করবেই।

সিমেস্টারের রেজাল্ট খারাপ হয়েছে? সিজিপিএ ডাউন? অনেকেই আপনাকে এড়িয়ে যাবে। কে থাকবে পাশে? ওই বন্ধুরাই।

অনেকে যখন বলে তার কোন বন্ধু নাই, তখন আমি খুব ভয় পাই। যাদের বন্ধু নাই, তাদের কমিউনিকেশন খুব খারাপ হয়ে যায়। অল্পতে তারা ভেঙ্গে পড়ে, অল্পতেই রেগে যায়, নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেয়, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার দক্ষতাগুলো তাদের থাকে না। অনেকটা ডোমেইন অ্যাফেক্টের মতো অবস্থা হয় তাদের। একটা সমস্যা আরেকটা সমস্যা নিয়ে আসে, দুই সমস্যা তখন তিন সমস্যা বানায়, তিন সমস্যা তখন চার সমস্যা বানায় …তাদের জীবনের এভাবে সমস্যা বাড়তেই থাকে।

দীর্ঘ জীবনে অনেকবারই আমরা বিপদে পড়ি। তখন মানুষ চেনা যায়। বিপদে পড়লে চামচিকাও নাকি লাথি মারে। কিন্তু হাত বাড়িয়ে দেয় কে? সে তো বন্ধু। জীবনের আনন্দে যেমন বন্ধু থাকে, বিপর্যয়েও বন্ধু থাকে।

জীবনের মানসিক, আর্থিক, বৈবাহিক, সামাজিক– সব আনন্দ আর বিপদে পাশে আছে কে?

কে আবার? চাইছি তোমার বন্ধুতা! আছে বন্ধু।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top