ফ্লাডলাইট

বিগ-থ্রি’র কফিনে শেষ পেরেকঃ কি হতে পারে আগামীতে?

নিয়ন আলোয়

গতকাল সাদা চোখে আইসিসির ভোটে ভারত হেরেছে ১-৯ ব্যবধানে। তবে কেন জানি মনে সন্দেহ হয় সবচেয়ে খুশি পাকিস্তান, তলে তলে কোন একটা গেম খেলেছে তারা।

কিভাবে? যুক্তি দিয়ে বলি,

ফেব্রুয়ারী মাসে নীতিগতভাবে নতুন মডেলের পক্ষে ভোট ছিলো ৭-২, ভোট দেয়নি জিম্বাবুয়ে। আগের বিগ-থ্রি ধরে রাখার জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল একটা মাত্র ভোট। ৭-৩ হলেই আগের নিয়ম বজায় থাকতো আর ভারত ৫৭০ মিলিয়ন ডলারই পেতো।

শুরু থেকেই শ্রীলংকা ভারতের সাথে ছিলো, আর ভারতের চোখ ছিলো জিম্বাবুয়ে আর বাংলাদেশের দিকে। যেকোন একটা ভোট পেলে ভারত জিতে যেত আর দুইটা পেলে ভোটই হতো না (৪ দেশ ভেটো দিলে ভোট হয়না আইসিসির)।

ভারতের প্রতিনিধি বাংলাদেশের শততম টেস্ট দেখতে শ্রীলংকা গেলো। সেখানে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা আর ভারত ঘোষণা দিলো তারা আগামী বছর শ্রীলংকার ৭০তম স্বাধীনতা দিবসে ট্রাই-নেশন সিরিজ “নিদাহাস” (মানে স্বাধীন) কাপ খেলবে। মনে হচ্ছিলো শ্রীলংকার সাথে সাথে বিসিবি থাকবে ভারতের সাথে।

এপ্রিলের শুরুতে পিসিবি চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খান শ্রীলংকা গেলেন। সেখানে আবার ভারতের প্রতিনিধি ছিলো না। একটা মিটিং হলো শ্রীলংকা, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের ভেতর। মিটিং শেষে শাহরিয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেন, “অনেক বিষয়ে আমরা একমত হতে পারিনি। তবে একটা বিষয়ে একমত যে ক্রিকেটে ভারত বা ইংল্যান্ডের একচেটিয়া আধিপত্য থাকতে দিবো না “।

এই মিটিং হবার আগের দুইটা জিনিস বলি, এক, বাংলাদেশ পাকিস্তানের আমন্ত্রন নাকচ করে, পাকিস্তান দুইটি টি-টুয়েন্টি খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানায় বাংলাদেশকে। এরপর পাকিস্তান আসবে কি না সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিলো। শাহরিয়ার বললেন, পাকিস্তান আসবে এমনকি বাংলাদেশ পাকিস্তানে এইচপি দল পাঠাবে। একই সাথে শাহরিয়ার টাকা ভাগাভাগির বিষয়টা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। “আমরা তিনবার যাচ্ছি, বাংলাদেশ একবারও আসেনি, সুতরাং আমাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, সিরিজের অর্থ বন্টন নিয়ে আলোচনা চলবে”।

আরো পেছনে গেলে, বিগ-থ্রি মডেল অনুমোদন করার সময় পাকিস্তান পক্ষে ভোট দিয়েছিলো এই শর্তে যে ভারত-পাকিস্তান সিরিজ হবে এবং ভারত আরব আমিরাতে সফরে যাবে। একটা MoU সাইন করেছিলো দুই দেশ। বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। সুতরাং, বলাই যায় পাকিস্তান এইবার যেভাবেই হোক নতুন প্রস্তাবের পক্ষে কাজ করতই।

কলম্বো মিটিং-এ এমন কোন আলোচনা হয়েছিলো যার ভিত্তিতে শুরুতে পাশে থাকলেও শ্রীলংকা চূড়ান্ত ভোটের সময় ভারতকে সমর্থন করেনি। বাকি থাকে বাংলাদেশ। পিসিবি বাংলাদেশ সফরের কথা বললেও দিন, তারিখ ইত্যাদি কিছুই চূড়ান্ত করেছিলো না। এরই ভেতর বিসিবি বস মুম্বাই গেলেন, বললেন “ভারত দূর্বল মানে বিসিবি দূর্বল, বিসিবি এমন কিছু করবে না যাতে ভারত আহত হয় “।

এরপরই পাকিস্তান সূচী চূড়ান্ত করে দিলো! ৯ জুলাই বাংলাদেশ আসবে, ১৪, ১৬ এবং ১৯ তারিখ তিনটা ওয়ানডে …… সবই চূড়ান্ত। খসড়া সূচী চলে আসলো মিডিয়ায়।

এরপর গতকালের ভোট। যেখানে শ্রীলংকা, বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে কেউই ভারতের পাশে থাকলো না। ভারতীয় বোর্ডের একটা সূত্র নিশ্চিত করেছে শশাঙ্ক মনোহর জিম্বাবুয়েকে অতিরিক্ত ১৯ মিলিয়ন ডলার প্রস্তাব দিয়ে সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সমর্থন না পাওয়াটা তাদের জন্য বিরাট সারপ্রাইজ ছিলো, একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিলো সেটা।

এই পর্যন্ত সবই ঠিক ছিলো। কিন্তু ভোটাভুটি শেষ হবার পর রাতেই পাকিস্তানের বাংলাদেশ সফর স্থগিত করার ঘোষণা তীব্র সন্দেহ ছড়াচ্ছে। এখনতো মনে হচ্ছে, পিসিবি আগেই ঠিক করে রেখেছিলো তারা আসবে না! শুধু সফরের আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশের ভারতের বিপক্ষে ভোট নিশ্চিত করেছে! একই ভাবে যেভাবে আইসিসি সভাপতি পদে লোটাস কামালের জয় নিশ্চিত হবার পর বাংলাদেশ পাকিস্তান সফর বাতিল করেছিলো।

বলে রাখি, পাকিস্তান সিরিজ মানে অবশ্যই বিসিবির জন্য বড় আর্থিক লাভ। বাংলাদেশে যেই পরিমান পাকিস্তানের সাপোর্টার আছে তাতে করে ভারতের পর পাকিস্তান সিরিজই সবচেয়ে লাভজনক।

বিসিবি কি ভেবেছিলো? ২০২০ সালের আগে আর ভারত-বাংলাদেশ সিরিজ নাই, সুতরাং পাকিস্তান সিরিজটা হাত ছাড়া না করতে? না কি সত্যিই বিসিবি বিশ্বক্রিকেট এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থেই ভারতের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলো?

বিসিবি হয়তো ভেবেছিলো, ভারতের বর্তমান বোর্ডের কর্তারা বেশিদিন থাকবেন না, নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধি আসলে তাদের সাথে মীমাংসা করে নিবে? মজার বিষয়, ভারতীয় বোর্ডের এই আদালত মনোনীত কর্তারা বেশিদিন থাকবেন না, জুনের শেষে পিসিবি চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খান অবসরে যাচ্ছেন, আইসিসি চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর অবসরে যাচ্ছেন জুনের এজিএম শেষে, আর বিসিবি সভাপতি পাপন উনিও বলেছেন জুলাই মাসে বর্তমান মেয়াদ শেষে আর নির্বাচন করবেন না সভাপতি পদে!!!

কিন্তু ক্রিকেট থাকবে! আইসিসি থাকবে! থাকবে সংশ্লিষ্ট বোর্ড!

এখন দেখার বিষয়ঃ

১) ভারত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে যায় কি না (আমার ধারনা যাবে, আর না গেলে সবচেয়ে বড় লস আইসিসির। বলাহয় ২০০৭ সালে প্রথম রাউন্ড থেকে ভারত বাদ পড়ায় পুরা বিশ্বকাপ লসের খাতায় ছিলো আইসিসির!)।

২) আগস্ট মাসে ভারত শ্রীলংকা সফরে যায় কি না! (৩ টেস্ট, ৫ ওয়ানডে, ১ টি টুয়েন্টি এই সিরিজের উপর শ্রীলংকার অনেক আর্থিক বিষয় নির্ভর করবে)।

৩) আগামী বছর “নিদাহাস কাপ” হয় কি না, মানে সিরিজ হবে তবে ভারত থাকে না কি তার জায়গায় পাকিস্তান বা অন্য কোন দল আসে!

৪) বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা ঠিক কি আলোচনা করেছে? এরই ভেতর খবর সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তান পূর্নাঙ্গ সফরে শ্রীলংকা যাবে আর তারপর নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে বাংলাদেশ পাকিস্তান সিরিজ হবে সেখানে নভেম্বর মাসে।

বাংলাদেশের একটা বড় টার্গেট আছে। ২০২৩ বিশ্বকাপ এশিয়ায় হবে, আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশ চাইবে ভারতের সাথে মিলে আয়োজন করা যায় কি না। স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানে বিশ্বকাপ হবেনা, শ্রীলংকা দুইবার আয়োজন করেছে অতীতে। সুতরাং বাংলাদেশ আরেকবার সুযোগ নিতে চায়। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সাথে সম্পর্ক খারাপ করবেনা বাংলাদেশ এইরকম ধারনা করাই যায়। অন্তত বাংলাদেশ গ্রুপ পর্বের ম্যাচ গুলা ঘরের মাটিতে খেলতে চাইবে এশিয়ায় হওয়া বিশ্বকাপে। সাথে একটা কোয়ার্টার ফাইনাল হলে বোনাস! গতবার বিশ্বকাপের অনুদানের টাকায় মিরপুর, চট্টগ্রামের চেহারাই বদলে গিয়েছিলো। এমনকি রিজার্ভ ভেন্যু ফতুল্লা বা খুলনার ড্রেনেজ সিস্টেম থেকে গ্যালারী সব আধুনিক হয়েছে বিশ্বকাপের টাকায়। বিসিবি নিশ্চয় এই সুযোগ আবার চাইবে! পাশাপাশি পূর্বাচলে বিসিবির নিজস্ব স্টেডিয়ামের কাজ শুরু হয়েছে, ৭৫ হাজার ধারন ক্ষমতার সেই স্টেডিয়ামে একটা বিশ্বকাপের ম্যাচ হলে মন্দ কি??

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top