বিশেষ

রূম্মান আহমেদ- অপুরান পুরাতনতা, অথবা….

রুম্মান আহমেদ আর্টসেল নিয়ন আলোয় neon aloy

গানে কথা অধিক ভূমিকা রাখে, নাকি সুর- এ লড়াই কোনোদিন শেষ হবার নয়। উভয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ স্বীকার করেও নিজ অংশকে একটু এগিয়ে রাখার প্রচেষ্টা গীতিকার ও মিউজিশিয়ান উভয়ের মাঝেই বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথ যদিও সহজ ফয়সালা করেছিলেন উভয়ের মাঝে বিয়ে দিয়ে। তাঁর ভাষায়, ‘বাক্য যা বলতে পারে না, সুর তাই বলে। কথার যেখানে সারা, সেখানেই গানের শুরু’। সোজা কথা, কবিতার অনির্বচনীয় ভাবটিই ব্যক্ত করে সুর, এরা একে অন্যের পরিপূরক। আমার ব্যক্তিগত মতে, সুর গানের জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘস্থায়ীত্ব লাভের কারণ, আর কথার মান দিয়ে গানটি টিক থাকে যুগ যুগান্তর।

আমাদের ব্যান্ড সংগীতে অনেক কবি-ই নিয়মিত লিরিক লিখেছেন। কিন্তু তাদের কেউই যেহেতু সুরকার নন, মূলত তাদের কাব্যানুভূতি প্রকাশ পেয়েছে অন্য আরেকজনের কাব্যবোধের ক্ষমতানুযায়ী। একইভাবে সুরকারদের অনেকেই কবি না হওয়ায় তাদের সুরে বলতে চাওয়া কথা উঠে এসেছে অন্য কারো লেখায়। মাকসুদুল হক, সঞ্জীব চৌধুরী, জিয়াউর রহমান- বাংলাদেশে ব্যান্ড আন্দোলনের এই তিনজন সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ট্রেন্ড সেটার লিরিসিস্ট নিজেরাই নিজের লেখা গানের সুরকার হওয়ায় সর্বাধিক সফলভাবে কথা ও সুরের আত্মিক মিলন তারা ঘটাতে পেরেছেন। কিন্তু সংরাইটার-কম্পোজার না হয়েও আরেকজন লিরিসিস্ট বাংলাদেশের ব্যান্ড সিনে অসংখ্য অনুরাগী তৈরি করতে পেরেছেন, গত এক যুগের ব্যান্ড লিরিকে তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড সেটারের নাম। রূম্মান আহমেদ, আর্টসেল-এর রূম্মান নামে যাকে সবাই চেনেন।

রুম্মান আহমেদ আর্টসেল নিয়ন আলোয় neon aloy

আর্টসেলঃ রুম্মান আহমেদের কথাগুলোকে জীবন দিচ্ছে যাদের সুর!

লিরিসিস্ট? না বোধহয়, রুম্মানকে জোর করেই কবি থেকে লিরিসিস্ট বানিয়েছিলেন আর্টসেলের সদস্যরা, বিশেষভাবে ছোটবেলার বন্ধু এরশাদ। রূপকের অকাল মৃত্যুর পর কবি রূম্মানের কবিতাগুলোকেই সুরের কাঠামোতে খাপ খাইয়ে নিয়ে তৈরি হয়েছে আর্টসেলের বিখ্যাত গানগুলো। ছুরিকাঁচি হাতে ব্যান্ড মেম্বারদের সুরকে অগ্রাধিকার দিয়ে মিটারে ফেলার চেষ্টা আর চেঁচামেচি-ঝগড়াঝাঁটি করে নিজের কবিতার প্রতিটি শব্দ রক্ষার মধুর লড়াই একে একে তৈরি করেছে ‘অবশ অনুভূতির দেয়াল’ বা ‘শহীদ সরণী’র মত প্রতিটি গান। মূলত এরশাদ ও রূম্মানের ক্রিয়েটিভ পার্টনারশিপই আর্টসেলের ইন্টেলেকচুয়াল সাইডটুকু কভার করে এসেছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, বাকি মেম্বারদের কাছে মিউজিক্যাল পার্টটুকুই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সবসময়।

রুম্মান আহমেদ আর্টসেল নিয়ন আলোয় neon aloy

সস্ত্রীক রুম্মান আহমেদ, সাথে আর্টসেল

রবীন্দ্রনাথ কবিকে বলেছেন ‘সংগীত নির্মাতা’। অন্ধকারের অভ্যন্তরে অনন্ত মৃত্যুর সাথে মিশে থাকতে চাওয়া জীবনানন্দ দাশের অন্ধভক্ত রূম্মানের সংগীতকার অংশ হিসেবে ‘আর্টসেল’ সহজেই মিশে গিয়েছিলেন তার কারণ, তারা ছোটবেলার বন্ধু, তারা একই সময়ে কাছাকাছি আবেগ পেরিয়ে একই সাথে তারুণ্যকে ছুঁয়েছিলেন। বিষাদের আভা ছড়ানো অন্ধকারা গীতিকাব্য নিয়ে রূম্মান তাই লিখতে পারেন ‘কোথায় আলোর উৎসবে স্বপ্নের প্রতিবিম্ব ভাঙে’-র মত লাইন, সমবয়সী প্রেমিকার বিয়ের উৎসব দেখার পর বাঙালি যুবকের নিয়মমাফিক হৃদয় ভাঙার সুর সে লাইনে প্রপারলি ব্যবহার করতে পারেন তাই লিংকন-এরশাদরাই। রূম্মানের লেখার অন্ধকার ও অলস নিসর্গভারাতিভুরতা ঐসময়ে এবং আজ অবধি তরুণদের ডেকে নেয় এক বিষাদিত স্বতঃস্ফূর্তিতার দিকে। ‘অনিকেত প্রান্তর’ দিয়ে রূম্মান যেমন তার লেখনীশক্তির একচেটিয়া প্রদর্শনী করেছেন, তেমনি ‘স্মৃতি স্মারক’ লেখায় প্রবাস গমনের পূর্বে বন্ধুদের শেষ আড্ডার স্মৃতিও তুলে এনেছেন নিজস্ব স্টাইলে।

রুম্মান আহমেদ আর্টসেল নিয়ন আলোয় neon aloy

শহরের কোন এক সোডিয়াম বাতির নিচে রুম্মান আহমেদ, সাথে আর্টসেলের লিড গিটারিস্ট এরশাদ জামান এবং লেখক।

রূম্মান বাংলা ব্যান্ডে বোধহয় প্রথম ডুয়েলিটি নিয়ে এসেছিলেন ‘নির্জনতায় তোমার কোলাহল’ এর মত ফ্রেজ ব্যবহার করে। এমন রূপক আরো অনেক ব্যবহার করলেও রূপক ও উপমার ব্যবহারে বারবার জীবনানন্দের প্রভাব ফুটে উঠেছে রূম্মানের লেখায়। তবে রূম্মানের আরেকটি শক্তিশালী দিক তার রাজনৈতিক কবিতাগুলো, ‘অনিকেত প্রান্তর’ নিয়ে চারদিকে মাতামাতি হলেও আমি রূম্মানকে চিনতে চাই ‘শহীদ সরণী’ লিরিক দিয়ে, যা নি:সন্দেহে আমার কাছে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ‘প্যালেস্টাইন’ এর মত অনন্য পলিটিকাল লিরিকগুলোতে ঘুরে ফিরে প্রায়ই উঁকি দিয়ে গেছে তার রজার ওয়াটার্স অনুরাগও।
রাজনৈতিক লিরিকগুলো দিয়ে রূম্মান অজান্তেই একটা বিশ্রী সমস্যা তৈরি করে গেছেন যদিও। আর্টসেল পরবর্তী প্রতিটি নতুন ব্যান্ড-ই ‘ধূসর’, ‘কাঁটাতার’, ‘অবয়ব’ ইত্যাদি ট্রেডমার্ক কিছু শব্দ পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে এক অদ্ভুত অর্থহীন লিরিক পয়দা করতে সচেষ্ট হয়ে পরেন, যারা আদতে আর্টসেল লিরিকের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের আশপাশ দিয়েও না ভিড়ে শাব্দিক ফ্যাশনটাকেই নিয়েছেন।
এও বা কম কি? যেভাবেই হোক, একটা গোটা প্রজন্মের কাজে লিরিক্যাল ইন্টেলেকচুয়ালিটির প্রয়োজনীয়তা বোঝানো এবং নিজের প্রভাব রেখে যাওয়ার কাজ সবাইকে দিয়ে তো আর হয়নি।

আর্টসেলের গান জনপ্রিয় হবার পেছনে যতটুকু তাদের মিউজিক্যাল ইউনিকনেস ভূমিকা রেখেছে, প্রায় সমগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাতে রূম্মানের কাব্যিক লিরিকের; যেভাবে জেমসের তুমুল জনপ্রিয়তাতেও বিশাল ভূমিকা রেখেছিলো তাঁর লিরিসিস্টদের কাজ। বিশেষ করে অন্ধকারাবৃত যে বিষাদের চিত্রকল্প রূম্মান লিরিকে এঁকেছিলেন, তা আর্টসেলের ডার্ক সাউন্ডের পেছনে বিশাল ভূমিকা রাখে এবং এই ডার্কনেসটুকুই তরুণদের আকৃষ্ট করে বুকের একদম আপন জায়গাটাতে আর্টসেলকে ‘আর্টসেলিজম’ হিসেবে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাখতে। রিলিজের দশ বছর পরও এখনো আর্টসেল সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে সবচেয়ে কমন প্রশ্নগুলো তাই লিরিক কেন্দ্রিকই হয়- ‘স্বপ্ন এখন এগারো সাতাশ’ বা ‘অনিকেত প্রান্তর’-র মানে কি?

বাংলা ব্যান্ডের কথাকে একঘেয়ে দৈনন্দিনতা ও প্যাঁচাল থেকে মুক্ত করে কবিতার আলোকিত অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলার পেছনে রূম্মান প্রথমসারির অপরাধী। ‘আধুনিক কবিতা যে হারে এগিয়েছে, আধুনিক গানের কথায় তার প্রতিফলন ঘটেনি’- কবিতাকেই টেনে গানের মাঝে যৌক্তিকভাবে খাপ খাইয়ে এ অভিযোগ দুমড়েমুচড়ে দিয়েছেন আর্টসেল ও রূম্মান। লিরিকের বঙ্গানুবাদ যে আসলে ‘গানের কবিতা’, তা হাড়েহাড়ে জানিয়েছেন তারা। ‘স্মৃতিস্মারক’-এর মত কিছু গানে এই মেলবন্ধন শতভাগ ক্লিক না করলেও সফলতার অনুপাতে কয়েকটি এমন ক্ষুদ্র অতৃপ্তি চোখে না লাগার মতই।

রুম্মান আহমেদ আর্টসেল নিয়ন আলোয় neon aloy

রুম্মান আহমেদ এবং লেখক ইশতিয়াক ইসলাম খান

পাললিক বাঙলা মাঝারির মাতৃভূমি, আকাশছোঁয়া প্রতিভা এখানে কদাচিৎ জন্মে, মাঝারি প্রতিভারাই যুগে যুগে রাজত্ব করে। রূম্মান চিরকালই তারকাময় আলো থেকে দূরে থেকেছেন, রয়ে গেছেন তার লেখালেখির অন্ধকারের মাঝেই। কড়া আর্টসেল ভক্তদের অনেকেই তাই জানেন না তার সম্পর্কে, জানেন না তার অতীত বা বর্তমান নিয়ে। সর্বশেষ রচনা ‘স্পর্শের অনুভূতি’ দিয়ে রূম্মান তার কবিত্ব ও লিরিসিস্ট স্বত্ত্বার সর্বাধিক ম্যাচিউরিটি দেখালেও তার সামগ্রিক লেখালেখির তালটা কোথায় যেন কেটে গেছে। প্রবাসজীবনের যান্ত্রিকতার জন্যেই কি? নাকি……?

মানুষ প্রজাতির সাফল্যের বিকাশ ঘটতে ঘটতে যেদিন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তাদের মাঝে কেউ কেউ স্বপ্ন-আবেগ-উপলব্ধিকে শব্দে ন্যাস্ত করতে শুরু করে, লৌকিক প্রতিবেশে যার অলৌকিক ক্ষমতার নাম দেয়া হয় কবিত্ব- সেদিন দেখা দেয় এক দুর্মর সমস্যার। তথাকথিত সফল আর ঐ কবিদের মাঝে এক অস্বস্তিকর সম্পর্কের জন্ম হয়। সফলরা কবিদের অবদান অস্বীকার করতেও সাহস পান না, আবার তাদের সাফল্যে কবিদের প্রাপ্য ভাগ দিতেও ঈর্ষা বোধ করেন। এই জাগতিক দ্বন্দ্বের মাঝে তীব্র উপহাস আর অভিমান নিয়ে যারা সরে দাঁড়ান, তারাই বোধহয় কবি। বাকিরা?
‘বিখ্যাত’ বা ‘জনপ্রিয়’!

রূম্মান ভাই, আমার কৈশোর-তারুণ্য জুড়ে বিষাদের অভয়ারণ্য গড়ে তোলা ধূসর সময়গুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা। আমি ইদানিং অনেক রাতে কান্নাগুলোর নীরব হবার শব্দ পাই, আপনি কি এখনো পান? নিজের, বা আপনার মতই অন্য কারো?
জানি না, জানাবেন।

লেখকঃ ইশতিয়াক ইসলাম খান,
লিরিসিস্ট, আর্টসেল।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top