ক্ষমতা

কেন পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করতে বাধ্য হই?

বাংলাদেশ পাকিস্তান তুলনা নিয়ন আলোয় neon aloy

পাকিস্তানের লাল মসজিদে চালানো অপারেশন সানরাইজ এর ঘটনা কার কতটুকু মনে আছে জানিনা। নেটফ্লিক্সে এটা নিয়ে ডকুমেন্টারি এসেছে সেই অপারেশন নিয়ে, নাম ‘Among the Believers‘। দেখে আসলে ইমোশনাল হয়ে গেলাম। ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তান দেশটার প্রতি কখনো পজিটিভ কিছু ফিল করিনাই। আজকে প্রথমবারের মত জরিনাদের জন্য ব্যাপক মন খারাপ করে বসে আছি। ডকুমেন্টারীটা বাংলাদেশের এলাকায় এলাকায় বাংলা ডাবিং করে দেখাতে পারলে ভালো হতো।

বিশাল কাহিনীর চুম্বকাংশ

আফগানিস্তানের যুদ্ধফেরত মাউলানা আজিজের হাত ধরে লাল মসজিদের মাদ্রাসায় উগ্রবাদের চর্চা চলে। সারা দেশে মাদ্রাসাগুলি হয়ে উঠে ঘৃণার চাষাবাদের কেন্দ্র। আফগানিস্তানের যুদ্ধের আগে সেখানে ৬০০০ এর মত মাদ্রাসা ছিলো যেখানে সংখ্যাটা এখন ৪০০০০ এর মত। লাল মসজিদ আর মাউলানা আজিজ নাটের গুরু। বিভিন্ন জায়গা থেকে গরীব পরিবারের বাচ্চাকাচ্চাদের আনা হয়। ছাত্রদের শিখানো হয় অস্ত্র চালানো। বাড়তে বাড়তে একটা পর্যায়ে এরা শরীয়া আইনের দাবিতে তাণ্ডব শুরু করে। বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ স্কুল বন্ধ করে দেয়। একপর্যায়ে সরকার এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় এবং মসজিদ ঘেরাও করে। ভিতর থেকে ঘোষণা দিয়ে আক্রমণ করা হয়। যুদ্ধ শুরু হয় বলা চলে। অনেকে মারা যায়।

প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশররফ ঘোষণা দিলেন, “১২০০-১৪০০ ছাত্রছাত্রী আত্মসমর্পণ করেছে। ভিতরে এখনো অনেকে আছে, যাদেরকে আত্মসমর্পণ করার জন্য অনুরোধ করছি। যদি না করেন, তাহলে আমি এখনি বলছি আপনাদের মেরে ফেলা হবে।“ রাত্রের অন্ধকারে এই মাদ্রাসার নাটের গুরু আজিজ বোরকা পরে পালাতে যায় এবং পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। তাকে সাথে সাথে লাইভ টিভিতে নেয়া হয়। তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে কেন সে একা পালাচ্ছিল। তার জবাব, “আমি যদি না পালাতাম তাহলে ভিতরের ছাত্ররা মারা পড়তো আমাকে রক্ষা করতে গিয়ে।” চিন্তা করেন কি রকমের শয়তান একটা লোক হতে পারে। বোরকা পরার কারণ জিজ্ঞেস করায় তার জবাব, “শরীয়াতে আছে যুদ্ধ থেকে পালানোর সময় যে কোন কৌশল অবলম্বন করা যাবে।” এই অভিযানে পুলিশ, ছাত্র, মিলিটারী সব মিলিয়ে ১৫০ জন মারা যায়। মাউলানা আজিজ জেলে যায় এবং দুই বছর পরে বের হয়ে যায়।

এই অপারেশনের পর থেকেই রেগুলার বেসিসে পাকিস্তানে জঙ্গী হামলা শুরু হয়। ২০০৭ থেকে ২০১৪ এর মধ্যে ৩৭০০ জঙ্গী হামলায় ১২০০ স্কুল ধ্বংস হয়। ৫০,০০০ মানুষ মারা যায়।

২০১৪ সালে মাউলানা আজিজ আইসিসকে প্রকাশ্যে সাপোর্ট দেয়। পেশোয়ারে এক স্কুলে হামলা হলে ১৪১ জনের মত স্টুডেন্ট মারা যায়। তারপরে পাকিস্তানীরা রাস্তায় নামে বিক্ষোভে। মাউলানা আজিজকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে শয়তানের বাচ্চা বলে, “খুব খারাপ লাগছে। আল্লাহ সাক্ষী এই বাচ্চাদের জন্য আমার মন কেঁদেছে। আমার দেশেরই তো বাচ্চা। কিন্তু এগুলো তো তালিবান হত্যার রিভার্স এফেক্ট। চোখের বদলা চোখ।”

মাউলানা আজিজ জেলে যায় আবার ২০১৫ সালে। পাকিস্তানে বোমা হামলা, জঙ্গিবাদের আগ্রাসনের ব্যাপারে আমরা সবাই জানি কম-বেশি। ধর্মের নামে বাড়াবাড়ির সর্বশেষ নিদর্শন হয়ে গেলো কয়েকদিন আগে। ইসলাম অবমাননার দায় দিয়ে এক ইউনিভার্সিটির ছাত্রকে গনপিটুনীতে মারা হয়েছে। কিন্তু পিছনের কারণটা ছিল অন্য। পাকিস্তানে এইরকম ব্লাসফেমির ঘটনা আরও আছে। জমিজমা নিয়ে বিরোধ? রাজনৈতিক মতভেদ? খালি বলো যে ইসলাম নিয়ে কটূক্তি করেছে। ব্যস, হাজারে হাজারে কুকুর হামলে পড়বে মেরে ফেলার জন্য।

পাকিস্তান ২০০৭-০৮ এর দিকে যেমন ছিলো আমাদের দেশটার বর্তমান অবস্থা প্রায় একই। লাল মসজিদে অ্যাটাক করলে যারা এখনো এটাকে ইসলামের উপরে এটাক এই বলে তাদেরকে ডিফেন্ড করে যাচ্ছেন, জেনে রাখবেন এদের বোমাটা শফী হুজুরের উপর পড়বেনা, আন্দালিব পার্থ, লেজেহোমো এরশাদের উপর পড়বেনা। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকির মত যারা ব্যালেন্স তত্ব দিয়ে ধর্ম নিয়ে কথা বলা আর একটা মানুষকে খুন করে ফেলাকে সমান বানিয়ে ফেলছেন তারা জেনে রাখুন এরা পাওয়ারে গেলে প্রথম বেতের বাড়িটা মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীদের পশ্চাদ্দেশেই পড়বে নাটক সিনেমার নামে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার অপবাদ দিয়ে। পড়লেও হয়তো টাকার জোরে বেঁচে যাবে। বড় বড় নেতারা যারা এই জঙ্গিবাদের নাটের গুরুগুলিকে পেলে পুষে বড় করছে, একটু খোঁজ নিলে দেখবেন সবার বাচ্চা কাচ্চা দেশের বাইরে। নিজেরাও একসময় চলে যাবে। সবার বিদেশে একটা করে খুঁটি আছে। সুতরাং পেশোয়ারের মত কোন স্কুলে যখন বোমা হামলা হবে সেখানে আপনার আদরের বাচ্চাটা থাকবে।

দিনশেষে আমরা আমজনতারাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো। তখন যতই কান্না করেন যে একদিন “নাস্তিক কোপানো ঠিক হয়নাই, কিন্তু ইসলাম নিয়ে কথা বলাও উচিত হয়নাই” এই কথাটা বলে সন্ত্রাসীদেরকে আপনিই ডিফেন্ড করেছেন এটা মিথ্যা হবেনা।

এন্ড ইউ নো হোয়াট? যতই আপনি “জঙ্গিবাদ ইহুদী নাসারা আম্রিকার সৃষ্টি” বলে কান্নাকাটি করেন, লাল মসজিদের ভিতরে মারা যাওয়া লোকেরা বা তাদের হামলায় মারা যাওয়া একটা মানুষও ইহুদী নাসারা না।

সবচাইতে টাচি লেগেছে জরিনা নামের একটা বাচ্চার গল্প। তাকে লাল মসজিদের মাদ্রাসায় দেয়া হয়েছিলো। সে এখান থেকে পালিয়ে বাসায় ফেরত যায়। অন্য একটা স্কুলে ভর্তি হয়। তার বাবা এই মেয়েকে বাচ্চাকালে বিয়ে দিতে চায়নি। সে চেয়েছিল মেয়েটা পড়বে। জঙ্গি হামলার ভয়ে স্কুলটা বন্ধ হয়ে যায়। পরে এই জরিনার বিয়ে দিতে হয়। খুব সম্ভবত ১২ বছর বয়স ছিলো তখন মেয়েটার।

প্যারালালি আরেকটা বাচ্চা ছেলের কাহিনীও দেখায়। এই ছেলে লাল মসজিদে এসে এমন ব্রেইনওয়াশড হয় আর কাফেরদের জন্য এতই ঘৃণা জন্মায় তার মনে যে সে আর বাসায় যেতে চায় না। তার বাবা নিতে আসলেও যাবেনা সে। তার জীবনের লক্ষ্য ননমুসলিম কাফের মারা।

দেশ কই যাচ্ছে বোঝার জন্য এই ডকুমেন্টারীটা অবশ্যই দেখা উচিত। এবং একটা ব্যাপার সবারই বোঝার সময় আসছে। আমজনতা মানে আমজনতা। রাজনীতির গুটি কিন্তু কেউ ফিরে তাকায় না। সেইজন্য নিজেদের ভালো নিজেরা না বুঝলে কয়দিন পরে বোমা খেয়ে, বা প্রিয়জনকে বোমা খাওয়া ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে কান্নাকাটি ছাড়া কিছু করার থাকবেনা। পেশোয়ারের স্কুলটার দেড়শ বাচ্চা এবং তাদের পরিবারেরও কিছু করার ছিলোনা।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top