টুকিটাকি

শুধুমাত্র চাটগাঁইয়ারাই কি চায়ে বিস্কুট চুবিয়ে খায়?

চায়ে বিস্কুট চুবানো নিয়ন আলোয় neon aloy

বিভিন্ন এলাকার মানুষজন এর কাছে কমপ্লেইন শুনলাম যে চা-তে বিস্কুট বা অন্যকিছু চুবিয়ে খেলে নাকি চাঁটগাইয়া বলে প্রমাণিত হয়। এই ব্যাপারে কিছু কথা শুনানোর জন্য লিখছি। বুঝে শুনে পড়বেন।

কোন শুকনা খাবার কোন পানীয়তে (বিশেষ করে চা,কফি,দুধ,বিয়ার) চুবিয়ে খাওয়া কে Dunking বলে। জানা মতে খ্রীষ্টপূর্ব সাল থেকে রোমানরা ওয়াইনে শক্ত খাবার চুবিয়ে খাবার প্রথা চালু করে। ১৬ শতকে প্রথম প্রথম বিস্কুট যখন আবিষ্কার হয় তখন ইংল্যান্ডের নৌবাহিনীর জন্য Hard Tack নামক বিস্কুট তৈরি করা হত। এটা এত শক্ত ছিল যে তারাও বিয়ারে চুবিয়ে এই বিস্কুট খেত। আসলে বিস্কুট শব্দের অর্থ হল “দু’বার সেঁকা” তাই দুইবার বেকিং করতে গিয়ে অনেক শক্ত হয়ে যেত তখনকার বিস্কুটগুলো।

এই আধুনিক যুগে অনেক বিখ্যাত বিস্কুট কোম্পানি তাদের বিস্কুট চুবিয়ে খাবার জন্য প্যাকেটে লিখে দেয়। যেমন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত বিস্কুট McVitie’s chocolate digestive কে কোম্পানি চা বা দুধে চুবিয়ে খেতে বলে, আমেরিকার বিখ্যাত Oreos বিস্কুট দুধে এবং Dunkin’ Donuts franchise কে কফিতে চুবিয়ে খাবার জন্য লেখা থাকে প্যাকেটে। ভিক্টোরিয়ান যুগে বিকালের চা’তে বিস্কুট চুবিয়ে খাওয়া টা সারা বৃটেনে প্রথা হয়ে যায়। বৃটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত সব দেশেই এটা ছড়িয়ে পরে। আমরাও বৃটিশদের কাছ থেকেই চায়ে বিস্কুট চুবিয়ে খাওয়া শিখেছি। তবে ইদানিং ব্রিটিশ রেস্টুরেন্টগুলো দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে এটা নিয়ে। যেসব খুব দামী রেস্টুরেন্ট সেগুলো তাদের ভেতরে বসে চায়ে চুবিয়ে কিছু না খেতে বলে। কিন্তু মধ্যবিত্তদের রেস্টুরেন্টগুলোতে এখনো সব চলে আগের মত।

এবার একটু বৈজ্ঞানিক কথাবার্তা বলি। লুকাস-ওয়াসবার্ন সমীকরণ নামে একটা বিশাল জটিল সমীকরণ আছে যেটা কৈশিক ছিদ্রযুক্ত জটিল বস্তুর সমান্তরাল নালিকাগুলোতে তরলের প্রবাহ নিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী ড. লেন ফিশার এই সূত্রের পরীক্ষা করে দেখান যে বিস্কুটের ভেতর তরলের বিচ্ছিন্ন প্রবাহ লুকাস-ওয়াসবার্ন সমীকরণের একটা প্রমাণ। তার এই জটিল সমীকরণের সাথে চায়ে বিস্কুট চুবানোর মত তুচ্ছ বিষয়ের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়ায় রঙ্গ করে তাকে IG Nobel Prize পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। সাধারণত যেসব বৈজ্ঞানিক গবেষণা মানুষের মনে হাস্যরসের জন্ম দেয়, সেগুলোকেই ইগ নোবেল প্রাইজ দিয়ে “সম্মান” জানানো হয়।

২০১২ তে বৃটিশ শেফ Heston Blumenthal এর আগ্রহের এবং চ্যালেঞ্জিং এর জন্য নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা MS Nose নামক এক বিশেষ ফ্লেভার পরিমাপক যন্ত্র বানান। বিস্কুট খাবার সাথে সাথে আমাদের মুখ থেকে বের হওয়া বিস্কুটের ফ্লেভারের উপাদান মিথাইল বিউটানল নামক ক্যামিকেল এর অস্তিত্ব বুঝতে পারে এই যন্ত্র। এই যন্ত্রের সাহায্যে তাঁরা দেখেন যে চায়ে চুবানোর পর বিস্কুট মুখে দিলে এই মিথাইল বিউটানল ৮-১০ গুন বেশি পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ বিস্কুটের স্বাদ বেশি মনে হচ্ছে। এরপর সন্দেহ দূর করার জন্য প্রফেসর সাচা মিউনি ছোট বস্তুর আনবিক গঠন বুঝার জন্য স্পেশালি বানানো এক্সরে আর সিটি স্ক্যান মেশিনের সাহায্যে শুকনো বিস্কুট আর চা তে ভেজানো বিস্কুটের ছবি তুলে দেখেন যে চায়ে ভেজানোর পর বিস্কুটের আনবিক গঠনে পরিবর্তন হয়ে গেছে। অর্থাৎ নিঃসন্দেহে চায়ে ভিজিয়ে খেলে শুকনা খাবারের স্বাদ বাড়ে।…
যাক, অনেক কথা বলে ফেললাম। তাই চায়ে ভিজিয়ে খাওয়াকে ব্যাকডেটেড না বলে স্পেশালি চাঁটগাইয়াদের স্বভাব না বলে এর পেছনে আসল কারণ জেনে নির্বিঘ্নে খেতে পারেন।

তথ্যসুত্র
www.telegraph.co.uk
www.wikipedia.org
www.teadunking.co.uk
www.npr.org
www.biscuitpeople.com

Most Popular

To Top