ক্ষমতা

সেকুলারিজম কি, এবং সেকুলারিজম কেন প্রয়োজন?

সেকুলারিজম নিয়ন আলোয় neon aloy

যেহেতু মানে না জেনেই অযথা অনেকেই লাফাযন সাধারণত, তাই ‘সেকুলারিজম’ শব্দটার আভিধানিক অর্থ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করলাম।

সেক্যুলারিজম কি?

সেক্যুলারিজম হচ্ছে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির সাথে ধর্মীয় সংগঠন বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাবকে আলাদা করার নীতি। এর মানে হচ্ছে রাষ্ট্র কখনো কোন মানুষকে তার ধর্ম দিয়ে বিচার করবেনা। রাষ্ট্রের কাছে সব ধর্মের মানুষ বা সংগঠন সমান অধিকার পাবে।

সেক্যুলারিজমের সাথে ধর্মহীনতার সম্পর্ক কতটুকু?

কোন সম্পর্ক নাই, আবার আছে। মূলনীতি অনুযায়ী সেক্যুলার রাষ্ট্র ধর্মের জন্য কারো প্রতি কখনো অসম আচরণ করবেনা। রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকবেনা এবং রাষ্ট্রের মানুষের ধর্মীয় পরিচয় তার কাছে মুখ্য না। একজন মানুষ হিন্দু হোক, মুসলিম হোক, বৌদ্ধ হোক, খ্রিস্টান হোক বা প্রচলিত ধর্মব্যবস্থাগুলির কোনটা অনুসরণ না করুক সে রাষ্ট্রের যে কোন পদে কাজ করতে পারবে, তার নিজস্ব বিশ্বাস সে ব্যক্তিগত জায়গায় রাখতে পারবে। কিন্তু যখন পদের দায়িত্ব পালন করতে হবে তখন ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত খোলসের বাইরে আসতে পারবেনা। দেশের প্রধানমন্ত্রী যে কোন ধর্মের হোক ব্যাপার না। কিন্তু রাষ্ট্রের কোন ব্যাপারে সেটা প্রভাব ফেলতে পারবেনা। সুতরাং সেক্যুলারিজম মানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাধ্যতামূলক ধর্মহীনতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্ম কোন ফ্যাক্টর না।
রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সময় যে ভোট দেয়া হয় সেখানে যেমন ধর্ম কোন ফ্যাক্টর হয়না ভোটের ওজনের ক্ষেত্রে, ঠিক তেমনি সেই ভোটার রাষ্ট্রের কাছ থেকে সেবা নেয়ার সময় কোন বৈষম্যের স্বীকার হতে পারবেনা। টাকার যেমন কোন ধর্ম হয়না, রাষ্ট্রেরও তেমনি হতে হবে।

উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, রাষ্ট্র অনুমোদিত কোন স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের সময় নিয়োগদাতাদের সবসময় প্রাধান্য দিতে হবে যোগ্যতর প্রাথীদের। ৩ জন নিয়োগদাতাই যদি মুসলিম হয়ে থাকেন তাহলেও তারা যেন কোন মুসলিম প্রার্থীকে অন্য ধর্মের প্রার্থীর চাইতে বেশী প্রায়োরিটি না দেন। কিন্তু নিজস্ব ব্যক্তিগত জীবনে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করার ১০০% অধিকার তাদের থাকবে। তেমনি প্রার্থীরও থাকবে।

সেক্যুলার রাষ্ট্র কেন দরকার?

কোন ব্যাখ্যায় না গিয়ে দু’টা উদাহরণ দেবো।

সামহোয়ারইন ব্লগে চেয়ারম্যান০০৭ নামে একজন চমৎকার ব্লগার ছিলেন। উনার ফানি লেখাগুলি আসলেই খুব ভালো লাগতো। হঠাৎ উনি ধর্মকর্মের দিকে মনোযোগ দিলেন। তারপরে উনার যে অবস্থা হলো সেটাকে আমি সাধারণত গোঁড়া/উগ্র বলি। আমার পরিচিত অনেক চমৎকার মানুষকেই হঠাৎ এমন বদলে যেতে দেখেছি। আমি বিশ্বাস করি যারা ধর্মকর্ম রেগুলার করে তারা আসলে ব্যক্তিগত জীবনে শান্তির জন্যই করে। মানুষের মন অনেক বিচিত্র। একেকজন একেকভাবে শান্তি খোঁজে। কেউ ধর্ম, কেউ সঙ্গীত, কেউ সাহিত্য, কেউ পরোপকার করে। বড় বড় ঐতিহাসিক ধার্মিকদের প্রচলিত জীবনী পড়ে সবসময় দেখে এসেছি উনারা সহনশীল, দয়ালু টাইপ, বুকভরা ভালোবাসা। কিন্তু প্রচুর উচ্ছল কাউকে যখন হঠাৎ এভাবে বদলে যেতে দেখেছি, তখন বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই খেয়াল করেছি তারা সবকিছুকে অপছন্দ করা শুরু করে। ভিন্নধর্ম, ভিন্নমত, ভিন্ন সবকিছুই। যাইহোক ফেসবুকে কয়েক মাস আগে একদিন চেয়ারম্যান সাহেবের একটা পোস্ট দেখলাম যে উনার এক ভারতীয় বন্ধু একজন ফ্রিল্যান্সার খুঁজছেন। অমুক-তমুক রিকোয়ারমেন্ট। সবশেষে উনি লিখেছেন উনার একটা ব্যক্তিগত শর্তের কথা। “প্রার্থীকে নামাজী হতে হবে।” নিচে একজন কমেন্ট করেছেন “তাহলে যোগ্যতা থাকলেও ননমুসলিম নিবেন না”? উনি লিখেছেন “না”।
আমি সেই স্ট্যাটাসটা শেয়ার করেছিলাম ক্যাপশন দিয়ে “এইজন্য সেক্যুলার রাষ্ট্র দরকার।”

শাবিপ্রবিতে আমাদের ডিপার্টমেন্টে ২০১০/২০১১ সালের দিকে স্বরস্বতী পূজা করা চালু হয়। ২০১৩ এর দিকে জুনিয়র কিছু ছেলে (হিজবুত তাহরীরের সদস্য, একজন একজন জঙ্গীগিরি করতে গিয়ে জেলে) হঠাৎ ফতোয়া দিয়ে বসে যে এত মুসলিমের দেশে হিন্দুরা পূজা করতে পারবেনা। অনেক যুক্তি, এইটা সেইটা। যাইহোক, ডিপার্টমেন্টের সবাই ধর্মমত নির্বিশেষে অনেক সহযোগিতা করায় প্রতিবারই পূজা হয়ে আসছে।

যেই দুইটা উদাহরণ দিলাম, এদের মত লোকজন যখন রাষ্ট্রের পদে থাকবে এবং তারা তাদের ব্যক্তিগত ধ্যানধারণা তাদের ক্ষমতাবলে অন্যদের উপর চাপিয়ে দেবে তখন সেই রাষ্ট্র উন্নতি করতে পারবেনা। কারণ কোন একটা দায়িত্ব পালন করতে লাগে কর্মদক্ষতা। কোন ঘরে জন্ম, কালচার কি- এগুলো মুখ্য না। সহজ উদাহরণ, মসজিদের ইমাম বা মন্দিরের পুরোহিত কি যেকোন মুসলিম বা হিন্দুকে করা হয়? হয়না। যে একটা প্রসেস মেনে সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করেছে তাকে দেয়া হয়।

রাষ্ট্র সেক্যুলার না হলে শুধুমাত্র ভিন্নমতের মানুষদেরই সমস্যা হবে- তা না। সমগ্র রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাব পড়ে।
ধরা যাক ৪ জন বাংলাদেশী মিলে একটা কোম্পানিতে কাজ করে আর সেখানে একজন মাত্র অন্যদেশের লোক কাজ করে কিন্তু সে অনেক স্কিলফুল। যেহেতু বাংলাদেশীরা সংখ্যায় বেশী তাই এরা নিজেরাই সবকিছু ডিসিশন নেয়। বিদেশী অনেক বেটার সল্যুশন দিলেও সেগুলো বাংলাদেশীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বাদ দিয়ে দেয়। এতে যেটা হবে, বিদেশীর আর কাজের প্রতি, কোম্পানির প্রতি শ্রদ্ধা থাকবেনা। আর ৪ পণ্ডিত মিলে ভুলভাল ডিসিশন নিলে কোম্পানি দেউলিয়া হবে।

এইসব কারণে রাষ্ট্রের নিজের উন্নতির স্বার্থেই একটা রাষ্ট্রকে সেক্যুলার হতে হবে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। সব ধর্মের মানুষ সমান সুবিধা ভোগ করবে। সবার ধর্মকে ব্যক্তিগত লেভেলে রাখতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে ধর্মীয় ব্যাপারগুলো কনফ্লিক্ট করে সেগুলো ভদ্রতার সাথে সমাধান করতে হবে। দেশে মুসলিম বেশী বলে কোন হিন্দু প্রধান বিচারপতি হতে পারবেনা, দেশে হিন্দু বেশী বলে কোন মুসলিম গরু খেতে পারবেনা, দেশে খ্রিস্টান বেশী বলে সবার চার্চে যেতে হবে এইরকম গায়ের জোরে করা সিদ্ধান্ত কখনোই কোন রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক না। যেকোন কাজে প্রধান যোগ্যতা থাকবে কাজ করার সক্ষমতা, ধর্ম না। কোন কিছু আপনার পছন্দ না হলে করবেন না। কিন্তু কে কি করবে না করবে সেটা আপনি চাপিয়ে দিতে পারেন না। যে কোন কিছুর সাথেই ধর্ম প্যাচ লাগিয়ে অনেক কাজ করা যায়। বড় বড় শয়তানীও এর বাইরে না। সেটা এড়াতেই সেক্যুলারিজম প্রয়োজন। কারো ভালো লাগলে সে আইন মেনে মুরগী, খাসি, গরু, কুকুর, বিড়াল, সাপ, ব্যাঙ যা খুশী খাক। পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক কোন বিপর্যয় না হলে সেটাতে রাষ্ট্র আইন করে বাধা দিতে পারবেনা।

বিশাল ব্যাখ্যা দিলাম। এরপরেও যাদেরকে দেখবো গোঁয়ারের মত আবার “সেক্যুলার মানে নাস্তিক” এইসব ত্যানা প্যাঁচাতে, তাদেরকে আর কিভাবে এই সহজ বিষয়টা বুঝানো যায় তা আমার জানা নাই। সব মতের প্রতি আমার রেসপেক্ট আছে। কিন্তু অন্ধ হেটার এবং না জেনেই পণ্ডিত এইরকম লোকদের দেখলে বিরক্তি লাগে। আমি যেহেতু রাষ্ট্র না তাই আমার ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিরক্তি দুর করার ব্যবস্থা আমি করতেই পারি!

আজকাল কোন কিছু জানতে বেশী কষ্ট করা লাগেনা। মুক্তবিদ্যার যুগে ইন্টারনেটে সবই পাওয়া যায়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top