ফ্লাডলাইট

বিজয়োল্লাসে সম্পন্ন হল গুরুবিদায়

মাশরাফি নিয়ন আলোয় neon aloy

টি-২০ ফরম্যাটটা কখনোই পছন্দ ছিল না তাঁর। তারপরেও, খেলাটা যখন ক্রিকেট, তিনি তো খেলবেনই। ঘাড়ের রগটা বাঁকা করে চ্যালেঞ্জ করবেন নিজেকেই।

তাই তো, একটু খাটো লেন্থে অফ স্টাম্পের একটু বাইরের লাইনের বলটাকে যখন ব্যাকফুটে ঠেকালেন নুয়ান কুলাসেকারা, মাশরাফি বিন মর্তুজার আন্তর্জাতিক টি-২০ তে উইকেট সংখ্যা ৪২। বাংলাদেশী বোলার হিসাবে ৩য়, সিমার হিসাবে প্রথম।

ক্রিকেটের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত স্বীকৃত সংস্করণে শুরুটা করেছিলেন ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়ে দলকে জিতিয়ে। শেষ করলেন অধিনায়ক হিসেবে, সতীর্থদের কাছ থেকে জয় উপহার পেয়ে।

তামিমের ইঞ্জুরির কারণে ইমরুল কায়েস পেলেন মহা আকাঙ্ক্ষিত সুযোগ। পেয়েই নিজের হতাশাজনক টি-২০ পরিসংখ্যানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তেড়েফুঁড়ে সূচনা করলেন। ওপাশ থেকে সৌম্য হয়ে উঠলেন আরো হিংস্র। ফলাফল- পাওয়ারপ্লের ৬ ওভারে স্কোর ৬৮-০।

সৌম্য সরকার হ্যান্ড-আই কো-অরডিনেশনের উপরে নির্ভর করে খেলা একজন ব্যাটসম্যান। আর যেকোনো হ্যান্ড-আই কো-অরডিনেশনওয়ালা ব্যাটসম্যানের সাধারণ দুর্বলতা থাকে স্লোয়ার ডেলিভারিতে। পাওয়ারপ্লে শেষ হতেই চৌকষ উপুল থারাঙ্গা তাই নিয়ে আসলে গুনারত্নেকে। গুনারত্নের স্লোয়ারে বিপর্যস্ত হয়ে অসহায়ের মত তার হাতেই ক্যাচ তুলে দিলেন সৌম্য সরকার। রেকর্ড ওপেনিং জুটি ভাঙে ৭১ রানেই। একটু পরেই রানআউট ইমরুল কায়েস। যার ফলে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হলো সাব্বির রহমান ও সাকিব আল হাসানকে। তাড়া সে কাজটা করলেন, এবং ভালোভাবেই করলেন। অন্ততঃ দ্বাদশ ওভার পর্যন্ত। বাংলাদেশের স্কোর ১১৮/২,২০০ রানের চূড়াটাকে তখনো মামুলি টিলা মনে হচ্ছিলো। ১৩তম ওভার থেকে শ্রীলঙ্কান বোলাররা যা করল, তাকে অতিমানবীয় বললে খুব একটা ভুল বলা হবেনা। ১৩তম ওভার থেকে ১৭তম ওভারের ৩য় বল পর্যন্ত  ২৭ বলে এল মাত্র ২৩ রান। চলে গেল সাকিব ও সাব্বির রহমানের ২টি মূল্যবান উইকেট।

সৌম্য সরকার নিয়ন আলোয় neon aloy

পাওয়ারপ্লে’তে ব্যাট হাতে চড়াও সৌম্য

২০০ রানের সংগ্রহটি যে দু’পা দূরের মামুলি টিলা হতে সুদূর সুউচ্চ এভারেস্ট হয়ে উঠল আর বাংলাদেশ দলকে থামিয়ে দিল ১৭৬ রানে, তার পেছনে এই ২৭ বলের অবদান সবচেয়ে বেশি।
এরপর মোসাদ্দেক হোসেন,মুশফিকুর রহিমরা কিছুটা রান তোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ওয়ানডে ক্রিকেটে তিনবার হ্যাটট্রিক করার অনন্য রেকর্ডধারী ‘হ্যাটট্রিক-স্পেশালিস্ট’ লাসিথ মালিঙ্গার খায়েস হল টি-২০ তেও হ্যাটট্রিক করার। করলেনও। ফলাফল গুরু মাশরাফির গোল্ডেন ডাকে ক্যারিয়ার শেষ, মেহেদী মিরাজের গোল্ডেন ডাকে শুরু। এছাড়া সাথে ছিল ট্রেডমার্ক ডেথ বোলিং, সব মিলে শেষটা একেবারেই ভাল হয়নি বাংলাদেশ দলের।

১৭৬ রানের লক্ষ্য। পুরোটা সময়ে শুধুমাত্র চামারা কাপুগেদারা ও থিসারা পেরেরার ৬ষ্ঠ উইকেট জুটিটি ছাড়া শ্রীলঙ্কা দলকে একটু সময়ের জন্যেও খেলায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। সতীর্থরা যেন পণ করে নেমেছিলেন, গুরুকে জয় উপহার দেবেনই দেবেন। জান-প্রাণ লাগিয়ে ফিল্ডিং করেছেন। প্রতিটি রান, প্রতিটি বাউন্ডারি আটকাতে, প্রতিটা ক্যাচ ধরতে ছুঁড়ে দিয়েছেন নিজের শরীর। বোলাররা প্রতিটা বলে এটাক করতে চেয়েছেন, উইকেট নিতে চেয়েছেন। এমনভাবে খেলেছেন তাঁরা, যেন গুরু মাশরাফির নয়, পুরো দলেরই জীবনের শেষ ম্যাচ এটি। আর এতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাকিব আল হাসান নিজেই।

শুরুটা করেছিলেন সাকিব আল হাসান, প্রথম ওভারের ২য় বলে ডেঞ্জারম্যান কুশল পেরেরাকে তুলে নিয়ে। নিজের ২য় ওভারে তুলে নিলেন দিলশান মুনাবীরাকেও। এরপর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ তুলে নিলেন লঙ্কান অধিনায়ক উপুল থারাঙ্গার উইকেট। মুস্তাফিজুর রহমান নিজের প্রথম ওভারে জাগিয়েছিলেন হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও। ফলে ৪০ রানেই শ্রীলঙ্কার নেই ৫ উইকেট। এরপর কাপুগেদারা আর থিসারা শুরু করলেন লড়াই। লড়াইটা গেল ৯৮ রান পর্যন্ত। এরপরেই দৃশ্যপটে আবারো সাকিব আল হাসান। থিসারা পেরেরাকে স্টাম্পিং এর ফাঁদে ফেলে ব্রেক থ্রু এনে দিলেন। এরপরে কাপুগেদারা একাই লড়েছেন কিছুক্ষণ, কিন্তু শ্রীলঙ্কা আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। আসলে শ্রীলঙ্কাকে ম্যাচে ফইড়তে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ‘ফুরিয়ে যাওয়া’ মুস্তাফিজের সংগ্রহ ৪টি উইকেট, সাকিব আল হাসানের ভাগে ৩টি। গুরু মাশরাফি নিজেও একটি উইকেট তুলে নিয়েছেন, ক্যারিয়ারের শেষ বলটির ঠিক আগের বলে সিকুগে প্রসন্নের মিডল স্টাম্প গুড়িয়ে দিয়ে।

তরুণ সাইফুদ্দিন যখন শ্রীলঙ্কান ইনিংসের শেষ আর নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেটটি নিলেন, মাশরাফি মাঠের অন্য কোণে দাঁড়িয়ে খুলে ফেললেন নিজের ক্যাপটা। উপরের দিকে আঙ্গুল তুলে কি যেন ইশারা করলেন। দলের সবাই এসে একে একে যখন আলিঙ্গন  করছিলেন, একটু পর পর কপালের ঘাম মুছছিলেন তিনি।

ঘাম মুছছিলেন? নাকি ঘাম মোছার উছিলায় মুছছিলেন অশ্রুজল? উত্তরটা তিনিই দিতে পারবেন ভালো।

আমরা শুধু এইটুকু জানি, আপনাকে আমাদের দরকার। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ২০১৭, কিংবা বিশ্বকাপ ২০১৯। একটা বৈশ্বিক ট্রফি হাতে নিয়ে শিশুর মত হাসতে হাসতে, কিংবা হাউমাউ করে খুশির কান্না কেঁদে আপনি ওয়ানডে থেকে বিদায় নিন, এভাবে অসহায়ের মত নীরবে কান্না লুকাতে লুকাতে নয়।

বড় ভালোবাসি আপনাকে, গুরু। বড্ড বেশি ভালবাসি!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top