ফ্লাডলাইট

কি ক্ষতি টাইগাররা আবেগপ্রবণ থাকলে? কি সমস্যা একটু কম প্রফেশনাল হলে?

টাইগার আবেগ প্রফেশনালিজম নিয়ন আলোয় neon aloy

ক্রিকেট খেলাটা দেখা শুরু করেছি নানীর কোলে বসে, ১৯৯৬ বিশ্বকাপ থেকে। প্রথম পরিচিত চার প্লেয়ারের নাম মাইকেল বেভান, রিকি পন্টিং, শচীন টেন্ডুলকার, শিবনারায়ণ চন্দরপল। আল্লাহর রহমতে আমার নানু এখনো বেঁচে আছেন, গতকালকেও ম্যাচের শেষ কয়টা ওভার আমি আর নানু একসাথে বসে দেখেছি।

একটা সময় প্রচুর খেলা দেখতাম। ১৯৯৮২০০০ সাল পর্যন্ত সময়টা এমন ছিলো, যেকোন মাঝারি লেভেলের প্লেয়ারের ক্যারিয়ার সামারির স্ট্যাটিসটিক্সও মুখস্ত বলতে দিতে পারতাম। কিন্তু ২০০৪০৫ এর সময়টা থেকে কেন যেন আগ্রহে ভাটা পড়তে শুরু করে। আগ্রহ কমতে কমতে একটা সময় দেখা যায় বাংলাদেশের খেলা না হলে আমি টিভিতে চ্যানেল ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছি। ইদানীং তবুও ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলা মাঝেমধ্যে দেখে মজা পাই, সাউথ আফ্রিকা অনেক আগের ভালবাসা, আর সেই সাথে অস্ট্রেলিয়ার রিস্ট্রাকচারিং প্রসেসটাও বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হয় খেলা দেখার সময়। এই ৪টা দল বাদে বাকিদের খেলায় কোন রস খুঁজে পাই না। কেন পাই না, সে প্রশ্নের জবাব এতদিন খুঁজে পাই নাই, যেটা গতকাল মাত্র পেলাম।

আমাদের প্রজন্মটা যে সময় খেলা দেখা শুরু করেছে, সেই সময় দলগুলোতে প্লেয়াররা ছিলো নিজেরা নিজেদের বন্ধুর মত। একটা পরিবার ছিলো একেকটা দল। প্রফেশনালিজমের চেয়েও অনেক বেশি প্রকট ছিলো ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো। ভারত টীমটার কথাই ধরি। কাম্বলিশচীন তো একেবারে স্কুলফ্রেন্ড। এর বাইরে অজয় জাদেজারাহুল দ্রাবিড়নয়ন মোংগিয়ার ছিলো আমাদের এখনকার মিরাজমুস্তাফিজমোসাদ্দেকের মত গলায়গলায় বন্ধুত্ব। পুরো দলের বড় ভাই ছিলো আজহারউদ্দীন। প্রায় কাছাকাছি সিনারিও ছিলো অস্ট্রেলিয়াসাউথ আফ্রিকাওয়েস্ট ইন্ডিজজিম্বাবুয়ে দলগুলোতেও।যে জিনিসটা আজ প্রফেশনালিজমের মোড়কে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে বলে মনে।

একমাত্র বাংলাদেশ দলটাই সম্ভবত এখনো ক্রিকেটের সেই পুরনো আবেগটার চাষবাস করে যাচ্ছে। এই দলটার প্লেয়াররা একটা ম্যাচ হেরে মুখ ভার করে মাঠ ছাড়ে যেন এইমাত্র তাদের খুব কাছের কারো মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে, ক্লোজ ম্যাচে শিরোপা হাতছাড়া করে পুরো দেশের সাথে একসাথে কেঁদে বুক ভাসায়, মানজারুল রানার মৃত্যুর সংবাদ শুনে চোয়ালে চোয়াল চেপে যেভাবে ২০০৭এর বিশ্বকাপে বলেকয়ে ভারতকে হারিয়ে সেই জয় রানাকে উৎসর্গ করেছিলো ঠিক সেভাবেই এখনো রানার মৃত্যুদিবসের আগেপরে একটা ম্যাচ জেতার জন্য মুখিয়ে থাকে।

এই দলটা যে আমাদেরই দল, আমাদের দেশের মাটির মানুষগুলোকে নিয়ে গড়া আমাদেরই প্রতিনিধি আমরা বুঝতে পারি যখন মাশরাফি তাসকিনকে হিরো বলে খোঁটা দেয়, তাসকিন হেয়ারস্টাইলিস্টের কাজ করে তাইজুলের চুল ঠিক করে দেয়, সিনিয়র প্লেয়াররা নিজের আপন ছোটভাইয়ের মত আপন ভেবে নির্দ্বিধায় তুইতোকারি সম্পর্কে কাছে টেনে নিতে পারেন একদম জুনিয়র প্লেয়ারটিকে। এরকম সুখের সংসার আর কোথায় পাবেন আপনি?

টাইগার আবেগ প্রফেশনালিজম নিয়ন আলোয় neon aloy

মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিম, মাহমুদুল্লাহদের দেখে তাসকিন-সৌম্য-মুস্তাফিজরা শিখেছে ভয়ডরহীন খেলার মন্ত্র, পাইপলাইনে আরো শাণিত হয়েছে মোসাদ্দেক-মিরাজ-সাইফুদ্দিনরা।

আর ক্রিকেটআবেগের সর্বশেষ উদাহরণটা তো গতকালকেরই! যেই দলটা শ্রীলঙ্কার কাছে প্রথম টি২০তে একরকম উড়েই গেলো, সেই দলটাই রেগুলার একাদশে দুইটা বড় পরিবর্তন এনে এমন খেলা দেখালো বিদায়ী ক্যাপ্টেনকে বিদায় সংবর্ধনা জানাতে, কোন শব্দই যথেষ্ঠ না এই পরিবর্তনকে বিশেষায়িত করতে। একদম শুরু থেকেই ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে শোনা যাচ্ছিলো বাঘের গর্জন! তেড়েফুঁড়ে বেদম প্রহার করে শুরুতেই শ্রীলঙ্কাকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিলো কায়েসসৌম্য। তবে ইনিংসের সেরা শট আমার মনে হয়েছে মালিঙ্গার বলে স্ট্যাম্প ছেড়ে লেগসাইডে সরে এসে জায়গা বানিয়ে মারা মোসাদ্দেকের ছক্কাটা। সেই সাথে সাকিবের সেন্সিবল ব্যাটিংমুশফিকের ক্যামিও তো ছিলই। পুরো ইনিংসে মালিঙ্গার হ্যাট্রিক আর ১২ ওভারের পর বাংলাদেশের রানের ঘোড়ায় লাগাম পরানো ছাড়া তেমন কোন সাফল্য নেই শ্রীলঙ্কানদের।

যেভাবে শুরু হয়েছিলো বাংলাদেশের ইনিংস, সে হিসাবে ইনিংস টোটাল ২০০ এর নিচে আটকে রাখাটাতেই মনে হচ্ছিলো শ্রীলঙ্কানরা ম্যাচে দুর্দান্তভাবে ফিরে এসেছে। তেড়েফুঁড়ে আক্রমণাত্বক খেলার মেন্টালিটি নিয়ে নেমেছিল তারাও। ইনিংসের প্রথম বলেই সাকিবের বলে চার মেরে শুরু করে পেরেরা, সাকিবকে বেশ বিরক্ত দেখা যায়। পরের বলেই উইকেট তুলে গর্জনে ফেটে পড়ে সাকিব। তখনই পরিষ্কার হয়ে যায় কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ দল। শ্রীলঙ্কা বাঘের থাবা থেকে বাঁচার আশা করে চিতার খপ্পরে পড়েছে। বাস্তবিক অর্থেই চিতার ক্ষিপ্রতায় লঙ্কান লায়নদের আঁকড়ে ধরছিল টাইগাররা। মুশফিকের তড়িৎ স্ট্যাম্পিং, বাউন্ডারী লাইনে মিরাজের উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়া ডাইভ। প্রতিটা প্লেয়ারের প্রতিটা মুভমেন্টে যে আটিচুড ফুটে উঠছিলো, তাতেই বুঝা যাচ্ছিলো সবার মনের ভিতরের কথা– “যে মানুষটা পায়ে ৭৭টা অপারেশন করে দলকে নিজের পুরোটা ঢেলে দিয়েছেন, তার বিদায়ী ম্যাচে এক রান বাঁচাতে যদি নিজের ২৩টা হাড্ডি ভাঙেকোন সমস্যা নাই!”

কেন জানি এই দলটাই আমার মন কাড়ে। জানি, খেলাটা জয়পরাজয়ের। পরাজিত দলের এখানে কোন ক্রেডিট নাই। কিন্তু এই পাগল বাংলাদেশ দলটাই আমার পছন্দ। হয়তো একটা সময় বাংলাদেশ প্রফেশনালিজমের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে প্রবল বিক্রমে সব দলকে ভেঙে গুড়িয়ে দিবে, কিন্তু সেই দলটা আমাকে এই আবেগপ্রবণ দলটার মত আনন্দ দিতে পারবে নাকি আমি জানি না। আমরা অনেকেই পুরনো ধাঁচের দর্শক। আমাদের কাছে খেলাটার আবেগের মূল্য অনেক বেশি। আমরা মাঠে কিছু রোবট দেখতে চাই না যারা খেলাটাকে নিজের চাকরি মনে করে মাঠে নামবে, দুইশোতিনশো রান করে আউট হয়ে আবেগশূন্যভাবে হেঁটে ফেরত আসবে। আমরা সেই দলটাকে পছন্দ করি যে দলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার ম্যাচের ক্রুসিয়াল মোমেন্টে স্কুপ শট খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়ে নিজের উপর প্রবল আক্রোশে ব্যাটের আঘাতে স্ট্যাম্প ছত্রখান করে দেয়, যেই দলের ক্যাপ্টেন সংবাদ সম্মেলনের নিজের বোলারদের উপর অবিচারের প্রতিবাদে চোখের জল ঝরায়, যেই দলটার প্রতি তার দর্শকদের এতটাই ভালবাসা যে হাজারো অযৌক্তিক দাবী তারা চাপিয়ে দিতে পারে ১১টা মানুষের উপর।

আমার মনে আছে গত বিশ্বকাপে ইন্ডিয়ার সাথে কোয়ার্টারফাইনাল ম্যাচটার কথা। যখন হাঁটুসমান ডেলিভারিকে নোবল ডেকে রোহিত শর্মাকে লাইফ পাইয়ে দিলো আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড, আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিলো মাশরাফির উপর। সে কেন এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠের মাঝে স্ট্যাম্প তিনটা লাথি মেরে ফেলে দিয়ে মাঠ থেকে দল নিয়ে বের হয়ে আসলো না যেখানে তার দলের দুই বোলারকে একদিন আগে নিষিদ্ধ করেই কর্তৃপক্ষ ক্ষান্ত হয়নি, মাঠেও নির্লজ্জ কারচুপি প্রকাশ্যে করে গিয়েছে। এতটাই উগ্র আবেগী আমরা। কি করবো বলেন? একটা সময় টানা ৪৬ ম্যাচ হারতে দেখেছি বাংলাদেশকে, বিশ্বকাপে কানাডার মত দলের কাছে হারতে দেখে রাগ আর চোখের পানি সামলে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছি।

সেই অসহনীয় দিনগুলো থেকে টেনে এনে দলটাকে একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছেন যে কয়জন খেলোয়াড়, তাদেরকে যখন শুনিতারুণ্যভিত্তিক দলগড়ার লক্ষ্যে দল ছাড়ার জন্য প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে, বিষয়টা মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। বিশেষ করে যখন দেখি মাশরাফির মত একটা মানুষ মুখ ভার করে মাঠ ছাড়ছে, সেটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না। এই লোকটা জানে যে বেকায়দা একটা ইনজুরিতে পড়লে সে সারাজীবনের জন্য হুইলচেয়ারে বন্দী হয়ে যেতে পারে। এটা জেনেও যে লোকটা একটা বাউন্ডারি বাঁচানোর জন্য ১৬ বছরের তরুণের মত ডাইভ দেয় এই দীর্ঘ শরীরটা হাওয়ায় ভাসিয়ে, সেই লোকটা আরো জমকালো বিদায় ডিজার্ভ করে। এবং ঠিক সেরকম সম্মান ডিজার্ভ করে মুশি, সাকিব, তামিম, মাহমুদুল্লাহসহ আমাদের এই গোল্ডেন জেনারেশনের প্রতিটা সদস্য, যাদের দেখে তাসকিনসৌম্যমুস্তাফিজরা শিখেছে ভয়ডরহীন খেলার মন্ত্র, পাইপলাইনে আরো শাণিত হয়েছে মোসাদ্দেকমিরাজসাইফুদ্দিনরা।

আসুন না, আরেকটু কম প্রফেশনাল হই, খেলাটা একটু উপভোগ করি। সারাদিনের যান্ত্রিক জীবনে এই একটা জিনিসই এখনো আমাদের পুরো দেশটাকে নিখাদ বিনোদন দেয়। আর একটু কম প্রফেশনাল আর অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে খেলেই যেহেতু আমরা সাফল্য পাচ্ছি, সেটাতে পরিবর্তন আনার কি দরকার? এটা কি আলটিমেটলি খেলোয়াড়দের মনে ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কা ঢুকিয়ে তাদের পারফরম্যান্সকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top