ফ্লাডলাইট

পথ চলার আরো আছে বাকী!

একটা সময় ছিল,যখন ঘরে হোক বা বাইরে, শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া হোক আর র‍্যাঙ্কিং এর নিচের দিকে থাকা জিম্বাবুয়ে, আমরা মাঠে নামতাম সম্মানজনক পরাজয়ের জন্য। ম্যাচ হারার দুঃখটা ছিল কম, ওদিকে কালেভদ্রে ম্যাচ জেতার আনন্দটা ছিল বিশ্বকাপ জয়ের সমান।

দিনে দিনে সময় বদলাতে বদলাতে আজ ঘর ও বাইরের হিসাব করতে শিখেছি,ঘরের মাটিতে হেরে যাওয়াকে মেনে নেয়া তো দূরের কথা,বিদেশের মাটিতেও হেরে যাওয়াকে মেনে নিতে কষ্ট হয় আজকাল। জয়গুলো আজ আর সেভাবে আনন্দ দেয়না,বরং হারের বিষাদটাই শেল হয়ে বুকে বিঁধে থাকে। বিষাদের তুলনায় অবশ্য ‘অপমান’ টাই বেশি কষ্ট দেয় আমাদের। একসময় বড় দলগুলো আমাদের কাছে হেরে এভাবে ‘অপমানিত’ হত। আমরা অবশ্য এককাঠি সরেস হয়ে উঠেছি, ‘অপমানিত’ হবার ক্ষেত্রে বড়-ছোট মানছি না। হারলেই অপমান বোধ করছি। সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছি খেলোয়াড়দের মুন্ডুপাতে।

যে কাটার মাস্টার মুস্তাফিজকে এই দুই বছর আগেও মাথায় তুলেছিলাম,তাকে ইনজুরি থেকে ফিরে ছন্দে আসার সুযোগটাও দিতে রাজী নই আমরা। ‘এই মুস্তাফিজ সেই মুস্তাফিজ নয়’ বলে বলে মুস্তাফিজকে একপ্রকার পর করে দিচ্ছি। মাঝে সৌম্য সরকার অফফর্মে চলে গিয়েছিলেন,তাকেও নিরলসভাবে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ দিয়ে চলেছি। এছাড়া দলের ছোট বড় তারকাদের কেউই বাদ যাননি আমাদের এই তীব্র ‘অপমানবোধ’ থেকে। বিশেষ করে সাকিব আল হাসান আর তামিম ইকবাল তো অনেক বছর ধরেই যে অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন, তাতে করে দুজনেরই “দেশের হয়ে খেলে ভুল করে ফেললাম নাকি” বলে অবসর নিয়ে ফেলাও অস্বাভাবিক কিছু ছিলনা।

অথচ বড় দল হয়ে উঠতে হলে কিছু মৌলিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়ে নিজেদের যাচাই করতে হয়। আছাড় খেয়ে না পড়লে সাইকেল চালানো শেখা হয়না,  আগুনে না পুড়লে সোনা খাঁটি হয়না, তেমনি এসব মৌলিক পরীক্ষায় লেটার মার্কস সহ পাশ না করতে পারলে বড় দলও হওয়া যায় না।

এসব মৌলিক পরীক্ষার মধ্যে পড়বে-

  • অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো;
  • যেকোন প্রকার চাপ(৩০০ এর ওপরে রানের টার্গেট,প্রাথমিক ব্যাটিং ধস,খরুচে বোলিং) সামাল দেয়ার দক্ষতা;
  • কঠিন পরিস্থিতিতেও বুক চিতিয়ে লড়াই করে যাওয়া;
  • নিজের প্রতি বিশ্বাস না হারানো;
  • নিজেকে অতিমাত্রায় বিশ্বাস না করা;
  • হারার আগেই হেরে না যাওয়া;
  • জেতার আগেই জিতে না যাওয়া;
  • কোন অবস্থাতেই নিজের প্রফেশনালিজম বিসর্জন না দেয়া তথা সবসময় নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে খেলবার চেষ্টা করা।

যতবার এই মৌলিক বিষয় সমূহে পাশ করেছি,ততবার আমরা জিতেছি। এই মৌলিক বিষয়গুলোতে বার বার সফল হতে থাকলেই আমরা বড় দল হয়ে উঠতে পারব। ২০১৫ সাল থেকে সফল হয়েছি দেশের মাটিতে, বিদেশের মাটিতেও হব ধীরে ধীরে,২০১৭ সালের বিদেশ সফরগুলোকে সত্যিকারের বড় দল হয়ে ওঠার সিঁড়ি হিসাবে ভেবে নিলেই হবে। সহজ নয়,তবে যেখানে সাথে আছে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেলে গড়া রঙিন পোশাকের দেশসেরা  স্কোয়াড,কাজটা খুব একটা কঠিনও নয়। তার আগ পর্যন্ত এখনো বড় দল হয়ে উঠিনি। তাই সমর্থনটা এখনই বড় দলের মত দিলে চলবেনা। কথায় কথায় অপমান বোধ না করে গঠনমূলক সমালোচনার সাথে প্রয়োজনীয় প্রশংসা করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

পথ আরো অনেক বাকী; পুরোটা চলতে দিন আগে!

এক নজরে একদিনের সিরিজে বাঘে-সিংহের ৩য় লড়াই

আমাদের রঙিন পোশাকের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা নাকি টস জেতেন না।

কথাটা আংশিক সত্য। সময়ের হিসাবে সেই জানুয়ারি মাসে নিউজিল্যান্ডের সাথে শেষ টি২০ তে টস জিতেছিলেন। শ্রীলংকার সাথে প্রথম দুই ওয়ানডেতে টস হারাতে অপেক্ষাটা আরো দীর্ঘ হল,তবে ৩য় ওয়ানডেতে  ঠিকই টস জিতলেন। সময়ের হিসাবে প্রায় চার মাস পরে। টস জিতে বোলিং এর সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল নাকি ভুল,সেটা আলোচনাসাপেক্ষ। তবে প্রথম ১০ ওভারে বিনা উইকেটে ৭৬ তুলে ফেলার পরেও যে ব্যাটিং দলকে ২৮০ তে বেঁধে ফেলা গেল,তাতে চৌকষ অধিনায়কত্ব ও বোলারদের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করতেই হয়। মুস্তাফিজ প্রথম ৩ ওভারে ২৫ রান দেবার পরেও পরবর্তী ৭ ওভারে দিলেন মাত্র ৩০ রান। উইকেট নিলে ২টি,ট্রেডমার্ক অফকাটারে ফর্মে থাকা কুশল মেন্ডিসকে কট বিহাইন্ড করালেন।  তাসকিন কিছুটা খরুচে ছিলেন, এ কারণে শেষ দিকের ওভারগুলোতে অধিনায়ক মাশরাফি নিজে দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। শেষ ওভারে দিলেন ৯ রান,তুললেন ২ উইকেট। শুরু ভালো না হলেও শেষটা ভালোই হল বাংলাদেশ দলের। শেষ দশ ওভারে হল মাত্র ৭৭ রান। শুরুর দশ ওভারে যা মনে হচ্ছিল,ইনিংস শেষে তার ধারে কাছেও যায়নি স্কোর।

২৮১ রানের লক্ষ্য খুব বড় না হলেও খুব ছোটও নয়। অন্ততঃ দুটি বড় জুটি না হলে এই মাঝারি স্কোরটাও রানের পাহাড় হয়ে চেপে বসতে পারে। সেটাই হল,তামিম ইকবাল প্রথম ওভারেই একটা চার মেরে শুরু করলেও শেষ বলেই  কুলাসেকারার গতির পার্থক্য বুঝতে না পেরে ক্যাচ তুলে দেন। ৩য় ওভারের শেষ বলে অফ স্টাম্পের দুই হাত দূরের বলে স্কয়ার কাট খেলতে গিয়ে কট বিহাইন্ড সাব্বির। ৪র্থ ওভারে লাকমলের হঠাৎ ভেতরে ঢুকে আসা বলে এলবিডব্লু হয়ে নেই মুশফিকও। ১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে অকূল পাথারে বাংলাদেশ দল। নামলেন সাকিব আল হাসান,আর ওদিকে আছেন একটু একটু করে পুরনো ফর্মের ছোঁয়া পেতে থাকা সৌম্য সরকার। দুজনে মিলে রানরেট সামাল দিলেন। জুটি জমে উঠছিল,সৌম্য সরকার স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন একটা ঐতিহাসিক ইনিংসের,তবে উইকেট ছুঁড়ে আসার পুরনো রোগে পেয়ে বসায় ৩৮ রানেই স্টাম্পড সৌম্য। ওদিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকা সাকিব আল হাসান নিজের খ্যাতির প্রতি সুবিচার করছিলেন,অসাধারণ খেলছিলেন,তবে সঙ্গ দিতে পারছিলেন না কেউই। শেষ মেষ নিজেও আউট হলেন বাজে বলে। ২৪ তম ওভারে ১১৮ রানে নেই ৬ উইকেট। ম্যাচের এপিটাফ লেখা হয়ে গেছিল তখনই। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজ হারার আগে হারতে রাজী নন। অসাধারণ খেলে অর্ধশত তুলে নিলেন বটে। কিন্তু শেষমেষ তাকেও মেনে নিতে হল,দিনটি বাংলাদেশের নয়।

ফলাফল,৭০ রানের হার। তবে দিনটি বাংলাদেশের না হোক,সময়টা যে বাংলাদেশের সেটার আলামতটা টের পাওয়া গেল ম্যাচ শেষ হবার পরেই। সিরিজের সমতা আনতে পেরে শ্রীলঙ্কানদের বুনো উল্লাস, ট্রফি শেয়ার করতে পেরে থারাঙ্গার মুখের আকর্ণবিস্তৃত হাসি,পাশে মাশরাফির বিষণ্ণ চেহারা- এসবই তো নতুন বাংলাদেশের আলামত,যে বাংলাদেশ স্বান্তনা চায়না, যে বাংলাদেশ কিছুই হারাতে চায়না,যে বাংলাদেশ আর ছোটটি নেই,হয়ে উঠছে বিশ্বের দরবারে বড় একটি পরাশক্তি।

ক্রিকেটের কিছু নিয়ম-কানুন বড় নিষ্ঠুর। ২য় ম্যাচটি বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞাটা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে ৩য় ম্যাচেও  ইনিংস শেষ করতে প্রায় ৩০ মিনিট দেরী হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী ওয়ানডে ম্যাচে নিষেধাজ্ঞায় থাকবেন অধিনায়ক মাশরাফি। ওদিকে সাকিব আল হাসান বল হাতে ছন্দে নেই একবারেই। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন,অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দেবার সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি আজ। অপর দিকে তরুণ মিরাজ ও মোসাদ্দেক খেলছেন ভাল,মুস্তাফিজ ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সৌম্য সরকারও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন কিছুটা।

আশা করছি সাকিব বল হাতে ছন্দ ফিরে পান দ্রুতই,মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আগের রূপে আসুন। জুন থেকে শুরু হওয়া চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ইতিহাস গড়ার জন্য পুরো দলটির সম্মিলিত শক্তির দরকার হবে।

ছয় ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতার দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা নেতা,অনুপ্রেরণার অপর নাম,একজন আপাদমস্তক ‘বড় ভাই’ টি হাতে একটি বৈশ্বিক ট্রফি নিয়ে শিশুর মত হাসছেন- এমন দৃশ্যটি  দেখানোর জন্য সর্বকালের সেরা দলটির সর্বকালের সেরা পারফর্ম্যান্সটা যে বড্ড জরুরি!

বড় দল হতে গেলে একটা বৈশ্বিক ট্রফি জেতাটাও তো কম দরকারি নয়!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top