ফ্লাডলাইট

লঙ্কায় লঙ্কা জয়ের অপেক্ষা বাড়ালো বৃষ্টি

বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ২য় ওয়ানডে নিয়ন আলোয় neon aloy

গোটা সিরিজ জুড়েই চলেছে নাটক। মাহমুদুল্লাহ টেস্টের অফফর্মের কারণে ওয়ানডে দলেও জায়গা হারাতে চলেছিলেন, ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি গোঁ ধরে বসায় মাহমুদুল্লাহ শুধুমাত্র টেস্ট দল থেকে বাদ পড়েই সে নাটকের যবনিকাপাত হয়েছে। রিয়াদও জবাব দিয়েছেন প্রস্তুতি ম্যাচে ৭১ রানের স্কোর করে। এরপরে মিরাজকে নিয়ে আরেক প্রস্থ নাটক। দেশে ফেরত পাঠানোর পরেই ম্যানেজমেন্ট হঠাৎ করে খেয়াল করলেন শ্রীলংকার ব্যাটিং অর্ডারে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান বেশি। সেই তুলনায় অফ স্পিনার কম হয়ে গেছে দলে। সুতরাং মিরাজকে আবার উড়িয়ে এনে অভিষেক করানো হল। এসবেও যেন ঠিক পুরো মজাটা আসছিল না। আমাদের বোর্ড সভাপতি, যাকে কৃতিত্ববাজিনামক শিল্পের পিকাসো বা ভ্যান গগ বললে ভুল হবেনা, রিয়াদকে বাদ দেয়া থেকে শুরু করে মিরাজকে দলে নেয়া, সবকিছুর কৃতিত্ব আমিই করেছিবলে নিজের করে নিয়ে চিত্রনাট্যের রসাত্মক অংশটি পূর্ণ করলেন।

মাঠের বাইরের সব নাটক পাশে রেখে ওয়ানডে সিরিজের দিকে তাকানো যাক এবার। সিরিজের শুরুতেই জানা ছিল ৩-০ তে সিরিজ জিতলে ৬ এ উঠবে বাংলাদেশ। প্রথম ওয়ানডেতেই বোঝা গিয়েছিল, লক্ষ্যটা অতটা কঠিন হবার কথা নয়। কারণ এই একাদশ বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা একাদশ। ফর্মে থাকা তামিম-সৌম্যের উদ্বোধনী জুটি, তিনে মারকুটে সাব্বির রহমান, মিডল অর্ডারে মুশফিক-সাকিব-রিয়াদ ত্রয়ী আর দুই প্রতিভাবান প্রতিশ্রুতিশীল যুবক মেহেদী হাসান মিরাজ ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, সাথে গুরু মাশরাফি নিজে, সাথে তাসকিন আহমেদ ও কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর দ্য ফিজরহমানকে নিয়ে গড়া পেস আক্রমণ তো আছেই।

ফলাফলটা সবার জানা। তামিম-সাকিব খেলেছেন যোগ্য সিনিয়রের মত। বিশেষ করে এক প্রান্ত আগলে ধরে তামিমের শতকের কারণেই মূলত প্রথমে সাব্বির রহমান ও পরে সাকিব আল হাসান স্কোরবোর্ড সচল রাখতে পেরেছেন। এছাড়া রানের গতি বাড়িয়ে ইনিংসের শেষ তুলির আঁচড়টা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দিয়েছেন পাকা চিত্রকরের মত। মাশরাফির নেতৃত্বে বোলিংটাও হয়েছে দুর্দান্ত। ডিউ ফ্যাক্টরএর সম্ভাবনা ছিল, তাই অভিষিক্ত মিরাজকে নিজের ওপেনিং পার্টনারই বানিয়ে ফেললেন মাশরাফি। মিরাজও আস্থার প্রতিদান দিলেন বেশ ভালোমত। যদিও শিশির বাবাজি আর আসেননি,আর বোলিংটাও সব মিলিয়ে দুর্দান্ত হয়েছে। ইনিংস জুড়ে চান্ডিমাল আর শেষ দিকে থিসারা পেরেরা কিছুটা হৃদস্পন্দন বাড়িয়েছিলেন,তবে ৩২৫ রানের লক্ষ্যটা খুব বেশিই বড় হয়ে গিয়েছিল শ্রীলংকার এই অপেক্ষাকৃত নবীন দলটির কাছে। 

মিলেছে বড় জয়তাই ২য় ওয়ানডের আগে উজ্জীবিত বাংলাদেশ। শ্রীলংকাও চাইছিল ঘুরে দাঁড়াতে। টসে জিতে ব্যাটিং নিয়ে যেভাবে খেলছিল লঙ্কানরা, ঘুরে দাঁড়ানোটা সম্ভব হয়েই যাবে বলে মনে হচ্ছিল। মুস্তাফিজ দিলেন ৮ ওভারে ৬০ রান, সাকিব ১০ ওভারে ৫৯ রান দিয়ে উইকেটশূন্য। দু’জনের নামের সাথে এমন বোলিং ফিগার একেবারেই যায়না। ওদিক দুর্দান্ত ফর্মে থাকা কুশল মেন্ডিস তুলে নিলেন সেঞ্চুরি, থারাঙ্গা তুললেন ফিফটি। শ্রীলঙ্কা রানের গতিও প্রশংসনীয়; ২০ ওভারের ভেতর ১০০, ৩৫ ওভারের ভেতর ২০০ এবং ৪০ ওভার শেষে তাদের স্কোর দাঁড়ায় ২৩৫, হাতে ৬টি উইকেট।

এমন অবস্থা থেকে যে ৩৫০ রানের পাহাড় গড়তে পারেনি শ্রীলঙ্কা, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব যাবে বাংলাদেশ দলের শেষ ৫ ওভারের বোলিং ও ফিল্ডিং এর উপর। উইকেটের পেছন থেকে মুশফিকের দুটি দুর্দান্ত রানআউট (যার মাঝে একটি প্যাভিলিয়নে ফেরায় ডেথ ওভারে বিপথজনক থিসারা পেরেরাকে), ৪৯তম ওভারে মুস্তাফিজের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসা (যদিও অন্তত দুটি বাজে বল  হয়েছে তাতে, আর তার একটিতে হয়েছে চার) ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে চমকদার ওভারটি ছিল তাসকিনের করা শেষ ওভারটি। ওভারের ৩য় বলের আগে সাদার ওপরে কালো ছোপের একটি কুকুর ঢুকে পড়ে মাঠে। সেটিকে কোনমতে তাড়ানো গেলেও তাড়ানো যায়নি শ্রীলঙ্কার শেষ মুহুর্তের বিভীষিকাটিকে। ওভারের ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম বলে যথাক্রমে দারুণ খেলতে থাকা গুনারত্নে, সুরাঙ্গা লাকমল ও নুয়ান প্রদীপকে ফিরিয়ে দিলে ৫ম বাংলাদেশি বোলার হিসাবে ওয়ানডেতে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তাসকিন আহমেদ। 

নাটকের সেখানেই শেষ নয়। ইতিহাস বলে, শ্রীলঙ্কার মাটিতে ৩০০ রান তাড়া করে কোন দল জিততে পারেনি। কিন্তু রেকর্ডবুকে এটাও আছে যে ঠিক ৪ বছর আগে ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ তারিখে পাল্লেকেলে’তে প্রথম ইনিংসে ৩০২ রান করেও হেরে গিয়েছিলো শ্রীলঙ্কা, এই বাংলাদেশের কাছেই! কিভাবে সম্ভব? সেদিনও শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসের পরেই বাগড়া দেয় বৃষ্টি। ফলে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭ ওভারে ১৮৪ রানের, যে লক্ষ্যে ব্যাটিং-এ নেমে বাংলাদেশ এক ওভার হাতে রেখেই ম্যাচ জিতে যায়। গতকাল এরকমই একটা ক্লাইম্যাক্সের আশা করেছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। কিন্তু অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স হিসেবে অতিবৃষ্টি সেই আশায় পানি ঢেলে দেয়।

শ্রীলঙ্কা হয়ত দুষবে সেই বেচারা কুকুরটিকেই, তার আসাতেই তো একে দারুণভাবে গড়া ইনিংসটার শেষটা হয়েছে বাজেভাবে, তার ওপরে বৃষ্টি এসে কেড়ে নিয়েছে সিরিজ জেতার শেষ সম্ভাবনাটাকেও। এখন ৩য় ওয়ানডেতে জিতে গেলে ট্রফিখানা শ্রীলঙ্কার জুটবে ঠিকই, তবে রেকর্ডবুকে ট্রফির আধখানা থাকবে বাংলাদেশের নামেই।

একজনের কথা আলাদা করে না বললেই নয়। সেই যে শেষ টেস্টের শেষ দিকে শ্রীলঙ্কা গেলেন,তখন থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফর্ম্যান্সই বলে দিচ্ছে খেলোয়াড়েরা কতটা উজ্জীবিত। আসলেই, ভাবতে অবাক লাগে, একটা মানুষ কিভাবে এতটা উজ্জীবিত করতে পারে পুরো দলকে? তবে নামটা যখন মাশরাফি বিন মর্তুজা,তখন ব্যাপারটা আর তেমন অবাক করেনা। গুরুতো শিষ্যদের উজ্জীবিত করবেনই, এ আর এমন কি?

তবে ৩য় ওয়ানডের আগে স্লো ওভার রেটের কারণে মাশরাফির কপালে ঝুলছে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ। সেই সাথে বেড়েছে লঙ্কার মাটিতে লঙ্কা জয়ের অপেক্ষাও। তবে শেষ স্মৃতি হিসেবে যেহেতু তাসকিনের হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে দারুণভাবে ফিরে আসার ছবিটাই সামনে আসবে টাইগার বাহিনীর, এছাড়া সেরা ওয়ানডে দলটাই যেহেতু খেলছে, লঙ্কার মাটিতে প্রথম সিরিজ জেতাটা খুব বেশি কঠিন তো হবার কথা নয়, নাকি?

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ESPNcricinfo.

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top