ইতিহাস

২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষনা এবং কিছু প্রশ্ন

স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ন আলোয় neon aloy

ইয়াহিয়া খান অনেক নাটক করে গোপনে ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেও, খবরটা গোপন থাকেনি। বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার এ কে খন্দকার এটা দেখে জানিয়ে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিবের কাছে রাত আটটার দিকে একটি চিরকুট আসে যেখানে বলা হয়, আজ রাতে আপনার বাসায় হামলা হতে পারে। এ কথা আমরা জানিই যে, অপারেশন সার্চলাইট এর মূল পরিকল্পনায় শেখ মুজিবের গ্রেফতার সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই উল্লেখ ছিল। সম্ভাব্য হামলার কথা টের পেয়ে রাতে তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবের জন্যে স্বাধীনতার ঘোষনা লিখে নিয়ে এসেছিলেন, বলেছিলেন স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে যুদ্ধ পরিচলনা করতে। কিন্তু শেখ মুজিব রাজি হননি এবং তাদের সবাইকে যার যার বাসায় চলে যেতে বলেন। রাত ১০ টায় ডঃ কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম গিয়েছিলেন শেখ মুজিবের বাসায়, তিনি তাদেরকে তৎক্ষনাৎ চলে যেতে বলেন।

সিদ্দিক সালিকের মতে রাত ১১.৩০ টায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়। রাত দেড়টায় গ্রেফতার করে শেখ মুজিবকে। সিদ্দিক সালিক, ডেভিড লুসাক এর ‘পাকিস্তান ক্রাইসিস’ নামক বইয়ের সূত্র ধরে বলেন, যখন প্রথম গুলি ছোঁড়া হয়, ‘the voice of Sheikh Mujibur Rehman came faintly through on a wavelength close to that of the official Pakistan Radio. In what must have been, and sounded like, a pre-recorded message, the Sheikh proclaimed East Pakistan to be the People’s Republic of Bangladesh. [১]

এখানে যে মেসেজের কথা বলা হচ্ছে, সেটা নিম্নরূপঃ

This may be my last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.

এই তারবার্তাটি ওয়ারলেসের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামেও এই তারবার্তাটি পাওয়া যায়। মুনতাসির মামুন দাবি করেছেন এই ঘোষণাপত্রের কোন প্রতিলিপি তাঁর চোখে পড়ে নি; তবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ অনেকেই নাকি বলেছেন যে, চট্টগ্রামে তারা প্রচারপত্রটি পড়েছেন এবং দেখেছেন। [২ক]

চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান নিজের নাম পরিচয় সহ বন্ধবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনা প্রচার করেছিলেন। বীর উত্তম রফিকুল ইসলামের মতে, তিনি এই ঘোষনা দেওয়ার জন্যে আওয়ামী লীগের নেতাদের অনুরোধ করেছিলেন; পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এটা লিখেছিলেন এবং এটি শুদ্ধ করেন ড জাফর। [৩] আবার, অনেকে বলেন, তাজউদ্দীন সেদিন রাতে শেখ মুজিবের জন্যে যে ঘোষণাপত্র তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন সেটার সাথে উপরোক্ত বক্তব্যের মিল আছে। [৪]

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’র বেলাল মোহাম্মদ জানাচ্ছেন, ‘জরুরী ঘোষণা’ শিরোনামের সাইক্লোস্টাইল করা একটি ছোট হ্যান্ডবিল পেয়েছিলেন। নিচে সাক্ষর ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের। বক্তব্যটা ছিল অনেকটা এরকমঃ

‘অদ্যরাত ১২ টায় বর্বর পাক-বাহিনী ঢাকার পিলখানা এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন অতর্কিত হামলা চালায়। লক্ষ লক্ষ শহিদ হয়েছেন। যুদ্ধ চলছে। আমি এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং সমস্ত বিশ্বের স্বাধীনতাকামী দেশসমূহের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করেছি। জয় বাংলা’।

এই হ্যান্ডবিলটা বেলাল মোহাম্মদ পেয়েছিলেন ডাক্তার আনোয়ার আলীর কাছে থেকে। সন্ধ্যা ৭.৩০ দিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর এটা বারবার বিভিন্ন কন্ঠে প্রচারিত হতে থাকে। অধিবেশন চলাকালীন সময়ে এম এ হান্নান আসেন সেখানে এবং বলেন, ‘আপনারা মাইকে আমার নাম ঘোষণা করুন। আমি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র প্রচার করবো’। অবশ্য, পরবর্তীতে নিজের নাম ঘোষনা ছাড়াই বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাপত্র প্রচার করেছিলেন। এবং বেতারে এটা ছিল নিজের কন্ঠে দ্বিতীয়বারের মতো ঘোষণা। [৫ক]

পাবনার শাহজাদপুরের তৎকালীন ওসি জনাব আব্দুল হামিদ ২৬ মার্চ সকাল আটটায় যে বার্তা পেয়েছিলেন তার একটি কপি বর্তমানে পাওয়া গিয়েছে। সেখানে লিখা ছিলঃ

‘From Dacca
To
Peoples of Bangladesh and all of the world.

Pakistan arms forces suddenly attacked EPR fo Peelkhana and Police forces at Rajarbag from 00 hours of 26th March killing lacks of unarmed people[.] fierce battle going on with EPR and Police forces in the street of Dacca and people are fighting gallantly for the freedom of bangladesh. Every section fo people of bangladesh asked attack enemy force at any cost of Bangladesh. May Allah bless you and help in your struggle of freedom.

Joy Bangla
S.K.Mujib’

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ন আলোয় neon aloy

প্রথমেই উল্লিখিত বার্তা এবং বর্তমান বার্তার মধ্যে কিছুটা অমিল রয়েছে। এ বিষয়ে মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘মনে হয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাতে তাঁর ঘোষনা দিয়েছিলেন এবং তা হয়তো খানিকটা বিস্তারিত ছিল। যিনি ওয়ারলেসে কোড সিগন্যাল পাঠিয়েছিলেন তিনি তা অনুবাদ করেছেন। এমনও হতে পারে বিদেশের জন্য প্রথমাংশ ইংরেজীতে আগে থেকেই করা ছিল, দ্বিতীয়াংশ বাংলায়। ইংরেজি বাক্য গঠনের জন্য এই মন্তব্য করছি। বা এমনও হতে পারে, বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন অংশ সুবিধামতো যে ওয়ারলেস অপারেটর পেয়েছেন তা পাঠিয়েছেন। মূল বক্তব্য কিন্তু দু’টি বার্তারই এক।[.] মিল অমিল যাই থাকুক এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত [এবং এখন নথি দ্বারা] যে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ গ্রেফতারের আগে স্বাধীনতা সংক্রান্ত একটি বার্তা ওয়ারলেসে প্রেরণ করেছিলেন এবং তা বিভিন্ন থান/অঞ্চলে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছিলেন’। [২খ]

শেখ মুজিব যে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন সেটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফলাও করে প্রচার করা হয়েছিল ২৭ মার্চের দৈনিকগুলোতে।[৬ক] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি নিউজে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনার কথা হয়। বলা হয় যে, ‘পাকিস্তানে সিভিল ওয়ার শুরু হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ করতে নেমে পড়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের নেতা পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন’।[৭]

নেদারল্যান্ডের পত্রিকা Leeuwarder Courant  একাত্তরের ২৭ মার্চ প্রকাশ করে,  Mujibur declares independence from East Pakistan। [৬খ]

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ন আলোয় neon aloy

২৭ মার্চে লীওয়ার্ডার কোউরান্ট পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিলো বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা।

সাউথ আফ্রিকার পত্রিকা Pretoria News  ২৭ মার্চ  “10000 slain in Pakistan civil war” শিরোনামের খবরে বলে, The civil war broke out after Rahman proclaimed the region an independent republic. [৬গ]

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ন আলোয় neon aloy

আয়ারল্যন্ডের The Irish Times মার্চের ২৭ তারিখ  Declaration of independence by East Pakistan  শিরোনামের খবরে বলে, ‘A Clandestine Radio said last night that East Pakistan has been declared independent and that heavy figting and that heavy fighting was going on between East and West Pakistani forces’ [৬ঘ]

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ন আলোয় neon aloy

২৭ মার্চ কলকাতার দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা বলে, ‘একটি অজ্ঞাত রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে আজ সকালে বিশ্বের কাছে পাঠানো এক বার্তায় জনাব রহমান (শেখ মুজিব) ঘোষণা দিয়েছেন যে শত্রু আঘাত হেনেছে এবং জনগণ বীরের মতো লড়াই করছে। বার্তাটি কলকাতা থেকে শোনা হয়েছে। রেডিও স্টেশনটি নিজেকে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছে’।[৮ক]

২৭ মার্চ মুম্বাইর দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া প্রথম বার্তা সম্পর্কে বলে, ‘আজ বিশ্বের কাছে পাঠানো এক বার্তায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের স্বাধীনতার জন্য বীরের মতো লড়াই করছে।[…] বার্তায় জনাব রহমান বলেন: ‘আজ রাত ১২টার দিকে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী হঠাৎ করে পিলখানা ও রাজারবাগে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ঘাঁটিতে হামলা চালায়। হামলায় অসংখ্য (নিরস্ত্র) মানুষ নিহত হয়’। [৮খ]

লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ২৭ মার্চ বলে, শেখ মুজিবুর রহমান শুক্রবার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ইসলামী জাতিটির (পাকিস্তান) দুই অংশের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকা অসন্তোষ গৃহযুদ্ধে রূপ নেওয়ায় তিনি এ ঘোষণা দেন। [৮গ]

২৭ মার্চের নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের খবরে বলে, ‘The Pakistan radio announced today that, Sheikh Mujibur Rahman, the nationalist leader of East Pakistan has been arrested only hours after he had proclaimed his region independent…’ [৯ক]

উদাহরণস্বরূপ মাত্র কয়টা সংবাদের কথা উল্লেখ করা হলো; মূল কথা হচ্ছে, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষনার সে খবর সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমই খুব গুরুত্বের সাথেই প্রচার করেছিল।

এছাড়াও, ওয়াশিংটন হাউসে ২৬ মার্চ পাঠানো গোপন নথিপত্রে বলা হয়, Pakistan was thrust into civil war today when Sheikh Mujibur Rahman proclaimed the east wing of the two-part country to be ‘the sovereign independence People’s Republic of Bangladesh’. [৯খ]

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘Indo-Pakistan crisis- chronology of key events’ শিরোনামে যে নথি ১৯৭২’র ২ ফেব্রুয়ারিতে পেশ করে সেখানে ২৬ মার্চ তারিখে বলা আছে – ‘Voice of Independent Bangladesh’ radio station broadcasts unilateral declaration of independence, saying sheikh Mujib has declared sovereign independent Bangladesh.’ [৯ঘ]

২৭ মার্চ বেলাল মোহাম্মদ  পটিয়ায় গিয়েছিলেন বেতার ভবন পাহারার জন্যে সেখানে অবস্থানরত বাঙ্গালি সৈন্যদের সাহায্য চাইতে। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন মেজর জিয়াউর রহমান সবচেয়ে সিনিয়র। তখন সৈন্য নিয়ে জিয়াউর রহমান আসেন বেতার কেন্দ্রে। বেতার ভবনে আসার পর বেলাল মোহাম্মদ রসিকতা করে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু জিয়াউর রহমান সেটাকে গুরুত্বপূর্ন প্রস্তাব হিসেবেই বিবেচনা করে রাজি হয়ে যান।[৫খ] প্রথমে তিনি   বলেন, I, Major Zia do hearby declare independence of Bangladesh; কিন্তু পরে বেলাল মোহাম্মদ উপদেশ দেন বঙ্গবন্ধুর নাম বলতে। তখন বলা হয়, On behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman …’ [১০]

এবার দু’টো বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করা উচিৎ। প্রথম, যেখানে ২৬ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে দেন এবং মেজর জিয়া যেখানে পরের দিন, ২৭ মার্চ রেডিওতে ঘোষণা দেন, সেখানে তাহলে তার দল কেন তাকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে এবং এই দাবির ভিত্তিটাই বা কতটুকু? এটা পরিষ্কার যে, মেজর জিয়ার ঘোষনা দেয়ার পূর্বে আরও অনেকেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবং তিনি যে ২৭ মার্চই ঘোষণা দিয়েছিলেন সেটা তার মুখেই স্বীকার করেছেন।[১১] জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক – এ দাবি তিনি নিজেও কখনো করেছেন বলে মনে হয় না। মূলত, আমাদের দেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিবের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে মেজর জিয়াকে বৃহদাকায় করে উপস্থাপনের জন্যেই তার সাঙ্গপাঙ্গরা এমন দাবি তুলে। তিনি নিজে বরং ৭ মার্চের ভাষণকেই স্বাধীনতার গ্রীন সিগন্যাল হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, ‘৭ ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষনা আমদের কাছে এক গ্রীন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু কোন তৃতীয় ব্যক্তিকে জানালাম না’। [জিয়াউর রহমান, একটি জাতির জন্ম, বিচিত্রা, ১৯৭৪]

মেজর জিয়াউর রহমানের ভাষণ কিছু দিক থেকে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই একজন মেজরের কন্ঠে এমন ঘোষণা শুনে অনুপ্রাণিত বোধ করেছিলেন এবং উৎসাহিতও হয়েছিলেন। শুধু একা তারাই না, বাঙালি সৈন্যরাও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে – এটা অনুভব করে অনেকেই বেশ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু এর জন্যে তাকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে আখ্যায়িত করা মূলত ইতিহাস বিকৃতির এক নিকৃষ্ট রূপ।

দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের গ্রেফতার প্রসঙ্গে। বদরুদ্দীন উমর ‘বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চা’ প্রবন্ধে শেখ মুজিবের গ্রেফতারকে ‘আত্নসমর্পন’ হিসেবে চিহ্নিত করে শেখ মুজিবের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘… শেখ মুজিব রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের বাড়িতে বসে থাকার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সামরিক বাহিনী তাঁকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায়। এভাবে ধরা দেওয়া যদি আত্নসমর্পণ না হয় তাহলে আত্নসমর্পণ আর কাকে বলে?’ এই দাবির সাথে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।

কিন্তু, এখানে বদরুদ্দীন উমরের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করতে হয়। প্রথমত, শেখ মুজিব নিজেই এ নিয়ে বলেছিলেন, আমাকে না পেলে ওরা গোটা ঢাকা শহরের প্রতিটি বাড়ি খুঁজবে। জ্বালিয়ে দিবে, নিরীহদের হত্যা করবে। তাঁর এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় জেনারেল টিক্কার কাছ থেকেও, In case we failed to arrest Sheik Mujib on that very night, my force would have inflicted a mortal blow at each home in Dhaka and elsewhere in Bangladesh. We probably would have killed crores of Bangalees in revenge on that night alone. [১২]

দ্বিতীয়ত, শেখ মুজিব সারাজীবন যে ধরণের রাজনীতি করেছেন সেটা বিবেচনায় আনলে, তাঁর দ্বারা পালিয়ে যাওয়া কতটা যৌক্তিক ছিল? তিনি কখনো পালিয়ে যাওয়া কিংবা গোপনে থাকার রাজনীতি করেন নাই; বরং, তিনি সবসময় সাংবিধানিক রাজনীতিই করেছেন। তাই দেখা যায়, পাকিস্তান আমলে বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। মাওলানা ভাসানী একবার শেখ মুজিবকে গ্রেফতার হতে বারণ করলে শেখ মুজিব লিখেন, ‘তাঁকে জিজ্ঞেস করা দরকার, তিনি কেন আমাকে গ্রেফতার হতে নিষেধ করেছেন? আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ, আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না’। [১৩ক]

এ বিষয়ে আরেকটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়। একবার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে এসেছিল তাঁর বাসায়; এসে দেখে যে তিনি বাসায় নাই। পরে বাসায় ফিরে এসে শেখ মুজিব তা জানতে পেরে ফোন করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে, ‘আমার বাড়িতে পুলিশ এসেছিল, বোধহয় আমাকে গ্রেফতার করার জন্য। আমি এখন ঘরেই আছি গাড়ি পাঠিয়ে দিন’।[১৩খ]

আরো পড়ুনঃ স্বাধীনতা যদি আমাদের না হতো… 

হুমায়ুন আজাদের লেখা দিয়েই আলোচনা শেষ করি, ‘আমাদের শোচনীয় দেশে সব ধরণের ব্যাখ্যাই সম্ভব, মিথ্যে এখানে খুবই শক্তিমান, অনেকটা আমাদের মায়ের বুলি, এবং নির্লজ্জভাবে তা প্রচার করা যায়। মুজিব যদি ধরা না দিয়ে পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করতেন, কোনো ভাঙা বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তাহলে কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আরো তীব্র, আরো সফল হতো? তাহলে কি তিনি মুজিব হতেন? তাহলে তো তিনি হতেন মেজর জিয়া। মুজিব পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না, তিনি মুজিব হতেন না, হতেন সামান্য ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, এবং আমরা একটি বিশাল রাজনীতিক ভাবপ্রতিমাকে হারাতাম, মুক্তিযুদ্ধে আমরা এতো অনুপ্রেরণা বোধ করতাম না। যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক, তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান’। [আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম – হুমায়ুন আজাদ]

তথ্যসূত্রঃ

১) Witness to Surrender – Siddik Salik
২) বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার সেই ওয়ারলেস বার্তাটি – মুনতাসীর মামুন
৩) মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর – গোলাম মুরশিদ
৪) নেতা ও পিতা – শারমিন আহমদ
৫) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র – বেলাল মোহাম্মদ
৬) ’৭১ সালে ৬ টি মহাদেশের মিডিয়ায় ২৬ শে মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার খবর – যাত্রী [আমার ব্লগ]
৭) ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এবিসি নিউজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর – কুলদা রায় [আমার ব্লগ] [লিংক – https://www.amarblog.com/index.php?q=porimanob/posts/145485]
৮) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা –  মাশুকুর রহমান ও মাহবুবুর রহমান জালাল [লিংক – https://gold.mukto-mona.com/Articles/jalal/swadhin_bangla_betar.html]
৯) The Sheikh Mujib Declaration of Independence of Bangladesh and Media Documents – MMR Jalal.
১০) স্বাধীনতা ঘোষণা : এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা – সৈয়দ আবদুল শুক্কুর –সাপ্তাহিক ২০০০
১১) ভিডিও লিংক – https://www.youtube.com/watch?feature=youtu.be&v=zDnAfMkF7gM&app=desktop
১২) অপারেশন বিগ বার্ড: যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুকে – অমি রহমান পিয়াল
১৩) অসমাপ্ত আত্নজীবনী – শেখ মুজিব

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top