গল্প-সল্প

আচার, জাল কিংবা ভালবাসার গল্প

আচার, জাল কিংবা ভালবাসার গল্প নিয়ন আলোয় neon aloy

১.
দুপুরের রান্না শেষে এক বালতি কাপড় কাচার পর অবশেষে কিছুটা অবসর পেল তামান্না। চরম বিরক্তি নিয়ে নিজের ঘরে যখন ঢুকল, সারা মুখ ঘামে জব জব করছে। ঘামা শরীরে বেশীক্ষণ থাকতে পারেনা ও। গোসল না করা পর্যন্ত গা ঘিনঘিন করতেই থাকে। কিন্তু গোসল করা সম্ভব হচ্ছেনা, অন্তত এই মূহুর্তে নয়। কাপড় কাচা শেষ না হতেই ট্যাপের পানি চলে গেছে, বিকেলের আগে আর সে পানি পাওয়া যাবেনা। আপাতত তাই মনে মনে ওয়াসার চৌদ্দ-গুষ্টি উদ্ধার করা ছাড়া উপায় নেই।

ফ্যান ছেড়ে দিয়ে তামান্না খাটে পা ঝুলিয়ে বসল। রাগে গা চিড় বিড় করছে। রাগটা ওর মা’র উপর। কাল রাতে কত করে বলে রেখেছিল, আজ কোনো কাজ করতে পারবেনা, বিকেলের পরে তো একেবারেই নয়। তামান্নার প্ল্যান ছিলো সারাটা বিকেল ধরে সাজবে সে, তারপর সন্ধ্যার আগে আগে আনিস ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাবে। কিন্তু হয়েছে ঘোড়ার ডিম। বড় ফুপুর হাত ভাঙ্গার আর সময় পেলোনা! ডাইনী বুড়ি একটা!

সকাল হতে না হতেই ফোন,
“নিলুফা, আমি তো আর নাই রে। এইবার আর বাঁচবোনা। মরার আগে একবার এসে দেখে যা।”

আর সব উপেক্ষা করা গেলেও, মাঝে মাঝে দ্বারস্থ হতে হয় এমন বড়লোক আত্নীয়ের ফোন উপেক্ষা করা যায়না। আর একবার গেলে হয়তো রাতের আগে ফেরাও হবেনা। অগত্যা তাই সারাদিনের কাজ তামান্নাকে বুঝিয়ে দিয়ে সকাল এগারোটার দিকে ক্লিনিকে চলে গেছেন ওর মা।

মা চলে যাওয়াতে অবশ্য একটা সুবিধা পেয়েছে তামান্না। মা থাকলে শাড়ি ম্যানেজ করা সমস্যা হতো। কিন্তু এখন আর সেটা কোনো সমস্যাই নয়। আনিস ভাই ওকে শাড়িতে দেখে নিশ্চয়ই খুব অবাক হবেন। হলে হোক, ওই মানুষটার জন্যই তো সব।

২.
আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলো তামান্না। কী স্নিগ্ধ মুখ, কী মায়াময় চোখ। চুল ভালো করে শুকায়নি এখনো, চোখে কাজল দেয়া ছাড়া আর সাজতেও পারেনি, অথচ কী সুন্দর লাগছে। আনিস ভাই চোখ ফেরাতে পারবেনা। টের পেলো তামান্না, ওর ফর্সা গালে রক্ত জমতে শুরু করেছে।

পুরো বিকেল পার করে সন্ধ্যার আগে পানি এসেছে অবশেষে। গোসল শেষে আর দেরি করেনি তামান্না, আগে ঠিক করে রাখা লাল শাড়িটা পরে নিয়েছে ব্যস্ত হাতে । শাড়িটা বের করার সময় অবশ্য প্রথমে একটু মন খারাপ হয়েছিলো । শাড়ির একজায়গায় কিসের যেনো হলুদ হলুদ দাগ। তবে অনেক কায়দা করে দাগটা কুচির ভেতর রেখেছে ও। আয়নায় বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়ে নিয়েছে আসলেই দাগটা এখন আর দেখা যাচ্ছেনা একটুও।

নিজেকে ভালোভাবে আরো একবার দেখে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আযানের অপেক্ষা করতে লাগলো তামান্না। আযান দিলে আব্বা আর ওর ছোট ভাই অন্তর নামায পড়তে যাবে। সে সুযোগে আনিস ভাইয়ের কাছে চলে যাবে ও। আনিস ভাই যে নামায পড়েনা, সেটা ভালো করেই জানে তামান্না। বাইরেও যায়নি, আগে থেকে খোঁজ নিয়ে রেখেছে ও। সুতরাং চিলেকোঠার ঘরে আনিস ভাইকে পাওয়া যাবেই। একবার ওখানে চলে যাবার পর কী হবে তা নিয়ে ভাবেনা তামান্না। যা হয় হোক, ও কেয়ার করেনা।

৩.
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তামান্না। আনিস খালি গায়ে লুঙ্গি পরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কী একটা বই পড়ছিলো। তবে ওকে অসময়ে আসতে দেখে চমকে গেছে বলে মনে হলোনা তামান্নার কাছে, যেনো অপেক্ষা করেছিলো ওর জন্যেই।

– কিরে, তুই?
– হু, তোমার সাথে দেখা করতে করতে আসলাম।
– ভালো, ভালো। ওই মোড়াটা টেনে নিয়ে বস।
ঘরের কোনায় রাখা একটা বেতের মোড়ার দিকে ইঙ্গিত করলো আনিস।

“আজকে ঘুরতে যাওনি কোথাও?”
“নাহ! তুই গিয়েছিলি নাকি? এতো সাজগোজ কার জন্যে শুনি?”, সবুজ রঙের একটা গেঞ্জি মাথা দিয়ে গলায় দিতে দিতে বললো আনিস।

“তোমার জন্য”, কথাটা তামান্না বলে ফেলেছিলো প্রায়। কিন্তু নিজেকে সামলে বললো, “কারো জন্যেই না। সবাই তো ঘুরতে বেরোয় আজকে। আমার কোথাও যাবার জায়গা নেই, তাই একাই সেজেছি। এখন তোমার এখানে এসেছি চা খেতে। চা খাওয়াও।”

হাসিমুখে বিছানা ছেড়ে উঠলো আনিস। উঠে স্টোভটা জ্বালাতে শুরু করলো। তামান্না আনিসের কাছে মাঝে মাঝে চা খেতে আসে। চা খেতে খেতে গল্প করে। কিন্তু একা একা, তাও আবার সন্ধ্যাবেলা, আগে আসেনি কখনো।

“সকালে পান্তা ইলিশ খেয়েছিলি?”, পানির পাতিল স্টোভে চড়িয়ে দিয়ে জানতে চাইলো আনিস।
“আরে নাহ, পান্তা জিনিসটা আমি দু’চোখে দেখতে পারিনা। আর ইলিশ মাছ কই পাব? তুমিতো জানোই, আব্বার বেতন আটকে আছে দুই মাস। ভাত, আলুভাজি আর ডিম ভাজি খেয়েছি। তুমি খেয়েছো পান্তা ইলিশ?”, টের পেলো তামান্না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা শুরু করেছে।

“হু, ভার্সিটিতে গিয়েছিলাম। ওখানে খেয়েছি”, তামান্নার দিকে তাকিয়ে জবাব দিলো আনিস। তারপর গলার স্বর পাল্টে বললো, “আচ্ছা একটা কথা সত্যি করে বল তো, এই সন্ধ্যা বেলায় কেনো এসেছিস এখানে? এখন যদি আমি দরজা লাগিয়ে দেই, কি করবি তুই?”, যদিও কথা শেষ করার আগেই হাসতে শুরু করেছে আনিস, কিন্তু সে হাসিতে ঠাট্টা নয় বরং গভীর কিছু টের পেলো তামান্না।

অনেক কষ্টে নিজেকে এতোক্ষণ সামলে রেখেছিলো তামান্না। কিন্তু আনিসের হাসিটা ওর সব নিয়ন্ত্রণ ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আনিসের চোখে চোখ রাখতে চেষ্টা করল। মনের সব দ্বিধা ঝেড়ে ভাবতে লাগল, আনিস ভাই পারবেতো ওর চোখের ভাষা পড়তে?

৪.
দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে তালা টিপে দিলো তামান্না। ছাদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফুফুকে দেখতে যাবার আগে, আচারের বয়মগুলো মা রোদে দিয়ে গিয়েছিলো । বলে গিয়েছিলো রোদ পড়ে গেলে ঘরে নিয়ে যেতে। নেওয়া হয়নি। আচারের কথা একদম ভুলে গেছে। এখন নিয়ে যেতে হবে। তবে কাপড় শুকায়নি এখনো, থাক ওগুলো। পরে অন্তরকে পাঠিয়ে দিলেই হবে, নামিয়ে নিয়ে যাবে।

তিন বছর আগে আনিস যখন স্কলারশিপ নিয়ে জার্মানি চলে গেলো, তামান্না তখন নাইনে পড়ে। চার বছর ধরে একই বাড়িতে থাকার ফলে আনিস আর তামান্নার মধ্যে সহজ একটা সম্পর্ক দাড়িয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ক্লাস এইটে ওঠার পর থেকে, আনিসকে দেখলেই কেমন যেনো একরকম কান্না কান্না মায়া অনুভব করতো তামান্না। নাম না জানা এ অনুভুতির কথা ও মুখ ফুটে বলেনি কখনোই। আর আনিসও আত্নকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় মগ্ন থাকার কারণে তামান্নার এ পরিবর্তন খেয়াল করেনি। তবে কে জানে, করেছিলো হয়তো, কিন্তু নিজেকে সতর্ক রেখে গেছে সবসময়।

একটা সময় রাতের পর রাত আনিসের কথা ভেবে জেগে থেকেছে তামান্না। তখন হাজার রকম চিন্তা আসতো মাথায়। সেসব চিন্তায় ডুবে থেকে কষ্ট ভোলার চেষ্টা করতো সে। শেষে আনিস যখন চলে গেলো, টের পেলো তামান্না, মায়ার সেই জালে সারাজীবনের জন্যে আটকে গেছে সে।

ঘরটায় কেউ আর থাকেনা এখন। তালা দেয়া থাকে সাধারনত। তবে এখনো মাঝে মাঝে তামান্না আসে এ ঘরে। তালা খুলে ঘরের ভেতর বসে থাকে চুপচাপ। আনিস ভাইকে কল্পনা করে অনেক রকম দৃশ্য সাজায় মনে মনে। জানে কোনো অর্থ নেই, তবু এই অর্থহীন কাজটা করতে ওর ভালোই লাগে ।

“মাকড়শার জালে ঘরটা ভরে গেছে, একদিন এসে পরিষ্কার করতে হবে”, আচারের বয়ম হাতে নিয়ে নিচে নেমে যেতে যেতে ভাবল তামান্না।

 

[কভার ফটোটি লুতফুল প্লাবন ফটোগ্রাফি হতে সংগৃহিত]

Most Popular

To Top