নিসর্গ

শর্টকাটে শিলংঃ ঘুরে এলাম মেঘের রাজ্য

শিলং নিয়ন আলোয় neon aloy

দেশের বাইরে গিয়ে কিছু সময় কাটানোর ইচ্ছা আমাদের গ্রুপের প্রত্যেকটা ছেলেরই মনে মনে ছিল। কিন্তু পাসপোর্ট, ভিসা, টাকা-পয়সা, আরও অনেক কিছু ম্যানেজ করা অনেক কষ্টকর হয়ে পরছিলো আমাদের জন্য। শুরুতে দার্জিলিং যাওয়ার শখ থাকলেও কিছু কারণে আমরা করিমগঞ্জ বর্ডার দিয়ে ইন্ডিয়া যেতে হবে দেখে দার্জিলিং প্রথমেই বাদ দিয়ে শিলংকে বেছে নিলাম। শিলংকে ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্বের পাহাড়ের বাড়ি বলা হয়। আমি বলব পাহাড় আর মেঘের বাড়ি কেননা পাহাড় আর মেঘ একসাথে একাকার হয়ে আছে সেখানে। শিলং সিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০০+ ফুট উপরে, তাহলে বুঝতেই পারছেন পাহাড়গুলা ঠিক কতো উপরে হবে।
ভ্রমণের বর্ণনায় যাওয়ার আগে কিছু কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজনীয় মনে করছি-
 
যেখানেই যান, পাসপোর্ট সাথে রাখবেন। কারণ অনেক জায়গায় পাসপোর্ট দেখাতে হয় আর পাসপোর্টের ফটোকপি (১০ কপি), পাসপোর্ট সাইজ ছবি (১০ কপি) সাথে নিবেন।
টুরিস্ট স্পট তাই হোটেলের অভাব নাই। আগে থেকেই হোটেল অনলাইনে বুক করে রাখার দরকার নাই কারণ এতে আপনার টাকা বেশি খরচ হবে। শিলং গিয়ে একটু সময় নিয়ে খুঁজলেই মনমতো হোটেল পেয়ে যাবেন। সব লেভেল এর হোটেল পাওয়া যায়। আমরা ছিলাম ৫ জন, প্রতি রাত ১৫০০ রুপি (মাঝারি মানের হোটেল)। হোটেল ভাড়া করার আগেই দেখে নিবেন বাথরুমে যাতে গরম পানির ট্যাপ থাকে, নাহলে কিন্তু যতদিন থাকবেন ততদিন গোসল করতে পারবেন না। ট্যাক্সি শিলং এর বেস্ট যানবাহন। ট্যাক্সি ভাড়া অনেকটাই আমাদের দেশের তুলনায় শিথিলযোগ্য।
আমরা যে প্ল্যান ফলো করে ঘুরেছি, সে অনুসারেই জানাচ্ছি কিভাবে দিন ভাগ করে ঘুরলে ভাল হতে পারে আপনাদের জন্য।
 

শিলং পিক নিয়ন আলোয় neon aloy

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০০ ফুট উপরে শিলং পিক। এখান থেকে শিলং সিটি অসম্ভব সুন্দর দেখায়। ছোট-বড়, উঁচু-নিচু রঙ্গিন বাড়ি-ঘর গুলা যেন আর সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। রাতের বেলায় বাতি জলে ঠিক যেন তারার মতো।


প্রথম দিন :
প্রথম দিন লোকাল টুরিস্ট প্লেসগুলো বেড়ানো শেষ করলেই ভাল কারণ সিটিতে ৭-৮ টা প্লেস আছে। শিলং পিক, এলিফেন্ট ফলস, গলফ লিঙ্ক, ওয়ার্ডস লেক, চার্চসহ আরও অনেক কিছুই আছে দেখার মতো। শিলং পিক প্রায় ৭০০০ ফুট উপরে যেখান থেকে শিলং শহর মারাত্মক লাগে, রাতে আরও বেশি সুন্দর লাগে। পুলিশবাজার সেন্টার পয়েন্টে সন্ধ্যার দিকে আড্ডা দিবেন, মজা পাবেন অনেক। সারাদিন ট্যাক্সি ভাড়া নিবে ১০০০ রুপির মতো।
 

চেরাপুঞ্জি নিয়ন আলোয় neon aloy

চেরাপুঞ্জি


চেরাপুঞ্জি নিয়ন আলোয় neon aloy

চেরাপুঞ্জিকে এশিয়ার স্কটল্যান্ড বলা চলে। বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আসে এখানে। ফলস সহ অনেক কিছু রয়েছে। মুভির শুটিং-ও হয় সেখানে। মেঘ আর পাহাড়ে এক হয়ে আছে এ জায়গাটায়।


দ্বিতীয় দিন :
দ্বিতীয় দিনে চেরাপুঞ্জি যেতে পারেন, ওখানেও অনেক জায়গা আছে দেখার মতো। চেরাপুঞ্জিকে এশিয়ার স্কটল্যান্ড বলা হয়। সেভেন সিস্টার ফলস, ডাইন্থলেন ফলস, ইকো পার্ক, কেইভ- এছাড়াও অনেক কিছু, সবকিছু একদিনে শেষ করা সম্ভব না। প্রত্যেকটির রুটও এক নয় । সকাল ৭-৮ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া নিবে ১৫০০ রুপি। দুপুরে ‘Nalgre Restaurant’ এ খাবেন কারণ এখানে খাবার অনেক সুস্বাদু। খাবার থালি হিসেবে এখানে, প্রতি রুই মাছের থালি ১৬০ রুপি সাথে থাকবে ভাত, ডাল, আলু-ভাজি, আলু-ভর্তা (মাছ ছাড়া বাকিগুলা আনলিমিটেড গায়েব করতে পারবেন, দাম একই)। আবার সন্ধ্যায় ফিরে পুলিশ বাজারে আড্ডা দেন, ভিন্ন মানুষ দেখেন, অভিজ্ঞতা গ্যাদার করেন।

পুলিশবাজার সেন্টার পয়েন্ট নিয়ন আলোয় neon aloy

শিলং সিটির প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে পুলিশবাজার সেন্টার পয়েন্ট। এখান থেকেই সব জায়গায় যাওয়া যায়। ষ্ট্রীটগুলোতে সকালে খাবার নিয়ে বসে, সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। রাত ৮-৯টার পরে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। এই ষ্ট্রীট দিয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০,০০০ হাজার মানুষ চলাচল করে।


তৃতীয় দিন :
তৃতীয় দিনে মাওলিংলং, ডাউকি লেক যেতে পারেন। মাওলিংলং এশিয়ার ক্লিনেস্ট ভিলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। গ্রামটি পাহাড়ি এলাকায় সবুজ দিয়ে ঘেরা, খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, মানুষ খুব ভালো, গাছ-গাছালির ফুল বা পাতা ছেঁড়া নিষেধ। সেখানে গেস্ট হাউস, হোটেলে রয়েছে থাকার সুব্যবস্থা। খাবারও মিল সিস্টেমে, বন-মোরগ বা ডিম দিয়ে সাথে থাকবে ভাজি, সবজি, ডাল। ১৫০ রুপি লাগবে বন-মোরগের ক্ষেত্রে, ১০০ রুপি ডিমের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ভিউ পয়েন্টও আছে, সেখান থেকে সিলেট অঞ্চলের ভিউ দেখা যায়। মাওলিংলং-এ আবার গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায়। ওরাই বলে এই গ্রাম নাকি ঈশ্বরের নিজের বাগান।

মাওলিংলং ভিলেজ নিয়ন আলোয় neon aloy

এশিয়ার ক্লিনেস্ট ভিলেজের স্বীকৃতি পাওয়া মাওলিংলং গ্রাম।


লিভিং রুট ব্রিজ নিয়ন আলোয় neon aloy

মাওলিংলং ভিলেজ যাওয়ার আগেই রিওয়াই ভিলেজ, যেখানে দেখা মিলে এই লিভিং রুট ব্রিজের। কয়েকটা গাছের শেকড় নিয়ে এটা প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। জনপ্রতি ১০ রুপি করে টিকেট কিনতে হয়। এখানে ভিন্ন কিছু ফল পাওয়া যায় যেগুলো বেশ সুস্বাদু।


এগুলো ছাড়াও অনেক জায়গা দেখার রয়েছে। সবগুলো স্পট ঘুরতে ১ সপ্তাহ সময় হাতে থাকলেই হবে। ওরা বাংলা, হিন্দি, ইংলিশ, খাসি অনেক ভাষা জানে। যে কেউ গেলে ভাষাগত সমস্যা হবে না। তবে ইংলিশ অথবা হিন্দি ভালো জানলে কোন সমস্যাই হওয়ার কথা না। বাংলাদেশীদের অনেক হোটেল ভাড়া দিতে চাইবে না কারণ বিদেশিদের জন্য একটা ফরম থাকে সেটা কম দামি হোটেল গুলাতে থাকে না। আমরা ছিলাম ‘হোটেল অনুরাধা’-তে, মোটামুটি ভালো, যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিবে। হোটেল ম্যানেজমেন্ট ট্যাক্সি ঠিক করে দিলে ড্রাইভারদের কাছ থেকে একটা কমিশন নেয় যেটা প্যাসেঞ্জারকেই দিতে হয়। সেভেন সিস্টার একটা হোটেল আছে, এইটার নিচে অনেক ট্যাক্সি পাওয়া যায় সেখানে গিয়ে ঠিক করে যাওয়া ভালো, কিছু রুপি কম খরচ হবে।
মে, জুন বা জুলাই-এর দিকে যাবেন কারণ তখন ফলসগুলাতে বেশি পানি থাকে। মেঘ আপনার সাথে খেলতে আসবে। শিলং যেতে চাইলে সিলেট ডাউকি বর্ডার বেস্ট অপশন, কারণ সেখান থেকে শিলং মাত্র ৩ ঘণ্টার রাস্তা।
ওহ, আমার সাথে ছিল বন্ধু জনি, সুমন, সৌমেন, রাজন।
ভ্রমণকাহিনী লিখতে কিছু ত্রুটি হতেই পারে আমার, বেতালা সুন্দর চোখে দেখবেন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top