ক্ষমতা

ট্রাম্পের পলিটিক্স, ট্রাম্পের পল্টিবাজি!

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি নিয়ন আলোয় neon aloy

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছিলো- ডোনাল্ড ট্রাম্প লোকটা পাগলাটে হলেও তার কথার দাম আছে। ট্রাম্প সেটাই বলেন যেটা তিনি বিশ্বাস করেন এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করে দেখাবেন। উল্টোদিকে হিলারি ক্লিনটন যেন সাক্ষাত শয়তান, ঘাঘু পলিটিশিয়ান, তার কথার কোন দাম নাই। সত্যি বলতে, এই ধারণা থেকে অনেক মার্কিন নাগরিকই কিন্তু তার ভোটটি দিয়ে এসেছেন ট্রাম্পের পক্ষে, ট্রাম্পের ধ্যান-ধারণা খুব একটা পছন্দ না করলেও। তাদের আশা ছিলো, গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের নির্বাচনী প্রলোভনের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আসলেই নতুন কিছু করে দেখাবেন।

মার্কিন নাগরিকদের এই বিশ্বাসের পিছনে বড় যে নিয়ামকটি কাজ করেছে, সেটি হলো ট্রাম্প তার নির্বাচনী খরচ সম্পূর্ণ নিজেই বহন করেছেন, যেখানে সাধারণত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নির্বাচনী তহবিলের বড় একটি অংশ আসে বড়-বড় কর্পোরেট কোম্পানির পকেট থেকে। আর এই নির্বাচনী তহবিলের বিপরীতে কর্পোরেট ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাটাও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের গলায় শেকল পরিয়ে দেয়। সেদিক থেকে সম্পূর্ন মুক্ত ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সেটাই আশা দেখিয়েছিলো লাখো মার্কিন নাগরিককে। কিন্তু ট্রাম্প কি আসলেই রক্ষা করছেন নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি? নাকি তিনিও আর দশজন রাজনীতিবিদের মতই ভুলে বসেছেন নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো?

আর এই প্রশ্ন থেকেই ক’দিন আগে ফেসবুকে ভাইরাল হয় একটি লেখা, যেখানে ট্রাম্পের ১১টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সেগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। সেই স্ট্যাটাসটি অনুবাদ করে তুলে ধরা হলো নিচে-

১। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তার চাকুরীর জন্য মাসিক বেতন নিবেন না। ক্ষমতায় বসার পর ইতোমধ্যেই তিনি গত দুইমাসের বেতন নিজের পকেটে পুরেছেন!

২। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তুলবেন, এবং এই দেওয়াল নির্মাণের পুরো খরচ আদায় করে নিবেন মেক্সিকো সরকারের কাছ থেকেই! যাই হোক, ট্রাম্প সেদিকে নজর না দিয়ে কংগ্রেসের কাছে ২৫ বিলিয়ন ডলার তহবিলের আবেদন করেছেন এই দেওয়াল নির্মাণের জন্য, যে টাকাটা দিনশেষে মার্কিন সাধারণ নাগরিকদের পকেট থেকেই আসবে।

৩। ট্রাম্প দাবী করেছিলেন হোয়াইট হাউজের অধিপতি হলে তিনি বারাক ওবামার মত গলফ খেলে ছুটি কাটাবেন না। যাই হোক, গত ৭ সপ্তাহের মধ্যে ৫টি সাপ্তাহিক ছুটি-ই তিনি গলফ খেলে কাটিয়েছেন, যার পিছনে মার্কিন সরকারের খরচ হয়েছে ১১.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

৪। ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় আসলে তিনি নিশ্চিত করবেন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে নির্মিতব্য সকল অবকাঠামো নির্মিত হবে মার্কিন প্রযুক্তি এবং কাঁচামাল ব্যবহার করেই। এতে ভগ্নপ্রায় মার্কিন শিল্পগুলো আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে, কর্মসংস্থান হবে কোটি আমেরিকানের।। অথচ বিতর্কিত কীস্টোন পাইপলাইন প্রজেক্টে ব্যবহারের জন্য রাশিয়া থেকে কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছে।

৫। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি সোশ্যাল সিকিউরিটি এবং স্বাস্থ্যখাতে এমন কোন পদক্ষেপ নিবেন না যার কারণে দরিদ্র মার্কিন জনগোষ্ঠী ভোগান্তির মুখে পরবে। তবে যাই হোক, তার সরকার ইতোমধ্যেই কংগ্রেসে যে বিলগুলো উত্থাপন করেছে, সেগুলোর প্রস্তাবনা তার প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত!

৬। ট্রাম্প জোরগলায় দাবী করেছিলেন তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের কারো কোনরকম আঁতাত নেই রাশিয়ান সরকারের সাথে। যাই হোক, ইতোমধ্যেই এদের মধ্যে ৭জন অনেক চেষ্টাচরিত্র করে আর মিথ্যা কথা বলেও নিজেদের রাশিয়ান কানেকশন লুকিয়ে রাখতে পারেননি। এই ৭জনের মধ্যে নিরাপত্তা উপদেষ্টার মত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তি মাইকেল ফ্লিনও রয়েছেন।

৭। ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি তার বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার সাথে আর সম্পৃক্ত থাকবেন না, এতে করে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। তিনি মত পরিবর্তন করেছেন।

৮। ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি তার ট্যাক্স রিটার্ন জনগণের সামনে প্রকাশ করবেন, যেটা তিনি এখনো করেননি।

৯। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ওয়াশিংটনকে দালালমুক্ত (কর্পোরেট লবীয়িস্ট) করার। যাই হোক, দালালদের খপ্পর থেকে ওয়াশিংটন কতটুকু মুক্ত হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না কারণ তিনি দালালদের বস যে কর্পোরেটরা, তাদের দিয়েই নিজের কেবিনেট ভরিয়ে ফেলছেন! বিষয়টা অনেকটা দেশকে চোরমুক্ত করার দায়িত্বে দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাতকে পুলিশপ্রধান পদে নিয়োগ দেওয়ার মতই হাস্যকর।

১০। ট্রাম্প দাবী করেছিলেন, ক্ষমতা নেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তিনি জঙ্গীগোষ্ঠী আইসিসের নাম-নিশানা মুছে দিবেন। গত দুইমাসে তার তেমন কোন পদক্ষেপ চোখে পরেনাই। তবে মুসলিম ব্যানের মাধ্যমে ৬-৭টি দেশের লাখ-লাখ মানুষকে সাফল্যের সাথে ভোগান্তির মুখে ঠেলে দিয়েছেন খুব সহজেই!

১১। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি ছিলো “ওবামাকেয়ার” এর পরিবর্তে এমন স্বাস্থ্যসেবা চালু করার, যার মাধ্যমে কম খরচে বেশি মানুষকে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা যায়। বাস্তবে তার রিপাবলিকান দলের প্রস্তাবিত আমেরিকান হেলথকেয়ার অ্যাক্ট ২০১৭ এর খসড়া অনুযায়ী ওবামাকেয়ারের চেয়ে অনেক কম মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে অনেক বেশি খরচে!

তো দিনশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের নির্বাচনী ক্যারিশমা যে ক্ষণস্থায়ী কিছু ফাঁকা বুলি ছিলো তাতে খুব বেশি সন্দেহ নাই। তবে দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে তিনি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় মনোযোগ দেন কি না।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top