ইতিহাস

একাত্তরের মার্চের উত্তাল তৃতীয় সপ্তাহঃ প্রহসনের আলোচনার আড়ালে আসন্ন দুর্যোগের ঘনঘটা

১৯৭১ মার্চ তৃতীয় সপ্তাহ নিয়ন আলোয় neon aloy

[গত পর্বের লিঙ্ক- একাত্তরের মার্চের উত্তাল দ্বিতীয় সপ্তাহঃ বিস্ফোরন্মুখ বাংলায় প্রতিরোধের প্রস্তুতিপর্ব]

স্বাধীনতার জন্য বাঙালি মনেপ্রাণে কতটা প্রস্তুত ছিলো, তার প্রমাণ হচ্ছে একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। যা দেখে এমনকি গান্ধীজীও বিস্মিত হতেন। পরিষদ নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয় সেটা নিরসনের জন্যে ১৫ তারিখ ঢাকায় আসেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। তার কিছু দিন পর যোগ দেন ভুট্টো। দফায় দফায় চলে রুদ্ধদ্বার বৈঠক-আলোচনা। কিন্তু এর আড়ালে ছিল অন্যকিছু। পৃথিবীর ইতিহাসে আলোচনার নামে এতবড় প্রহসন আর হয়েছিল বলে মনে হয় না। ভাসানী তখন এক সভায় বলেছিলেন, ইয়াহিয়া কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ নন। একজন পাঁড় মাতাল। একজন মাতালের সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করা উচিৎ না। মুজিবের উচিৎ সুস্পষ্টভাবে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে সেই মতো কর্মসূচি গ্রহণ করা।

১৬ মার্চ, ১৯৭১

দিনটি ছিল মঙ্গলবার। উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের ১৫ তম দিন; শেখ মুজিবের সাথে বৈঠকের সাথে মিটিংয়ের জন্যে আগের দিন (১৫ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এসে ঢাকা পৌছেন। ষোল তারিখ সকাল এগারোটায় প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও ইয়াহিয়া খানের বৈঠক সম্পন্ন হয়। ইয়াহিয়া খান পরিষদ স্থগিত করার ক্ষেত্রে তাঁর পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করে আলোচনা শুরু করেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে ইয়াহিয়া বলেন যে, তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে চান। এর উত্তরে শেখ মুজিব তাঁকে বলেন, জনগণের যে মনোভাব এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মার্চ তিনি যে দাবি উত্থাপন করেছেন, তার চেয়ে কম কোন কিছু মেনে নেওয়া সম্ভব না এবং জনগণও সেটা মানবে না। আলোচনাকালে ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের ছয় দফার মৌলিক দাবীগুলো নীতিগতভাবে মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছেন এমন ভাব দেখান।

উল্লেখ্য, সেদিন থেকে ইপিআর জওয়ানদের অস্ত্র সামরিক কতৃপক্ষ তুলে নেয়; যার কারণে প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে সেদিন বাঙালি ইপিআরদের হাতে অস্ত্র বদলে দীর্ঘ বাঁশের লাঠি ছিল। বৈঠক চলাকালীন সময়ে জনতা প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে জমায়েত হয়ে “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে থাকে। আলোচনা শেষে বঙ্গবন্ধু বলেন, আরো আলোচনা চলবে। বিকেলে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘরোয়া মিটিং অনুষ্ঠিত হয়।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে তখন নিয়মিত সেনা প্রেরণ করা হত অপারেশন সার্চলাইটের জন্যে। এবং এই সৈন্য মোতায়েন বন্ধ করতে ভারত তার আকাশসীমার উপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানগামী সকল বিদেশী বিমান উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে আহসান হাবীব তার সিতারাখেদমত খেতাব বর্জন করেন। আন্দোলনের সমর্থনে এদিনে (১৬ মার্চ) যেসব সংগঠন পথে নেমেছিল তারা হলঃ কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসেস ফেডারেশন, উদীচী শিল্পগোষ্ঠী, ব্রতচারী আন্দোলন, স্টেটব্যাংক কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ, দেশরক্ষা খাতে বেতনভুক্ত বেসামরিক কর্মচারীদের সভা, ঢাকা জিলা সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড, নোয়াখালি এসোসিয়েশন, চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি, তাঁত শিল্প উন্নয়ন সমিতি, মগবাজার সংগ্রাম পরিষদ, দেশবিভাগে নিযুক্ত বেসামরিক কর্মচারী সমিতি।

অসহযোগ আন্দোলনে সেই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। সারাদেশব্যাপী আন্দোলন অব্যাহত থাকে। জয়দেবপুরে জনতার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, ড. জোহা হল, মুন্নুজান হল, যশোর, রংপুর সেনানিবাস এলাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা পিলখানা, ফার্মগেট, রামপুরা, কচুক্ষেত এলাকায় সামরিক বাহিনী অসহযোগ আন্দোলনকারীদের উপর নির্যাতন চালায়।

১৭ মার্চ, ১৯৭১

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫২ তম জন্মদিন ছিল এদিন। জন্মদিন উপলক্ষে ঘরোয়া এক আলোচনায় ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার বাসায় বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, “আমার জন্মদিনই কি আর মৃত্যুদিনই কি। আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু।’

কড়া সামরিক পাহারার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ভবনে শেখ মুজিব এবং ইয়াহিয়া দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় বসেন। পাকিস্তানিদের ভাষায়, সে বৈঠক ছিল একটা Tough session। সেদিনও শেখ মুজিব বৈঠকের শুরুতেই সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। এবং ইয়াহিয়া আবারো আইনগত সমস্যার কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনেই দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন যে আলোচনা শেষ হয়ে যায়নি, আলোচনা আরো চলবে। ঐদিন সন্ধ্যায়ই আবার ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি দলের বৈঠক অনুষ্টিত হয়।

উল্লেখ্য, শেখ মুজিবের সাথে বৈঠকের পরপরই ইয়াহিয়া খান বেলুচিস্তানের কসাই টিক্কা খানকে বলেন, The Bastard is not behaving. You get ready’। টিক্কা খাদিম হোসাইন রাজাকে রাতে ফোন করে জানান, Khadim, you can go ahead!’ ধীরে ধীরে সম্পন্ন হচ্ছিল অপারেশন সার্চলাইটের সকল প্রস্তুতি।  

একই দিনে চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাতে মাওলানা ভাসানী বলেন যে, বাংলার মানুষ এখন স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি জনগণ এখন স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। এছাড়াও ন্যাপ নেতা আবদুল ওয়ালী খান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে সাক্ষাত করেন। এবং বিকালে সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের জন্য জাতীয় পরিষদই যোগ্য স্থান। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পিপিপি নেতা জেড এ ভুট্টো ও প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান।

সেই সাথে আজকের দিনে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আগামী ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবসকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

১৮ মার্চ, ১৯৭১

এই দিন ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের সাথে কোন বৈঠক ছিলনা। তবে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আমেরিকা, বৃটেন, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি শক্তির প্রতি তাদের সরবরাহকৃত অস্ত্র দ্বারা বাঙালীদের হত্যা চালানোর প্রয়াস বন্ধ করতে বলেন।

এদিকে চট্টগ্রামে মাওলানা ভাসানী বলেন তাঁর ৮৯ বছরের আন্দোলন জীবনে তিনি কখনো একটি দাবীতে এভাবে জনগণের একতা আর সহযোগিতা দেখেন নি আর। স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর (ভাসানী) এবং শেখ মুজিবের মধ্যে পরিষ্কার কোনো বোঝাপড়া রয়েছে কিনা এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সব কিছুই সাংবাদিকদের কাছে বলা যাবে না। অনেক কিছুই রাজনীতিবিদদের কাছে গোপন থাকে।’ অন্যদিকে, পিপিপি প্রধান ভুট্টো জানান,  শাসনতন্ত্রের প্রশ্নে গোপন আলোচনার জন্য পরদিন ঢাকা যেতে প্রেসিডেন্ট তাঁকে যে আমন্ত্রণ করেছেন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তেজগাও-মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে সেনাবাহিনীর হামলা নিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, এ ধরণের উস্কানি আর সহ্য করা হবে না। এছাড়াও সরকারী ঘোষণায় জানানো হয় যে, ইয়াহিয়া-মুজিব তৃতীয় বৈঠক সকাল ১১ টায় অনুষ্ঠিত হবে।

এদিনই রাও ফরমান আলী ও খাদিম হোসাইন রাজা পাঁচ পৃষ্ঠার একটা নীল নকশা তৈরী করেন, যার নাম পূর্বে ছিল BLITZ, এবং পরে দেয়া হয় Operation Searchlight

১৯ মার্চ, ১৯৭১

অসহযোগ আন্দোলনের ১৮তম দিনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে জয়দেবপুরে। সেদিন জয়দেবপুর রাজবাড়ি থেকে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী জওয়ানদের সেনানিবাসে ফিরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে পাঞ্জাবী বিগ্রেডিয়ারের নেতৃত্বে সামরিক কতৃপক্ষ একদল সেনা জয়দেবপুর পাঠান। সকাল ১১ টায় পাঞ্জাবী নেতৃত্বাধীন পাকবাহিনীর দলটি চৌরাস্তায় আন্দোলনরত জনতার উপর প্রবল গুলিবর্ষণ করে। রাজবাড়ির দিকে অগ্রসরগামী সেনাবাহিনীকে  প্রতিরোধ করতে বাঙালি সেনাদল যোগ দেয় যার নেতৃত্ব দেন  লেঃ কর্ণেল মাসুদ হোসেন ও মেজর শফিউল্লাহ। পাঞ্জাবী বাহিনী ঢাকা ফিরে যায়। পথিমধ্যে বোর্ড বাজারে জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে। মৃতের সংখ্যা ১২৫ বলে জানা যায়। সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী জয়দেবপুরে সান্ধ্য আইন জারি করে বহুলোককে অজ্ঞাত স্থানে ধরে নিয়ে যায়। তারা আর কেউ ফিরে আসে নি। সেনাবাহিনী কর্তৃক এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে শেখ মুজিব বলেন, জনগণ যখন রক্ত দিতে তৈরী হয়, তখন তাঁদের দমন করতে পারে এমন শক্তি পৃথিবীতে নাই।

শেখ মুজিবের সাথে ইয়াহিয়ার দেড় ঘন্টার একান্ত বৈঠক হয় এদিন। শেখ মুজিব আবারো জোর দিয়ে বলেন যে, সংকট উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা এবং নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা। সন্ধ্যার দিকে উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক প্রেসিডেন্ট ভবনে সংগঠিত হয়। আওয়ামী লীগ তরফ থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ ও ড. কামাল হোসেন এবং সরকারের পক্ষে বিচারপতি এ আর কর্ণেলিয়াস, লেঃজেঃ পীরজাদা ও কর্ণেল হাসান অংশ নেন।

অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা জনাব মিয়া মমতাজ দৌলতানা, শওকত হায়াৎ খান ও মাওলানা মুফতি মাহমুদ এদিন ঢাকা আসেন। করাচীতে পিপিপি নেতা ভুট্টো বলেন: ক্ষমতার হিস্যা থেকে বঞ্চিত হলে তিনি চুপ করে বসে থাকবেন না। তিনি শক্তি প্রদর্শনে বাধ্য হবেন।

এদিনও অনেক মিছিল শেখ মুজিবের বাসভবনে যায়। শেখ মুজিব তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচার ব্যবস্থা করে যাব।”

২০ মার্চ, ১৯৭১

মার্চের বিশ তারিখ মীরপুর, চট্টগ্রাম, পার্বতীপুর, সৈয়দপুরে বাঙালির সাথে বিহারী ও সেনাবাহিনীর দাঙ্গা শুরু হয়।

আন্দোলন তখন চলছে পুরোদমে। চারু ও কারু শিল্পীরা “স্বা ধী ন তা” পোস্টার লিখে বুকে বেঁধে অসহযোগ আন্দোলনে রাস্তায় নামেন। প্রত্যেক মহল থেকেই ২৩ মার্চের পাকিস্তান দিবসকে কেন্দ্র করে বেশ তোড়জোড় প্রস্তুতি চলছিল। ভাসানী সেই দিনটিকে ‘স্বাধীন পূর্ববাংলা দিবস’ হিসেবে উদযাপন করার আহবান জানান।

সেদিন সকাল দশটায় বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের ৪র্থ দফা আলোচনা শুরু হয়। বৈঠক সোয়া দুই ঘন্টা চলে। এদিনের আলোচনায় আওয়ামী লীগের ছয়জন শীর্ষস্থানীয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান , এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং ড কামাল হোসেন। অন্যদিকে, ইয়াহিয়ার উপদেষ্টার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এ কে ব্রোহী, শরীফুদ্দিন পীরজাদা, মীঃ কর্ণেলিয়াস। বৈঠকে আগের দিনের গোলাগুলির ঘটনার কথা উঠলে শেখ মুজিব স্পষ্ট বলেন, নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানো হতে থাকলে পাল্টা গুলি চালানোর জন্যে শেষ পর্যন্ত তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেবেই। তাঁর এমন কঠোর কথা ইয়াহিয়া খানকে কিছুটা বিব্রত করে তুলে।

এ দিনেই করাচীতে পিপিপি নেতা ভুট্টো সাংবাদিকদের জানান যে, তিনি পরবর্তী দিন ঢাকা আসছেন। এবং বলেন যে, প্রেসিডেন্ট আমন্ত্রণে সন্তোষজনক জবাব পেয়ে তিনি ঢাকা আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

১৮ তারিখে তৈরিকৃত সেই নীলনকশা এই দিন পড়ে শোনানো হয় টিক্কা খানকে এবং এটা অনুমোদিত হয়।  

২১ মার্চ, ১৯৭১

দিনটা ছিল রবিবার। সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলোতে কালো পতাকা উড্ডয়ন করা হয়।  বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে অগণিত লোক মিছিলের জন্য জমায়েত হয়। এছাড়াও সন্ধ্যায় বিশিষ্ট লেখক ও শিল্পীরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে সাহিত্য ও গণসংগীতের আসর করেন।

প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের দেড় ঘন্টার একটি অনির্ধারিত বৈঠক বসে। বৈঠকে তাঁর সাথে আরো ছয়জন সহকর্মীও ছিলেন। তাঁরা ইয়াহিয়াকে বললেন যে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কেবল প্রদেশগুলোতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংকট সমাধানের পথে তাঁরা এগুচ্ছেন’।

এ দিন বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসভবনে বিশিষ্ট আইনজীবী এ কে ব্রোহীর সাথে এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হোন।

বিকালে ইয়াহিয়া খানের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার জন্য বারোজন নেতাসহ পিপিপি নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো ঢাকায় আসেন। সন্ধ্যায় দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে ইয়াহিয়া-ভুট্টো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা ছিল একান্ত গোপন। রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ভুট্টো দলীয় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সাথে ঘরোয়া এক আলোচনায় মিলিত হন। পরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতার কক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের মত বিনিময় হয়। এদিকে অন্যত্র ভুট্টো তাঁর সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে সামরিক প্রস্তুতিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিচ্ছিলেন। অপারেশন শুরু হবে জেনে যখন পাকিস্তানি নেতারা একে একে চলে যাচ্ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে তখন ভুট্টো ঠিকই থেকে গিয়েছিলেন; খুব কাছ থেকে গণহত্যা স্বচক্ষে দেখবেন বলে। ২৬ মার্চ সকালে তাঁর মুখ থেকে শোনা যায়, ‘আল্লাহ পাকিস্তানকে বাচিয়ে দিয়েছেন’।  

চট্টগ্রামের পোলো ময়দানে জনসভায় মাওলানা ভাসানী ইয়াহিয়া খানকে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা স্থানান্তর করে সরে পড়ার আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ শেখ মুজিবের পেছনে কাতারবন্দী। … আমরা এ দেশকে স্বাধীন করবোই’। অন্যদিকে, জয়দেবপুরে ১৯ মার্চ জারীকৃত সান্ধ্য আইন ছয় ঘন্টার জন্য প্রত্যাহার করা হয়। অপরাহ্ণে এই সান্ধ্য আইন অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ করা হয়।

আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ’  ২৩ শে মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’ উপলক্ষে পাকিস্তানি পণ্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সাথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের স্থলবাহিনীর শক্তি দ্বিগুণ করে যাচ্ছিল গোপনে।

২২ মার্চ, ১৯৭১

আন্দোলন তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল। প্রতিদিন মিছিল, সভা-সমাবেশ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে জনসাধারণ করে যাচ্ছিল। সব মিছিলের মুখ মিলছিলো ধানমন্ডির ৩২ নং রোডে। এ দিন সম্পর্কে দৈনিক পূর্বদেশ লিখেছে, ‘আজ ২২শে মার্চ শপথে শপথে প্রদীপ্ত দিন। প্রহরগুলো শুধু নয়, প্রতিফল যেন সংগ্রামের দুর্জয় প্রত্যয়ের এক একটি মৃত্যুঞ্জয় পতাকা হয়ে ৩২ নম্বর সড়ককে আন্দোলিত করেছে। এত প্রাণাবেগ, এত ভাবাবেগ, একদিনে এতবার এসে সঞ্চারিত হয়নি। জনতার এত জোয়ার এর আগে আছড়ে পড়ে নি এক দিনে এতবার ৩২ নম্বর সড়কে’।

আন্দোলনকারীরা ধানমন্ডিতে মার্কিন কনসাল জেনারেলের বাড়িতে বোমা ছুঁড়ে মারে।

ভুট্টো ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া খানের সাথে উপনীত আপোষ ফর্মুলা দেখে বেঁকে বসলেন। তাঁর বক্তব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে সামরিক আইন প্রত্যাহার করা যাবে না। প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু ও পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে ইয়াহিয়া খান প্রায় এক ঘন্টা পনের মিনিটের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শেষে শেখ মুজিব বলেন, আলোচনার যদি কোন অগ্রগতি না হতো তা হলে কেন আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি? মূলত, কোন সমাধানের পথে যাওয়ার ইচ্ছেই ছিল না ইয়াহিয়া-ভুট্টোর। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ শে মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। সাংবাদিকদের সাথে এ বিষয়ে প্রশ্নত্তোরকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, ৪ দফা পূরণ না পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা আব্দুল কাইয়ুম খান ও মাওলানা শাহ আহমেদ নুরানীকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান। এদিন আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে কবিতা পাঠের আসরে অংশ নেন আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, দাউদ হায়দার ও অন্যান্যরা। সভা ড: আহমদ শরীফ সভাপতিত্ব করেন। বিভিন্ন সংবাদ পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ও খবরে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

২৩ মার্চ, ১৯৭১

এই দিন ইতিহাসের ব্যতিক্রমী দিন। ‘মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল’ গ্রন্থে ডঃ কামাল হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য বছর দিনটি পাকিস্তান দিবস রূপে পালিত হতো। কিন্তু ১৯৭১ এর ২৩ মার্চ হাজার হাজার বাংলাদেশের পতাকা বিক্রি হলো। আমার মনে পড়ে, ভোর ছয়টার দিকে আমি যখন সংশোধিত খসড়াটির কপিসহ গাড়ি নিয়ে আমার অফিস থেকে বের হলাম, তখন নওয়াবপুর রেলক্রসিং থেকে আমিও একটি বাংলাদেশের পতাকা কিনলাম। সংশোধিত খসড়াসহ সকাল সাতটায় আমি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনের পৌঁছলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে অনেক মিছিল এসে উপস্থিত হলো এবং শেখ মুজিবের বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হলো’।  

সকাল ৯.২০ মিনিটে পল্টন ময়দানে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ’ এর গণ বাহিনীর কুচকাওয়াজ শুরু হয়। সম্মিলিত গণবাহিনী ঢাকার রাজপথ ধরে কুচকাওয়াজ করে গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্যে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আসে। শুধুমাত্র প্রেসিডেন্ট ভবন, ক্যান্টনমেন্টগুলো ও তেজগাও বিমানবন্দর ছাড়া আর কোথায় পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। দূতাবাসগুলোতে প্রথমে তাদের জাতীয় পতাকার সাথে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করলেও জনরোষের কারণে পরবর্তীতে তা নামিয়ে ফেলে এবং কিছু কিছু দূতাবাসে বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয়। টেলিভিশনে উর্দু সঙ্গীতও বাজানো হয়নি।  সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন প্রতিবাদ সভা-সমাবেশ অব্যাহত রাখেন। এই দিন সম্পর্কে আসগর খান লিখেছেন, ‘এ দিনই বলতে গেলে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, কোথাও পাকিস্তানি পতাকার চিহ্ন নেই’।   

এই দিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমে এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্বাধীনতার জন্যে সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণের জন্যে জনগনকে আহ্বান জানানো হয়। তাঁরা বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছি, কাজেই যে পতাকা আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি, তা পুনরায় তোলা বা স্বাধীনতা থেকে পিছু পা হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। তাই যে কোন কিছুর বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করাই আজ সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির পবিত্র কর্তব্য’।

দু’দফায় সকাল ও বিকালে বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টা ও সরকারী উপদেষ্টাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

২৪ মার্চ, ১৯৭১

আন্দোলনের ২৩ তম দিন ছিল ২৪শে মার্চ। বঙ্গবন্ধু তাঁর বাসভবনের সামনে মিছিলরত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, “শহিদের রক্তের সাথে আমি বেইমানি করতে পারব না। আমি কঠোরতর সংগ্রামের নির্দেশ দেয়ার জন্য বেঁচে থাকব কিনা জানি না। দাবী আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালায়ে যাবেন।” সংবাদমাধ্যমকেও একই কথা বলেন। এরপর তিনি কোথায় থাকবেন তা না জানলেও সংগ্রাম অবশ্যই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

এদিকে ঢাকার বাইরে পাক বাহিনীর এরিয়া কমান্ডাররা হত্যার তান্ডবলীলা শুরু করে দেয়। চট্টগ্রাম পোর্টের ১৭ নং জেটি থেকে এম ডি সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানো নিয়ে হাজার হাজার বাঙালি চট্টগ্রামে ব্যারিকেড রচনা করে। রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী বলেন, “১৯৩০ এর সূর্যের চট্টলা আবার ইতিহাসে স্বাধীনতার দ্বিতীয়বার সংযোগ ঘটালো।”

সৈয়দপুরে বিহারী-পাক বাহিনী যৌথভাবে নারকীয় গণহত্যা ঘটায়। ঢাকায় তাজউদ্দীন আহমেদ তীব্র প্রতিবাদ জানান। অনেক স্থানে ২৪ মার্চ থেকেই অবাঙ্গালীরা তাদের তান্ডবলীলা শুরু করে দেয় এবং বাঙ্গালীর প্রচুর জান মাল বিনষ্ট হয়।

কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে রাষ্ট্রের নাম কনফেডারেশন অব পাকিস্তান নামকরণের প্রস্তাব পেশ করেন। সরকারী দলের বিচারপতি কর্ণেল গিয়াস কনফেডারেশনের স্থলে ইউনিয়ন শব্দটি ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। লেঃ জেঃ পীরজাদা আগামীদিন চুক্তি স্বাক্ষরের সময় নামকরণ করার প্রস্তাব দেন।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিগ্রেডিয়ার মজুমদারকে জরুরী মিটিং এর কথা বলে টিক্কা খান চট্টগ্রাম থেকে হেলিকপ্টারে তাকে ঢাকা সরিয়ে আনেন। এবং ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ চৌধুরী সহ তাদের ক্যান্টনমেন্টে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এটা ছিল মূলত অপারেশন সার্চলাইট পরিকল্পনার সাথেই সম্পৃক্ত। ইতোমধ্যে ইয়াহিয়া-ভুট্টো নীলনকশার কাজ সমাপ্তির পথে। শেষ আঁচড়ের কাজ চলছে ইস্টার্ন সদর দপ্তরে। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও রাও ফরমান আলী দুটি হেলিকপ্টারে সব ক’টি ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে ব্রিগেড কমান্ডারদের নীলনকশা সম্পর্কে নির্দেশ প্রদান করে বিকেল বেলা ঢাকা ফেরত আসেন। মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠক বাতিল করা হয় এবং ধীরে ধীরে পাকিস্তানি নেতারা করাচির বিমান ধরা শুরু করেন, যা সম্পর্কে সিদ্দিক সালিক বলেন, as wise birds flee to their nests before the coming storm’।

 

সূত্রঃ
১) ৭১ এর দশমাস – রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
২) একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম
৩) মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল – ডঃ কামাল হোসেন
৪) Witness to surrender – Siddiq Salik
৫) উপধারা একাত্তর – মইদুল হাসান
৬) ভাসানী কাহিনী –সৈয়দ আবুল মকসুদ

[বায়ান্ন-একাত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ বিষয়ক শাবিপ্রবি-ভিত্তিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বায়ান্ন-একাত্তরের হয়ে এই পর্বটির কাজ করেছেন সজীব সাখাওয়াত।]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top