ফ্লাডলাইট

শততম টেস্টের আদ্যোপান্ত

আজকে মনে পড়ে যায় বয়কটের কথাগুলো। মনে পড়ে বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচ এর বিরুদ্ধে আরও অসম্মানজনক কথাগুলো। এসব কথা আর মনে করতেও ইচ্ছে হয় না। আমরা ধীরে ধীরে সেসব সমালোচনার জবাব দিয়ে যাচ্ছি, মুখে কিছুই বলতে হচ্ছে না।

এরপরেও বয়কটের একটি কথা মনে পরেই গেল। ইংল্যান্ড এর বিরুদ্ধে সেরা এবং স্মরণীয় জয়ের পরও তিনি বলেছিলেন “Bangladesh need to beat big teams abroad”। এই কথাগুলোর জবাব আমরা প্রায় নিউজিল্যান্ডে দিয়ে দিচ্ছিলামই। কিন্তু অধিকাংশ সেশন এগিয়ে থাকার পরেও কিছু ভুলের কারনে আমরা হেরে গেলাম। তেমনি ভারতের বিরুদ্ধেও আমরা মোটামুটি ভাল ব্যবধানে হেরে গেলেও কিছু মুহূর্ত পর্যন্ত ভালই লড়াই করেছিলাম।

এর পর এল সেই শ্রীলঙ্কা সফর। যে সফর নিয়ে আমাদের সবার মাঝেই অনেক আশা ছিল। সফরের শুরুতেই আমাদের ক্যাপ্টেন, কোচ এবং সব খেলোয়াড়ের মধ্যেই সিরিজ জয়ের একই কথা। এ যেন অন্য এক বাংলাদেশ। যারা আগে সবসময়ই বলত ভাল খেলার কথা, লড়াই করার কথা তারাই আবার বলছে সিরিজ জয়ের কথা। সেটিও আবার কই? শ্রীলংকায়! যে দলটি কিনা কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের মাটিতে হোয়াইটওয়াশ করল!! সেই তাদেরই মাটিতে আমাদের সবাই বলছে আমরাই নাকি ফেবারিট! এই সব কথাগুলোই  চাপ সৃষ্টি করল সম্ভবত আমাদের উপরেই। তাই নিজেদের প্রথম ম্যাচে আমরা হেরে গেলাম চান্দিমাল, কুশল মেন্ডিস, হেরাথের শ্রীলঙ্কার কাছে। আমরা ওইসব কথাবার্তা মিডিয়ায় না বলে যদি নিজেদের মধ্যেই রেখে খেলতাম তবে কে জানে এই সিরিজের ফল ভিন্নও হতে পারত।

এরপর এল আমাদের দ্বিতীয় টেস্ট। খেলা শুরু হওয়ার দুই-তিনদিন আগে থেকেই শুরু হল মাহমুদুল্লাহ নাটক। এরপর স্কোয়াডে নেই দেশসেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান মুমিনুল হক। অভিষেক হল অনেক সম্ভাবনার মোসাদ্দেক হোসেনের। যিনি কিনা প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে এরই মধ্যে করে ফেলেছেন তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি। প্রথম দিন শেষে শ্রীলঙ্কা ২৩৮/৭। গলার কাঁটা হয়ে ছিলেন চান্দিমাল। চান্দিমাল অসাধারন খেলে দলের রান বাকি টেলএন্ডারদের নিয়ে আরও ১০১ রান বাড়িয়ে নিলেন। লাকমল এবং হেরাথ অসাধারন সাপোর্ট দিয়ে গেলেন চান্দিমালকে। চান্দিমাল থামেন ১৩৮ রানে। শ্রীলঙ্কা অলআউট ৩৩৮ রানে।

এরপর দ্বিতীয় দিন শেষ বাংলাদেশের ২১৪/৫-এ। এরমধ্যে আবার দলের রান ১৯২/২ থেকে ১৯৮/৫ হয়ে গিয়েছিল। ক্রিজে ছিলেন দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যান সাকিব এবং মুশফিক। পরের দিন মুশফিক ফিফটি করে ফিরে গেলেও সাকিব অভিষিক্ত মোসাদ্দেককে নিয়ে করে ফেললেন ১৩১ রানের জুটি। যা এই মাঠের ৭ম উইকেট জুটির রেকর্ড। এই জুটিটিই বাংলাদেশকে সম্ভবত ম্যাচ জয়ের দিকে নিশ্চিত এগিয়ে দিয়েছিল। সাকিবের ১১৬ এবং  মোসাদ্দেক এর ৭৫ রান বাংলাদেশ দলকে এনে দিল অসামান্য ১২৯ রানের লিড। তরুন মোসাদ্দেক তার অভিষেক ইনিংস দিয়েই বুঝিয়ে দিলেন কেন তাকে দলের ভবিষ্যৎ মনে করা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই।

এরপর শ্রীলঙ্কা ভালভাবেই জবাব দিতে শুরু করল এবং ভালভাবেই ম্যাচে ফিরে আসল। একপর্যায়ে তাদের রান ছিল ১৪৩/১। এবং তখনই সবার প্রিয় মুস্তাফিজ দলকে অসামান্য ব্রেকথ্রু এনে দিলেন কুশল মেন্ডিসকে আউট করে। অতঃপর সাকিব মুস্তাফিজের আঘাতে জর্জরিত শ্রীলঙ্কা হয়ে পড়ল ১৯০/৬। তখনও ক্রিজে ওপেনিং ব্যাটসম্যান করুনারত্নে। অবশেষে দলের ২১৭ রানের সময় করুনারত্নে ১২৬ রান করে ফিরে গেলেন। তাকে ফেরালেন সাকিব। ক্যাচ ধরলেন সৌম্য সরকার স্লিপে, হ্যা স্লিপেই! আমরা সম্ভবত স্লিপে অবশেষে একজন ভাল ফিল্ডার পেয়ে যাচ্ছি সৌম্য সরকারের মধ্যেই। স্লিপের শত শত ক্যাচ মিসের দৃশ্য মনে হয় শেষ হওয়ার সময় হয়েছে বাংলাদেশের।

অতঃপর স্রীলঙ্কার রান ২৩৮/৮। লিড মাত্র ১০৯ রানের। তাদের দ্রুত অলআউট হওয়াটা মনে হচ্ছিলো সময়ের ব্যাপার। কিন্তু সেখান থেকেই দিলরুয়ান পেরেরা-লাকমল জুটি শ্রীলঙ্কাকেই বরং দেখাতে শুরু করলো আরেক অভাবনীয় জয়ের সম্ভাবনা। জুটি গড়লেন ঠিক ৮০ রানের। সেই মুহূর্তেই শুভাশিস এবং মিরাজের দারুন কম্বিনেশনে রান আউট হলেন পেরেরা ৩১৮ রানে। এরপর আর এক রান করেই তারা অলআউট ১৯০ রানের লিড নিয়ে।

বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ১৯১ রানের। শক্তিশালী দলকে তাদেরই মাটিতে হারানোর পথে প্রথম পদক্ষেপ। বয়কটের কথার জবাব দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। এবং দেখতে দেখতেই দলের দুই উইকেট নেই মাত্র ২২ রানেই। অজানা ভয়কে অনেক দুরেই ঠেলে দিল তামিম-সাব্বির জুটির ১০৯ রান । এরপরেই তামিমের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসা এবং তার আরেকটি শতক হাতছাড়া করা এবং সাথে দলের অন্যতম স্মরণীয় সেঞ্চুরির ইনিংস মিস হয়ে যাওয়া। এরপর সাব্বিরও দ্রুত ফিরে গেলে অজানা আশঙ্কা আবার ভর করে বসে ড্রেসিং রুমে। সাকিব মুশফিক আবার ভালভাবে পরিস্থিতির সামাল দিলেন এবং সাকিবের বিদায়ের পর মোসাদ্দেক-মুশফিক এমনভাবে দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে গেলেন যে একবারের জন্যও হারার কথা মনে আসল না আর। যদিও এর মাঝেই একবার আম্পায়ার সুন্দরম রাভীর বাজে সিদ্ধান্ত মুশফিকের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, কিন্তু রিভিউয়ের মাধ্যমে যা মুশফিকের মুখে হাসি তো ফুটালোই, সাথে সারা দেশের মানুষও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। অবশেষে মিরাজের সুইপ শটে দলের অসামান্য জয় এবং প্রথমবারের মত বিদেশের মাটিতে কোন শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ ড্র করা। তামিম, সাকিব, মোসাদ্দেক, মুস্তাফিজ, মুশফিক এবং বাকি সবার কাঁধে চড়ে প্রথম বিদেশের মাটিতে স্মরণীয় জয় পাওয়া। তামিম ম্যাচসেরা এবং সাকিব সিরিজসেরা এবং “জয়বাংলা” কাপ মার্চ মাসে হাতছাড়া না করা ।

একসময় বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ তিন দিনেই হেরে যেত। এরপর চারদিনে নিতে শুরু করল। এবং এখন নিয়মিতই আমাদের টেস্ট ম্যাচ পাঁচদিন পর্যন্তই ভালভাবে গড়ায়। বাংলাদেশের সর্বশেষ ৫টি টেস্টই বিদেশের মাটিতে খেলেছে এবং প্রতিটিতেই ভাল ফাইট করে ম্যাচ পুরো ৫ দিন পর্যন্তই নিয়ে গিয়েছে। এবং এই ম্যাচটিতে তো অবশেষে জিতেই গেল। এখন দলের কাছে চাওয়া তাদের যেন এই ধারাবাহিকতার ব্যাঘাত না ঘটে এখন।

এক এক করে ১০০ টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ফেললাম আমরা । প্রথম ১০০ টি ম্যাচে জয় মাত্র ৯ টি । আশা করি সামনের ১০০ ম্যাচে এই সংখ্যা তিনগুন বা চারগুন হয়ে যাবে । দেশে এবং বিদেশের মাটিতেও প্রতিপক্ষ আমাদের নিয়ে আর হেলাফেলা করার সাহস দেখাবে না । খেলোয়াড়েরা তাদের পূর্ণশক্তি দিয়ে দলের জন্য লড়ে যাবেন এবং দলকে আরও বেশি বেশি গৌরবময় মুহূর্ত উপহার দিবেন ।

বেচারা হাতুরেসিংহের জন্য খারাপই লাগছে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের টেস্ট জয় যে একজন শ্রীলঙ্কান হিসেবে এবং বাংলাদেশের কোচ হিসেবে তার জন্য দুইরকম অভিজ্ঞতা। প্রফেশনাল মানুষেরা মনে হয় সবসময় এমনই হন। তার কাছ থেকে পাওয়া সেরা মুহূর্ত ছিল সম্ভবত তামিমের উইকেট বিলিয়ে দেয়ার সময়কার তার চরম বিরক্ত হওয়া অভিব্যক্তিটি।

সামনেই ওয়ানডে সিরিজ। এবার চাওয়া আরও বড়। এবার চাওয়া ট্রফি ভাগাভাগি নয়। বরং ট্রফি প্লেনে করে দেশে নিয়ে আসাই এখন আমাদের সবার প্রত্যাশা। মুশফিক তার টিম নিয়ে ভালভাবেই আমাদের আশা পুরণ করেছেন। এবার প্রিয় মাশরাফির হাত ধরে বাকি আশাটিরও বাস্তবায়ন চাই টিম বাংলাদেশের কাছ থেকে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top