ফ্লাডলাইট

শততম টেস্ট জিতেছি, শত টেস্ট জিতব কবে?

বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা টেস্ট নিয়ন আলোয় neon aloy

২০০৮ সাল। বছরের শেষ দিন। ঢাকা টেস্টে ৫২১ রানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ দল যেভাবে ব্যাট করছিল, বিশেষ করে সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম, তাতে মনে হচ্ছিল ইতিহাসটা হয়েই যাবে। এর আগে মোহাম্মদ আশরাফুল তুলে নিয়েছিলেন সেঞ্চুরি, আর সাকিব আল হাসান সম্ভবত ছিলেন তার সেরা ফর্মে।

হঠাৎ এল বিপত্তি।

১২১ তম ওভারে ধাম্মিকা প্রসাদের অফ স্টাম্পের বাইরের বল চালাতে গিয়ে বলটা ব্যাটে লেগে স্টাম্প ভেঙ্গে দিল। আর সাকিব আল হাসান ব্যাটটাকে মুখের কাছে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। আফসোস, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও ইতিহাস গড়ার সুযোগটা হারানোর হাহাকার স্পষ্ট ফুটে উঠছিল তার চেহারায়। স্টাম্প ভাঙ্গার বিশ্রী আওয়াজটা তাকে কয়দিন পুড়িয়েছে সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

২০১৭ সাল, মার্চের ১৯ তারিখ। ‘জয় বাংলা’ টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচে কলম্বোর পি সারা ওভালে ১৯১ রানের টার্গেট ব্যাট করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আর শ্রীলংকার বিপক্ষে কাঙ্খিত সেই টেস্ট জয়ের মাঝে দূরত্বটা ২ রানের।

রঙ্গনা হেরাথকে সুইপ করে রান নেবার কল দিলেন মিরাজ, তখন দৌড়াতে দৌড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়লেন মুশফিকুর রহিম। এরপর দুই রান নিয়েই জড়িয়ে ধরলেন মিরাজকে।

ড্রেসিংরুমে তখন কেমন লাগছিল সাকিবের? তামিমের পাশে দাঁড়িয়ে ডিন জোন্সের সাথে কথা বলার সময়, কিংবা পরে সিরিজসেরার পুরষ্কার নিতে আসার সময় তার চোখেমুখের উচ্ছ্বাসটা দেখে তা পুরোটা না হলেও, অনেকটা আন্দাজ করা যায়।

শততম কোন কিছু মানেই টাইগারদের জয়োৎসব, এটা প্রায় নিপাতনে সিদ্ধ হয়ে গেল এই টেস্ট জয়ের মাধ্যমে। তার ওপরে এই টেস্টের মাঝেই গেছে ১৬ই মার্চের দিনটি। যেদিন মোটরসাইকেল এক্সিডেন্টে আমরা চিরতরে হারিয়েছিলাম মানজারুল ইসলাম রানাকে। রানার জন্মদিনের আশেপাশের দিনগুলোতে এরপর থেকে টাইগাররা কখনো হারেনি শুধু গতবছরের পাকিস্তানের সাথে টি-২০ ছাড়া। অবশ্য সেটাকে বাদ দেয়া যায় হিসাব থেকে, রানা যে দেশের হয়ে টি-২০ খেলেননি কখনো।

শততম টেস্ট ম্যাচ, রানার অদৃশ্য উপস্থিতি, এ দু’টো ব্যাপার থাকলেও স্বপ্নটা দেখতে কষ্ট হচ্ছিল মাঠের বাইরের কিছু অস্থিরতার কারণে। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে নাটক, মমিনুলের হঠাৎ বাদ পড়া, কোচের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ, ক্লাব রাজনীতির কালো হাতের ছোঁয়া- সবকিছু মিলে স্বপ্ন দেখতে দিচ্ছিল না।

তবে টেস্ট শুরু হতেই ধীরে ধীরে আশার পালে হাওয়া লাগতে শুরু করল। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাচ্ছিল শ্রীলংকা, মুশফিকুর রহিম বোলিং ও ফিল্ডিং চেঞ্জে দেখালেন উন্নতির ছাপ। তবে দীনেশ চান্ডিমাল তার দুর্ভেদ্য টেকনিক ও ভাগ্যদেবীর কিছুটা সাহায্য নিয়ে গলার কাঁটার মত বিঁধে থেকে শ্রীলঙ্কাকে ৩৩৮ পার করিয়ে দিলেন।

বাংলাদেশও জবাব দিচ্ছিল ভালই। ৯৫ রানে ওপেনিং জুটির পরে  ফিফটির ঠিক আগমুহূর্তে মনোযোগের হালকা বিচ্যুতিতে আউট তামিম ইকবাল, ৬১ রান করে সৌম্য সরকারও ফিরে গেলেন সান্দাকানের এক দুর্দান্ত গুগলিতে। এরপরে দিনের শেষভাগে হঠাৎ ধস। নেই সাব্বির, ইমরুল ও নাইটওয়াচম্যান তাইজুল ইসলাম। স্কোরকার্ড দেখাচ্ছে ১৯৮-৫। সাকিব আল হাসান নেমেই যেভাবে খেলছিলেন, অনায়াসেই ৬ষ্ঠ উইকেটটাও যেত। কোনমতে ভাগ্যের জোরে টিকে থাকলেন দিনের শেষ পর্যন্ত।

পরের দিন, নতুন সূর্যের সাথে দেখা গেল সম্পূর্ণ নতুন সাকিবকে। অসাধারণ সেঞ্চুরি করে বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি চাইলে ‘এভাবেও খেলতে’ পারেন। এবং ‘এভাবে খেলে’ গেলে নামের পাশে আজ ৫টার বদলে ১৫টা টেস্ট সেঞ্চুরিও থাকতে পারত।

রান বাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সাকিব আউট হলেন, এরপরে দৃশ্যপটে এতক্ষণ ধরে আড়ালে থাকা অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। স্ট্রোকের ফুলঝুরি আর সাথে ধৈর্য আর নিখুত টাইমিংএর সমন্বয়। প্রথম শ্রেণীতে গড় তার কেন ৭০ ছুঁইছুঁই,তা বুঝতে এই ৭৫ রানের ইনিংসটি যথেষ্ট। সঙ্গ পেলে হয় সেঞ্চুরিটাই হত।

বেশ ভাল একটা লিডের চাপ নিয়ে ব্যাট করতে নামল শ্রীলংকা। এবার চান্ডিমাল পারলেন না, তবে ওপেনার দিমুথ করুনারত্নে খেললেন ১২৬ রানের ইনিংস। বাকি ব্যাটসম্যানরা কেউ সেভাবে কিছু করতে না পারলেও শেষ দিকে দিলরুয়ান পেরেরা আর সুরাঙ্গ লাকমলের স্ট্রোকপ্লেতে ভর করে শ্রীলংকা বাংলাদেশকে দিল ১৯১ রানের টার্গেট।

ঐতিহাসিক জয়ের পথে ১৯১টি রান। ২২ রানেই সৌম্য আর ইমরুল কায়েসের বিদায়, তাও পরপর দুই বলেই। এরপরে তামিম ইকবাল শো। খেলছিলেন সম্ভবত  জীবনের সেরা ইনিংস। একটাবারও সুযোগ দেন নি উইকেট নেবার, রক্ষণাত্মক শট হোক আর আক্রমণাত্মক- সবকিছু খেলছিলেন ব্যাটের মাঝ বরাবর লাগিয়ে। সাব্বির রহমানের সাথে লম্বা জুটি করে বাংলাদেশের জয় এনে দিলেন হাতছোঁয়া দূরত্বে। যখনই মনে হচ্ছিল জীবনের সেরা ইনিংসটা খেলে ম্যাচ জিতিয়েই ফিরবেন, তখনই সম্ভবত ইনিংসের একমাত্র মিসটাইমড শটটি খেললেন। সামনে এসে মারতে গিয়ে বল আকাশে তুলে দিলেন, বাউন্ডারি লাইনের একটু ভেতরে রোদ চোখে নিয়ে পেছনের দিকে দৌড়ে দীনেশ চান্ডিমাল যে ক্যাচটি নিলেন, এ ধরণের ক্যাচগুলো সাধারণত ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়। নিয়মিত বিরতিতে যখন সাব্বির আর সাকিব আল হাসান প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন, তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল ম্যাচ ঘুরে গেছে। বিশেষ করে সাকিব আল হাসান যেভাবে প্লেড অন হলেন, যে কেউ তার শত্রূকেও এভাবে আউট হবার অভিশাপ দিতে গিয়ে দু’বার ভাববে। সবকিছুই আভাস দিচ্ছিল আরেকটি যন্ত্রণাময় স্বপ্নভঙ্গের।

স্বপ্নভঙ্গ হয়নি শেষমেষ। মুশফিক আর মোসাদ্দেক হতে দেন নি। যদিও জিততে যখন লাগে আর ২ রান। তখন মোসাদ্দেককে হেরাথে হঠাৎ লাফিয়ে ওঠা বলে অসহায়ের মত আউট হতে দেখে মনে পড়ছিল গতবছর ভারতের সাথে হেরে যাওয়া টি-২০ ম্যাচটির কথা। তবে মিরাজ মাথা ঠান্ডা রাখলেন। হতে দিলেন না এমন কোন ট্র্যাজেডি, কে জানে জয়ের সাথে মুশফিকের আনন্দের একটা কারণ এটাও ছিল কিনা?

১০০ ম্যাচ পূর্ণ হল,৯টি জয় পাওয়া গেল। টেস্ট জগতের মাত্র ৪র্থ সদস্য হিসেবে আমাদের কাছে হারল শ্রীলংকা। ছোট ছোট কাজগুলো ঠিকমত করা গেছে। শুভাশিস ও মুস্তাফিজে পাওয়া গেছে টেস্ট মেজাজের দুই উইকেটটেকার বোলার। সাকিব, তাইজুল  ও মিরাজ- তিন টেস্ট স্পিনার। গভীরতা ও অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে ব্যাটিং লাইনাপও এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা (ত্রুটি বলতে মমিনুলের অনুপস্থিতি)। সব দিক দিয়ে সম্ভাব্য সেরা দলটিকে নিয়েই টেস্ট খেলছি আমরা।

এ বছর আরো টেস্ট আছে। হয়ত আর জিতব না। হয়ত ড্র করব, কিংবা হারব সবগুলোতেই। কিন্তু এই টেস্ট ম্যাচটার মত ছোটখাট কাজগুলো ঠিকঠাক করতে দেখাটাই অনেক আনন্দ দেবে। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে এই টেস্টেও খেলতে পারিনি, সামনের টেস্টগুলোতে খেলব এই আশা করাই যায়।

তবে সবচেয়ে আকুল আবেদনটা বিসিবির প্রতি। ১৭ বছর হয়ে গেল, ১০০টা টেস্ট খেলে ফেললাম। এভাবে কালেভদ্রে ম্যাচ জিতেই কি সন্তুষ্ট থাকতে হবে সাকিব-মুশফিক-তামিমদের? নাকি এবার একটু ভাববেন ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোটাকে নিয়ে? একটু ভাববেন জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে বাধ্য করা নিয়ে? বিশেষ করে কোন টেস্ট সিরিজের আগে?

ক্লাব রাজনীতিটাকে একটু পাশে রাখুন না, ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্মানের ফরম্যাটটাকে নিয়ে সময় থাকতে একটু ভাবুন। নিয়মিত টেস্ট জিতলে গর্বটা তো আমাদের বা ক্রিকেটারদের শুধু নয়, আপনাদেরও বটে। ওয়ানডে বা টি-২০ ম্যাচ জয় আর যাই হোক, টেস্ট ম্যাচ জেতার আনন্দটার ২০ ভাগের এক ভাগও দিতে পারেনা। টেস্ট ম্যাচ জেতার এই অমানুষিক আনন্দটা আমরা আরো নিয়মিত পেতে চাই।

শ্রদ্ধেয় বোর্ড কর্মকর্তাগণ, ভক্তকুলের এই আকুতি শুনতে পাচ্ছেন কি?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top