ফ্লাডলাইট

বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা প্রথম টেস্ট: উচ্চাভিলাষ এবং বাস্তবতা

Bangladesh vs Srilanka Test

যখনই আমরা শ্রীলঙ্কায় খেলতে যেতাম বা শ্রীলঙ্কা আমাদের এইখানে খেলতে আসত, বেশিরভাগ সময়ই আমরা হারতাম তাদের তিনজন খেলোয়াড়ের কাছে। তাদের সেই তিনজন খেলোয়াড় হলেন কুমার সাংগাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে এবং মুত্তিয়াহ মুরালিধরন। এদের মধ্যে আবার সাঙ্গা এবং মুরালিধরন তো একেবারেই অবিশ্বাস্য পারফর্মার ছিলেন আমাদের বিরুদ্ধে। সাঙ্গাকারা মাত্র পনের টেস্টেই আমাদের বিরুদ্ধে ১৮১৬ রান করেছিলেন ৯৫.৫৭ গড়ে। আর জয়াবর্ধনের ১৩ টেস্টে ১১৪৬ রান, ৭৬+ গড়ে । আর মুরালিধরন তো মাত্র ১১ টেস্টেই আমাদের বিরুদ্ধে ৮৯টি উইকেট নিয়েছিলেন!!!! প্রতি ৫ ওভার বোলিং করলেই তিনি আমাদের ব্যাটসম্যানদের বিরুদ্ধে একটি করে উইকেট পেতেন। যেখানে দুই দলের মধ্যেকার দ্বিতীয় সেরা বোলার হেরাথ। ৭ টেস্টে উইকেট মাত্র ৩০ টি (মুরালির বিচারে)! এই তিনজনের তোপে আমরা টেস্টে তাদের বিরুদ্ধে কোন লড়াই-ই করতে পারতাম না, শুধুমাত্র সম্মানজনক হারের কথাই চিন্তা করতাম মাত্র।

আর বাংলাদেশের একজন এসব হারের মধ্যে মাঝে মাঝে জেগে ওঠার চেষ্টা করতেন, মানে সম্মানজনকভাবে হারার চেষ্টা করতেন, তিনি আর কেউ নন, যিনি অনেক দিন আমাদের আশার ফুল হয়েছিলেন- আমাদের আশরাফুল। তিনি ১৩ টেস্টে ৪৫+ গড়ে রান করেছেন ১০৯০ রান। আর একজন এখন এই কাজটি ঠিকমত করে যাচ্ছেন তিনি আমাদের বর্তমান টেস্ট ক্যাপ্টেন মুশফিকুর রহিম।

এতকিছু বলার কারন উপরোক্ত চারজন এবারের সিরিজে দলে নেই। তাই বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কার তিন গ্রেটের অনুপস্থিতে ম্যাচ বা সিরিজ জিততে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তারা আগের সব হারের বদলা নিতে চাইবে, সব ব্যথা ফেরত দিতে চাইবেই। এসব হওয়া উচিৎ দলের ভিতরের মন্ত্র।

প্রথম টেস্টের প্রথম দিন। দিনটি আমাদেরই হতে পারত যদি শুভাশিস নো বলটি না করতেন। এই একটি নো-বলই সম্ভবত পুরো ম্যাচেই দলকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিল। পড়ে পাওয়া সুযোগ কিভাবে কাজে লাগাতে হয় তা যেন আমাদের দেখিয়ে দিলেন কুশল মেন্ডিস। যিনি প্রথম বলে শূন্য রানে আউট হয়ে যেতেন, সেই তিনিই কিনা খেলে ফেললেন ২৮৫ টি বল!! আর রান করলেন ১৯৪!! বাংলাদেশের বোলাররা তবুও সান্তনা খুঁজতে পারেন তাকে ডাবল সেঞ্চুরির আক্ষেপ উপহার দিয়ে! কুশল মেন্ডিসসহ অন্যান্যদের সহযোগীতায় শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৪৯৪ রানে।

শ্রীলঙ্কা যেমনভাবে ইনিংস শেষ করল তার ঠিকঠিক প্রতি উত্তর দিতে লাগলেন আমাদের ওপেনাররা। উদ্বোধনী জুটিতে ১১৮ রান করার পর তামিমের উদ্ভট আউটে দলের ভাঙ্গনের শুরু। একমাত্র মুশফিকই পুরোপুরি টেস্ট টেম্পারমেন্ট নিয়ে লাস্ট পর্যন্ত খেলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। সঙ্গী হিসেবে পেলেন শুধুমাত্র একজনকে। তিনি দলের ৮ নম্বর ব্যাটসম্যান মিরাজ। মিরাজের সহায়তায় দলকে ফলোঅন থেকে বাঁচালেও সম্ভবত ম্যাচ বাঁচাতে পারলেন না মিরাজের সাময়িক অমনোযোগিতায়। তাই মিরাজের আউটে বেশি হতাশ হলেন ক্যাপ্টেন মুশফিকই। দলের ইনিংস শেষ তাই ৩১২ রানে।

১৮২ রানের বিশাল লিড নিয়ে শ্রীলঙ্কার যে কাজটি করার কথা ছিল সেটি তারা ভালভাবেই পেরেছে। দ্রুত রান তোলা এবং তাদের মানসিক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল করা। এই দুটো কাজই তারা ভালভাবেই করেছে। তাই দলের লিড ৪০০ পেরোনোর পরও তারা ডিক্লেয়ার করে নি কেননা তারা তাদের বোলারদের উপর বিশ্বাস রেখেছে আর চেয়েছে বাংলাদেশের সব প্লেয়ারকে আরও খাটিয়ে নিতে। এই কাজটি তারা সফলভাবেই করেছে। থারাঙ্গার সেঞ্চুরিতে এবং বাকিদের সহযোগিতায় তাই তারা দ্বিতীয় ইনিংস ডিক্লেয়ার করে ৬ উইকেটে ২৭৪ রানে। দল লিড পায় ৪৫৬ রানের।

৪৫৭ রানের বিশাল টার্গেটের সামনে খেলতে নেমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ফল হাতে থাকে দুইটি। এক তাড়াতাড়ি কোন কষ্ট ছাড়াই ম্যাচটি হেরে যাও জলদি অল আউট হয়ে। নয়ত কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সারাদিন উইকেটে পড়ে থেকে ম্যাচ ড্র করতে। প্রথম ইনিংসের মত এবারও উদ্বোধনী জুটি দলকে ম্যাচ বাচানোর স্বপ্ন দেখানো শুরু করলেও জুটি ভাঙ্গার মাধ্যমেই আবার শুরু হল দলের সেই চিরচেনা ব্যাটিং বিপর্যয়। যা দলকে আরেকটি বিশাল পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেয়।

শ্রীলঙ্কার তিন গ্রেটের অনুপস্থিতে টাইগাররা ম্যাচ বা সিরিজ জিততে, বা আগের সব হারের বদলা নিতে চাইবে, সব ব্যথা ফেরত দিতে চাইবে- এটাই স্বাভাবিক। এসব হওয়া উচিৎ ছিল দলের ভিতরের মন্ত্র, তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করার কিছুই ছিল না। কেননা আমরা আজ পর্যন্ত যাদের বিপক্ষে টেস্টে কোন ম্যাচই জিততে পারি নি, এমনকি কোন ম্যাচ জেতার মত অবস্থায়ও জেতে পারি নি, সেই তাদের বিপক্ষে তাদের দেশে গিয়েই সিরিজ জেতার কথা, তাদের সংবাদ মাধ্যমের সামনেই এসব বলা কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা আমার মাথায় আসে নি। এসব কথা যদি আমরা প্রথম টেস্ট ম্যাচ জিতেও বলতাম, তবুও মানানসই হত। এসব কথা বলে আমরা শ্রীলঙ্কা দলকে অটোমেটিক তাঁতিয়েই দিলাম। তারা এখন অনেক প্রতিজ্ঞ থাকবেন আমাদের হারাতে। এবং চেষ্টা করবে সিরিজে আমাদের কোন সুযোগ না দিয়েই হোয়াইটওয়াশ করতে। আমরা ফেবারিট এসব আমাদের মুখ দিয়ে না বেরিয়ে যদি ব্যাট এবং বল দিয়ে এসবের প্রমাণ দিতে পারতাম তবে তারাই আমাদের ফেবারিটের মর্যাদা দিয়ে দিত। আমাদের আর এই কথা আমাদের মুখ দিয়ে বলতে হত না।

এই কথাগুলো যদি ওয়ানডে সিরিজের পূর্বে আমাদের প্লেয়াররা বলত তবুও মনে মনে খুশি হতাম। কেননা আমাদের দল ওয়ানডেতে যেকোন দলকেই যেকোন জায়গায় হারানোর ক্ষমতা রাখে। আর শ্রীলঙ্কায় গিয়ে তাদেরই তাদের মাটিতে টেস্টে হারানোর আগাম ঘোষণা তাই আমার কাছে অতিমাত্রায় কল্পনা মনে হয়। কেননা শ্রীলঙ্কার এই দলটিই কিছুদিন আগেই নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ধবলধোলাই করে পাঠিয়ে দিয়েছে।

এইটা লিখতে লিখতেই দল হেরে গেল ২৫৯ রানের বিশাল ব্যবধানে। আমরা কিছুদিন টেস্টে ধারাবাহিক কিছু ম্যাচ জিতি তারপরই না হয় আমাদের ক্যাপ্টেন, প্লেয়াররা বিদেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের কথা তাদের দেশে তাদের সংবাদমাধ্যমের সামনেই বলুক মাথা উঁচু করে এই প্রত্যাশায়। কেননা দল ভালভাবে পারফর্ম করলে এসব কথা তখন আর আমাদের বলতে হবে না তাদের মুখ দিয়েই এসব কথা চলে আসবে তখন। সেই দিনের প্রত্যাশায় যেদিন আমরাও বিদেশের মাটিতে গিয়ে বলতে পারব, “আমরা প্রতিটি ম্যাচ জয়ের লক্ষেই নামব । তাদের হালকাভাবে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।”

Most Popular

To Top