ফ্লাডলাইট

‘পেশাদারিত্ব’ শিখেছি, টেস্ট খেলা শিখব কবে?

সেই পুরনো চিত্র। বিপক্ষের উইকেট নিতে অনেক বেশি কষ্ট করা লাগে আমাদের, তবে আমাদের উইকেট নিতে বিপক্ষ দলের প্রয়োজনীয় মৌলিক কষ্টটাও করা লাগেনা, এমনকি আজকাল তো তাদের হোমগ্রাউন্ডজনিত সুবিধাটাও নেয়া লাগছেনা। মোটামুটি দিনভর ব্যাট করা যায়, এমন পিচ বানিয়েই আমাদের হারিয়ে দিচ্ছে তারা (ভারতের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট আর সদ্যসমাপ্ত গল টেস্ট যার প্রমাণ)।

১৭ বছর হয়ে গেল, এখনো এটা শিখলাম না যে, টেস্ট ক্রিকেটে নিজের উইকেটটার মূল্য কত। কেউ ‘স্বাভাবিক খেলা’ খেলতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে আসেন, কেউ বোঝেনই না তিনি কি করছেন? তামিমের ‘ব্রেন ফেড’টা আলোচনায় এসেছে বলে এ নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু এত বছর ধরে টেস্টে আমাদের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানই যে ব্রেন ফেডের ‘অনুশীলন’ করছেন! খুব ভালো শুরুর পরেও নির্বিষ বলেও এমনভাবে আউট হন তারা, খালি চোখে ব্রেন ফেড ছাড়া সম্ভাব্য আর কোন অজুহাত পাওয়া যায়না। বেশি না, ছোটখাটো কিছু কাজই তো আশা করেছিলামঃ

আশা করেছিলামঃ একটা ভালো প্রথম ইনিংসের সংগ্রহ।
পেয়েছিঃ তামিম ও সৌম্যের ফিফটি, মুশির লড়ে যাওয়াতে পড়ে পাওয়া ৩১২টি রান। অথচ সুযোগ ছিল অনেক বড় স্কোরের।

আশা করেছিলামঃ উইকেটে থেকে কত বেশি বল খেলা যায় তার প্রচেষ্টা।
পেয়েছিঃ মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

আশা করেছিলামঃ ফিল্ডিং করার সময় পুরো ১১ জন মিলে খেলায় থাকার চেষ্টা।
পেয়েছিঃ ক্যাচ মিসের পুরনো মহড়া।

আশা করেছিলামঃ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া।
পেয়েছিঃ দীর্ঘশ্বাস।

আশা করেছিলামঃ নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে ব্যাটিং, বোলিং বা ফিল্ডিং করা।
পেয়েছিঃ ‘স্বাভাবিক খেলা’ ও কিছু হতাশা।

প্রয়োজনীয় ছোটখাট কাজগুলো ঠিকঠাক করতে পারি বলেই আজ ওয়ানডেতে সাফল্য আসছে। মধ্যম মাত্রার দল হয়ে উঠেছি। হাতে থাকা খেলোয়াড়দের যে মান, তাতে দলটিকে আমাদের ইতিহাসেরই সেরা দল বলা যায়। অসাধারণ প্রতিভাবান এই দলের এই খেলোয়াড়রাই ওয়ানডেতে সাফল্য আনছেন নিয়মিত, টি-২০ তেও  সাফল্য পাওয়া শুরু করেছেন, তারপরেও টেস্টে ছোটখাটো মৌলিক কাজগুলোই করা হয়ে উঠছেনা, কারণটা কি? কেনই বা টেস্ট ম্যাচের টেম্পারমেন্ট এত দিনে গড়ে ওঠেনি, কেনই বা মুশফিকুর রহিম ছাড়া নিকট অতীতে কেউই ম্যাচের পরিস্থিতি অনুসারে ব্যাটিং গিয়ার বদলাতে পারছেন না, কেনই বা আপাতদৃষ্টিতে ‘অনভিজ্ঞ’ দলের কাছেও এভাবে পরাজিত হতে হচ্ছে?

শ্রীলংকার বিরুদ্ধে আমাদের সামগ্রিক ব্যাটিং -এর চিত্র এই একটি ছবিতেই ফুটে উঠে।

শ্রীলংকার বিরুদ্ধে আমাদের সামগ্রিক ব্যাটিং -এর চিত্র এই একটি ছবিতেই ফুটে উঠে।

এই প্রশ্নগুলোর মূলে চিন্তা করতে গেলে  সমস্যা অনেক বেশি। ঘরোয়া প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে কাঠামো বলতে কিছু নেই, বেতন কম, একেবারে মৌলিক সুবিধাগুলোও অনেকাংশে নেই, পিচের মান ভালো নয়, ব্যাটসম্যানরা মুড়িমুড়কির মত রান করেন, স্পিনাররা মুড়িমুড়কির মত উইকেট নেন, ফাস্ট বোলারদের জন্য কিছু নেই, রিভার্স সুইং শেখার সুযোগ নেই ইত্যাদি।

তাই জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড়েরা, ঘরোয়া প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটের চেয়ে বাইরের দেশের লীগ অথবা ‘বিশ্রাম’ কেই শ্রেয় মনে করেন। জাতীয় দলে আশা যাওয়ার ভেতরে আছেন, জাতীয় দলের বাইরে আছেন, জাতীয় দলে না ঢুকলে আর চলছে না- এই তিন শ্রেণির ক্রিকেটার ছাড়া আর কারো প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলার ‘দায়’ আর কারো নেই। জাতীয় দলে চলে আসলেই তবে ‘দায়’-মুক্তি।

আজ যে ক্রিকেটাররা ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ‘দায়’ আর ‘দায়মুক্তি’র অনুশীলন করছেন,তাতে সবচেয়ে বড় দায়টা বোর্ডকে নিতে হবে। ১৭ বছর ধরে টেস্ট জগতে আছি, এখনো কেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বিভাগভিত্তিক কাঠামো নেই, বিভাগীয় ক্রিকেট এসোসিয়েশন নেই, সে এসোসিয়েশনের হাতে কেন বিভাগীয় দল ও মাঠের দায়িত্ব নেই- ইত্যাদি প্রশ্ন বহুদিনের। এছাড়া ১৭ বছর টেস্ট খেলে ১৮তম বছরে পা দিয়েছি, কিন্তু গল টেস্টসহ টেস্ট খেলা হয়েছে মাত্র ৯৯টি। বছরে ৬টির ও কম। অন্যান্য দলগুলো যখন নিয়মিত ৩টেস্ট, ৪টেস্ট বা ৫ টেস্টের সিরিজ খেলছে, আমরা পড়ে আছি ২টেস্টের সিরিজে। ৩ টেস্টের সিরিজ নিয়মিত আয়োজন করাতে বিসিবির কূটনৈতিক ব্যর্থতা কম দায়ী নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের দৈন্যদশার কারণে টেস্ট টেম্পারামেন্ট গঠন হবার আগেই খেলোয়াড়রা টেস্ট দলে ঢুকে যাচ্ছেন, ফলে টেস্টের পারফর্ম্যান্স খারাপ হচ্ছে, টেস্টের পারফর্ম্যান্স খারাপ হচ্ছে বলে অন্যান্য টেস্ট খেলা দেশগুলো আমাদের আমন্ত্রণ করছেনা, দেশে আসলেও ২ টেস্টের বেশি খেলতে চাইছেনা, ফলে টেস্ট কম খেলা হচ্ছে, টেস্ট কম খেলার কারণে সাফল্য বা ব্যর্থতা যাই হোক, সেগুলো রঙিন পোশাকের সাফল্যের আড়ালে চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে, চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে বলে বোর্ড ঘরোয়া প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট নিয়ে ভাবছেনা, না ভাবার কারণে দৈন্যদশাও কাটছেনা- গড়ে উঠেছে দুর্ভেদ্য এক চক্র।

এভাবেই চলছে, প্রশ্ন তুললে খেলোয়াড়-কোচ-বোর্ড সবার সম্মিলিত জবাবটাও বড় পুরনো- ‘আমরা শিখছি।’

হ্যাঁ, ‘শিক্ষার কোন বয়স নেই।’

বোর্ড শিখছে, খেলোয়াড়রা শিখছেন। ওয়ানডে-টি২০ তে বিশ্বকাপ চলে আসবে, তবুও টেস্ট খেলা শেখা শেষ হবেনা। টেস্ট ম্যাচ সামনে রেখেও ঘরোয়া প্রথম শ্রেনীর খেলা বাদ দিয়ে বাইরের দেশের লীগ খেলবেন ‘তারকা’ ক্রিকেটাররা। জিজ্ঞেস করলে বলবেন, “আমরা ‘পেশাদার’ খেলোয়াড়,না খেললে পেট চলবে কি করে?” বোর্ড নির্বাকচিত্তে ছাড়পত্র দেবে। ওটাও তাদের ‘পেশাদারিত্ব’। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেটের মান বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের ধরে রাখার ‘পেশাদারিত্ব’ তারা দেখাতে পারেন না। কিংবা প্রতি সিরিজে টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা বাড়ানোটাও তাদের এই ‘পেশাদারিত্ব’-এর অন্তর্গত নয়।

এভাবেই চলুক তবে, আমরা আপনাদের কাছে ‘পেশাদারিত্ব’ শিখি, আপনারা টেস্ট খেলা শিখতেই থাকুন, শিখতেই থাকুন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top