লাইফস্টাইল

কিভাবে নিজের স্কিল বাড়াবেনঃ পর্ব ২ – কমিউনিকেশন

স্কিল কমিউনিকেশন নিয়ন আলোয় neon aloy

[প্রথম পর্বের লিঙ্ক এখানে- “কিভাবে নিজের স্কিল বাড়াবেনঃ দক্ষতা”]

এরকম বহুবার হয়েছে যে, চা খাচ্ছি আর গল্প করছি কয়েকজন মিলে, একজন একটা প্রশ্ন করলো কোন একটা টেকনোলোজি নিয়ে, সবাই চুপ থেকে কেন যেন মনে মনে চিন্তা করছে “ফয়জুল ভাই বলুক”। হ্যাঁ, এটা সত্য আমি টেকনোলোজি নিয়ে কথা বলতে অত্যধিক পছন্দ করি (অনেকে মনে মনে বিরক্ত হয়, আমি জানি, কিন্তু কিছু করার নাই। মুভি, গান, খাওয়া এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে না)। কিন্তু তখন অন্যকে জোর করে কিছু বলতে বললেও সে/তারা কিছু বলতে চায় না। কেন? সে কি ওই টেকনোলোজিটার সম্বন্ধে জানে না? উঁহু। সে এটা নিয়ে খুব হাই লেভেল এর কাজ করেছে, সেটা আমি জানি। কিন্তু তার পরেও সে কথা বলতে ইচ্ছুক না। অর্থাৎ, সে যে বলতে চাইল না, এই সমস্যা আসলে কিন্তু তার জ্ঞান এর অভাব না। অভাব হল তার কনফিডেন্স, অভাব হল তার গুছিয়ে কথা না বলতে পারা। ঠিক একইভাবে, ইন্টারভিউ বোর্ডে অনেকেই একেবারে বোবা হয়ে যায়, ইচ্ছা করে এমন করে তা কিন্তু না। এটা আসলে সেই টপিক্সে কথা বলার অনভ্যাসে বোবা হয়ে যায়। আর ইন্টারভিউ যদি হয় ইংরেজিতে। তাহলে সত্যিকারের বোবাই হয়ে যায় বেশীরভাগ দক্ষ মানুষ। কেন এমন হয়?

আল্লাহ্‌ এর রহমতে, আমি মাঝে মাঝেই ইন্টারভিউ নিয়েছি জুনিয়রদের। অনেক সময় নিজেও ইন্টারভিউ দিয়েছি দেশের কোম্পানিতে, বিদেশের কোম্পানিতে। ইন্টারভিউ দেশে হয়েছে বাংলায়, বিদেশেরগুলো ইংরেজিতে। তো সব জায়গায় কমন যে ব্যাপার তা হল, একজন প্রশ্ন করেন (জানার জন্য হতে পারে, অন্যকে টেস্ট করার জন্যও হতে পারে), অন্য একজন সেই প্রশ্ন উত্তর যথাযথ ভাবে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন। চেষ্টা থাকে প্রশ্নকর্তাকে স্যাটিসফাই করা। এই কমিউনিকেশন প্যাটার্নে পরিবর্তন হয় ভাষাতে, পরিবর্তন হয় বিষয়বস্তুতে। কিন্তু প্রশ্নকর্তাকে বুঝানোর ব্যাপারটা সব জায়গায় কমন। যে যত সুন্দর করে বুঝাতে পারে, প্রশ্নকর্তা তার উপর ভরসা করতে পারে/কনভিন্সড হয় তত বেশি। এই বুঝানোর ব্যাপারটার কিন্তু সুন্দর একটা নাম আছে। আমরা সবাই আমাদের সিভিতে লিখি ” Communication Skill = High “, অথচ কোন বিষয়ে ১ মিনিট কথা বলতে দিলে ৫ সেকেন্ড পর আমতা-আমতা ছাড়া কিছু করার থাকে না বেশীরভাগ মানুষের।

অনেকে বলতে পারেন কেউ তো মুখস্থ করে ৫ মিনিটও কথা বলতে পারে। না স্যার। চাকরীর ইন্টারভিউ বোর্ড আর পড়াশুনার বোর্ড ভাইভার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। আপনার কথার স্টাইল দেখেই প্রশ্নকর্তা বলে দিতে পারবে আপনি আসলেও জানেন, নাকি মুখস্থ ঝাড়ছেন। আর টেকনোলোজি ওয়ার্ল্ডে কাজ করার পাশাপাশি কেন এবং কিভাবে সেটা হয়েছে সেটা জানাও আবশ্যক, নাহলে ইন্টারভিউতে ফেইল। সুতরাং ৫ মিনিট মুখস্থ বলতে পারলেও প্রশ্নকর্তাকে কনভিন্স করা মুখের কথা না।

Communication Skill এ ভালো করার প্রথম শর্ত হল কারো সাথে কথা বলতে গেলে (সেটা আড্ডার মধ্যেই হোক, বাসার ভিতরেই হোক, বা অফিসেই হোক), আগে প্রশ্নকর্তা/অন্যপক্ষকে কথা সম্পুর্ন করতে দেয়া। আমার দেখামতে খুব কম মানুষের মধ্যেই অন্যকে কথা শেষ করতে দেয়ার ধৈর্য থাকে। পুরোটা না শুনেই উত্তর দেয়া অথবা জানা সত্ত্বেও কিছুই বলতে না পারা- দু’টোই খারাপ। অজানা বিষয়ে আন্দাজে কথা না বলা আরেকটা স্টেপ। আন্দাজে কথা বলা আপনার সম্মান জাস্ট মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় অন্যের কাছে সেটা মনে রাখবেন। ইন্টারভিউ বোর্ডে কোন জিনিস না জানা দোষের না, কিন্তু আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া প্রচন্ড দোষের বিষয়। আন্দাজে কথা বলা লোকের প্রতি অন্য মানুষের কনফিডেন্স থাকে না, এবং এই বদভ্যাসটা জানা বিষয় গুলোও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

এছাড়া যা প্রশ্ন করা হয়েছে পরিমাপমত উত্তর দেয়া আরেকটি অংশ Communication Skill এর। এটা করতে পারা তখনই সম্ভব যখন আপনি প্রশ্নকর্তার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটা ধরতে পারবেন।

কোন একটা বিষয়ে ফ্লুয়েন্টলি কথা বলা Communication Skill এর আরেকটি অংশ। এতে ভালো করার উপায় হল নিজেকে কাল্পনিক টিচার বানিয়ে মনে মনেই সেই টপিক নিয়ে লেকচার দেয়া শুরু করা। প্রথমে বাংলায়, পরে ইংরেজিতে প্র্যাকটিস করা। বিশ্বাস করুন, এধরনের প্র্যাকটিস আপনার জ্ঞান ও কমুনিকেশনের লেভেল যে কি পরিমাণ বৃদ্ধি করবে তা অকল্পনীয়। এই প্র্যাকটিসের আরেকটি সুবিধা হল, যদি কখনো ইন্টারভিউতে এগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে, আপনি তখন একেবারে ঝেড়ে কাশতে পারবেন যতক্ষন ওরা আপনাকে না থামায়। মাঝে মাঝে প্রশ্নকর্তা দেখতে চান আপনি আসলে কত গভীর পর্যন্ত বিষয়টি সম্পর্কে জানেন, তখন আপনাকে থামাবে না। আপনার কথা বলার প্র্যাকটিস না থাকলে, অনেক জানা বিষয় যা আপনি আগেই করেছেন, এবং যা আসলেও খুবই মূল্যবান জ্ঞান (মনে করুন সি-শার্প এর একটা অপটিমাইজেশন টিপস যা আপনি ব্যাবহার করেছেন) তা বলতে ভুলে যাবেন। পরে বাসায় আসার পর আফসোস হবে, আর ইন্টারভিউয়ার ভাববে আপনি সেটা জানেন না।

সবশেষে, টিমে কাজ করতে গেলে, টিম চালাতে গেলে অবশ্যই আপনাকে অন্য মেম্বারদের সাথে কথা বলতে হবে। যদি আপনি কমিউনিকেশনে দুর্বল হোন, অন্যের কথা না বুঝেন, অন্যরা আপনার কথা না বুঝে, তাহলে আপনি কখনই কোন টিমে গিয়ে শান্তি পাবেন না। ধীরে ধীরে টিম ও পরে অফিস থেকে ছিটকে যাবেন।

এতক্ষন যা বললাম সেগুলো হল সরাসরি কথা বলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অনেক জায়গায় সিভি দেয়ার পরেও ডাকই আসে না ইন্টারভিউ-এর। বা বিদেশী কোম্পানিতে সিভি দিয়েছেন। প্রথমে তো ওরা সিভি দেখবে, পরে আপনার সাথে কথা বলতে চাইবে। তাহলে কথা বলার স্কিল কষ্ট করে বাড়িয়ে তো কোন লাভই হল না। এক্ষেত্রে কি করা?

আসলে এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে, আপনাকেও গ্লোবালী আপনার পরিচিতি বাড়াতে হবে। আপনার অনলাইন উপস্থিতি বাড়াতে হবে গ্লোবাল স্কেলে। ব্লগ, ভিডিও, ফোরাম এসবে থাকতে হবে আপনার সরব উপস্থিতি। ব্যাপারটা এমন না যে, আপনার ব্লগ দেখে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে অনেক কিছু করে ফেলবে তাই আপনাকে আগে অনেক কিছু জানতে হবে তারপর ব্লগিং করতে হবে। নোটঃ হাজার হাজার ছেলেমেয়ের উপকার হতেই পারে আপনার দ্বারা, তবে প্রথম থেকেই এই প্ল্যানে না আগানোই ভালো। কারণ দেখবেন নেটে হাজার হাজার অসাধারন সাইট আছে যা নিয়ে আপনি আসলে লিখতে চাচ্ছেন, তখন আশাহত হয়ে লেখালেখিই ছেড়ে দেবেন! আসলে চিন্তা করতে হবে সম্পুর্ন উল্টোভাবে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ের জন্য না, আপনি আপনার নিজের জ্ঞান গুলোকে এক জায়গায় রেখে দেয়ার জন্য লিখবেন, যেন আপনি আপনার অর্জিত জ্ঞান গুলোকে নিজের কুইক রেফারেন্স হিসেবে ব্যাবহার করতে পারেন। এরপর, নিজের স্যাটিসফ্যাকশনের জন্য এই লেখালেখি করতে গিয়ে দেখবেন লেখার সময় আপনার চিন্তার সাথে লেখার লাইন গুলো অনেক কিছুই মিলছে না, কেমন যেন ভাসা ভাসা জ্ঞান ছিল এতদিন আপনার। তখন লিখাটা কমপ্লিট করার জন্য ও নিজের কনসেপ্ট ক্লিয়ার করার জন্য আরো প্রচুর প্রচুর পড়াশুনা করা লাগবে আপনার, যা আপনার জ্ঞান ও আপনার লেখার মান উভয়কেই বাড়াবে। সুতরাং উচ্চাশাহীন ব্লগিং আসলে নিজের উপকার ও সেই সাথে বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে জনগণের উপকারও করবে।

এছাড়াও, যখনই আপনার সিভি কেউ খুলবে (দেশে হোক বা বিদেশে), সেখানে আপনার অনলাইন পরিচিতি আপনাকে অন্য যে কারো চাইতে আলাদা করে ফেলবে। আপনার নাম দিয়ে সার্চ করে যদি আপনার করা বিভিন্ন কোয়ালিটি কন্ট্রিবিউশন প্রথম পেজেই পেয়ে যায়, তাহলে ইন্টারভিউ এর আগেই আপনার সম্পর্কে ইন্টারভিয়ারের মনে খুব উঁচু ধারণা তৈরি হয়ে যাবে যা আপনার আসল ইন্টারভিউতে প্রচন্ড হেল্প করবে। যিনি আপনাকে উনার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করবেন, তিনি ইন্টারভিউ এর আগেই আপনার স্কিলসেট (যা আপনার সত্যিই আছে, এখানে আপনাকে মিথ্যা শো-অফ করতে বলা হচ্ছে না, দয়া করে ভুল বুঝবেন না) সম্পর্কে জ্ঞাত হবেন। এছাড়াও অনেক সময় আপনার ইন্টারেস্টিং কোন কাজ দেশ অথবা বিদেশের অনেকের ভালো লেগে যেতে পারে, যা আপনাকে খুব ভালো কোন চাকরী বা বিজনেস অফার এনে দিতে পারে।

উপরের এত কথার সারাংশ হল,

  • পড়াশুনা করবেন প্রচুর।
  • সেগুলো নিজে কথা বলা প্র্যাকটিস করবেন প্রচুর (সামনে অডিয়েন্স থাকুক বা না থাকুক)
  • গুছিয়ে লিখুন টিউটরিয়াল আকারে (যেন যে কেউ এসে একটা ক্লিয়ার কনসেপ্ট পায়)
  • ভিডিও রেকর্ড করুন (ক্লাস লেকচার এর মত করে)

প্রথম পর্বে আলোচনা করেছি আপনাকে প্রচুর কাজ করতে হবে। এই পর্বে আলোচনা করলাম কমিউনিকেশন স্কিল নিয়ে। যদি আপনি কাজের দক্ষতার পাশাপাশি কমিউনিকেশন স্কিলেও দক্ষ হয়ে উঠেন, তাহলে আপনি যোগ্য লোক হিসেবেই কোম্পানির বড় বড় পদে সম্মানের সাথে চাকরী করতে পারবেন ইন শা আল্লাহ্‌ । সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য লোক হিসবেই আপনি কাজ করতে থাকবেন। আপনার যোগ্যতা আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যে, কোম্পানি আপনাকে সিলেক্ট করবে এমন হবে না, বরং আপনি  কোম্পানি সিলেক্ট করবেন যে এর পর কোথায় যাবেন। এবং এই পাওয়ার আপনি অর্জন করেছেন বিগত কয়েক বছরের টানা পরিশ্রমে। এটা আপনার ভাগ্য না, এটা আপনার অর্জন।

[তৃতীয় পর্বের লিঙ্ক এখানে- “কিভাবে নিজের স্কিল বাড়াবেনঃ মানসিকতা”]

লেখকঃ ফয়জুল করিম
সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, সেফালো;
প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও- কোড কুপারস।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top