ইতিহাস

একাত্তরের মার্চের উত্তাল প্রথম সপ্তাহ এবং ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ

১৯৭১ মার্চ প্রথম সপ্তাহ নিয়ন আলোয় neon aloy

মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যত নেই। কথাটি যশস্বী লেখক-চিন্তক আহমদ ছফার। ছফার কথাটি আমাদের ভাবায়। অতীতে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ হলে ভবিষ্যত নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব থাকে, তা গভীর চিন্তা-মনোযোগের বিষয় নিঃসন্দেহে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার হলেও বাংলাদেশ বিষয়ক যেকোন আলোচনা-যুক্তি-তর্কে প্রায় অবধারিতভাবে চলে আসে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ। যে সমস্ত আশা-আকাঙ্খা-প্রতিশ্রুতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হাজির হয়েছিল এই জনগোষ্ঠীর জীবনে, তার অধিকাংশই আজও অধরা। আর এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রশ্নে অনিবার্যভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফলে, ঠিক কি ঘটেছিল সেই উত্তাল সময়জুড়ে তার চুলচেরা বিবরণ ও বিশ্লেষণ জানা জরুরি। ১৯৭১ সালের যে নয় মাসকে আমরা যুদ্ধের মাস বলে জানি, সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ সঠিকভাবে জানা আশু কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময়কালকে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এই পর্বে আমাদের আলোচনা উত্তাল মার্চের প্রথম সপ্তাহ অর্থাৎ ১ মার্চ থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাসমূহে সীমাবদ্ধ থাকবে।

১ মার্চ, ১৯৭১।

একাত্তরের মার্চের প্রথমদিন থেকেই উত্তপ্ত ছিল ঢাকাসহ সারাদেশ। হঠাৎ করেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। তার এই ঘোষণা পূর্ব পাকিস্তানের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বেতারে ঘোষণা শোনার সাথে সাথেই বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। কোন রাজনৈতিক দলের ঘোষিত কর্মসূচী ছাড়াই ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায় জনমানসে। তবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর এই বিক্ষুব্ধ মনোভাবকে পাত্তা দিতে চায়নি পাকিস্তানি শাষক শ্রেণী।

ইয়াহিয়ার ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় হোটেল পূর্বাণীতে জরুরী ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির এক অনির্ধারিত বৈঠক বসে। সেখানে জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। বৈঠক পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন আওয়ামীলীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, “এটা দুঃখজনক যে একটি সংখ্যালঘু দলের আবদার রাখতে গিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই হবে।” তিনি আরো বলেন, “শেষপর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীদেরই জয় হয়েছে। তবে অবশেষ জয় আমাদের। দেশে সামরিক আইন বহাল থাকা সত্ত্বেও পিপিপি’র চেয়ারম্যান জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগদানে ইচ্ছুক পশ্চিম পাকিস্তানি সাংসদদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সামরিক আইন শুধুমাত্র বাঙালিদের জন্য। কিন্তু আমরা যেকোন প্রতিকূল অবস্থার জন্য তৈরি রয়েছি।”

সাংবাদিক সম্মেলনেই প্রতিবাদস্বরূপ দেশব্যাপী অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহবান জানানো হয়। ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়া হয়। এ কর্মসূচী ছিল পাঁচদিনের। এরপর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভা, সেই জনসভা থেকে পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২ মার্চ, ১৯৭১।

আওয়ামীলীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকা হরতালে ঢাকাবসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়। সমস্ত দোকানপাট, কলকারখানা, অফিস-আদালত স্থবির হয়ে পড়ে। কেউ কোন কাজে যোগ দেয়নি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে জানা যায় এমনকি কাঁচাবাজারিরাও সেদিন বসেনি ঢাকার রাস্তায়। মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ততায় তিনি বিস্মিত হন।

২ মার্চের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন। সকাল ১১ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রজনতার বিশাল সমাবেশ ছিল। তবে সভাটি বটতলায় হবার কথা থাকলেও অভূতপূর্ব জনসমাগমের কারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সভামঞ্চ কলাভবনের গাড়ি বারান্দার ওপরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মাইকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে যেকোন ত্যাগ স্বীকার ও সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। সভাস্থল থেকে মুহুর্মুহু স্বাধীনতার স্লোগান দেয়া হতে থাকে। এই ঐতিহাসিক সভার সভাপতিত্ব করেন ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী। তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সভায় ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন বক্তব্য রাখেন। এই সভাতেই সবুজ জমিনের উপর লাল বৃত্তের মাঝখানে সোনার বাংলার সোনালী মানচিত্র সম্বলিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। পতাকা উত্তোলন করেন ডাকসুর সহসভাপতি আ স ম আব্দুর রব। পতাকাটির ডিজাইন করেন শিল্পী শিব নারায়ণ দাশ।

সমাবেশ শেষে এক বিশাল মিছিল স্বাধীনতার স্লোগান দিতে দিতে বায়তুল মোকাররমের দিকে যায়। মিছিলটির অগ্রভাগে ছিলেন তোফায়েল আহমেদসহ উল্লেখিত ছাত্রনেতারা।

এর মধ্যেই ঢাকা শহরে সন্ধ্যা ৭ টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ ঘোষণা করা হয়। এই ঘোষণার সাথে সাথেই বিভিন্ন ছাত্র হল ও শ্রমিক এলাকা থেকে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-শ্রমিক কারফিউ ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলগুলোতেঃ ‘সান্ধ্য আইন মানিনা’, ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ইত্যাদি স্লোগান চলতে থাকে। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় মিছিলগুলোতে সামরিক বাহিনী গুলি চালায়। ছাত্র-জনতার মধ্যে এক অনমনীয় মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল গভর্নর হাউজের দিকে অগ্রসর হয়। সেই মিছিলেও গুলি চালানো হয়।জাতীয় লীগের এক জনসভায় জনাব আতাউর রহমান খান আওয়ামীলীগ, ভাসানী ন্যাপ, ওয়ালী ন্যাপ ও জাতীয় লীগের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে গণআন্দোলনের আহবান জানান।

এরকম টালমাটাল পরিস্থিতি শুধু ঢাকাতেই ছিলনা। জেলা শহরগুলো থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

৩ মার্চ, ১৯৭১।

মূলত মার্চের প্রতিটি দিনই ছিল আগুনঝরা, রক্তঝরা। প্রতিটি দিনই ছিল সকল শ্রেনী পেশার মানুষের এক সুরে বেজে ওঠার মুহুর্ত। ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ যার যার মতো করে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ জারি রাখে। সামরিক জান্তার গুলি-বন্দুক-রক্তচক্ষুকে তোয়াজ করার মানসিকতা ছিলনা কারোরই। ৩ মার্চও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে এদিন সবচেয়ে অভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটে একটি গুজবের ভিত্তিতে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দখল নিচ্ছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। রাজারবাগ সদর দফতরের চারদিকে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়। উদ্দেশ্য সামরিক জান্তাকে প্রতিহত করা। পরে এটি গুজব প্রমাণিত হলে জনতা শান্ত হয় এবং রাজারবাগ ত্যাগ করে। জনতা কোন বন্দুকধারী বাহিনীকে এতটা ধারণ করছে, নিজেদের মনে করছে এবং তাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সামরিক জান্তাকেও মোকাবেলা করতে চাইছে ইতিহাসে এমন নজির খুব বেশি পাওয়া যায়না।

এছাড়াও ২ মার্চে বিভিন্ন স্থানে সামরিক বাহিনী কর্তৃক হত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ শোক মিছিল বের করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে বটতলায় আয়োজিত হয় এক প্রতিবাদ সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন ড.মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। সভায় স্বাধীনতা সংগ্রামে জনতার সঙ্গে এক হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়া হয়।

এই দিনে চট্টগ্রামে বাঙালি-অবাঙালি সংঘর্ষ উস্কে দেয়া হয়। এই দিনে চট্টগ্রামে প্রায় পাঁচশতাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

জেনারেল ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের ১২ জন শীর্ষস্থানীয় নেতার সাথে ১০ মার্চ ঢাকায় বৈঠক আহবান করেন। তবে বেশিরভাগ নেতাই বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এই আমন্ত্রণকে নির্মম পরিহাস বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, একদিকে সামরিক বাহিনী দিয়ে নিরীহ জনতার উপর নির্যাতন আর অন্যদিকে বৈঠকের আহবান করা হচ্ছে। এটি নির্মম রসিকতা ছাড়া আর কিছুনা। তিনি বন্দুকের মুখে এহেন বৈঠকে বসার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান না করার কোন কারণ খুঁজে পাননি।

বিকেলবেলা পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ৭ মার্চের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তিনি পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর প্রতি আহবান জানান। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচী দেয়ার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে আন্দোলনের রুপরেখে পেশ করেন। তাঁর নির্দেশনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি চেয়েছেন সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব বোঝাপড়া তৈরি করতে। তিনি জনগণের রায়ের প্রতিফলন না ঘটা পর্যন্ত ট্যাক্স ও খাজনা বন্ধ করতে বলেন, হরতাল পালনকারী মেহনতী মানুষদের সাহায্য করার লক্ষ্যে দুপুর ২ টার পর থেকে রিকশাচালকদের বাড়তি ভাড়া প্রদানের নির্দেশ দেন, সামরিক বাহিনীর গুলিতে আহত ব্যক্তিদের জন্য ব্লাডব্যাংকে রক্ত জমা দেয়ার আহবান জানান এবং সাংবাদিকদের নির্ভীকচিত্তে সত্য তথ্য তুলে ধরতে বলেন। এই সমাবেশেই স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাপত্র প্রচার করে।

৪ মার্চ, ১৯৭১।

৪ মার্চ নাগাদ দেশের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সকল সরকারী, বেসরকারী, আদালত, ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিমান-রেল-বাস-স্টিমার, ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এদিন বন্ধ থাকে। জনগণ হরতালে অভাবিত সাড়া দেয়। ঢাকায় কারফিউ তুলে দেয়া হলেও খুলনা, রংপুরে কারফিউ বহাল থাকে। খুলনায় সামরিক বাহিনীর হাতে প্রাণ হারায় বহু সংখ্যক মানুষ। চট্টগ্রামের পরিস্থিতি বেশ নাজুক ছিল। ফরিদপুরে স্মরণকালের ইতিহাসে বৃহত্তম প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়। যশোরে মিছিলে গুলি চলে এবং জনতা লাশের মিছিল বের করে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর বিবৃতিতে উপনিবেশবাদী শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন।

মাওলানা ভাসানী লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাঙালিদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জানান। তিনি বলেন, তিনি কংগ্রেস, খেলাফত, মুসলিম লীগ, আওয়ামীলীগ ও ন্যাপের মাধ্যমে আন্দোলন করেছেন কিন্তু তাঁর ৮৯ বছরের জীবনে এবারকার মত গণজাগরণ ও অগণতান্ত্রিক ঘোষণার বিরুদ্ধে এতটা সংঘবদ্ধ বিক্ষোভ আর দেখেননি।

৫ মার্চ, ১৯৭১।

পরিস্থিতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং সংকট সমাধানের সকল দ্বার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেখে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ঢাকায় আর সৈন্য না পাঠানোর অনুরোধ জানান এবং ইয়াহিয়াকে ঢাকায় এসে আলোচনার ব্যবস্থা করতে বলেন। ইয়াহিয়া প্রথমত রাজি হলেও পরে ৫ মার্চ ঢাকায় আসতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ, বিরক্ত ইয়াকুব দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান। কিন্তু তিনি আঁচ করতে পারেননি তাঁর পদত্যাগ বার্তা পাঠানোর আগেই পাঞ্জাবের সামরিক আইন প্রশাসক জঙ্গি জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

৫ মার্চ রাজপথ একইভাবে রক্তে রঞ্জিত ছিল। শুধু চট্টগ্রামেই নিহত হয় ২৩৮ জন। টঙ্গীতে সেনাবাহিনীর গুলিতে শ্রমিক নিহত হয়। ফলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা একটি কাঠের ব্রীজ পুড়িয়ে দেয়, বড় বড় গাছের গুড়ি ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে রাস্তায়। রাজধানীতে টঙ্গীতে নিহত শ্রমিকদের লাশ নিয়ে ছাত্রলীগ বিশাল মিছিল করে। এদিন দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়।

সামরিক অফিসার আসগর খান করাচী থেকে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। তিনি ভবিষ্যতে কী হতে পারে বা কী হতে যাচ্ছে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর নির্দেশে সামরিক অভিযান চালানো হবে, আমাকে গ্রেফতার অথবা হত্যা করা হবে এবং পাকিস্তান ভেঙে যাবে। পরবর্তীতে হুবুহু তা-ই ঘটায় আসগর তাঁর “Generals in Politics” বইতে বিস্ময় প্রকাশ করেন। আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ তাঁর বিবৃতিতে অবিলম্বে এই ঘৃণ্য গণহত্যা বন্ধের দাবি জানান।

ঢাকার লেখক-বুদ্ধিজীবীরা শহীদ মিনারে ড.আহমদ শরীফের নেতৃত্বে স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করেন। ছাত্রলীগ নেতারা লাঠিমিছিল বের করেন ঢাকার রাজপথে।

৬ মার্চ, ১৯৭১।

৬ মার্চ ছিল আহুত হরতালের শেষদিন। মহিলা আওয়ামীলীগের আয়োজনে একটি বিশাল মহিলা মিছিল বের হয় এদিন। পেশাদার শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, গণশিল্পীবৃন্দ সভা-সমাবেশ ও মিছিল বের করেন। অসহযোগ চলতে থাকে পুরোদমে। অলি আহাদের নেতৃত্বে পল্টনে জনসভা এবং মোজাফফর আহমেদের সভাপতিত্বে গণসমাবেশ হয়। টঙ্গীতে বর্বর হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে কাজী জাফর এক শ্রমিক সভা ও মিছিলের নেতৃত্ব দেন। ছাত্রলীগ সন্ধ্যায় মশাল মিছিল বের করে। এদিকে ঢাকা ও যশোরে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদী পালিয়ে যায়। যশোরে প্রায় ৪ লক্ষ লোকের এক গণবাহিনী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ করে। পাকবাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে আশ্রয় নেয়।বহুসংখ্যক সৈন্য ও বিহারী জনতার হাতে হতাহত হয়।

৭ মার্চ, ১৯৭১।

এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দিন – ৭ মার্চ। এদিন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন রেসকোর্স ময়দানে। সমগ্র জাতি অধীর অপেক্ষায় আছে নেতার দিক-নির্দেশনা শোনার জন্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আবালবৃদ্ধবনিতা জড়ো হয়েছে রেসকোর্সের ময়দানে। তারা তাদের নেতাকে একপলক দেখতে চায়, নেতার কাছ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে চায়। ঢাকার সমস্ত রাজপথ গিয়ে মিশেছে রেসকোর্সে। লাখ লাখ নারী-পুরুষের পদভারে এবং স্বাধীনতার গগনবিদারী স্লোগানে ঢাকা নগরী প্রকম্পিত। যারা রেসকোর্সে আসতে পারেনি তারা ব্যস্ত হয়ে রেডিওর নব ঘোরাচ্ছে ঘরে, চায়ের দোকানে, যে যেখানে আছে সেখানেই। ঢাকা বেতার থেকে ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচারের কথা থাকলেও সামরিক কর্তৃপক্ষ তা পন্ড করে দেয়, পরে বেতারকর্মীদের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে ৮ মার্চ সকালে ভাষণটির ধারণকৃত অংশ সম্প্রচার করা হয় বেতারে।

সমাবেশ মঞ্চে আসতে নেতার দেরি হচ্ছিল। কারণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আলাপ চলছিল। এই সময়ে ছাত্রলীগ নেতারা মঞ্চ থেকে একের পর স্লোগান দিয়ে পুরো ময়দান উদ্বেলিত করে রাখেন। স্লোগানগুলো দেখে নেয়া যাক:
“তোমার দেশ আমার দেশ-বাংলাদেশ বাংলাদেশ”
“তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা মেঘনা যমুনা”
“তোমার নেতা আমার নেতা-শেখ মুজিব শেখ মুজিব”
“বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন করো”
“জয় বাংলা”

অবশেষে ৩টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু সমাবেশমঞ্চে হাজির হন এবং তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু করেন। দীর্ঘ ২২ মিনিটের এই ভাষণে তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে ঘোষণা দেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
উক্ত ভাষণে তিনি বেশ কয়েকটি কর্মসূচী ও দাবি পেশ করেন। যেহেতু তাঁর এই ভাষণটি অসংখ্যবার আমরা শুনেছি এবং শুনতে থাকবো, তাই তাঁর ভাষণটি এখানে তুলে না ধরে বিশ্ব মিডিয়া ও বিশ্লেষকেরা ভাষণটিকে এযাবতকাল পর্যন্ত কিভাবে দেখে এসেছে তা উল্লেখ করে এই পর্বের লেখার সমাপ্তি টানতে চাই।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রভাবশালী সরকারসমূহ ও বিশ্ব-সম্প্রদায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। সকল আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিরা ঢাকায় উপস্থিত থেকে ভাষণের বিবরণ প্রদান করেছেন। ‘নিউজউইক’ সাময়িকীর বিখ্যাত রিপোর্ট, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘পোয়েট অব পলিটিকস্’ হিসেবে, সে-কথা আমরা জানি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের কাছেই নয়; বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যমেও এ ভাষণকে একটি যুগান্তকারী দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

১৯৭৪ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শন ভ্যাকব্রাইড বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ঠ নয়, প্রয়োজন মানুষের মুক্তি। বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। সাম্য ও সম্পদের বৈষম্য দূর করাই স্বাধীনতার সমার্থ। আর এ সত্যের প্রকাশ ঘটে ৭ মার্চের ভাষণে।’

অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন মানব জাতির পথ প্রদর্শক।…তাঁর সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয় সমস্ত পৃথিবীও স্বীকার করবে।’

পশ্চিম বঙ্গের প্রয়াত সিপিএম নেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছেন,‘৭ মার্চের ভাষণ একটি অনন্য দলিল। এতে একদিকে আছে মুক্তির প্রেরণা, অন্যদিকে আছে স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা।’

কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ‘৭ মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল।’

মার্শাল টিটো বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণের তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এই ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিব প্রমাণ করেছেন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানীদের কোন রকম বৈধতা নেই। পূর্ব পাকিস্তান আসলে বাংলাদেশ।’

দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ আসলে স্বাধীনতার মূল দলিল।’

গ্রেট ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ বলেছেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চির জাগরুক থাকবে। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।’

একই সাথে বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যমেও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে। নিউজউইক পত্রিকার নিবন্ধ ‘দ্যা পয়েট অব পলিটিক্স’-এ বলা হয়েছে, ‘৭ মার্চের ভাষণ কেবল একটি ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য কবিতা। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি রাজনীতির কবি হিসেবে স্বীকৃতি পান।’

১৯৯৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, ‘শেখ মুজিব ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমেই আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ঐ ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের কৌশলও ছিল।’

বিবিসি-১৯৭১, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে জন আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের সঙ্গে তুলনীয় এই ভাষণটি। যেখানে তিনি একাধারে বিপ্লবী ও রাষ্ট্রনায়ক।’

থমসন রয়টার্স ১৯৭১- ‘বিশ্বের ইতিহাসে এ রকম আর একটি পরিকল্পিত এবং বিন্যস্ত ভাষণ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে একই সঙ্গে বিপ্লবের রূপরেখা দেয়া হয়েছে এবং সাথে সাথে দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনা ও দেয়া হয়েছে।’ একই সালে এএফপি বলেছে, ‘ ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যদিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের নির্দেশনাও দিয়ে যান। ঐ দিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।’

১৯৭১ সালে দ্যা ওয়াশিংটন পোস্টের এক ভাষ্যে বলা হয়, ‘শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণই হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক ঘোষণা। পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে ঐ ভাষণেরই আলোকে।’

১৯৭২ সালে আনন্দবাজার পত্রিকার এক নিবন্ধে বলা হয়,‘উত্তাল জনস্রোতের মাঝে, এ রকম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, দিকনির্দেশনামূলক ভাষণই শেখ মুজিবকে অনন্য এক ভাবমূর্তি দিয়েছে। দিয়েছে অনন্য মহান নেতার মর্যাদা।’

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর কবিতায় বলেছেন,
‘কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠবাণী?
গণসূর্যে মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন
তাঁর অমর- কবিতাখানি।’

তথ্যসূত্র:
* একাত্তরে পাকবর্বরতার সংবাদভাষ্য – আহমদ রফিক
* ৭১ এর দশমাস – রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী
* উপধারা একাত্তর মার্চ-এপ্রিল – মঈদুল হাসান
* একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম
* বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ – মাহবুবুল আলম।

[পরবর্তী পর্বের লিঙ্ক- একাত্তরের মার্চের উত্তাল দ্বিতীয় সপ্তাহঃ বিস্ফোরন্মুখ বাংলায় প্রতিরোধের প্রস্তুতিপর্ব]
[বায়ান্ন-একাত্তর ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ’ বিষয়ক শাবিপ্রবি-ভিত্তিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বায়ান্ন-একাত্তরের হয়ে এই পর্বটির কাজ করেছেন সারোয়ার তুষার।]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top