নাগরিক কথা

আলাদা করে নারী দিবস কেন?

নারী দিবস নিয়ন আলোয় neon aloy

কেনো আলাদা করে একটা দিবসের দরকার? সবকিছুতে সমান অধিকার চায়, আবার বাসে আলাদা সিট কেন লাগে? যদি নিজেকে মানুষই মনে করে তাহলে একটা দিবস লাগে কেন? ? এমন হাজারো হাজারো প্রশ্নে ফেসবুকের হোমপেজ ভরে যাবে আগামী ২৪ ঘন্টা এবং তারপরো চলবে। এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হয়না এমন কোন নারী নেই। কেউ কেউ ইগ্নোর করে আবার কেউ মুখের উপর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। আর প্রশ্নকারীরা কেউ নিজের প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে মনে মনে খুশি হয় যে আমি যা বলছি তাই তো ঠিক আর কেউ কেউ অপরপক্ষের উত্তরে কোনদিনও সন্তুষ্ট হয় না এবং তালগাছ আমার বলে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অত্যাবশ্যকীয় ভাবে প্রশ্নকারীর বেশির ভাগ পুরুষ এবং কিছু সংখ্যক নারী।

প্রশ্নকারীর প্রশ্ন করার অধিকার আছে, ছোটোবেলা থেকে সে নিজের চারপাশে যা দেখে আসছে তাতে সে এভাবেই চিন্তা করতে শেখে। তাকে ছোটোবেলা থেকে যখন শেখানো হয় যে তুমি পুতুল খেলতে পারবে না, তোমার জন্য তো গাড়ি বন্দুক, তুমি এভাবে কাঁদছ কেনো? এভাবে তো মেয়েরা কাঁদে, মেয়েদের মতো ঢং করছো কেনো? মেয়েদের মত হাঁটছ কেনো? কেনো কেনো কেনো?? তুমি পুরুষ, তোমার তো শক্ত হতে হবে, তোমার তো বড় হতে হবে, পড়তে হবে, গাড়ি-বাড়ি বানাতে হবে, ভালো বৌ পেতে হলে ভালো চাকরী পেতে হবে… … যে ছোটোবেলা থেকে এগুলো শুনে বড় হয় সে এমন প্রশ্ন করবে না কেনো? তার নিজের জন্য তো কোন দিবস নেই! নানা রকম নানা রঙের দিবস, বছরের ৩৬৫ দিনেই কোনো না কোন দিবস আছে। মানে দিবসের তো প্রয়োজন তখনই পরে যখন কোন কিছু সমাজে প্রতিষ্ঠিত না, সেটাকে সমাজে স্বীকৃতি দেবার জন্য। তাহলে নারী দিবস মানে অবশ্যই নারীরা সমাজে এমন এক আজব প্রজাতি যাদের সমাজে স্বীকৃতি দরকার।

ব্যাপারটা আসলে একটু অন্যরকম। এই লেখা যদি কেউ কষ্ট করে পড়ে থাকেন তাহলে আমার একান্ত অনুরোধ যে লেখাটার এক বিন্দু কথাও আপনার ভালো লাগাত হবে না। এটা একজন মানুষের যে কিনা নিজে একজন নারী, তার একান্ত নিজস্ব কিছু ভাবনা যেটা সে নিজের মত করে প্রকাশ করেছে। আপনি যদি নিজে চিন্তা করতে পারেন বা কষ্ট করে নারী দিবসের সূত্রপাত কোথায় সেটা একটু খোঁজ দ্য সার্চ দেন তাহলে বুঝতে পারবেন কেনো একটা দিবসের প্রয়োজন এমন আজব এক প্রজাতির জন্য? সেটা করলে আসলে বিষয়টা ভালো মত ক্লিয়ার হবে। যদি কারো সত্যিই জানার ইচ্ছা থাকে, তাহলে যেকোন কিছু নিজে খুঁজে পড়ে জেনে নেয়া ভালো, বায়াসড হবার কোন আশঙ্কা থাকে না।

নারী আর পুরুষ, মায়ের পেটে কেউ আলাদা থাকে না। তারা আলাদা হয় পৃথিবীতে আসার পর। সমাজ বানায় নারী আর পুরুষ। ওই যে উপরের ‘কেনো কেনো কেনো’ প্রশ্ন গুলো ছিলো, সেগুলোই বানায় নারী আর পুরুষ। মা বানায় নারী আর পুরুষ, বাবা বানায় নারী আর পুরুষ, খালা খালু মামা মামী চাচা চাচী ফুপু ফুপা পাড়া প্রতিবেশী দেশ জাতি পৃথিবী সবাই মিলেই বানায় নারী আর পুরুষ। মানুষ বানানোর তাগাদা নেই, কিন্তু নারী আর পুরুষ বানানোর প্রতিযোগীতা চলে জন্মের পর থেকে! এই প্রতিযোগিতায় একদল নিজেকে সুপিরিয়র ভেবে বড় হয়, আর একদল নিজেকে একটা পরগাছা ভেবে বড় হয় যার সব দায়িত্ব ভবিষ্যতে অন্য দলের। এটাই ভেবে বড় হতে শেখায় বেশিরভাগ পরিবার, সমাজ। প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমনই হয়, অন্তত এদেশে। বাকি ১০ শতাংশ চেষ্টা করে একটা সুন্দর সুখী সমাজ গড়ার যেখানে নারী আর পুরুষেরও আগে অন্তত কিছু মানুষ থাকবে। শতাংশটা হয়তো ঠিক হলো না, এটা আমার ধারণা মাত্র।

আমার একটা প্রশ্ন ছিলো যেটার আমি মনের মত উত্তর পাই না। কেনো ছোটোবেলা থেকে আমাদের সবাইকে এটা শেখানো হয় না যে আমাদের সবার নিজেদের কিছু দায়িত্ব আছে পৃথিবীর কাছে। আমি নারী না পুরুষ সেটার আগে আমাকে একজন মানুষ হতে হবে, সেই পরিচয়ের পর আসুক আমার নারী বা পুরুষ সত্ত্বার কথা। এই দুই সত্ত্বা তো চিরন্তন, কিন্তু মানুষ সত্ত্বাটাকে আমি আগে চিনি! এই মানুষ সত্ত্বাই তো আমার প্রথম পরিচয়। কিন্তু আফসোস, আমাদেরকে এভাবে কেউ ভাবতে শেখায় না। এভাবে ভাবার জন্য আমাদের নিজেদের অনেক যুদ্ধের পর নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। আর এভাবে প্রস্তুত করতে খুব কম সংখ্যক মানুষই পারে, সংখ্যা ব্যাপারটাই এখানে একটা তামাশা হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা বেশিরভাগ মানুষই যে পারি না এমন ভাবতে তার পিছনে অনেক অনেক অনেক কারণ আছে। একটা কারণও এখানে ব্যাখ্যা করতে চাই না। আমি শুধু চাই এ পৃথিবীটা এমন একটা জায়গা হয়ে উঠুক যেখানে নারী অধিকারের কথা বলে বলে মুখে ফেনা না তুলে এমনভাবেই নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক যেনো আমাদের একটা দিবসের প্রয়োজন আর না পরে। একজন নারীও যেনো ধর্ষনের স্বীকার না হয়, একজন নারীও যেনো নিজ ঘরে কাছের মানুষদের দ্বারা নির্যাতিত না হয়; না শারীরিক না মানসিক। আমি চাইনা কোন পুরুষও কোন নির্যাতনের শিকার হোক; না শারীরিক না মানসিক। আমরা সবাই একটু মানুষ হইনা কেন?

আমরা একটু ভাবতে শিখি। আমরা খাওয়া-পড়া-থাকার কথা চিন্তা করার পর আরো কিছু নিয়ে ভাবতে শিখি। আমরা যেনো আমাদের সন্তানদেরকে একটু ভাবতে শেখাতে পারি। আমরা তো চাইলেই পারি মেয়েটাকে এটা শেখাতে যে তোমার দায়িত্ব তোমার নিজের। তোমার জীবনে একজন সঙ্গী আসবে, জীবনসঙ্গী; কিন্তু তোমার নিজের দায়িত্ব তো তোমারই!

মেয়েটাকে এটা শেখাতে পারি যে তুমি যা আছো তা-ই তো তুমি, তাতেই তুমি পূর্ণ। তোমার ওই স্নো-পাউডার-মেকাপ মেখে কারো জন্য সুন্দর হতে হবে না। তুমি এমনিতেই সুন্দর! তুমি যদি সাজতে চাও তো নিজের জন্য সাজো, নিজের ভালো লাগার জন্য সাজো। তুমি শুধু নারী- এজন্য তোমার সেজেগুজে পুতুল হতে হবে না। পুতুল জড়বস্তু, তুমি তো পুতুল না! তুমি জীবন্ত, তুমি এমনিতেই সুন্দর।

আমরা তো ছেলেটাকে এটা শেখাতে পারি যে তোমার নিজের এতো মানুষের দায়িত্ব নিতে হবে কেনো? তোমার বোন আছে, সেও পরিবারের দায়িত্ব নিবে। শুধু ঘর পরিষ্কার করার জন্য আর রান্না বান্না করার জন্য তুমি একটা বৌ ঘরে আনবে না। তার একটা জীবন আছে, তোমার একটা জীবন আছে, দুজন মিলেই দুই জীবনকে এক ট্র্যাকে আনবে। যেকোন একজনের স্যাক্রিফাইস যেনো না করতে হয়, দু’জনের কম্প্রোমাইজেই যেনো একটা সুন্দর পরিবার হয়। আমরা ছেলে মেয়ে দুজনকেই এটা তো শেখাতেই পারি, না?

আমরা মেয়েটাকে তো এটা শেখাতে পারি যে তোমার নিজের রুজি তুমি আয় করবে, সাথে তোমার পরিবারেও তুমি সাহায্য করবে। তুমি নিজে যেটুকু পারো সেটা দিয়েই তুমি অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারবে, তোমাকে সে সুযোগ তৈরী করে দিবো আমরা।

আমরা পারি না এমন করতে? চাইলেই তো পারি, কিন্তু করি না কেনো?

যে মেয়েটা গার্মেন্টসে কাজ করে তার পরিবারকে গ্রামে সাহায্য পাঠাচ্ছে তাকে কিন্তু সুযোগটা তৈরী করে দেয়া হচ্ছে না, সে নিজে তৈরী করে নিচ্ছে। ভালো রেজাল্ট করে চাকরী করে পরিবারকে সাহায্য করছে যে মেয়েটা, তাকেও কিন্তু সুযোগটা তৈরী করে নিতে হচ্ছে। যে মেয়েটা পৃথিবীর সীমা পেরিয়ে মহাকাশে যাচ্ছে সেও সুযোগটা তৈরী করে নিচ্ছে। আমরা সমাজ কিন্তু তাকে তৈরী করে দিচ্ছি না, সে নিজে তৈরী করে নিচ্ছে; নানা বাধা-বিপত্তির পরেও কিন্তু তৈরী করে নিচ্ছে।

যেদিন এই সুযোগ আর তৈরী করতে হবে না, সেদিন আমাদের একটা আলাদা দিবস লাগবে না। সেদিন শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে যে একটা দিবস ছিলো নারীদের জন্য, যেটা অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে ঠিক করা হয়েছিলো। আজ সেটা নেই, কারণ আজ নারী পুরুষের আগে মানুষ আছে… আজ মানুষের জন্য দিবস আছে… না নারীর জন্য, না পুরুষের জন্য।

আমি চাই এমন একটা পৃথিবী, যেখানে আমি একজন নারী বলে আমার উঠতে-বসতে-চলতে-ফিরতে কথা শুনতে হবে না। আমি যা করবো তা আমার নিজের যোগ্যতায়, মানুষ হিসেবে নিজের যোগ্যতায়। যোগ্যতাটা যদি কম হয় তাহলে সেই কম যোগ্যতা দিয়েই যেটুকু পারি সেটা করবো। শুধু নারী বলে আমার চেয়ে কম যোগ্যতার কোন পুরুষ যেনো আমার ওই জায়গাটা না পায়। আর আমি নারী বলে অন্য কারো চেয়ে ভালো কোন জায়গায় যেতে চাই না। আমি কোন কোটাও চাই না। আমি চাই সব কোটা উঠে যাক, পৃথিবীটা এতো সুন্দর হোক যে সবাই সবার যোগ্যতা দিয়ে নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সবাই সেই যোগ্যতা অর্জনের সমান সুযোগ পায়- এমন একটা পৃথিবী চাই আমি।

নিজের মনে হচ্ছে যে সুলতানার মত একটা স্বপ্ন দেখছি। তাও ভাবতে ভালো লাগে যে একটা স্বপ্ন দেখার মত চোখ তো আছে! আর আছে নিজের গন্ডিতে সেই স্বপ্ন পূরণ করার চেষ্টা করার সাহস।

পৃথিবীর সকল নারী কে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা… বি বোল্ড ফর চেঞ্জ…

লেখকঃ নওরীন খানম অর্না

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top