গল্প-সল্প

“সাত হাজার টাকার বই” – সাদমান সাকিব আয়নের ছোটগল্প

সাত হাজার টাকার বই নিয়ন আলোয় neon aloy

ঘুম থেকে উঠামাত্রই শরীরে কেমন জানি একটা আরামদায়ক শান্তি-শান্তি ভাব চলে আসলো সায়মের। এটা ভাবতেই ভালো লাগছে আর মাত্র দুইদিন পর এসএসসি পরীক্ষা শেষ। দুই বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম অবশেষে শেষ হতে চললো। সারা শরীরে একটা আরামদায়ক শিহরণ এবং মুখে হাসি নিয়ে বিছানা থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে সোজা নাস্তার টেবিলে চলে গেলো সায়ম।

“আম্মু আমার ব্যাগ বের করো, কাপড়চোপড় গুছাতে হবে”, মা’কে দেখেই বলে উঠলো।
– একা একা ঢাকা না গেলে হয় না বাবা? তোকে একা ছাড়তে যে আমার মন মানতেছে না!
– না, হয় না। আমার বই কিনতেই হবে। কতো দিনের স্বপ্ন একটা লাইব্রেরি দিবো, তার জন্যে অনেক বই দরকার। কিচ্ছু হবে নাচিন্তা কইরো না, ব্যাগ বের করো তো আম্মু।

সায়মের মা মুখ গোমড়া করে ব্যাগ বের করতে গেলো। ছেলেটা বড় অবুঝএকা ঢাকা যেতেই হবে? ওর বাবা যখন এক-দুই মাস পর ঢাকা যেতো, তখন বাপ-বেটা একসাথে গেলে হতো না? তা না, কি এমন বই কিনে উদ্ধার করবে যেনো!

সায়মের এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে সবাই সালামি দিয়েছে ওকে, সর্বমোট আট হাজার টাকা। এর মধ্যে এক হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে, আর সাত হাজার টাকা আছে যেটা দিয়ে বই কিনবে বলে ঠিক করেছে সায়ম। আসলে সায়মের মাথায় অনেক দিন থেকেই চিন্তা ছিলো অনেক বই কিনবে গল্পের। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র অথবা বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়ে বই এনে পড়তে আর ভালো লাগে না। সায়ম ঠিক করেছে বাসায় লাইব্রেরি দেওয়ার পরগরীব বাচ্চাদের বিনা মূল্যে বই দেওয়া হবে পড়ার জন্যে, একটা বই পড়ে শেষ করলে আরেকটি নতুন বই। বাসার পাশেই দু’টি গরীব বাচ্চাদের স্কুল আছে। যেখানে মাঝে মাঝে গিয়ে বাচ্চাদের পড়ায় সেবাচ্চাদের সাথে মজা করে সময় পার করে। এবার বাচ্চাদের কথা দিয়েছে কমিক্সের বই দিবে ওদের পড়তে।

সন্ধ্যায় বাবা বাসায় আসার পর অনেক কষ্টে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি করানো গেলো ওনাকেকিন্তু তাও এক শর্তেছোট মামা সাথে যাবে। সায়ম খুশি খুশি মনে রাজি হয়ে গেলো। এর আগে মাত্র একবার ঢাকায় গিয়েছিল সে, ক্লাস থ্রি’তে পড়ার সময় ডাক্তার দেখাতে। ছোট ছিলভালমত কিছু মনেও নেই। শুধু মনে পরে পেয়ারা খাচ্ছিল বাবার কাছ থেকে নিয়ে নিয়ে। “এবার ঢাকা যাবো, নীলক্ষেত থেকে গল্পের বই কিনবো” এটাই যেনো চোখে ভেসে উঠছিলো শুধুমাত্র সায়মেরতাই খুশি মনে রাজি হয়ে গেলো।

আটাশ তারিখ শেষ হলো সায়মের পরীক্ষা। দীর্ঘ ১২ বছরের স্কুলজীবনের অবসান ঘটলো আজ। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় এসে মনের আনন্দে ব্যাগ গুছাতে ব্যাস্ত হয়ে পরলো। পরদিন সকালে বাস, সাথে আছেন ছোট মামা। মামাভাগ্নে মজা করতে করতে ঢাকা বেড়ানোর স্বপ্ন রীতিমত দেখা শুরু করে দিয়েছে সায়ম। যদিও বাবা-মা এখনো সায়মকে একা ঢাকা ছাড়তে রাজি না। এর আগে কখনো বাবা মাকে ছেড়ে একা ছিলো না, তাই হয়তো ভয় হচ্ছে বাবা মার মনে।

বাস সকাল দশটায়। কিন্তু উত্তেজনা থেকেই হয়তো সায়মের ঘুম সকাল ছয়টার দিকে ভেঙে গেলো। উঠেই প্রথমে যেই বইগুলো কিনবে তার লিস্টগুলো এক-এক করে পিন মেরে ব্যাগে রেখে দিলো যত্ন করে। প্রায় এক বছর যাবৎ ফেসবুকটিভিপেপার থেকে ভালো কিছু বইয়ের নাম কালেক্ট করেছে। মোট দুইশ একটিযার মধ্যে সব কিনতে না পারলেও বেশীর ভাগ কেনার চেষ্টা করবে বলে আগেই ঠিক করে রেখেছিল।

মামা এবং সায়ম দুইজনই পাশাপাশি সিটে বসে রবীন্দ্র সংগীত শুনছিলো ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে“। মামা বরাবরই মজার মানুষ। রবীন্দ্র সংগীতটি শুনে সাথে সাথেই বললো, “ভুল কথা একদম, ঘরে তালা মারা থাকলে চাবই ভেঙে কি হবে? উচিত ছিলো ‘ভেঙে মোর ঘরের তালা নিয়ে যাবি কে আমারে’ হওয়া!”

৭ঘন্টার জার্নি, কতো কিছু দেখবে এই সফরেবইতো কিনবেই পাশাপাশি মামা কথা দিয়েছেন জাদুঘরে নিয়ে যাবেন সায়মকে, এগুলা ভেবে রীতিমত শিহরণ হচ্ছিল তার। আসলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের অনেক স্বপ্ন থাকে, সব স্বপ্ন হয়তো পূরণ হয় না। কিন্তু কোনো একটি পূরণ হলে যেমন আলাদা ভালোলাগা কাজ করে মনের ভিতর ঠিক তেমনি হচ্ছিল সায়মের।

বাস ঢাকায় পৌঁছালো সাড়ে ছয়টার দিকে। এখন যেতে হবে ফুফুর বাসায়। সিএনজি’তে বসে অনেক নতুন কিছু দেখল সায়ম। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন অনুভূতি, নতুন পরিবেশ- সব মিলিয়ে দারূন এক রোমাঞ্চ হচ্ছিল তার। বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে আটটা বেজে গেলো। ফুফুর বাসায় নেমে হালকা কুশল বিনিময়ের পরেই খাওয়াদাওয়া শেষ করেই সোজা ঘুম।

পরের দিন দুপুরের দিকে মামাকে নিয়ে রওনা দিলো সায়ম। আজকে নীলক্ষেত যেতে হবে, আগামীকাল মিরপুর-১০ এবং তার পরদিন জাতীয় জাদুঘরে নিয়ে যাবে মামা-ভাগ্নে।

সায়মদের বাস যখন শাহবাগে পৌঁছালো তখন তারা দেখলো সেই এলাকায় প্রচণ্ড মারামারি হচ্ছে। দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলছে। পুলিশ-র‍্যাব সামলাবার চেষ্টা করছে। কাছাকাছি সব গাড়িতেও ইট-পাটকেল এমনকি পেট্রল বোমা দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দু’টো প্রাইভেট কারে আগুন নিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে পিকেটাররা। বাসের ড্রাইভার এসব দেখে বাস তাড়াহুড়া করে সাথে সাথে ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো।

এদিকে হঠাৎ এমন পরিস্থিতি দেখে সায়ম ঘাবড়ে গিয়েছে,
– মামা আমার অনেক ভয় লাগতেছেওরা যদি আমাদের গাড়িতে হামলা করে?

সায়েমের মামা চিন্তিত মুখে বললো,
বাবা ঘাবড়াসনি। বেশী কিছু হলে আমরা জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে পালিয়ে যাবো। সায়মের মামাও হঠাৎ করে এরকম বিভীষিকাময় পরিস্থিতি দেখে হকচকিয়ে গিয়েছে।

কিন্তু পিকেটারদের নজর এড়িয়ে ড্রাইভার বাস ঘোরাতে পারলো না, পিকেটারদের চোখে  পরার সাথে সাথে এসে এলোপাতাড়ি ইট-পাটকেল মারা শুরু করলো জানালা উদ্দেশ্য করে। বাসের ভিতর মহিলা এবং শিশুদের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। কয়েকজন পরিস্থিতি খারাপ দেখে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পরলো, কিন্তু পিকেটাররা এসে বাঁশ-লাঠি দিয়ে বেদম মারা শুরু করলো তাদের।

সায়েমের মামা সায়েমকে নিয়ে পিছনের জানালা দিয়ে যেই লাফিয়ে পরতে যাবে, ঠিক তখনই বাইরে থেকে কেউ একজন কিছু একটা ভিতরে ছুঁড়ে মারলো আর সাথে সাথে সম্পূর্ণ বাসের ভিতর আগুন লেগে গেলো। আগুনের হলকায় পিছিয়ে আসতে গিয়ে কিসে যেন ধাক্কা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো সায়ম।

আবছাভাবে যখন জ্ঞান ফিরলো সায়মের, তখন ওর কাছে মনে হলো ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছে বেড়াতে। তাকে হাসপাতালের ট্রলিতে করে ইমারজেন্সি বিভাগে নিয়ে যাচ্ছে ডাক্তাররা। অবচেতন মনেই সায়ম বললো, “আচ্ছা আমি এখানে কেনো? আমার না বই কিনতে যাওয়ার কথা?”

সায়মের চারপাশ প্রবলভাবে বদলে গেছে। জ্ঞান হারানোর আগে মামার বলা কথাসায়েম দৌড় দিয়ে পালিয়ে যা বাবা“- বারবার বাজতে থাকল তার কানে। সেইসাথে “ছোট মামা কোথায়উনি কি মারা গেছেন? আচ্ছা আমি কি মারা গেছি নাকি মারা যাচ্ছি? আমার শরীরে কেনো কোনো অনুভূতি পাচ্ছি না?” এই চিন্তাটাও এই চিন্তাটাও চক্রাকারে তার মাথায় ঘুরা শুরু করল।

ঘোর লাগা চোখ দিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে সায়ম দেখে অনেক লোকজন আগুনে পোড়া, কারো সারা শরীর ব্যান্ডেজ করানার্স-ডাক্তারদের ছোটাছুটিতে চারিদিকে তীব্র হাহাকার।

হঠাৎ তার মনে হলো, তার দেহ থেকে কিছু একটা বেরিয়ে যাচ্ছেচোখ আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে আসছে।

এই ছেলে তোমার নাম কি? বাসা কোথায়? … অ্যাই ছেলে… চোখ বন্ধ করো না….একটু কষ্ট করে জেগে থাকার চেষ্টা করো বাবা, আমরা তোমাকে ইমারজেন্সিতে নিয়ে যাচ্ছি….

ডাক্তারদের কথা সে শুনতেই পাচ্ছে না ভালোমতোতার এক ধরণের অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে যেটার উৎস এই পৃথিবীতে না, অন্য কোন দুনিয়ায়। সায়মের শেষবারের মতন মনে হলো তার মার বলা কথাগুলো- একা একা না গেলে হয় না বাবা? তোকে একা ছাড়তে যে আমার মন মানতেছে না!”

Most Popular

To Top