ইতিহাস

অ্যালকাট্রাজ পালানো কয়েদীরা!

আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে সুরক্ষিত কারাগার ছিল কোনটা? উত্তরটা চোখ বন্ধ করেই দেওয়া যায়- অ্যালকাট্রাজ (The Alcatraz Federal Penitentiary)। অ্যালকাট্রাজকে সবচেয়ে সুরক্ষিত বলা হচ্ছে কারণ এই কারাগারটা একটা দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত এবং এই দ্বীপ থেকে পার্শ্ববর্তী স্যান ফ্রান্সিস্কো উপকূলের দূরত্ব ২.০১ কিলোমিটার। আল ক্যাপোন, মিকি কোহেনের মত দুর্ধর্ষ অপরাধীদের শেষ ঠিকানা ছিলো অ্যালকাট্রাজ।

এই কারাগার থেকে পালাতে চাইলে প্রথমে বন্দীকে নিজের সেল থেকে বের হওয়া লাগবে, তারপর সেল ব্লক এবং কারাগারের সীমানা প্রাচীর থেকে বের হওয়া লাগবে। এবং সবশেষে ২ কিলোমিটার ঠান্ডা পানি সাতার কেটে পার হওয়া লাগবে। গুজব ছিল, এই পানি এতোই ঠান্ডা যে এখানে সাঁতার কাটতে গেলে হাইপোথার্মিয়ার কবলে পড়ে মারা যেতে হবে। সেইসাথে সাগরের প্রচন্ড স্রোত তো আছেই এবং তার সাথে হাঙরের ভয়। ভালো কথা, এই সবগুলোই কিন্তু কারাগারের গার্ডদের চোখ ফাঁকি দিয়ে করা লাগবে!

অ্যালকাট্রাজ নিয়ন আলোয় neon aloy

পাখির চোখে অ্যালকাট্রাজ…

১৫৭৬ জন দুর্ধর্ষ বন্দী ছিল অ্যালকাট্রাজে। যাদের মধ্যে ৩৬ জন বন্দী ১৪ বারের মত পালানোর চেষ্টা করেছে। এই ১৪ টি আলাদা ঘটনায় ২৩ জন দ্বীপের ভিতরেই গার্ডের হাতে আটক হয়, ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, পানিতে ডুবে মারা যায় ২ জন এবং “জন পল স্কট” নামে এক অপরাধী সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছালেও হাইপোথার্মিয়াতে আক্রান্ত হয় এবং সাথে সাথেই গার্ডদের হাতে ধরা পড়ে। বাকি পাঁচ জনকে দেখানো হয়েছে “নিখোঁজ” হিসাবে। হয় এরা সাগরে তলিয়ে গিয়েছে অথবা FBI-কে ফাঁকি দিয়ে রীতিমত বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে ।

আজকের গল্পটা এই ৫ জনের মধ্যকার ৩ জনকে নিয়ে।

অ্যালকাট্রাজ নিয়ন আলোয় neon aloyঅ্যালকাট্রাজ পালানোতে “সফল” তিনজন

প্রথমজন ফ্র্যাঙ্ক মরিস, এই পলানোর ঘটনার মাস্টারমাইন্ড। যে লোকটা IQ টেস্টে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার টপ ২% এর মধ্যে থাকতে পারে, সে কোন লেভেলের ট্যালেন্টেড হতে পারে সে ধারণা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তবে এই লোকটা যে আর ১০ টা মানুষের মত টিপিক্যাল হবে না এটা চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায়।

ওয়াশিংটনে ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া ফ্র্যাঙ্ক মরিস ১১ বছর বয়সে বাবা-মা’কে হারান। প্রথমবারের মত ফ্র্যাঙ্ক যখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তখন তাঁর বয়স ১৩ বছর। পরবর্তীতে কিশোর বয়সেই কয়েকবার ড্রাগস আর সশস্ত্র ডাকাতির জন্য পুলিশের হাতে ধরা পরার রেকর্ড আছে এই ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ডের।ব্যাংক ডাকাতিতে ধরা খেয়ে ১০ বছরের জন্য লুসিয়ানা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় তাঁকে। সফলতার সাথে এই কারাগার ভেঙে পালাতে পারলেও ১ বছর পর তিনি আবার ধরা পড়েন এবং তাকে পাঠানো হয় আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত কারাগার অ্যালকাট্রাজে। সময়টা ছিল ১৯৬০ সাল।

বাকি দুইজন “জন উইলিয়াম এংলিন” এবং “আলফ্রেড ক্লারেন্স এংলিন”, দুই ভাই। ১৯৩০-৩১ সালে জর্জিয়াতে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহন করা এই দুই ভাইয়ের আরো ১১ জন্ম ভাইবোন ছিল। দুই ভাই ছিল দক্ষ সাঁতারু। মিশিগান লেকের বরফজমা ঠান্ডা পানিতে সাঁতার কেটে রীতিমত তাক লাগিয়ে  দিতো বাকি ১১ জন ভাইবোনকে।

১৯৫০ এর দিকে এরা ব্যাংক ডাকাতি শুরু করে টীম হিসাবে। বেশিরভাগ সময় এরা রাতে ব্যংক ডাকাতি করতো যেন মানুষ না মারা লাগে এবং এরা একবার খেলনা পিস্তলের ভয় দেখিয়ে ব্যাংক ডাকাতিও করে। ধরা পড়ার পর কয়েকটা কারাগারে রাখা হলেও সবসময় পালানোর চেষ্টা করার জন্য তাদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয় অ্যালকাট্রাজে, আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত কারাগার । সময়টা ১৯৬০ অথবা ‘৬১ সাল।

ফ্র্যাঙ্ক মরিস এবং এংলিন ব্রাদার্সের সাথে আরো একজন “হতভাগা” জড়িত ছিল। অ্যালেন ওয়েস্ট। গাড়ি চুরির অপরাধে জেলে যাওয়া অ্যালেন একসময় ফ্লোরিডা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করে এবং ধরা পড়ে অ্যালকাট্রাজে নির্বাসিত হন।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে ফ্রাঙ্ক মরিস, এংলিন ব্রাদার্স আর অ্যালেন ওয়েস্টকে পাশাপাশি সেল দেয়া হয় অ্যালকাট্রাজে। ফ্রাঙ্ক মরিসের নেতৃত্বে বাকি ৩ জন আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত কারাগার থেকে পালানোর প্ল্যান শুরু করে। পরের ৬ মাস তারা ধীরে ধীরে সেলের ভেন্টিলেটরে গর্ত করে। সেল থেকে বের হবার জন্য এর চেয়ে ভালো অপশন ছিল না তাদের হাতে। ভেন্টিলেটরে গর্ত করার জন্য শুরুতে চামচ কিংবা ব্লেডের মত সহজলভ্য জিনিস ব্যাবহার করলেও পরবর্তীতে ভ্যাকিউম ক্লিনারের মোটরের সাহায্যে তারা ছোটখাটো হ্যান্ড ড্রিল মেশিন তৈরি করে ফেলে। গ্রুপের ১ জন যখন তার সেলে খোঁড়াখুঁড়ি করতো, তখন বাকি সদস্যদের ভিতর কেউ গার্ডকে পাহারা দিতো, কেউ মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতো (গার্ডদের টাকা দিয়ে খুশি করাতে পারলে মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট কিংবা পেইন্টিং এক্সেসরিজ নিজের সেলে রাখা যেত) যেন খোঁড়াখুঁড়ির শব্দ কেউ না শুনতে পায়।

ভেন্টিলেটরে বানানো গর্তটা তাদেরকে একটা করিডরের সন্ধান দেয়, যেখানে সাধারণত কোন গার্ড থাকতো না। করিডোর থেকে তারা সেল ব্লকের ছাদে উঠতে সমর্থ হয়। এবং বিল্ডিঙের ভিতরের এই জায়গাতে তারা একটা ছোট ওয়ার্কশপ বানিয়ে ফেলে। এখানে বসেই তারা চুরি করে আনা রেইনকোর্ট দিয়ে লাইফ জ্যাকেট বানায়। এই লাইফ জ্যাকেটগুলা সীল করার জন্য তারা পাশের স্টিম পাইপের তাপ ব্যাবহার করেছিল।

এখান থেকে পরবর্তীতে তারা বিল্ডিং এর ছাদে উঠতে সমর্থ হয় এবং ধীরে ধীরে ছাদের উপরের ভেন্টিলেশন ফ্যান এবং গ্রীলের সাথের সব রিভেট কেটে ফেলে।

কিছু সময় পরপরই অপরাধীদের সেলের সামনে গার্ড টহল দিতো। এর জন্য ভেন্টিলেটরের গর্ত দিয়ে রুমের বাইরে বের হবার আগে তারা তাদের বানানো “ডামি হেড”গুলো এমন ভাবে বেডের উপর রেখে চাদর দিয়ে ঢেকে দিতো যেন বাইরে থেকে দেখে মনে হয় খাটের উপর কেউ একজন শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সাবান, টিস্যু পেপার গলিয়ে মন্ড টাইপ কিছু একটা বানাতে পারতো তারা, যেটা দিয়ে পরবর্তীতে ডামি হেডগুলা তৈরি করা হয়।

অ্যালকাট্রাজ নিয়ন আলোয় neon aloy

অ্যালকাট্রাজ ফেরারি কয়েদীদের পরিকল্পনার সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছিলো এই ডামিগুলো

জুন ১১, ১৯৬২

প্ল্যান শুরু করার ৭ মাসের মাথায় তারা মোটামুটি সবকিছুই ম্যানেজ করে ফেলে। যদিও অ্যালেন ওয়েস্টের রুমের ভেন্টিলেটর তখনো ভাঙা শেষ হয়নি। পুর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্রাঙ্ক মরিস আর এংলেন ব্রাদার্স তাদের বিছানার উপর ডামি হেডগুলো রেখে সেগুলাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলো, যেন না বোঝা যায় সেল থেকে কয়েদী গায়েব হয়ে গিয়েছে। তারপর তারা করিডোর এবং সেলব্লকের ছাদের ভেন্টিলেশনের জায়গা দিয়ে বিল্ডিং এর ছাদের উপর উঠে যায়।

ছাদের ভেন্টিলেশনের প্লেসটা অনেক উপরে থাকায় জন্য ১ জনের পক্ষে অসম্ভব ছিল সেখানে ওঠা । কিন্তু যেখানে ৩ জন ব্রিলিয়ান্ট গ্রুপ মেম্বার আছে সেখানে সকল কঠিন কাজ সহজ হতে বাধ্য।

অ্যালকাট্রাজ নিয়ন আলোয় neon aloy

ভেন্টিলেটর ভেঙে বানানো সুড়ঙ্গ

উল্লেখ্য, অ্যালেন শেষ পর্যন্ত রুমের ভেন্টিলেটর ভাংতে পারে। ব্লকের ছাদে গিয়ে দেখে তার একার পক্ষে এতো উপরে ওঠা অসম্ভব। বাকি ৩ জন যেহেতু আগেই চলে গিয়েছে, সেহেতু অ্যালেন ওয়েস্ট পালানোর চিন্তা বাদ দিয়ে তার নিজের সেলে এসে হতাশ হয়ে শুয়ে পরেন। তিনিই পরবর্তিতে এই মামলার প্রধান স্বাক্ষী ছিলেন।

পরের দিন দুপুর ১২ টার আগে কেউ জানতেই পারলো না তিনজন কয়েদী তার আগের রাতে আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত কারাগার ভেঙে পালিয়েছে। গার্ড যখন তাদের রুমে গিয়ে বিছানার চাদর সরালো, তখন বিছানার উপর ডামি হেড ছাড়া স্বাভাবিকভাবেই আর কিছুই পেলো না।

অ্যালকাট্রাজ নিয়ন আলোয় neon aloy

কয়েদীদের নিজেদের সেলে তৈরি করা সুড়ঙ্গমুখ

পরবর্তী ১০ দিন তন্ন তন্ন করে খোঁজার পর অ্যালকাট্রাজের আশেপাশে সমুদ্রে বেশ কিছু অযাচিত জিনিস পাওয়া যায়। বৈঠা সদৃশ কিছু একটা, একটা প্ল্যাস্টিকের ব্যাগে মধ্যে এংলিন ব্রাদার্সের আত্মীয়দের নাম-ঠিকানা এবং ছবি। এর কিছুদিনের মধ্যে রেইনকোট দিয়ে বানানো লাইফজ্যাকেটগুলাও পাওয়া যায়। শুধু পাওয়া যায়নি ৩ টা মানুষের কোন অস্তিত্ব।

অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও FBI বিন্দুমাত্র কোন লিড খুঁজে পায় নাই, যেটা দিয়ে তারা পলাতকদের ট্রেস করতে পারে। ১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর FBI এই ফাইল ক্লোজ করে দিতে বাধ্য হয়।

জ্বী, উপরের আর্টিকেল পড়ে আপনার মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে ফ্র্যাঙ্ক মরিস আর এংলিন ব্রাদার্সের শেষ পর্যন্ত কি হলো? অথবা তারা হিমশীতল সাগর পার হয়েছিল কিভাবে? নাকি তারা সমুদ্রেই ডুবে গিয়েছিল, না FBI এর চোখ ফাঁকি দিয়ে জেলের বাইরে স্বাধীন জীবন যাপন করতে পেরেছিল?

কতগুলা যুক্তি দিয়ে লেখাটা শেষ করি।

প্রথমত, একজন অপরাধীকে যখন অ্যালকাট্রাজে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন তার ভিতরে যে জিনিসটা ঢুকিয়ে দেয়া হতো, সেটা হচ্ছে ভয়। এই ভয়কে আরো দৃঢ় বানানোর জন্যই হয়তো সমুদ্রের পানিকে হিমশীতল বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল । একই সাথে হাঙরের ব্যাপারটাও নিছক গুজব ছিল। হয়তো এই কারণগুলার জন্যই তারা তিনজন ভালোভাবেই লাইফ জ্যাকেট পরে সমুদ্র পার হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, শুরুর দিকে FBI ধারণা করে এই তিনজন হয়তো সাগরে ডুবে মারা গেছে। কিন্তু একজনেরও লাশের অস্তিত্ব না পাওয়া প্রমান করে, এটা নেহায়েত গা-বাঁচানোর অজুহাত ছিল।

ফুটনোট – ধারণা করা হয় এই তিনজন ব্রাজিলে আত্মগোপন করে আছে। এংলিনদের দুই বোন ২০০২ সালে ঘোষণা দেন, তার ভাইয়েরা বেঁচে আছে। তাদের বয়স সেসময় ৮০ পেরিয়ে যাবার কথা। তারা এটাও জানান, ১৯৬২ সালে সান ফ্র্যান্সিস্কো থেকে একটা ফোনকল পান তারা। যেখানে এংলিন ভ্রাতৃদ্বয় তাদের পরিবারকে ক্রিসমাসের শুভকামনা জানায় । অপরদিকে, নরওয়ের একটা জাহাজে থাকা কিছু নাবিক দাবী করে তারা গোল্ডেন গেট ব্রিজ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে একটা লাশ সাগরে ভাসতে দেখে যার পরণে কয়েদীদের পোশাক ছিল এবং এই ঘটনা অ্যালকাট্রাজ থেকে তিন কয়েদী পালানোর ১ মাসের মধ্যে ঘটে।

৫৫ বছর পর আমরা এখনো জানি না ফ্রাঙ্ক মরিস আর এংলিন ব্রাদার্সের পরিণতি আসলে কি হয়েছিল। সব রহস্যের যে সমাধান হতে হবে, এমন তো কোন কথা নেই। কিছু রহস্য না হয় অমিমাংসিত থেকে যাক!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top