নাগরিক কথা

কমে আসুক চিকিৎসকের সাথে রোগীর দূরত্ব

ইন্টার্ন ডাক্তার নিয়ন আলোয় neon aloy

তখন আমি ‘কচি’ ইন্টার্ন ডাক্তার।
সবে পাশ করেছি। অভিজ্ঞতা কম কিন্তু ভাব বেশী।
গম্ভীর মুখে হাসপাতাল এ ঘুরি। গম্ভীর হবার কারন, রোগীরা ইয়ং ডাক্তার দেখে হালকাভাবে নিতে চাইলেও, গাম্ভীর্য দেখে যাতে সেটা না করে।

এর মাঝে এক বৃদ্ধা রোগী ভর্তী হলো একদিন। পেটে ব্যাথা। আমি পেটে হাত দিয়ে দেখি মুত্রথলি ভর্তি প্রস্রাব কিন্তু উনি বোধ পাচ্ছে না প্রস্রাবের। খবর নিয়ে জানলাম ওনার অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিস। রোগ ধরে ফেললাম। অতিরিক্ত সুগারের কারনে মুত্রথলির নার্ভ নষ্ট হয়ে এই রোগ হয়। চিকিৎসা শুরু করলাম। কিছুক্ষন পর শুনলাম রোগী এবং রোগীর লোকজন আমাকে কেবিন এ ডাকছে। রোগ সম্পর্কে জানতে চায়। আমি আরো দুই তিন কেজি গাম্ভীর্য বাড়িয়ে একদম প্রফেসর টাইপ ভাব নিয়ে গেলাম কেবিন এ। বৃদ্ধা রোগী আমাকে দেখেই দিলো রাম ধমক,
– “ঐ ডাকতর ছ্যাড়া, এইডি কি করসো আমারে? অখনো ছ্যালাইন দাও নাই কিয়ারে?”
রোগীর এক ছেলে জিজ্ঞাসা করলো, “ভাই আমার মা এর কি হইছে? কি ছিকিৎসা দিলেন? একটা সুই ও দিলেন না এক্ষনো আর ছয়টা টেশ(টেস্ট) ধরায়া দিলেন, ব্যাবসা করেন খালি?”
রাগে আমার মাথা চক্কর দিলো। বলে কি এরা? চিকিৎসার কি বুঝে যে এইসব বলে? তাও ভাষার এ কি অবস্থা..
মাথা ঠান্ডা করে ব্যখ্যা সহকারে বললাম, “ওনার ডায়বেটিক ব্লাডার ডিসফাংশন নামক রোগ হয়েছে, ইউরিনারি ব্লাডার রেসপন্স করছে না, আমরা ইউরিনারি ক্যাথেটার দিয়ে ভয়েড করানোর… ”
আমার সুন্দর বিদেশী ব্যাখ্যা শুনে তারা পটলো না, উল্টা আরেকজন মহা পন্ডিত বললো, “না না, আফনেদের ছিকিৎসা ভালো না, একটা সুই ও দিলেন না, পচ্ছাবের নল পরায় দিসেন, এইডিরে কুনু ছিকিৎসা কয়?”

আমি রাগে দুঃখে গজগজ করতে করতে ফিরে আসলাম। মনে মনে ভাবলাম, শালার পাবলিক, ছাত্র জীবন থাকলে দুই চারজন পোলাপান আইনা বুঝায়া দিতাম চিকিৎসক কে সম্মান কিভাবে দিতে হয়।

রাতে বড় স্যার তার ভর্তী রোগীদের দেখতে আসলেন। ঐ রোগীর কেবিন এ যাওয়ার সময় মনে মনে ভাবলাম, “এইবার চান্দু দেখি তোমরা কি বলো। আমাকে তো ভুল বুঝলা”।
স্যার ঐ কেবিনে ঢুকার সাথে সাথে বৃদ্ধা ডাবল ঝাড়ি দিলো,
“তুমি কেডা? কি চাও? এই ব্যাডায় কি চায়?”
স্যার হেসে ফেললেন। বললেন, “বুড়ি দেখি আমারে বকা দেয়, কি হইলো বুড়ির? রাগ কেন? সিস্টাররা খাতির যত্ন করে নাই?”
বুড়ি বলে, ” হ, এইতানের আমারে দ্যাখনের সময় আছে কুনু?”

এরপর স্যার যা যা করলেন, তা হলো দক্ষতা, ভালো ও খারাপ ব্যাবহার এবং জবাবদিহিতার অসাধারন কম্বিনেশন!
– তিনি রোগী কে পরীক্ষা করলেন।
– ইতিমধ্যে কি চিকিৎসা দিয়েছি চেক করলেন, যোগ বিয়োগ করলেন, আরো টেস্ট দিলেন।
– স্যালাইন কেন দেওয়া হচ্ছে না তার জবাবে নিজের হাতে ঔষধের বাক্স থেকে স্যালাইনের বোতল দেখিয়ে বললেন যে স্যালাইন রেডি আছে। লাগলেই দিবো।
– রোগীর রক্তের সুগার ২৬ শুনে রোগীর ছেলেকে ভাতিজা সম্বোধন করে কিছুক্ষন বাজেভাবে ধমকালেন, অপমান করলেন।
– এক্কেবারে খাস বাংলা কথ্য ভাষায় কয়েকবার বুঝালেন বুড়ির কি রোগ।
– কেন সুই (ইনজেকশান) দেওয়া হয় নি, এর জবাবে বুড়ির দিকে তাকায়া বললেন, ‘দেখসেন আপনার পোলাপান কত খারাপ? আপনারে সুই দিয়ে ব্যাথা দিতে চায়’। বুড়ি মাথা নেড়ে স্বীকার করলো যে তার পোলাপান সব ফাজিলের দল এবং সবগুলা বউ পাগল।
– সব কাজ এর ফাঁকে ফাঁকে কয়েকবার বুড়ির তেলতেলা মাথায় হাত বুলালেন এবং সিস্টার কে বললেন খালা কে দিয়ে যাতে সুন্দর করে বুড়ির চুল আঁচড়ে বেধে দেয়।

উপরের পুরো কাজগুলো তিনি সারলেন মাত্র ৩/৪ মিনিটে।

তিনি চলে যাবার পর রোগীর সেই বদমেজাজি ছেলেরা দল বেধে আমার রুম এ এসে আমাকে বললো, “স্যার যা লাগে করেন, টেশ যতগুলা লাগে দেন, মা রে আপনাদের উপরে ছাড়লাম, আপনারা যা বলবেন সেইটাই”।

সেদিন থেকে আমি চেহারার গাম্ভীর্য্য ঝেড়ে ফেলে দিলাম। রোগীর সাথে ঐ স্যার এর মত করে মিশতে চাইতাম এবং প্রায় প্রতিবারই ফলাফল হিসেবে রোগীদের বিশ্বাস পেয়েছি। মাঝে মাঝে সম্ভব হতো না, হয়তো ঐ স্যার নিজেও সবসময় পারেন না কিছু ভিন্ন পরিস্থিতির কারনে।
কিন্তু আজ এই চার বছর পর আমি নিশ্চিত জানি যে আসলে আমাদের চিকিৎসা অতটাও খারাপ না, শুধুমাত্র বিভিন্ন কারনে রোগীর সাথে ব্যবহার এর আর্ট রপ্ত করতে পারি নি দেখে আমরা চিকিৎসার দিক থেকে বদনাম হয়ে আছি। সঠিক চিকিৎসা দিয়ে রোগী কে বোঝাতে পারছি না আমি কিভাবে সঠিক, ভুল ত্রুটি হলেও বোঝাতে পারছি না কার ভুলটা কোন যায়গায়।

দেশের ডাক্তার ও রোগীদের ভুল বোঝাবোঝি কমার আশায় রইলাম।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top