বিশেষ

একেই বলে সত্যজিৎ, একেই বলে শুটিং!

সত্যজিৎ রায় একেই বলে শুটিং নিয়ন আলোয় neon aloy

ইতালিয়ান পরিচালক ভিত্তোরিও দে সিকার এর বানানো দ্যা বাইসাইকেল থিফ মুভিটি দেখে সিনেমা বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলেন এক সাহসী বাঙালি তরুণ। মাথার ভেতর গেঁথে আছে প্রখ্যাত কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা “পথের পাঁচালী” উপন্যাসটি। পণ করলেন সিনেমা বানাবেন এবং মাথার ভেতর গেঁথে থাকা পথের পাঁচালী দিয়েই শুরু করবেন। তৎকালীন সময়ে পথের পাঁচালী কে স্ক্রিপ্ট হিসেবে নিতে মুখিয়ে ছিলেন আরো অনেকে। কিন্তু, বিভূতিভূষণের স্ত্রী সত্যজিৎকেই দিলেন পথের পাঁচালীর স্বত্ব। সমস্ত আবেগ দিয়ে সেই তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়েন সিনেমা বানাবেন বলে।
আজ পর্যন্ত সর্বজনস্বীকৃত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র (পথের পাঁচালী) নির্মাণের পেছনে রয়েছে অনেক শ্রম, কষ্ট এবং মজাদার কাহিনি।
সত্যজিৎ রায়ের নিজের বর্ণনায় নিচে পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের পেছনের কিছু গল্প তুলে ধরা হলো।

যেভাবে যোগাড় হলো অপু!

“… পথের পাঁচালী ছবি তোলার কাজ চলেছিলো আড়াই বছর ধরে। অবিশ্যি এই আড়াই বছরের রোজই যে শুটিং হয়েছে তা নয়। আমি তখন বিজ্ঞাপনের আপিসে কাজ করি। এই কাজের ফাঁকে ফাঁকেই শুটিং হত। আর তার অধিকাংশই হত ছুটির দিনে বা আপিসের কাজ থেকে ছুটি নিয়ে। পয়সাকড়ি বেশি ছিল না আমাদের। যেটুকু জোগাড় হত তা ফুরিয়ে গেলে কাজ বন্ধ করে বসে থাকতে হত যত দিন না আবার কিছু টাকা জোগাড় করা হয় তার অপেক্ষায়। শুটিং হবার আগে অভিনয় করার জন্য লোক জোগাড়ের একটা বড় পর্ব ছিল। বিশেষ করে অপুর জন্য কিছুতেই একটি বছর ছয়েকের ছেলে পাওয়া যাচ্ছিলো না। শেষে বাধ্য হয়ে আমরা কাগজের বিজ্ঞাপন দিলাম। রাসবিহারী অ্যাভিনিউ- এর একটা বাড়িতে একটা ঘর নিয়েছিলাম সেই ঘরে রোজ বিকেল একটা নির্দিষ্ট সময় সব ছেলে এসে হাজির হত। অনেক ছেলেই এসেছিল, কিন্তু মনের মতো একটিও নয়। একদিন একটি ছেলে এল, তার ঘাড়ে পাউডার লেগে আছে দেখে আমার কেমন জানি সন্দেহ হল। তার নাম জিজ্ঞেস করতে ছেলেটি মিহিগলায় বলল, ” টিয়া “। সঙ্গের অভিভাবককে জিগ্যেস করলাম, ‘ একে কি সদ্য সেলুন থেকে চুল ছাঁটিয়ে আনলেন নাকি ? ভদ্রলোক ধরা পড়ে গিয়ে আর আসল ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। বললেন ছেলেটি আসলে মেয়ে, অপুর পার্ট পাবার লোভে তাকে চুল ছাঁটিয়ে এনেছেন আমাদের কাছে। বিজ্ঞাপন দিয়ে ছেলে না পাওয়ার ফলে আমাদের প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা হয়েছিল। শেষে আমার স্ত্রী একদিন ছাত থেকে নেমে এসে বললেন, ‘ পাশের বাড়ির ছাতে একটি ছেলেকে দেখলাম ; তাকে একবার ডেকে পাঠাও তো। ‘ এই পাশের বাড়ির ছেলে শ্রীমান সুবীর ব্যানার্জিই শেষে হল আমাদের অপু। …”

জৈবিক যত বিড়ম্বনা

“… ছবির কাজ যে আড়াই বছর ধরে চলবে সে তো গোড়ায় ভাবা যায়নি, শেষে যত দিন যায় ততই ভয় হয় অপু – দুর্গা যদি বেশি বড় হয়ে যায় তা হলে ছবিতে সেটা ধরা পড়বে। কিন্তু ভাগ্য ভাল যে এই বয়সে যতটা বাড়ার কথা, দু’জনের একজনও ততটা বাড়েনি। আশি বছরের বুড়ি চুনিবালা দেবী – যিনি ইন্দিরা ঠাকরুন সেজেছিলেন তিনিও যে শুটিং-এর এত ধকল সত্ত্বেও আড়াই বছর বেঁচেছিলেন, সেটাও আমাদের পরম সৌভাগ্য। শুটিং এর একেবারে শুরুতেই হল গোলমাল। অপু- দুর্গাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কলকাতা থেকে সত্তর মাইল দূরে বর্ধমানের কাছে পালসিট বলে একটা জায়গায়। সেখানে রেললাইনের ধারে কাশফুলে ভরা মাঠ। অপু-দুর্গার প্রথম ট্রেন দেখার দৃশ্য তোলা হবে। বেশ বড় দৃশ্য, তাই একদিনে কাজ শেষ হবে না, অন্তত দু’দিন লাগবে। প্রথম দিন ছিলো জগদ্বাএী পুজো। অপু- দুর্গার মধ্যে মন কষাকষি চলছে, দিদির পিছনে ধাওয়া করে অপু গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসে পৌঁছেছে কাশবনে। সকাল থেকে শুরু করে বিকেল অবধি কাজ করে প্রায় অর্ধেক দৃশ্য তোলা হল। প্রথম দিনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে দিন সাতেক পরে আবার সেই জায়গায় ফিরে গিয়ে মনে হল – এ কোথায় এলাম ? কোথায় গেল সব কাশ? দৃশ্য যে প্রায় চেনাই যায় না। স্থানীয় লোকের কাছ থেকে জানা গেল কাশবন নাকি গরুর খাদ্য। এই সাত দিনে সব কাশ খেয়ে গেছে তারা। এখন যে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে জায়গাটা সেখানে ছবি তুললে আর প্রথম দিনের ছবির সঙ্গে মিলবে না। এ দৃশ্যের বাকি অংশ তোলা হয়েছিল পরের বছরের শরৎ কালে, যখন আবার নতুন কাশে মাঠ ভরে গেছে। …”

“… পয়সার অভাবে এত বেশি দিন ধরে ছবি তোলার জন্য আরও অনেক সমস্যার সামনে পড়তে হয়েছিল আমাদের। একটা উদাহরণ দিই। বইয়ে আছে অপু – দুর্গাদের পোষা কুকুর ভুলোর কথা। গ্রাম থেকেই একটা কুকুর জোগাড় হয়েছিল ; সেটা আমাদের সকলেরই বেশ পোষ মেনে গিয়েছিল। ছবির একটা দৃশ্যে অপুর মা সর্বজয়া অপুকে ভাত খাওয়াচ্ছেন। ভুলো দাওয়ার সামনে উঠোনে বসে খাওয়া দেখছে। অপুর হাতে তীর ধনুক, খাওয়ায় তার বিশেষ মন নেই। সে মার দিকে পিঠ করে বসেছে, কখন আবার তীর ধনুক নিয়ে খেলবে তারই অপেক্ষা। অপু খেতে খেতেই তীর ছোঁড়ে। তারপর খাওয়া ছেড়ে উঠে যায় তীর আনতে। সর্বজয়া বাঁ হাতে থালা ডান হাতে গ্রাস নিয়ে ছেলের পিছনে ধাওয়া করে । কিন্তু ছেলের ভাব দেখে বোঝে সে আর খাবে না । ভুলোও উঠে পড়েছে। তার লক্ষ ভাতের থালার দিকে। এর পরের শট – এ দেখানো হবে সর্বজয়া বাকি ভাতটুকু আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়। আর সেটা যায় ভুলোর পেটে। কিন্তু এই শটটা আর নেওয়া গেল না। দিনের আলো ফুরিয়ে গেল, আর সেই সঙ্গে আমাদের টাকাও। মাস ছয়েক পরে টাকা সংগ্রহ হলে আবার বোড়াল গ্রামে যাওয়া হয় দৃশ্যের বাকি অংশ তোলার জন্য। কিন্তু গিয়ে জানা গেল ভুলো আর নেই। এই ছ’মাসের মধ্যে সে কুকুর মরে গেছে। কী হবে ? খবর পাওয়া গেল আর একটা কুকুর আছে অনেকটা ভুলোর মতোই দেখতে। আনো ধরে সে কুকুরকে। সত্যি তো। দুই কুকুরের অাশ্চর্য মিল। গায়ের বাদামি রঙ্গে তো বটেই। সেই সঙ্গে আগেরটার মতো এটারও ল্যাজের ডগা সাদা। শেষ পর্যন্ত এই নকল ভুলোই সর্বজয়ার পিছন পিছন এসে দিব্যি আস্তাকুঁড়ে ফেলা থালার ভাত খেয়ে ফেলল, আর আমাদেরও পুরো দৃশ্যটা তোলা হয়ে গেল। ফিল্ম দেখে ফাঁকি ধরে কার সাধ্যি। …”

প্রকৃতিও যখন বাধ সাধে!

“… এই পয়সার অভাবেই আমাদের বৃষ্টির দৃশ্য তুলতে প্রচন্ড অসুবিধা হয়েছিল। বর্ষাকাল এল গেল, অথচ আমাদের হাত খালি বলে শুটিং বন্ধ। শেষটায় যখন পয়সা এল তখন অক্টোবর মাস। শরৎকাল ঝলমলে দিনে বৃষ্টির আশায় অপু- দুর্গা যন্ত্রপাতি লোকজন নিয়ে রোজ গিয়ে গ্রামে বসে থাকতাম। আকাশে একটুকরো কালো মেঘ দেখলেই হাঁ করে সেদিকে চেয়ে থাকতাম, যদি সেটা জাদুবলে আকাশ ছেয়ে ফেলে বৃষ্টি নামিয়ে দেয়। শেষে একদিন তাই হল। শরৎকাল ঘনঘটা করে নামল তুমুল বৃষ্টি। তারই মধ্যে দুর্গা বৃষ্টিতে ভিজে দৌড়ে এসে কুলগাছতলায় ভাইয়ের পাশে এসে আশ্রয় নিল। ভাইবোন জড়াজড়ি করে বসে আছে। দুর্গা বিড়বিড় করছে, ‘ নেবুর পাতা করমচা, হে বৃষ্টি ধরে যা। ‘ শরৎকালের বৃষ্টিতে রীতিমতো ঠান্ডা, অপুর খালি গা, অ্যালক্যাথিনের ছাউনিতে ঢাকা ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে দেখছি সে ঠক ঠক করে কাঁপছে। শট্ এর পরে দুধের। সঙ্গে ব্র্যান্ডি খাইয়ে ভাই বোনের শরীর গরম করা হল। অবিশ্যি দৃশ্যটা যে ভালই হয়েছিল সেটা যারা ছবিটা দেখেছে তারাই জানে। …”

আর এভাবেই নির্মিত হয় বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল- পথের পাঁচালী!

এই পৃথিবীর বুকে সত্যজিৎ রায় নামের মানুষটি জন্মগ্রহণ না করলে উপমহাদেশে অনেক ফিল্মমেকারের জন্ম হতো না। শুধু উপমহাদেশ নয়, উপমহাদেশের বাইরেও মার্টিন স্কোরসেজি, আব্বাস কিয়রোস্তামি সহ আরোও অনেক বিখ্যাত নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের কাজ দেখে চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হন।

শেষ করার আগে বিশ্ববরেণ্য জাপানী চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়ার সেই বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি উদ্ধৃত করতেই হয়:

এই পৃথিবীতে বাস করে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র না দেখা চন্দ্র-সূর্য না দেখার মতোই অদ্ভূত ঘটনা।

মানুষটিকে এবং মানুষটির সৃষ্টিকে নিয়ে হাজার হাজার কথামালা তৈরী করা যায়। কিন্ত, একজন গুণমুগ্ধ হিসেবে শুধু এইটুকুই বলতে চাই –
” মহারাজা তোমারে সেলাম ”

*তথ্যসূত্রঃ “একেই বলে শুটিং” -সত্যজিৎ রায়।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top