গল্প-সল্প

“সায়াহ্ন” – বর্ষণ হাসান অয়নের ছোটগল্প

মাগরীবের আযান পড়া মাত্র প্রতিদিনকার মতো খেলা বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের পাড়ার মাঠে এটাই নিয়ম। খেলা যে অবস্থাতেই থাকুক, আযান দিলেই খেলা শেষ। সাত বলে আর পাঁচ রান লাগতো কিংবা আর মাত্র একটা উইকেট হলেই জিতে যায় এমন কোনো অজুহাত চলবেনা। আযান দেয়ার সাথে সাথে তাই যে মাঠের যেখানে থাকে সেখান থেকেই খেলা থামিয়ে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করে। কয়েকটা ছেলে কিছুটা দূরের পাড়া থেকে খেলতে আসে, ওদের তাড়াহুড়া সবচে বেশী। অবশ্য আমিও স্ট্যাম্পগুলো খুলে নিয়ে যত দ্রুত পাড়ি বাসায় চলে আসার চেষ্টা করি। মাঠের কাছে বাসা হওয়াতে অন্য কেউ আর স্ট্যাম্প আনতে চায় না। ব্যাট-বল অন্যরা নিয়ে আসলেও আমার স্ট্যাম্পেই তাই খেলা চলে প্রতিদিন।

বাসা কাছে বলে আমার দ্রুত না করলেও চলে, কিন্তু আমার ব্যস্ততা অন্য কারণে। প্রতিবেলার নামাজ মসজিদে পড়ার চেষ্টা করি আমি। বিশেষ করে মাগরীবের নামাজ। মসজিদটা মহল্লার একবারে শেষ মাথায় হওয়ায় যাওয়া আসার সময় রাস্তার সাথে লাগানো কিছু হিন্দু বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে হয়। আযানের পর পর বাড়িগুলোকে ঘিরে শাঁখের শব্দ আর ধূপের গন্ধে অন্য রকম একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এই ব্যাপারটা বড় ভালো লাগে আমার।

আমাদের মহল্লায় মুসলমান পরিবারের সংখ্যা হিন্দু পরিবারের তুলনায় অনেক বেশী হলেও দুই ধর্মের মানুষের মাঝে সুসম্পর্কের অভাব হয়নি কখনো। পেপার-পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলগুলোতে তাই ধর্মের দোহাই দিয়ে যেসব দাঙ্গা হাঙ্গামার খবর দেখি, সেগুলো কেমন বানোয়াট বানোয়াট লাগে। তবে হিন্দু মুসলমান পরিবারের মাঝে ঝগড়া-ঝাটি যে লাগেনা, তা নয়। কিন্তু সেখানে ধর্মের ব্যাপারটা সামনে আসেনা।

আশফাক চাচার সাথে ফিরোজ চাচার ঝগড়া যদি কার বাড়ির ছাদের কার্ণিশ বেপরোয়াভাবে অন্যের ছাদের সাথে লেগে গিয়েছে তাই নিয়ে হয়, তবে অনীল কাকার সাথে আশফাক চাচার ঝামেলা বাধে অনিল কাকার ছাগল আশফাক চাচার বাগানে ঢুকে আমগাছগুলোর পাতা খেয়ে সাফ করে দিয়েছে বলে। আবার রতন কাকার সাথে সুনীল কাকার গন্ডগোল যদি বাড়ি বানানোর সময় না বলে নিয়ে যাওয়া দু’বস্তা বালি নিয়ে বাধে, তবে ফিরোজ চাচার সাথে রতন কাকার বেধে যায় গত বছর ধার নেয়া ইট সময় মতো ফেরত না দেয়ায়। মোট কথা, আমাদের এই এলাকায় হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে রেষারেষির তালিকাটা অনেক লম্বা হলে হতেও পারে কিন্তু সেখানে ধর্মের অজুহাত খুজে পাওয়া যাবেনা।

দু’ধর্মের এই সুসম্পর্কের উদাহরণ হিসেবে আমাদের সাথে পরশ কাকাদের সম্পর্কের কথাই বলা যায়। যদিও সম্পর্ক এখন আর নেই। তবে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। অতীতের উদাহরণটা তাই এখনো ভালোভাবেই দেয়া চলে। ওনাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক যতটা ভালো ছিল মহল্লায় অন্য কোনো মুসলমান পরিবারের সাথেও এমনটা ছিলনা। প্রতি ঈদে যেমন কাকাদের জন্য আমাদের বাসায় গরুর মাংসের পাশাপাশি আলাদা করে রাজহাঁস কিংবা খাসির মাংস রান্না হতো, তেমনি পূজা পার্বণে পরশ কাকার বাসায় আমাদের সবার নিশ্চিত দাওয়াত থাকত। এমনিতে স্বর্নালি কাকিমার হাতে তৈরী অজস্র নাড়ু, হরেক রকম আচার আর ক্ষীর পায়েস খেয়েই আমরা দুই ভাই বড় হয়েছি, একইভাবে যেমন আম্মার বানানো হাজার রকম পদ ও বাড়িতে গেছে নিয়মিতই।

পরশ কাকার দুই মেয়ে। ঋতু আর পূজা। ঋতুদি আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক বড়, আর পূজাদি প্রায় সমবয়সী। ভাইয়ার সাথে কলেজে পড়ে। ছোট বেলা থেকেই একসাথে বড় হওয়ায় ওরা দুজনে বন্ধু ছিল খুব। যদিও তখন পুতুল খেলার সময় বর হিসেবে পূজাদির আমাকেই বেশী পছন্দ ছিল, ভাইয়া খুব কমই বর হতে পারতো, বেশীরভাগ সময় হতো দারোয়ান নাহলে কাজের ছেলে, কিন্তু এই বড় বেলায় এসে ওদের সম্পর্কটা যে আর শুধু বন্ধুত্বে আটকে নেই কিছুদিন ধরে তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। অন্তত আমি বুঝতে পারছিলাম। দু’ভাই যখন এক ঘরেই ঘুমাই, তাই মোবাইলে যতই ভাইয়া ফিসফিসিয়ে কথা বলুক, দু চারটা শব্দ আমার কানেও আসতো। আর তাতেই যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গিয়েছিল আমার।

অবশ্য বিষয়টা নিশ্চিত হই একদিন ভাইয়ার মোবাইলের ইনবক্স চেক করে। এমনিতে ভাইয়া ওর মোবাইল আমাকে ধরতেই দেয়না, এমনকি বাথরুমে গেলেও ওটা নিয়ে যায় সাথে করে। কিন্তু সেদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে দেখি ভাইয়া ওর সাত রাজার ধনটা রেখেই কোচিং করতে চলে গেছে। ব্যস আর যায় কোথায়! মোবাইলের সিকিউরিটি কোড ভাঙ্গতে বড়জোড় দু মিনিট লেগেছিল। তারপর প্রায় একঘন্টা ধরে ইনবক্সে জমিয়ে রাখা সাড়ে পাচশ ম্যাসেজ পড়ে যা জানলাম তাতে আমার ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। তক্ষুনি হয়তো ছুটে গিয়ে আম্মাকে সব বলে দেয়া উচিত ছিল, কেনো যে বলিনি তখন এ নিয়ে এখনো আফসোস আমার, কিন্তু কেনো যেনো বলতে ইচ্ছে করেনি। বরং পূজাদির সাথে ভাইয়া কে খুব ভালো মানাবে ভেবে কেমন যেনো হিংসা হচ্ছিল।

সেদিন ভাইয়া বাসায় ফেরার পর টের পেয়ে গিয়েছিল যে আমার আর কিছু জানতে বাকি নেই। ফোনটাকে যদিও আমি ঠিক আগের জায়গায় আগের মত করেই রেখে এসেছিলাম, কিন্তু তারপরেও ভাইয়া বুঝল কিভাবে সেটা এক রহস্য। তবে আমি যে আব্বু আম্মুর কাছে মুখ খুলবনা এটা ভাইয়া জানত। এরকম অলিখিত অনেক নিয়ম দুই ভাই সেই ছোট বেলা থেকেই মেনে আসছি। কখনো কারো বিশ্বাসভঙ্গের কারণ কেউ হইনি। আমার দিকে শুধু কটমট করে তাকিয়ে ছিল ভাইয়া। আমি জানতাম, ভাইয়া এখন ওভাবে তাকানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেনা। না কোনো বকাবকি, না কোনো মার-পিটন। কারণ আমি যা জানার জেনেই ফেলেছি, ওসব করলে বরং আম্মুর কানে যাবার সম্ভবনাই বাড়বে। ভাইয়ার বিষদৃষ্টিতে পাত্তা দেবার সময় অবশ্য আমার নেই, সমাজ পড়ছিলাম, ভাইয়া তাকিয়ে আছে টের পেয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে আরো জোরে জোরে পড়তে শুরু করে দিলাম।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য ভাইয়া আর পূজাদি ধরা পড়েছিল। আর সেটাও খুব বাজে ভাবে। গত সপ্তাহে ঋতুদির বিয়ের অনুষ্ঠান। লগ্ন ছিল সন্ধ্যার পরে পরেই। ওই সময় তাই বিয়ের মন্ডপকে ঘিরেই সবাই ব্যস্ত থাকবে ভেবে সুযোগটা নিয়েছিলো দু’জন। কিন্তু কি একটা কাজে তখন ঋতুদির এক পিসী ছাদে হাজির হয়। আর সেখানেই দুজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। উনি ভাইয়াকে চিনতেন আগে থেকেই। তারপর আর কি! বাড়ি ভর্তি লোকজনের সামনে সেই বোকা মহিলা যা নয় তাই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে শুরু করে দিলেন। সেসব শুনে লজ্জায় আমার নিজেরই মাথা কাটা যাচ্ছিল। আমার ভাইয়া গবে্ট জানতাম, কিন্তু এতো বড় গবেট সেটা আমার জানা ছিল না। এতো মানুষের পরোয়া না করে প্রেম করাটা এতোই কি জরুরি হয়ে পড়েছিল ওদের, আল্লাহ মালুম।

সেই মহিলার চিৎকার, পুজাদির অঝোরে কান্না, ভাইয়ার হেঁট করে রাখা মাথা, আব্বা-আম্মার হতবিহবল মুখ, এতোকিছু একবারে সহ্য না হওয়ায় ওখান থেকে বেরিয়ে বাসায় চলে আসি আমি। পরে ঠিক কি হয়েছিল, সেটা জানতে পারিনি। তবে ভাসা ভাসা যা শুনেছিলাম, পরশ কাকা নাকি সবার সামনে ঋতুদির শ্বশুরের পা জড়িয়ে ধরে বিয়ে ভাঙ্গা ঠেকিয়েছিলেন, তবে পণের পাচ লাখ টাকা দ্বিগুন করে দিতে হয়েছিল, সেই সাথে বাড়তি পাঁচ ভরি সোনা। কাকার মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে শুধুমাত্র ভাইয়ার জন্য এতোটা নীচে নামতে হয়েছে ভেবে ভাইয়াকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছা হচ্ছিল। নিজের ভাই বলেই হয়তো কাজটা করতে পারিনি। তবে ঋতুদির বিয়েটা না ভাংলেও আমাদের দুটো পরিবারের সম্পর্কটা ভেঙ্গে গিয়েছিল সেদিনই।

 

২.

অনেকক্ষন হলো ঝা ঝা রোদ মাথায় নিয়ে ছাদে বসে আছি। কারণ একজনই। পূজাদি।

সেদিনের সেই ঝামেলার পর থেকে পরশ কাকাদের কাউকে আর তেমন বাড়ির বাইরে দেখা যায়না। শুধু পরশ কাকাকে মাঝে মাঝে বিকেল বেলা দেখি অফিস থেকে ফিরতে। এই ক’দিনে মানুষটার চেহারা ভেঙ্গে গেছে একবারে। চোখ গুলো গর্তে ঢুকে গেছে। ফর্সা মুখে চোখের নীচের কালিগু্লোকে কেমন বিশ্রী দাগের মতো দেখায়। আগে আমাকে দেখলেই হাসিমুখে কাছে ডাকতেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, কিন্তু এখন হঠাৎ করেও যদি কোথাও দেখা হয় তবে মুখ ঘুরিয়ে রাখেন, আমাকে না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যান। শুনেছি, এলাকার অন্যান্য হিন্দু পরিবার গুলো পরশ কাকাদের জাত গেছে বলে ওনাদের সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দিয়েছে। এই জাত জিনিসটা কি, আর এটা কিভাবেই বা চলে যায় সে ব্যাপারে আমার পরিষ্কার ধারনা নেই। তবে জাত যাওয়ার কারণে পরশ কাকাদের একঘরে করে রাখলেও, আমাদের সাথে মিশতে অন্যান্য হিন্দু পরিবার গুলোর যে সমস্যা নেই সেটা গত ক’দিনেই বুঝে গিয়েছি।

দর দর করে ঘাম ঝরে যাচ্ছে, অথচ পূজাদির দেখা নেই। প্রতিদিন দুপুরে এই সময়টায় পূজাদি গোসল সেরে ছাদে কাপড় শুকাতে আসে। দুটো ছাদের মাঝে মাত্র একটা বাড়ি পার্থক্য হওয়ায় আমাদের ছাদ থেকে পূজা দিদিদের বাড়ির ছাদটা মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যায়। আমি তাই পূজাদিকে দেখার জন্য এই সময়টায় ছাদে চলে আসি প্রতিদিন। ঝামেলা বাধার অনেক আগে থেকেই কাজটা করি আমি। কেনো করি, এর কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। জানিনা এতে করে আমার জাত চলে যায় কিনা, কিন্তু যতদিন ভালো লাগবে পূজাদিকে এভাবে দেখার সুযোগটা আমি হারাবোনা কিছুতেই।

মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে পূজাদির মায়া মায়া মুখটা দুহাতে চেপে ধরে একেবারে চোখের সামনে নিয়ে এসে দেখি। অনেকক্ষন ধরে, যতক্ষন মন না ভরে। ভাইয়া এভাবে দেখেছে নিশ্চই। ওর ডায়েরী পড়লে নিশ্চিত হওয়া যেতো হয়তো। কিন্তু আমার গবেট ভাই, ডায়েরী লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে ভীষণ চালু। প্রতিদিনই দেখি টুক টুক করে কি যেনো লিখে রাখে ডায়রীতে, কিন্তু পরে যখন বাসায় থাকেনা কিংবা থাকলেও ঘুমিয়ে থাকে, তখন হাজার খুজেও কোথাও পাইনি জিনিসটা।

ছাদ থেকে চলে যাবো এমনটা যখন ঠিক করে ফেলেছি, তখন পূজাদিকে ওদের ছাদে দেখতে পেলাম। হলুদ সবুজ মেশান একটা জামা পরে আছে, ভেজা চুলগুলো গামছা দিয়ে পেচানো। দূর থেকেও আমার কেনো যেনো মনে হলো, পূজাদির চোখ দুটো লাল। যেনো কেদেছে অনেক্ষণ। দিদিকে যতই দেখছি, আর আমার ভেতরটা যেনো ততই দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এমনই হয় প্রতিবার। সত্যি বলতে, এই যন্ত্রণা পাবার লোভই আমাকে প্রতিদিন ছাদে টেনে নিয়ে আসে।

অবশ্য পূজাদি আমার যন্ত্রণাটাকে বেশীক্ষণ স্থায়ী হতে দিলনা। হাতে করে আনা কাপড়গুলোকে দ্রুত নেড়ে দিয়ে সিড়িঘরের লোহার দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেলো। যাবার আগে আমার দিকে অবশ্য তাকিয়েছিলো একবার, যেনো বুঝিয়ে দিয়ে গেল আমি যে দেখছি সেটা সে ঠিকই টের পেয়েছে, প্রতিদিনই পায় । এতে অবশ্য আমি খুব একটা অবাক হইনা। শুনেছি, অন্ধকারেও নাকি মেয়েরা ছেলেদের দৃষ্টি পড়তে পা্রে, আর সেখানে একটা ছেলে এভাবে হা করে তাকিয়ে আছে সেটা বুঝতে না পারার কোনোই কারণ নেই।

পূজাদি চলে যাবার পর ছাদে বসে বসে রোদ পোহানোর কোনো মানে হয়না। তাই আমিও নীচে চলে আসলাম। সিড়ি ভাংতে ভাংতে আমার একটা কথাই মনে হচ্ছিল কেবল, পূজাদি যদি চাপ সহ্য করতে না পেরে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলত, ভাইয়াকে আমি নিশ্চিত খুন করে ফেলতাম।

 

৩.

কলিংবেল বাজতেই দরজা খুলে দিয়ে আসলাম। আব্বা এসেছে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলে ডাইনিং সবার আগে পড়ে। আজকে আমি বই খাতা নিয়ে ডাইনিংয়ে পার হয়ে এসেছি। বাড়ির সামনের দিকটা রঙ করা হচ্ছে, রংমিস্ত্রীরা আমার পড়ার টেবিল নিয়ে গেছে। রঙ আর চুন-সুড়কি লেগে সেটা এখন বলতে গেলে ব্যবহারের অযোগ্য। তাই বাধ্য হয়েই আমার এই স্থানান্তর।

আব্বার ঘরে ঢুকে আমার পাশের একটা টেনে নিয়ে বসে পড়ল। সাথে সাথে মোজার তীব্র কটু গন্ধ এসে লাগল নাকে। আম্মা রান্নাঘরে করছিল কী যেনো, আব্বার উপস্থিতি টের পেয়ে বেরিয়ে আসল,
“আজকে এতো দেরি করলে যে?”
“আর বলোনা, তোমার গু্ণধর ছেলের জন্যতো এলাকায় টেকাই দায়”, আব্বার কন্ঠে তীব্র ঝাঁজ।

খুব ভুল নয় কথাটা। পরশ কাকাদের মতো আমাদের একঘরে হয়ে যেতে হয়নি ঠিক, কিন্তু প্রতিদিন নিত্য নতুন বিব্রতকর পরিস্থিতি সামলে চলতে হচ্ছে। আসলে আমাদের মহল্লার সাদামাটা জীবনে মুসলমান ছেলে আর হিন্দু মেয়ের প্রেমের মতো মুখোরোচক কিছু রোজ রোজ তো আর জোটে না। হাজারটা গুজব ছড়াতে তাই সময় লাগেনি। মুদির দোকান থেকে খাবার টেবিল, এমনকি আমার ক্লাস থেকে খেলার মাঠ, গুজব চলছেই অবিরাম। ভাইয়া তো আজকাল ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, আব্বা-আম্মা আর আমাকেই তাই এসব সহ্য করে চলতে হয়। আমি অবশ্য খুব একটা বিচলিত হইনা এসবে। একসময় সবার আগ্রহেই ভাটা পড়ে যাবে। ধীরে ধীরে ভুলে যাবে সবাই। অনেক পরে এরকম কোনো ঘটনা আবার ঘটবে হয়তো, তখন সেটার গুজব ছড়াতে দিয়ে লোকে ভাইয়ার উদাহরণ টেনে আনবে। তাছড়া কবরচাপা পড়ে থাকবে ব্যাবপারটা। তবে মাঝে মাঝে কিছু কিছু ঘটনা একেবারেই সহ্য হয়না। যেমন সেদিন বিকেলের দিকে আম্মার আনতে দেওয়া মসলাপাতি কিনে ফিরছি, এমন সময় মোড়ের এক চাইয়ের দোকানে দেখি মুরব্বি টাইপ এক লোক বেশ আসর জমিয়ে বসেছেন,

“রায়হানের বড় ছেলেটা যা করছে সেটা নির্ঘাত কুফরী। কী যে দিনকাল আসছে! অবশ্য ছেলেটারও আর কী দোষ, অল্প বয়স, বুঝে নাই। ভুল করে ফেলছে। যত নষ্টামির গোড়ায় তো চাঁড়ালের মেয়েটা। নিজেদের তো ধর্মের বালাই নাই, একটা মুসলমান ছেলের ধর্ম ক্যামনে ডুবানো যায়, সেই ব্যবস্থা করছে। চাঁড়ালের জাত তো! মুখে যতই মিষ্টি কথা বলুক, জাতটাই খারাপ……..”
ওখানে দাঁড়ানোর রুচি আর হয়নি আমার। সোজা বাসায় চলে এসেছি।

এদিকে আব্বা গলা চড়িয়েই যাচ্ছেন,
“……… তোমার ছেলেকে বলো, মসজিদে গিয়ে হুজুরের কাছে তওবা করে আবার কলেমা পড়তে। নইলে আমাদের বাড়ির কাউকে ওই মসজিদে ঢুকতে দেবেনা……”

মোজার গন্ধটা এড়াবার চেষ্টা করতে গিয়ে আব্বার কথা গুলো কানে ঢুকছিলনা ঠিকমতো । আম্মাকে ইশারা করে আমার অবস্থা বোঝাতে চাইলাম, কিন্তু আম্মা দেখি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। কী আর করা! বই খাতা নিয়ে আমাকে তাই উঠে পড়তেই হলো। কথার মাঝে বাধা পেয়ে আব্বা বিরক্ত হলেন মনে হয়, সে হলে হোক, মোজার গন্ধ সহ্য করে বসে থাকার কোনো মানে হয়না।

 

৪.

ভাইয়া আজকে হঠাত করে ছাদে ডেকে এনেছে।

বিকেল প্রায় শেষ। একটু পরেই আযান দিবে। গত রাতে বৃষ্টি হওয়ায় মাঠে পানি জমে গেছে। ক্রিকেট খেলা তাই আপাতত বন্ধ। বিছানায় শুয়ে শুয়ে হুমায়ুন আহমেদের একটা বই পড়ছিলাম, এমন সময় ভাইয়া এসে বলল, “চল ছাদে যাই”।

কথাটা শোনার পর সত্যি সত্যি ভাইয়ার দিকে কিছুক্ষণ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ছিলাম। আব্বার বকাবকিতে ভাইয়া আবার কলেজে যাওয়া শুরু করেছে যদিও, কিন্তু ঐ কলেজের সময়টুকু ছাড়া ঘরের বাইরে বের হয়না বললেই চলে। এর আগে আমি নিজে কয়েকদিন ভাইয়াকে ছাদে যাবার প্রস্তাব দিয়ে ঝাড়ি খেয়েছি। তাই ভাইয়ার কথাটা আমার কাছে রীতিমতো বিস্ময়। ভাইয়া আবার মত পালটে ফেলতে পারে ভেবে রাজি হয়ে গেছি তাড়াতাড়ি।

ছাদে আসার পর প্রায় মিনিট পনেরো পেরিয়ে গেলেও, একটা কথাও বলেনি ভাইয়া। ডুবতে বসা সূর্যের আভা পড়ে মেঘের গায়ে তৈরী হওয়া নকশা গুলো দেখে যাচ্ছে গভীর মনোযোগে।

– “পরশ কাকারা খুলনা চলে যাচ্ছে, শুনেছো নাকি?”, আমি নিরবতা ভাঙ্গলাম।
– “হুম, আম্মা বলল”, আকাশের দিকে তাকিয়েই জবাব দিল ভাইয়া।
– “তোমার খারাপ লাগবেনা?”
– “তোর খারাপ লাগবেনা? পূজাকে তো আর দেখতে পাবিনা।“
কী সর্বনাশ! ভাইয়া জানে তাহলে! পূজাদি নিশ্চয়ই ভাইয়াকে বলে দিয়েছিল। লজ্জায় ইচ্ছে করল মাটির সাথে মিশে যাই।

– “পূজাদির নাকি বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে শুনলাম। ছেলে নাকি খুলনাতেই থাকে”, লজ্জা কাটানোর জন্য কোনোরকমে বললাম আমি।
– “হতে পারে”, কন্ঠে একরাশ নির্লিপ্ততা ঢেলে জবাব দিল ভাইয়া।
– “পূজাদির বিয়ের পর বাচ্চা হলে সেটা তোমার বাচ্চা হবে তাইনা ভাইয়া?”, হঠাত করে মুখ ফসকে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেল। নিজেরে বোকামী তে ইচ্ছে হলো নিজেকেই চড় লাগাই। ভাইয়া নিশ্চয়ই এখন চরম রাগ করবে।

কিন্তু যেমনটা ভেবেছিলাম, তেমন কিছুই করলনা ভাইয়া। শুধু আকাশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– “আমার ডায়েরী তুই পড়েছিস তাইনা?”
– “হুম, তোমার টেবিলের ড্রয়ারটার তলায় আরো যে একটা ছোট্ট ড্রয়ার আছে গতকাল মাত্র সেটা খুঁজে পেয়েছি।
– “ভালো”।

আর কিছু বললনা ভাইয়া। চুপ করে আকাশ দেখতে লাগল।

মাগরীবের আযান পড়তে শুরু করেছে। মসজিদে যাবার তাগিদ অনুভব করলাম। গত রবিবার তওবা করতে আসার পর থেকে ভাইয়াও দিনে তিন চার ওয়াক্ত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আসে। এভাবে কতদিন চলবে জানিনা। তবে ভাইয়ার সাথে মসজিদে যেতে আমার ভালোই লাগে

– “ভাইয়া?”
– “হু”
– “চলো নামায পড়ে আসি”
– “হুম, চল”

বাসা থেকে টুপি মাথায় দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম দুই ভাই। পরশ কাকাদের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। কাকারা চলে যাবেন কদিন পরেই। তখন আর পূজাদির শাঁখের আওয়াজ শোনা হবেনা। ভাবতে গিয়ে কেনো যেনো মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তবে আজকে শুনতে পাবো নিশ্চয়ই। এইতো ধুপের গন্ধ পাচ্ছি। শাঁখের আওয়াজও হয়তো শোনা যাবে এক্ষুণি। শব্দটা শোনার অপেক্ষা করতে করতে আমি এগিয়ে যেতে থাকি।

Most Popular

To Top