নাগরিক কথা

চিকা (কিংবা ডাইনোসর) মারা!

চিকা মারা নিয়ন আলোয় neon aloy

চিকা হলো ইঁদুরের খালাতো ভাই, বদ ও নোংরা একটা প্রানী। এর কোন উপকার আমার জানা নেই, তবে অপকার যে করে সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু ‘চিকা মারি’ বা ‘চিকা মারতে যাই’ যে কাউকে বললে বুঝে যাবে কি বলতে চাচ্ছেন। তবে এটার সাথে কোন মারামারি জড়িত নাই, এর একটা শুদ্ধ বাংলা নামও আছে ‘দেয়াল লিখন’।

১৯৬৯ এর উত্তপ্ত ঢাকা শহরের দেয়ালে-দেয়ালে বাংগালীর দাবী সম্বলিত কথা, স্লোগান, দাবী জানানো হইতো। কমখরচে জনগনের কাছে রাজনৈতিক মেসেজ পৌঁছানোই মূল উদ্দেশ্য ছিল। এর আবেদনও থাকতো লম্বা সময়ব্যাপী। এখন দেখা যাক, নিরীহ দেয়াল লিখন কালের বিবর্তনে কিভাবে চিকা মারা হয়ে গেল?

দেয়াল লিখন সাধারনত রাতের বেলায় হতো, দিনে করলে পুলিশের ধাওয়া ও গ্রেফতার নিশ্চিত। তাই রাতের বেলাই এই কাজ করার উপযুক্ত সময় ছিলো। কয়েকজন বন্ধুবান্ধব-সহকর্মী মিলেই এই কাজটা করতে যেতো। পাড়া-বেপাড়ায় কাজ করতে হতো, আত্মরক্ষার্থে গজারী অথবা সাইজ মত বাঁশ থাকতো। আর লাঠি হাতে পুলিশের সামনে পড়ে গেলে জেরার মুখে বলতো বলত ‘চিকা মারতাছি’। সেই থেকে চালু এই কথা। চিকা মারা মানেই তাই দেয়ালে লেখা।

দেশ স্বাধীন হয়েছে, আগের সাদা-কালো চিকা এখন রঙিন হয়েছে। ভারত থেকে অনেক কিছু পেয়েছি আমরা, তার সাথে চিকা মারার অন্য মাত্রাও আমদানি করতে ভুল করিনি- বিজ্ঞাপন! ৭৯-৮০ সালে ভারতে প্রথম যখন যাই তখন চোখে পড়ে দেয়ালে দেয়ালে সাবান, টুথপেস্ট, জুতা, সেন্ডেল কি নাই? সব কিছুর বিজ্ঞাপন!

প্রথমে ভালই লেগেছিল যে লোকগুলির মাথায় কত বুদ্ধি! বিনা পয়সায় বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে। পরে টের পেলাম এটার মধ্যেও পয়সা হাতবদল হয়! ধীরে ধীরে এটা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পরলো! সুনামগঞ্জ থেকে কুয়াকাটা যেখানেই গিয়েছি, দেখেছি প্রত্যন্ত গ্রামেও দেয়ালগুলো দখল হয়ে গেছে বিজ্ঞাপনের পর বিজ্ঞাপনে।

ঢাকা শহরের পরিচিতি ছিল এককালে মসজিদের শহর বলে। পরে তা পরিচিত হলো দেয়ালের শহর হিসাবে। যেদিকেই তাকাও শুধু সীমানা চিহ্নিতকরন আর দেওয়াল, কোন রিলিফ নাই।

আমি আর্কিটেকচারের ছাত্র না, এর এবিসিডি-ও জানিনা। তবে এই সীমাহীন সীমানা আমায় পীড়া দেয়। এই দেয়ালও আবার খালি নাই, সবগুলোতে চিকা মারা! কোন বাড়িওয়ালা হয়ত তার দেওয়ালে সাদা রং করছেন, রাতে তার মধ্যে কেউ এসে লাল চিকা মেরে রেখে গেলো। আবার কেউ কেউ আগের মারা চিকা নিজেরাই চুনকাম করে মুছে দেয়, যেন তাতে মাল্টিকালার নতুন প্রজেক্ট করা যায়। বিরক্ত বাড়িওয়ালা হাল ছেড়ে দেয়। সুন্দর একটা বাড়ির দেওয়ালে মরা চিকা, যেন সুন্দর একটা মুখের উপর লোমওয়ালা মেছতা!

রাজধানীর জেল্লা অনেক বেড়েছে, দৃষ্টিনন্দন অনেক ইমারত ঢাকা শহরের রাজপথে, অলিতে-গলিতে! এই কোটি টাকার শিল্পের উপরও চিকা মারা হচ্ছে। এই চিকা আবার একটু উন্নত ধরনের, কখনো কখনো উত্তেজকও! এই চিকার নাম বিলবোর্ড ও সাইনবোর্ড!

চিকা মারা নিয়ন আলোয় neon aloy

বাড়ির দেওয়ালে চিকা মারা যদি সুন্দর মুখে মেছতার মত কুৎসিত হয়, তবে এই সাইনবোর্ডগুলোকে কি টিউমার বলা যায় না?

হ্যা, ইমারতের ভিতরে দোকান আছে, ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান আছে; তাদের পরিচিতি দরকার, তাদের বিজ্ঞাপন দরকার। কিন্তু সেটাতো ভিতরের দিকেও করা যায়! মিরপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরার রোডগুলির সুদৃশ্য বিল্ডিংগুলি, প্রতিটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের একটি করে সাইনবোর্ড বিল্ডিংটার বাইরে ঝুলছে! হলুদ-লাল বিভিন্ন রং এর ‘মুল্য হ্রাস’, ‘ভর্তি চলছে’ ঝুলছে, কে, কি বলতে চাচ্ছে সেটা বোঝাই মুশকিল।

এর বদলে প্রতিটি প্লাজা বা বিল্ডিং এর বাইরে একটা সাইনবোর্ড থাকতে পারে। সেখানে সেই প্লাজার প্রতিটি দোকানের একই সাইজের সাইনবোর্ড থাকতে পারে, বিল্ডিং এর ভিতরে ডিসপ্লে বোর্ডে দোকানের অবস্থানের ম্যাপ সহ আকর্ষনীয় প্রদর্শনী থাকতে পারে। এছাড়া নিজ নিজের দোকান ঘরের উপরেতো নাম থাকছেই।

বাইরে কাপড় ঝুলিয়ে দৃষ্টি থেকে সুন্দর একটা ভবনকে চিকা মেরেঅদৃশ্য করে দিতে হবে কেন? এগুলোর সাইজ এত বেড়েছে যে এগুলোকে এখন আর চিকা মারা বলা যাবে না, বরং ডাইনোসর মারা বললে হয়তো এগুলোর আকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে!

Most Popular

To Top