গল্প-সল্প

ছোটগল্পঃ অনূভুতির দেয়াল

অনুভূতির দেয়াল নিয়ন আলোয় neon aloy

আমার বয়স তখন ষোল আর ওর সাতাশ। সে তখন এমবিএ শেষ করে ফেলেছে আর আমি দেবো এসএসসি। হঠাৎ করে বাবা মারা যাওয়ায় মা দিশাহারা হয়ে পড়েছিলো। আমি ছিলাম সবার বড়। আমার ছোট একটা বোন আর একটা ভাই আছে। বাবা একটা ছোট ব্যবসা করতেন, তেমন কিছুই রেখে যেতে পারেন নি। এই সময় আমার মামা তারিফের সঙ্গে আমার বিয়ের প্রস্তাব আনে। কথা হোলো, আম্মুর একটু বোঝা কমুক আমাকে বিদায় দিয়ে। যেদিন আমাকে দেখতে এলো, সেদিন আমি তো কেঁদেকেটে অস্থির। আমি এখনো আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই। আম্মুর গায়ে পা তুলে দেই। আম্মুকে একদিন না দেখলে থাকতে পারিনা। এই অল্প বয়সে আমি কিভাবে অন্যের ঘরে যাব। ওরা আসার পর তারিফ কেবল একটু করে আমায় দেখেছিলো। এরপর বিয়ে ঠিকঠাক।

বিয়ের রাতে প্রচন্ড ভয়ে ছিলাম। আমার চেয়ে প্রায় এগারো বছরের বড় সে। কখনো কি বোঝাপড়া হবে এর সাথে!! রুমে এসে সে কেবল বললো, তন্বী তুমি ঘুমাও, চিন্তা কোরো না কিচ্ছু নিয়ে। তোমার মায়ের কাছ থেকে কাল তোমার স্কুল ড্রেস আর বই নিয়ে আসব স্কুলে যাবা ঠিকঠাক পড়বা…রেসাল্ট কিন্তু ভালো করা চাই। এই বলে সে ওর আর আমার মাঝে একটা কোলবালিশ রেখে অন্যপাশ ফিরে ঘুমোতে গেলো।এই বাড়িতে কাজের চাপ তেমন একটা নেই। তারিফের বোন শাহানা পড়ে ক্লাস এইট এ। ওর সাথে আমার সময় কেটে যায়। যে যার হালে থাকে। তারিফের কাজ থেকে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়। এরপর সে আমাকে পড়ায়। পড়া না পারলে হাতে বেতের বারিও পড়ে। তবুও আজকাল ওকে আমার ভালো লাগে। হুদাই ভালো লাগে। এসএসসি পরিক্ষা শুরু হল। আমি ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম! ভালোই দিলাম সব পরীক্ষা…রেসাল্ট বের হলো। শাহানা জেএসসি তে জিপিএ-৫ আর আমিও। আমার বাসা আর ওদের বাড়ির সবাই খুশি। অতঃপর আমি কলেজে ভর্তি হলাম। সিটি কলেজে। ও দিয়ে আসতো আর ওর বাবা নিয়ে আসতো। আমার উপর সে সবসময় পড়ালেখা নিয়ে চাপ
দিতো।

আমার আর ওর মধ্যে ভালোবাসা ধীরে ধীরে জন্মালেও ওর সাথে নিজেকে মেলাতে পারিনি। হয়ত সেও পারেনি। আমার চাহিদা বেশি ছিলো। রোমান্টিসিজম ওর মধ্যে খুব কম ছিল। সে কাজ আর আমার পড়ালেখা নিয়েই বেশি বিজি থাকে। আমি চাইতাম ওর সাথে ঘুরে বেড়াতে, আমি চাইতাম ও একটা দিন
অন্তত আমার সাথে গল্প করুক। আমি চাইতাম ও আমাকে প্রতি পদে পদে বুঝিয়ে দিক ও আমাকে কতটা ভালোবাসে। কানে কানে এসে বলুক ভালোবাসি, একদিন শাড়ির আঁচল টেনে ধরে ওর বুকে জড়িয়ে ফেলুক আমাকে, বুকে জমা আগুন নেভাক ওর উষ্ণ স্পর্শে!

কিন্তু না! ওর অনেক ইচ্ছা আমাকে ডাক্তার হতেই হবে। প্রতিষ্ঠিত হতে হবে যেকোনো ভাবে। পরিবারের অনেক চাপ বিয়ের দুই বছর পার হচ্ছে কিন্তু আমরা ক্যানো বাচ্চা নিচ্ছি না। এত কিছুর পর আমি চাইছিলাম আমার একটা বাচ্চা হোক। আমি চাইলাম ওদের কথা মানতে। কিন্তু না, সে কেবল এটাই বললো, “যেখানে আমি আমার বোন কে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, সেখানে তুমি ক্যানো না? তোমার ও তো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অধিকার আছে!” বাচ্চা-কাচ্চা পরে! আগে লেখাপড়া… ও ওর জায়গায় ঠিকই ছিলো। ইন্টারমিডিয়েট দিলাম। মোটামুটি সাইন্সের সব সাব্জেক্ট এ ভালোই। এডমিশন টেস্টের জন্য ভর্তি হলাম। সাথে চললো ielts এর ক্লাস! এত সব কিছুর মধ্যে আমার আর ওর মধ্যে ক্যানো যেন দূরত্ব চলে আসলো। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা থেকে অনেক দূর হয়ে যাচ্ছিলাম। হাঁপিয়ে উঠছিলাম। সে আমার জন্য একাই যুদ্ধ করলো এতগুলো দিন কিন্তু আমি ক্যানো যেন ওকে আর আমার করে চাইতে পারিনা।

আমি থাকি চট্টগ্রামে। কিন্তু টিকলাম সিলেট মেডিকেল কলেজে। আরেক বিপত্তি। সে চিন্তাভাবনা ছাড়াই বলে বসলো “সিলেটেই পড়বা, হোস্টেলে থাকবা, মাঝেমধ্যে আমি গিয়ে দেখে আসব”। আমাকে কেউ কিচ্ছু বলার সূযোগ দিলোনা। তারিফ কে ছেড়ে আসতে চাইনি আমি। যাই হোক, ভালোবাসি তো!

কিন্তু জোরাজুরিতে চলে এলাম সিলেট। হোস্টেলে থাকি। এসে প্রথম ক্লাসটা করলাম। প্রথমদিনেই আমার বন্ধুত্ব হয় এক ছেলের সাথে। রাহাত… আমারই ব্যাচমেট! আমরা এক সাথে ক্লাস করতাম। গাছের তলায় বসে গল্প করতাম। আমার বিয়ের কথা সে জানতো। আমার কথা বুঝতে চাইত। মন খারাপ হলে হাসাতো। একসাথে ক্যাম্পাসে বসে আমরা ঝালমুড়ি খেতাম। চট্টগ্রামের গল্প শুনতো ও। রাতে ফোনে কথা বলতাম। মাঝেমধ্যে বেড়াতে নিয়ে যেত। আর এদিকে তারিফ ফোন করলে আমার বিরক্ত লাগতো। কথা বলতে চাইতাম না। দেখা করতে এলে সে আমার হাত ধরলে চাইলেও ধরতে দিতাম না। বিরক্তি লাগতো। অথচ ওর সাথে কাটিয়েছি ৭৩০টি রজনী এক মশারির তলায়। আজ ওকে আমার সহ্য হয় না। ও আমাকে আমার মত করে ভালোবাসতে পারেনি। আমার ভালো লাগে রাহাতকে। কেন যেন মনে হয়, আমার জীবনে রাহাত কে লাগবে তারিফ কে নয়।

একটা কঠিন মানসিক দোটানায় পড়লাম আমি। তারিফ আমার পরিবারের অসহায় অবস্থায় পাশে দাঁড়িয়েছে, আমার আজকের অবস্থানে আসার পেছনেও সব কৃতিত্ব তার আর সবচেয়ে বড় কথা সে আমার স্বামী, এদেশে চাইলেই স্বামীকে ছাড়া যায় না, আমার মতো মেয়ের জন্য সেটা আরো কঠিন। দিনগুলো ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছিল, এতো মানসিক অশান্তি শঙ্কা আর দ্বিধা নিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। একটা অপরাধবোধও আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, আমি বিবাহিত হয়েও আরেকটা ছেলের সাথে অবাধে মিশছিলাম, ঘনিষ্ঠ হচ্ছিলাম দিনে দিনে এমনকি রাহাত একদিন আচমকাই আমার গালে চুমু খেয়েছিল, কোমর স্পর্শ করেছিলো শক্ত হাতে, আমি চমকে উঠেছিলাম কিন্তু বাঁধা দেই নি, আমার ভালো লেগেছিল কোন পুরুষের প্রেমপূর্ণ ছোঁয়া। তবে হোস্টেলে ফিরে রুমে ঢুকতেই আমার চোখে ভীষণ কান্না এসে ভর করে, নিজেকে পাপী আর প্রতারক মনে হতে লাগলো। অবস্থাটা আসলে বোঝানো কঠিন, আমি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। কিন্তু হঠাৎ এমন কিছু ঘটে যাবে আমি কখনো ভাবি নাই। তারিফ কে বলে দিতে চাই সব কিছুই। যে আমার আর ওর সাথে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না। কিন্তু বলতে পারি না… কিন্তু না বলে আর কতদিন। আমার ওকে বলে দেয়া উচিত!!

ওকে হোস্টেলে ডাকলাম। সাথে ছিলো একটা ইয়া বড় বক্স। সে কি যেন একটা বলতে চাইছিলো। অনেক হাসিখুশি ছিলো। আমি বলতে না দিয়ে ওকে বলে বসলাম রাহাত আর আমার কথা। হুরমুর করে বলে ফেললাম সব! অনেক্ষণ ধরে কেউ কথা বলিনি।

ওর চোখের কোণায় এক বিন্দু জল আবিষ্কার করলাম।

কিন্তু তাতে আমার কিছু আসে যায় না। সে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে উঠলো, “হ্যাপী ম্যারিজ এনিভার্সারি তন্বী,” রাহাত কে ডাকো তো।

রাহাত এলো…

ডাকার পর কেবল একটা কথাই বললো “তন্বীর যেন কখনো কিছুর অভাব না হয়, সমস্যা না হয়, কখনো যেন ওর চোখে পানি না আসে। যদি কখনো দেখি আমার তন্বী বিন্দুমাত্র কষ্টে আছে সেদিন আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না”। আমি বিরক্তি নিয়ে ওকে চলে যেতে বললাম। যাওয়ার আগে সে বললো “তোমার বাড়ি আর আমার বাড়ির সবাইকে আমি ম্যানেজ করে নেব, তুমি একটু ও চিন্তা করবে না তন্বী, আসি” ওকে বিদায় দিয়ে বক্স টা নিয়ে রুমে আসলাম। খুললাম! দুইটা ডায়েরি আর প্রায় ৫৬টা চিঠি।

একটা ছোট্ট বাচ্চার পুতুল….
-প্রথম চিঠি টা
পড়তে শুরু করলাম!

“আমার পিচ্চি বউ, ঘুমিয়ে আছ এখন তুমি। নিষ্পাপ একটা বাচ্চার মত গদগদ হয়ে ঘুমাচ্ছ তুমি। রুমের হালকা সবুজ বাতি তে তোমার ঘুমন্ত মুখ টা আরো বেশি মায়াবী লাগছে। ক্যানো জানিনা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমাকে ছুঁতে চাইনা আমি। আমি চাইনা তুমি পুরোনো হও। আমি চাই তুমি এমনি থাকো।”

আরেকটি চিঠি-
“তন্বী, জানি আমি তোমাকে সময় দেই না। জানি তোমার অনেক ইচ্ছা-আকাংখা। জানি তুমি আমি থাকার পর ও একা। জানি তুমি ভালো নেই। কিন্তু আমি যদি তোমাকে আমার সবটা দিয়ে দি, তাহলে তোমার মাকে দেয়া আমার ওয়াদা পূরণ হবে না। তিনি চান তুমি মানুষের মত মানুষ হও! তিনি অনুতপ্ত তোমাকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে! আমি এইজন্য চাই তুমি অনেক বড় হও। চাইনা আমাদের এ বৈবাহিক সম্পর্ক টা তোমার জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াক।”

ডায়েরীর কিছু লাইন-
“তন্বী, তোমার নাকে একটা দুল থাকলে তোমাকে খুব মানাতো। তন্বী, অনেক ইচ্ছা করে কেউ আমাকে বাবা ডাকুক। তোমাকে মা…. আমাদের একটা ছোট্ট বাবু হোক! কিন্তু তন্বী তোমার ভবিষ্যৎটা যে এখানেই থেমে যাবে তা হলে।

তন্বী! বৃষ্টি হচ্ছে, ইচ্ছে করছে তোমার হাত ধরে ভিজি। কিন্তু তুমি তো এখনো ঘুম থেকেই ওঠোনি।

একের পর এক পাতা পড়তে লাগলাম। তারিফ যে আমাকে কতটা ভালোবাসে, কতটা চেয়েছে এটা আমি কখনোই বুঝিনি। নিজের অজান্তে আমার চোখ বেয়ে ঝড়তে লাগলো অশ্রু……

সময় এখনো আছে।

আমি তখনি সব ঠিকঠাক করে নিয়ে হোস্টেল থেকে বের হলাম। বেশি দেরি হয়ে যায়নি। ট্রেন ছাড়বে ৪টায়। স্টেশনে পৌছে দেখলাম তারিফ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। দৌড়ে ওর কাছে গেলাম। কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে বললো “এই নিন আপনার টিকিট, আরেকটু দেরি করলেই ট্রেন ছেড়ে দিত যে ম্যাডাম!”

জানালার পাশে বসেছি ওর কাঁধে মাথা রেখে। খুব শক্ত করে ও আমার হাত ধরে রেখেছে। একটা হেডফোন দুইজনে শেয়ার করে শুনছি-
“বাড়িয়ে দাও তোমার হাত… আমি আবার তোমার আঙ্গুল ধরতে চাই”

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top