নাগরিক কথা

শিক্ষাব্যাবস্থাঃ আমাদের চিন্তাশক্তি ও দক্ষতার স্বরূপ বিশ্লেষণ (১ম পর্ব)

শিক্ষাব্যবস্থা চিন্তাশক্তি দক্ষতা নিয়ন আলোয় neon aloy

কয়েকদিন আগে শিক্ষা ক্যাডারের এক ভাইয়ের (জয়দ্বীপ দে শাপলু) কল্যাণে জানলাম যে বাংলাদেশ কলা ও মানবিক শাখায় গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে বিশ্বে ৪র্থ স্থান অর্জন করেছে! এই খবরটি হতে পারত অত্যন্ত আনন্দের খবর। কিন্তু উল্টো এরকম একটি সংবাদ শুনে আমি যারপরনাই আতঙ্কিত বোধ করলাম! আপাত একটা ভাল খবরের আড়ালে আসলে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর বাস্তবতা।

পরিকল্পনাহীনতা

বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে কোন পরিকল্পনা ছাড়া হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স তৈরি করা হয়। এই বিপুল উচ্চশিক্ষিত জনতাকে কি কাজে লাগানো হবে? কি হবে তাদের কর্মক্ষেত্র? তাদের অর্জিত ডিগ্রি অনুযায়ী কাজ তারা পাবে কিনা? এসব বিষয়ে কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়া উচ্চ শিক্ষিত বেকার তৈরির এই আত্মহন্তারক প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসার কোন পরিকল্পনা কখনই নেয়া হয় নি!
কি হাস্যকর! সারা পৃথিবীর টপ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে আমাদের কোন প্রতিষ্ঠান নাই, গবেষণা নাই, সৃজনশীল উদ্যম নাই, ছোট্ট একটা দেশ হুট করে মানবিক ও কলা বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে ৪ নম্বর পজিশন পাওয়াটা আমার কাছে অস্বস্তিকর!

উচ্চশিক্ষা সকলের জন্য নয়। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিগ্রি নেবে না, নেয় না কোথাও! কিন্তু আমাদের এখানে নেয়। কোন মতে এইচএসসি পাশ করতে পারলেই হল। ২ পয়েন্ট পার করেছে তো এখন তাকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়তে হবেই! টেকনিক্যাল এডুকেশন আমাদের দেশে অবহেলার পাত্র। কিন্তু যে ছেলেটার বেসিক শিক্ষার পরে বুদ্ধিভিত্তিক দিক থেকে আর তেমন কিছু অর্জনের নেই, যে ছেলেটা কারিগরি কোন একটা বিষয়ে অনেক ভাল করতে পারত কেন তাকে আমরা বিএ/এমএ পাশ করাচ্ছি?
আরেকটা জিনিস আমি অবাক হয়ে ভাবি। মাস্টার্স সারা পৃথিবীতে একটা এডভান্স ডিগ্রি হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের দেশে যদু-মদু-কদু সবাই মাস্টার্স ডিগ্রি হোল্ডার। সাথে অত্যন্ত উচুদরের প্রফেশনাল ডিগ্রি “এমবিএ”র ছড়াছড়ি।

অযথা ফাউ এসব ডিগ্রির অনেক রকমের জ্বালা আছে।
জ্বালা নম্বর ১ঃ কোন মতে একটা ছেলে বা মেয়ে বিএ পাশ করলেই সে নিজেকে বিরাট কাবিল বলে মনে করে। কায়িক পরিশ্রম বা টেকনিক্যাল কোন কাজ বা ছোটোখাটো কোন ব্যাবসা তখন সে আর করতে চায় না। এমনকি পরিবারের কাজেও সে আসে না। একে তো চাকুরী নাই, তার পরও সে বিএ/এমএ পাশ! তাহলে আর কাজ কি? হয়ে যায় পাড়ার বখাটে যুবক। দল বেঁধে, ঘোট পাকিয়ে ইভটিজিং, আড্ডা, নেশা এসব নিয়ে থাকে ও কারন হয় সামাজিক বিশৃঙ্খলার!
জ্বালা নম্বর ২ঃ অর্জিত ডিগ্রি অনুযায়ী চাকুরী না পেয়ে চূড়ান্ত হতাশায় নিমজ্জিত হয়। এবং অবধারিত ভাবে নেশার দিকে ঝুঁকে যায়! আস্তে আস্তে পাড়ার উঠতি রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের পাল্লায় পরে হয় মাস্তান। এদের মাঝেই হাজারে একজন ক্লিক করে বড় রাজনিতিবিদ হয়েও যায়। কিন্তু বাকি ৯৯৯ জনের স্থান আস্তাকুড়!
জ্বালা নম্বর ৩ঃ শেষমেষ আর কিছু করনীয় না পেয়ে যায় বিদেশ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করে এরা! কিন্তু আগের জেনারেল পড়াশোনা তখন আর কোন কাজে আসে না। নতুন করে একটু টুকটাক ট্রেনিং নিয়ে বা ট্রেনিং ছাড়াই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরও ইনকাম হয় কম!

করনীয় কি?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সকল ইউনিভার্সিটি থেকে কোন রকমে কেজি হিসেবে এসব ডিগ্রি দিয়ে দেয়ার এই প্রবনতা বন্ধ করতে হবে! যারা যোগ্য; সত্যিকারের উচ্চশিক্ষার ফলে কিছু হওয়ার, দেশকে কিছু দেয়ার ক্ষমতা আছে তারাই পড়াশোনায় অগ্রগামী হবে। একটা দেশের সবাইকে একাডেমিক লাইনে উস্তাদ হওয়ার তো কোন প্রয়োজন নাই!
বরঞ্চ আমাদের কারিগরি প্রতিষ্ঠান গুলোকে আধুনিকায়ন করা জরুরী। সারা পৃথিবীতে আমাদের শ্রমবাজারের চাহিদা নিরুপন ও সে অনুযায়ী প্রশিক্ষন দেয়া যায়! কারিগরি জ্ঞান, সে অনুযায়ী বাস্তব প্রশিক্ষন, প্রকৃত শ্রম চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনা! এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ভুমিকা হবে মুখ্য!

উচ্চশিক্ষার প্রকৃত স্বরূপ

এইচ এস সি র ফলাফলে বিপর্যয়ের পর মন ভেঙ্গে গেলো। কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাই দিলাম না। ভর্তি হলাম আনন্দমোহন কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে! ৩ মাস ক্লাস করে বুঝলাম আমার ১৪ গোষ্ঠী মিলেও এই সাবজেক্ট থেকে পাশ করে ডিগ্রি নিয়ে বের হতে পারবে না। লেখা পড়া বাদ দিয়া সাধারন জ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি পড়তে শুরু করলাম পরেরবার ভর্তি পরীক্ষা দিব বলে!

আল্লাহর ইশারা বলতে হবে! পরের বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গুলো সাবজেক্টে চান্স পেলেও ভর্তি হলাম মার্কেটিং-এ! এখানেই আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেলো। মার্কেটিং এমন একটা সাবজেক্ট যাতে একটু সৃজনশীল ব্রেইন থাকলে, গুছিয়ে বানিয়ে লেখার ক্ষমতা থাকলে এতে তেমন পড়াশোনার প্রয়োজন নাই! ইংলিশ মিডিয়ামে একটু গুছিয়ে লেখা শিখে যাওয়ার পর শুধু পরীক্ষার আগের ২ দিন প্রস্তুতি নিয়েও একটা বিভাগ থেকে প্রথম হয়েছি আমি!এর জন্য সারাজীবন আমি কৃতজ্ঞ থাকব ডঃ এস এম কবির স্যারের কাছে। স্যার তখন বিভাগের চেয়ারম্যান। তার সময়ে মার্কেটিং বিভাগে সবচেয়ে বেশি ফ্রি হ্যান্ড লেখার চর্চা হয়েছে। একথা আজ গর্বের সাথে বলতে পারি যে ৬.৫ বছরের ছাত্র জীবনে একটা পাতাও কোন সিনিয়রের নোট থেকে ফটোকপি করে পড়ি নাই আমি। সমগ্র সিলেবাস পড়ানো হত, কোন সাজেশন নাই, প্রশ্ন আগের বছরের সাথে পরের বছরের মিল নাই। আমরা লেকচার ও বই মিলিয়ে বুঝে শুনে রিডিং পড়ে যেতাম! কমন পড়া না পড়ার বিষয় ছিল না! ( যদিও দুঃখ নিয়েই বলতে হয় এখন আমার বিভাগের জুনিয়র ছেলে মেয়েরা নোট করে, মুখস্ত করে, বমি করে দিয়ে ৪ পয়েন্টে ৪ পায়!)
 
এভাবে নিজের ঢোল কেন পিটালাম? কারন আমি রিমেল ছিলাম ভাগ্যবান। সবাই এমন কপাল নিয়ে জন্মায় না। বাংলাদেশের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও কলা অনুষদের বিষয়সমূহের ৯৯ ভাগ ছাত্র-ছাত্রী অন্ধের মত নোট মুখস্থ করে পরীক্ষা দেয়। আমি এমনও দেখেছি যে ৭ বছর আগের কোন বড় ভাইয়ের নোট ফটোকপি করতে করতে লেখা আর পড়া যায় না। আমার একজন রুমমেট একবার এক ফাইনাল পরীক্ষার আগে মোট ৪ টি প্রশ্নের প্রস্তুতি নিলো। পরীক্ষায় প্রশ্ন আসবে ৫ টি। ভাবলাম কেমনে কি? পরীক্ষা শেষে রুমে ফিরে হাসিমুখে জানালো যে একটা প্রশ্ন কে ভেঙ্গে ২ টা করা হয়েছে। উত্তর ১০০ ভাগ দিয়েছে।

আমি কয়েকদিন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়েছি। অনেক ছাত্র-ছাত্রী পরিচিত। অনেক টিচার আমার সিনিয়র , বন্ধু, জুনিয়র। তাই দায়িত্ব নিয়েই বলছি এসব প্রতিষ্ঠানে নাকি নোট না দিলে সে ভাল শিক্ষক তো দূরের কথা, শিক্ষকই না! স্যার নোট বানিয়ে দেবেন, স্টুডেন্ট গিলবে! ব্যাস! কিচ্ছা খতম। উচ্চ শিক্ষা কমপ্লিট! বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতেও সৃজনশীল চর্চা হয় না বললেই চলে!

বিশ্ববিদ্যালয় গুলো স্বাধীন। স্বাধীনভাবেই যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর শুধু গ্র্যাজুয়েট/মাস্টার্স উৎপাদন করেই চলেছে। ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন সৃষ্টির চেষ্টা নাই। ক্লাস হোক বা না হোক নোট পড়ে পরীক্ষা দিয়ে ডিগ্রি ঠিকই জুটে! এর মাঝেও নিজের চেষ্টায় অনেক জ্ঞানী-গুণী মেধাবী জন্ম নেয়। কিন্তু ভার্সিটির অবদান তাতে খুবই যৎসামান্য। একটা সার্বজনীন পরিবেশ, বন্ধু, আড্ডা, তর্ক অনেককেই তৈরি করে। কিন্তু সিস্টেম তাতে কি অবদান রাখে বলা মুশকিল!

ডিগ্রির দেমাগে যদি পথ চলা যায়, জ্ঞানের আলো কে খুঁজে? দুটো লাইন শুদ্ধভাবে বাংলা লেখার চেষ্টারই বা কি দরকার? ইংরেজির অবস্থাও তথৈবচ! এজন্যই দেখা যায় শিক্ষিত ডিগ্রিধারী এসব গণ্ড মূর্খের ঠ্যালায় আসল জ্ঞানীর খোঁজ নাই। তাও এই দেশ ডঃ জাহিদ হাসানের (প্রফেসর, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি) মত জ্ঞানী মানুষ তৈরি করে। তাও আবার একটা ফারমিওন নামের কণা আবিষ্কারের আগে যার খোঁজ আমরা রাখি না!

লেখকঃ
সাইফুল ইসলাম রিমেল,
সিনিয়র সহকারী সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
(বর্তমানে ওএসডি হিসেবে ইউনিভার্সিটি অভ ম্যানচেস্টার, ইংল্যান্ড এ অধ্যয়নরত),
২৮তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top