নাগরিক কথা

ইতিহাস না জানা রোগঃ নিছকই টিভি রিপোর্ট, নাকি টিআরপি বাড়ানোর আত্মঘাতী লোভ?

ইতিহাস না জানা টিআরপি লোভ নিয়ন আলোয় neon aloy

আবারও একুশে ফেব্রুয়ারির সাথে সাথে হোমপেজ ভর্তি টিভি চ্যানেলগুলির রিপোর্টে। সাংবাদিকরা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা একেকজনকে প্রশ্ন করছেন ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কি হয়েছিলো? যারা ঠিকমত বলতে পারেননি তাদেরকে নিয়ে ভিডিও কম্পাইল করে টিভিতে, ফেসবুকে প্রচারণা “কারা এসেছে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে?”

এইসব ভিডিওগুলির উদ্দেশ্য আমার কাছে সিম্পলি স্লো পয়জনিং। কেন?

১) হোমপেজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম রিলেটেড ট্রেন্ডিং টপিকগুলো হচ্ছে গোলাম আজম ভাষা সৈনিক ছিল এই দাবীতে যদি ১ টা পোস্ট, সেইটা ডিফেন্ড করে ১০টা পোস্ট (এপ্রিশিয়েট করার মত)।
২) ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমরা শেষ কিছু জানার সুযোগ পেয়েছি স্কুলে থাকতে। কিওয়ার্ড হচ্ছে ঢাকা মেডিকেল, পুলিশের গুলি, সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত। স্কুলে থাকতে যে আমরা ইতিহাস, ভুগোলের বিভিন্ন টপিক পড়েছি তার মধ্যে কত পারসেন্ট আমাদের মনে আছে? আমার কিছুই মনে নাই কয়েকটা পর্বতের নাম ছাড়া।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের বেশীরভাগেরই জ্ঞানের দৌড় স্কুলের চিকন চিকন বইয়ের কিছু লেখা পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পড়া বাদে বেশী কিছু না। জীবন নিয়ে সংগ্রামের মধ্যে খুব অল্প মানুষেরই সময় সুযোগ বা আগ্রহ থাকে এগুলি নিয়ে পড়াশোনা করার। এটা বাস্তব কথা। এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নাই।
৩) ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর কি ভূমিকা ছিল এটা কি আমাদের পড়া হয় কোথাও? লোকটা যে অনশন শুরু করেছিলো জেলে বসে এবং শেষ পর্যন্ত স্ট্রেচারে করে তাকে বাইরে আনতে হয় এটা কি আমরা জানি? সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার এই কটা নামের মধ্যেই যে ভাষা আন্দোলন সীমাবদ্ধ নয় এটা কি মিডিয়া আমাদেরকে জানানোর চেষ্টা করে কখনো? সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর নাম স্কুলের বাংলা বইয়ের পরে কোথাও কি আমরা দেখতে পাই অহরহ? টিভিতে রেগুলার দেখানো হয়? এগুলি নিয়ে ডকুমেন্টারি রেগুলার দেখানো হয়? পত্র-পত্রিকায় চমৎকার কোন লেখা ছাপানো হয় যেগুলি দেখলেই জানতে ইচ্ছা করবে? পার্ক বা রাস্তার মোড়ে কোন বোর্ডে লিখে রাখা হয় এমনভাবে যাতে চারপাশে মানুষ খালি দেশের ইতিহাস দেখে শিখতে বাধ্য হয়?

কোন নেতা বা মন্ত্রী ভাষণ দেয়ার সময় এগুলি নিয়ে কথা বলেন? তারা শুধু “বঙ্গবন্ধুর আদর্শে কাজ করি” এর বাইরে কোন নতুন কথা কি বলেন? ইতিহাস বলেন?

দেশের কোথাও কি আমরা সহজেই জানতে পারি সেই ক্ষুব্ধ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পাকিস্তান এসেম্বলিতে তর্কাতর্কির ঘটনা?

অথচ এগুলি আমাদের জানানো দরকার ছিল কারো। আমরা আশা করতে পারিনা ১৬ কোটি মানুষের সবাই প্রতিদিন নিজের আগ্রহে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করবে। কিন্তু এটা আশা করতে পারি যে সরকার এবং মিডিয়া দেশের, টিভির, পেপারের আনাচে-কানাচে ইতিহাস এমনভাবে ছড়িয়ে রাখবে যাতে মানুষ দেখতে দেখতে জানতে বাধ্য হয়। মানুষ বাস-ট্রেন-স্টেশন-জ্যামে কত সময় নষ্ট করে অপেক্ষা করতে করতে। সবগুলি স্টপে যদি অল্প অল্প করে ইতিহাস লেখা, ছবি আঁকা কয়েকটা বোর্ড লাগানো যেতো, মানুষ কি এগুলি পড়ে সময় পার করার চেষ্টা করতো না? মাথা নষ্ট করে দেওয়া সব আত্মত্যাগের কথা কি তাদেরকে নাড়া দিতো না?

জাতীয় দিবসগুলিতে খুব বিরক্তিকর ভাবে কিছু লো-কোয়ালিটি মাইক লাগিয়ে হিন্দি গান বাজানো হয়, ভাষণ প্রচার করা হয়। এগুলির কি কোন পজিটিভ ইমপ্যাক্ট আছে? অথচ এই টাকা দিয়ে কিছু আকর্ষণীয় লিফলেট বানিয়ে এলাকার লোকজনকে দেয়া যেতো।

তখন আমরা আশা করতে পারতাম দেশের সবাই ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর নাম জানবে, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানবে। এর সাথে মুক্তিযুদ্ধের পার্থক্য করতে পারবে।

স্কুল শেষ করার পরে শুধু শহীদ মিনারে ফুল দেয়াটাই ট্রেন্ড হয়ে আছে। জানাটা ট্রেন্ড হয়ে নাই। এই ট্রেন্ডও যাতে নষ্ট হয়ে যায় ঠিক এজন্যই এইসব ভিডিও প্রচার করা হয় যাতে মানুষ বিব্রত হবার ভয়ে না যায়, এটাকে হিন্দুদের পূজা বলে বিভ্রান্ত করা হয়। ১ জন ২ জন করে সংখ্যাটা বাড়বে। আজকে যাকে টিভিতে দেখানো হল সে কি পরের বছর যাবে? যাবেনা।

অথচ এই মিডিয়াই কত করুণভাবে দেখায় একেকটা নরপশু রাজাকারের ফাঁসির পর স্বজনের কান্নাকাটি, আহাজারি। কিন্তু তারা একবারও তাদের অপরাধগুলি সারা বছর ধরে দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেনা।

সমাজের অসঙ্গতিগুলো সবার সামনে তুলে ধরা মিডিয়াগুলোর কাজ। কিন্তু মিডিয়ার অসঙ্গতিগুলো কে তুলে ধরবে? যে সাংবাদিক আজ শহীদ মিনারে এসে ভুলভাল বকে যাওয়া মানুষের সাক্ষাৎকার ফলা করে প্রচার করছেন, তিনি কি তাদের কথাগুলো প্রচার করছেন যারা উত্তরগুলো ঠিক ঠিক বলতে পেরেছিলো? অথবা নিউজ টীমেরই ক্যামেরাম্যান যখন নেতা-নেত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণের ফুটেজ নিতে আগে থেকে রেখে যাওয়া পুষ্পস্তবকগুলো মূলবেদীতে উঠে জুতো দিয়ে মাড়ান, সে ছবিটা কতটা প্রচার পাচ্ছে? কিংবা এই নিউজ টীম যে চ্যানেলের চাকরী করে, সে নিউজ টীমটা কি তাদের ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের একটা সাক্ষাৎকার প্রচার করবে যেখানে ঘাড়ের রগটা ত্যাড়া করে তারা তাদের বসকে প্রশ্ন করবে- “দেশের মানুষকে বা আগামী প্রজন্মকে দেশের এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিখাতে আমাদের চ্যানেলে নিয়মিত কোন অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় না কেন স্যার?” না, তারা এগুলো করবে না। কারণ এতে টিআরপি বাড়বে না। আরেকজনের দিকে আঙ্গুল তুলে টিআরপি বাড়ানো সহজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া আরো সহজ। নিজেরা নিজেদের পজিটিভ ক্রিটিসিজমের সময় কোথায়?

আমার কাছে এনাফ টাকা থাকলে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী আর আনিসুল হকের যারা ভোর এনেছিল এই বই দুইটা দেশের সবাইকে এক কপি করে দিতাম। সহজ ভাষায় আকর্ষণীয় করে লেখা বইগুলি যে একবার পড়বে তারা অজস্রবার গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যাবে চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন এর কি ভয়াবহ লেভেলের কলিজা ছিলো। তখন ক্রিকেটারদেরকে জাতীয় বীর বলার আগে ১০০ বার চিন্তা করবে। গোলাম আজম ভাষা সৈনিক এটা শুনে বিভ্রান্ত হবেনা। আমাদেরও ভুল মানুষের প্রচারণা করতে হবেনা।

নিজের বংশমর্যাদা নিয়ে আমরা যতখানি সচেতন তার চেয়ে বেশী সচেতন হওয়া উচিত দেশের ইতিহাস নিয়ে। নিজেদের প্রয়োজনেই। অথচ আমাদের সামনে রাজাকারদেরকে যতখানি উপস্থাপন করা হয় তার ১% ফোকাসও দেয়া হয়না তাদেরকে “যারা ভোর এনেছিলো”।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top