নাগরিক কথা

ভাষা ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো

ভাষা নিয়ন আলোয় neon aloy

ভাষা কেবল যোগাযোগ বা ভাব আদান-প্রদানের মাধ্যমই নয়। ভাষা ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্যকর করারও মাধ্যম। আসলে ক্ষমতাই ভাষাকে নির্মাণ করে। একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো টিকে থাকতে গেলে তাকে অনুকূল ভাষা নির্মাণ করে নিতে হয়। আমরা যে ভাষায় কথা বলি, লিখি, ভাব বিনিময় করি তার প্রকৃতি ও চরিত্র ঠিক করে দেয় ক্ষমতাকাঠামো। ক্ষমতার ভাষা মানুষের মৌল অবস্থানকে অস্বীকার করে, তাকে মুছে ফেলতে চায়। অস্তিত্বের মধ্যে পরিবর্তনের ফলে মানুষ যে সমস্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় তা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয় নিজস্ব ভাষার অভাবে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তনকে নাকচ করতে চায় কারণ পরিবর্তন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার আধিপত্যকে বিনাশ করতে চায়। পরিবর্তনকে স্বাগত জানালে কেন্দ্র ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়তে বাধ্য। ক্ষমতার ভাষার চাপে মানুষের চিন্তাজগত ক্ষমতা নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে মানুষের জ্ঞানচৈতন্য যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা ক্ষমতা কর্তৃক নির্ধারিত ও নির্মিত। তবে মানুষ একেই চিরন্তন জ্ঞান বলে মনে করে। আদতে চিন্তা ও ভাষা খুব আলাদা কোন ব্যাপার নয়। ভাষা চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কোন বিষয়ে মানুষ কী বলবে, কী ভাববে তার রাজনৈতিক বিন্যাসকে মিশেল ফুকো বলতেন ‘ডিসকোর্স’, যা মানুষের ভাষা তথা চিন্তাকে শাসন করে। তাই বলা চলে মানুষের জ্ঞান-চেতনা-চিন্তার যে উৎপাদন হয় ক্ষমতা তার উৎপাদক। চেতনার জগতে বিরাট অন্তর্ঘাত না ঘটলে মানুষ ক্ষমতার ভাষা যে অর্থ ও বাস্তবতা নির্মাণ করে তাকেই শাশ্বত বলে মনে করে।

মূলত ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করেই শাসকশ্রেণী মানবজাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। ক্ষমতা যে সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত তাদের প্রত্যেকেরই আধিপত্যের ভাষা থাকে। সমাজে যখন ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ছিল, তখন তাদের বিশেষ ভাষাপদ্ধতিও ছিল। যে ভাষার মধ্য দিয়ে ব্রাহ্মণ্য চিন্তা, আধিপত্যবাদীরা তাদের মূল্যবোধ, মতাদর্শ ব্রাত্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে দিত। সমাজের অধিকাংশ মানুষ সেই মূল্যবোধগুলোকেই একমাত্র সত্য, ধ্রুব বলে গণ্য করতো। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ভাষাপদ্ধতির পরিবর্তন হয়, মূল্যবোধ ও মতাদর্শেরও পরিবর্তন হয়। পরিবর্তন হয় শিথিল হয়ে পড়া ক্ষমতার আধিপত্যকে নতুন শক্তি দেবার উদ্দেশ্যে। একটি বিরাট অংশের মানুষের উপর শাসন-শোষণ ও আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে ক্ষমতাকাঠামোকে স্বীয় মতাদর্শের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে হয়। ক্ষমতার ভাষা তৈরি হয় ক্ষমতার মূল্যবোধ অনুসারে। মানুষের মন ও চেতনায় সেই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয় ভাষার মাধ্যমে। ভাষার মাধ্যমে ক্ষমতা নিত্যনতুন অর্থ, বাস্তবতা ও সত্য নির্মাণ করে। ক্ষমতাশূন্য মানুষকে বুঝতে শেখায় অধিপতি শ্রেণীর ডিসকোর্স বা কথকতাই বেঁচে থাকার একমাত্র পন্থা।

মানুষ তার নিজের অস্তিত্বের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে পারুক এটা কোন কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামোরই কাম্য নয়। মানুষের অস্তিত্বের প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে যদি ভাষা মানুষকে সচেতন করে তোলে তাহলে মানুষ আর বিচ্ছিন্ন, একা থাকবেনা। মানুষ সংঘবদ্ধ হবে এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। তাই ক্ষমতা মানুষের জ্ঞান, আবেগ, স্বপ্নকল্পনা এবং অভিজ্ঞতালব্ধ চেতনাকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বদ্ধ পরিকর। ভাষার মাধ্যমে মানুষের মনোজগতের উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে মানুষের মনকে ক্ষমতা তার উপনিবেশে পরিণত করে। বর্তমান পৃথিবীর ক্ষমতা বিন্যাসের সাথে ভাষার রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। “বিশ্বায়ন” কিংবা “মুক্তবাজার অর্থনীতি” নামের একচেটিয়াকরণ আজকের ভয়াবহ বাস্তবতা যেখানে মাত্র আটজন মানুষের কাছে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের চেয়ে বেশি সম্পদ কুক্ষিগত। এই তথাকথিত বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতির সমান অবদান ও অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। “বিশ্বায়ন” মূলত একক ক্ষমতা, মতাদর্শ, সংস্কৃতি, রুচি এবং একচেটিয়া সম্পদের মালিকানার শাসন পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়ার কৌশল। এটি সম্ভবপর হয় হাজার হাজার ভাষার উপর হাতে গোনা কয়েকটি ভাষা, আরো বিশেষ করে বললে একটি ভাষার আধিপত্যের মাধ্যমে। উপনিবেশ-উত্তর বাস্তবতায় ঔপনিবেশিক ভাষার আধিপত্য কমছেনা বরং বাড়ছে দিনকে দিন। ইংরেজি এখন সারাবিশ্বের অধিপতি ভাষা তার কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ ইংরেজির প্রভাব কমে মার্কিন ইংরেজির প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনেও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা বিন্যাসের রদবদল ক্রিয়াশীল।

ভাষা নিছক জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করেনা, ভাষা ক্ষমতার ধারক ও বাহক। যে দেশের মানুষ তার মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবিতে রক্ত দিয়েছে, সেই বাংলাদেশেই বাংলাভাষা প্রশাসনিক ভাবে তিরোহিত কেন তা বুঝতে খুব সমস্যা হবার কথা না। প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রভুদের প্রতিনিধিত্বকারী শাষকশ্রেণী ও বুদ্ধিজীবীরা নির্লজ্জ ও আপোষহীনভাবে ইংরেজির পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকেন। তাঁরা যে সমস্ত যুক্তি দেখান তা একসময় ইংরেজির বিপক্ষে ও লাতিন ভাষার পক্ষেও দেখানো হত। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে কিন্তু ঠিকই হিন্দি দোর্দন্ড প্রতাপে টিকে আছে। শুধু টিকেই নেই, বরং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ভাষা হয়ে উঠছে। শুধুমাত্র হিন্দি ভাষার চর্চা করে কারোর সেখানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সম্ভাবনা নেই। হিন্দি ভাষা নিজ দেশের অন্যান্য ভাষার জন্য তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার ভাষাবৈচিত্র‍্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। এর কারন আর কিছু নয়, হিন্দিভাষী পুঁজির মালিকদের একচেটিয়া আধিপত্য। একই প্রক্রিয়ায় চীনা, জাপানী, আরবী ভাষাও শক্তিশালী ক্ষমতার ভাষা হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী। বস্তুত পৃথিবীতে এমন একটি দেশ নেই যারা অন্যভাষাকে প্রধান ভাষা হিসেবে বহাল রেখে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়েছে। প্রবল প্রান্তিকের উপর ক্ষমতার চর্চা করে ভাষার মাধ্যমে। তাই বিশ্বক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে একক ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সময়ের দাবি। একটি সত্যিকার অর্থে মুক্তিমুখিন সমাজ গড়ে তুলতে সর্বাগ্রে দরকার আরোপিত ভাষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং নিজ ভাষার বি-উপনিবেশায়নের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত, মুক্ত ভাষা এবং সেই ভাষার প্রাত্যহিক ও প্রশাসনিক চর্চা। ঊনিশ ও বিশ শতকের ভাষাবিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ফলে এটি সুবিদিত যে, কথিত “পশ্চাদপদ” আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষারও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এমনকি, ‘মানভাষা’, ‘উপভাষা’; ‘কেন্দ্র’ ও ‘প্রান্ত’ ভাষা সংক্রান্ত ডিসকোর্সও বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top