গল্প-সল্প

ছোটগল্পঃ গ্লানি…

ছোটগল্প গ্লানি নিয়ন আলোয় neon aloy

(১)
জানুয়ারি মাসের শীতের সকাল। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে আঞ্জুমান আদর্শ সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ে পিটি শুরু হয়। পিটি শুরু হবার পরপরই ১০টা থেকে ক্লাস চলে একেবারে বেলা ৪ টা পর্যন্ত। মাঝে অবশ্য ১ ঘন্টার টিফিন ব্রেক। আজ স্কুলে পৌছাতে অমির খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। ততক্ষনে কোরআন তেলাওয়াত শেষ হয়ে জাতীয় সংগীত শুরু হয়ে গেছে। অমি সপ্তম শ্রেনীর লাইনের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুর মেলাচ্ছে- “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি…” এই সংগীত, এই সুর তার এত ভাল লাগে যে যতবারই সে গায় তার চোখ টলমল করে উঠে আর মুগ্ধ হয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এই অপূর্ব সংগীত রচয়িতার প্রতি। কেমন করে কিছু লোক হিন্দুয়ানী দোহাই দিয়ে এই সংগীতকে অবজ্ঞা করে এটা কিছুতেই তার মাথায় আসে না। অন্য লোকের কথা বলতে হবে কেন? এই সেদিন স্বাধীনতা দিবসে তার বাবাকেই তো তার কোন এক বন্ধুর সাথে আলাপচরিতায় বলতে শুনেছে- “একটা মুসলিম দেশের জাতীয় সংগীত হল এক মালাউনের লেখা গান, যতসব হিন্দুয়ানী রীতিতে দেশটা নাপাক হয়ে গেল।” অমি তার আব্বুকে যথেষ্ট বুদ্ধিমান মনে করতো। তার আব্বু ব্যারিস্টার গনি চৌধুরী বলতে গেলে সমাজের উপর তলার একজন মানুষ। শহরের নামকরা লোকজনের সাথেই তার উঠাবসা। সেই লোকের এমন ধারনায় অমি শুধু অবাকই হয়নি রীতিমত হোঁচট খেয়েছে।

(২)
ক্লাস শেষ হলে অমি অন্য ছেলেদের মতন দেরি করে বাসায় ফেরে না। তার একটা তাড়া থাকে কারন সে পাড়ার ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন। ব্যাট-বল, স্ট্যাম্পসহ যাবতীয় সরঞ্জামাদি তার হেফাজতেই থাকে। অতএব সে দেরি করলে দিনের খেলাটাই লাটে উঠে। রিক্সায় করে বাসায় ফিরছিল অমি। রিক্সাটি যখন বাসার কাছাকাছি চলে এল, দূর থেকে একটা জটলার মত দেখা গেল। ঘটনা কি হতে পারে সে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। আর একটু সামনে এগোলে সে একটা পুলিশ ভ্যান দেখতে পেলো। রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে যখন সে গেটে এল তখন দেখতে পেল পুলিশ তার আব্বুকে হাতকড়া পড়িয়ে ভ্যানে উঠিয়ে নিচ্ছে। কাঁধের স্কুল ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে সে যেই আব্বুর দিকে দৌড় দিতে উদ্যত হল, তার আম্মু তাকে জাপটে ধরে থামিয়ে দিলো। বিস্মিত অমি চিৎকার করে আম্মুকে জিজ্ঞেস করছে- “কি হয়েছে আব্বুর? ওরা আব্বুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কেন?”
গনি সাহেবের স্ত্রী বেগম পারভিন সুলতানা ছেলেকে স্বান্তনা দিলেন- “ও কিছু না, পলিটিক্যাল গেম। তুমি ছোট মানুষ, বুঝবে না। তোমার আব্বু কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসবেন।” অমির মাথায় তবু অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কেন তার আব্বুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করবে? কি তার অপরাধ?

(৩)
প্রতিদিনের মতো পরদিন অমি সকালে স্কুলে গেল। সপ্তম শ্রেনীর ক-সেকশনের ছাত্র অমি। এখন পর্যন্ত স্কুলের সব পরীক্ষায় সে প্রথম স্থান অধিকার করে এসেছে। সেই হিসেবে ক্লাসের সকলেই তাকে সমীহ করে, শিক্ষকদেরও প্রিয় পাত্র অমি। কিন্তু সময়ের সাথে সব কিছুই যে পাল্টে যায়, আজকের দিনটা না এলে অমি কোনদিন বুঝতেই পারতো না। সে ক্লাসে প্রবেশ করার সাথে সাথেই প্রথমে ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্টু ছেলে টিপু তারপর তারসাথে সুর মিলিয়ে ক্লাসের অর্ধেক ছেলে বলে উঠলো- “রাজাকারের ছেলে, রাজাকারের ছেলে”। ঘটমান ঘটনার আকস্মিকতায় বিচলিত হয়ে অমি তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু মামুনকে জিজ্ঞেস করে- “ব্যাপার কি রে মামুন?”
ইতস্তত করে মামুন জবাব দেয়- “টিভিতে নাকি দেখিয়েছে যুদ্ধাপরাধের দায়ে পুলিশ তোর বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে।”

গতকাল রাতে অমি টেলিভিশন দেখে নি। তাই সে এসবের কিছুই জানে না। তবে আসার সময় খেয়াল করেছে বাসার সকলেরই কেমন যেন মনমরা ভাব। অমি আর মামুনের কথোপকথনের এক পর্যায়ে টিপু এসে অমির গায়ে ধাক্কা মেরে বলে-“রাজাকারের বাচ্চা পাকিস্তান যা।“ অমির চোখ দিয়ে জল চলে এলো, নিজেকে আর সামলাতে পারল না সে। ব্যাগ থেকে কলমটা হাতে নিয়ে টিপুর ডানহাতের কনুইয়ে আচ্ছা করে ১ টা ঘা মারল। তারপর ১ দৌড়ে একেবারে স্কুলগেটের বাহির। রাস্তা ধরে হাঁটছে আর কাঁদছে অমি। সে এখন বাসা্য যাবে না। হাঁটতে হাঁটতে শিশু একাডেমীর পাশের ছোট পার্কটাতে এসে বসে অমি। সে ভাবছে তার বাবা সত্যিই রাজাকার ছিলেন নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার? রাজাকার মানে যারা দেশদ্রোহিতা করেছে, যারা এদেশের মানুষ হয়েও ৭১ সালে পাকিস্তানিদের সাথে হাত মিলিয়ে খুন করেছে এদেশের লাখো মানুষকে। এসব সে পড়েছে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে। আচ্ছা তার আব্বু যদি সত্যিই একজন রাজাকার প্রমানিত হয় তাহলে সে কি করবে? না না, এ মানা যায় না। আর যাই হোক, সে একজন রাজাকার, দেশদ্রোহীর সন্তান এটা সে কোনভাবেই মেনে নিতে পারবে না।

(৪)
সেদিনের পর থেকে অমি সম্পূর্ণ বদলে গেল। হাসিখুশি ছেলেটার মুখে যেন এক কদর্যপুর্ন গাম্ভীর্যের ছায়া। সে আর এখন স্কুলে যায় না। তার আম্মু আর বড় ভাইয়া তাকে পিটিয়েছে পর্যন্ত তবু সে স্কুলে যাবে না। সে ঠিক করে ফেলেছে যতদিন না তার আব্বুর মামলার রায় হয়, ততদিন সে স্কুলে যাবে না। কিন্তু তার আগে তাকে জানতে হবে তার আব্বুর অপরাধ কি। অতঃপর ছোট্ট অমি রীতিমত গবেষণা শুরু করে দিল। টেলিভিশনের নিউজ শুনে সে এখন, পত্রিকাও পড়তে শুরু করে দিল। সে পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে খবরের কাগজ খুঁজতে লাগলো। তার আব্বু গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ২৫ শে জানুয়ারি। ২৬ শে জানুয়ারি তারিখের সমস্ত পত্রিকা অমি খুব ভাল করে পড়লো। পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৩ মে নেত্রকোনার মুক্তারপাড়া মাঠে পাক হানাদার বাহিনী প্রফুল্ল মাস্টারসহ মোট পাঁচজনকে হত্যা করেছিল। আর তাদের এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে পুলিশ তার বাবাকে প্রেপ্তার করে। রিপোর্ট পড়ার পর একটা নাম অমির মনে গেঁথে গেল- “প্রফুল্ল রায়”। ঠিক এই নামটাই সে কোথায় যেন পড়েছিল। হ্যাঁ, হ্যাঁ! মনে পড়ে যায় অমির, আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের স্কুল মাঠে খেলতে যেয়েই সে এই নামটা পরেছিল। পরদিন শুক্রবার সে আদর্শ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে যায়। বিদ্যালয়ের অফিসরুমের বাহিরে শুরু থেকে আজ অবধি প্রধান শিক্ষকদের নাম, ছবি ও কার্যকালীন মেয়াদ উল্লেখ আছে। তালিকায় সযত্নে চোখ বুলায় অমি। তালিকার একেবারে উপরের দিকে কয়েকটা নামের পরেই অমির চোখ আটকে যায়-
“প্রফুল্ল রায় (৩ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৯- ৩ মে, ১৯৭১)”
পাশের ছবিটার দিকে তাকিয়ে অমি আরও অবাক হয়ে যায়। তার মনে হচ্ছে এই লোকটাকে সে এর আগেও দেখেছে? কিন্তু এ কি করে সম্ভব? তাহলে কি এমন হতে পারে না যে এই ব্যাক্তির ই অন্য একটা ছবি সে অন্য কোথাও দেখেছে? কিন্তু সেটা কোথায়? অমির মাথাটা যেন ঘুরপাক খাচ্ছে। সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না। আচমকা একটা ছবি তার মনে ভেসে উঠলো। অমনি সে দৌড়াতে লাগলো বাসার দিকে যেন আর একটু দেরি করলেই ছবিটা হারিয়ে যাবে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে তার রুমে ঢুকল, ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনিটা আটকে দিল। তারপর বিছানাটা উল্টে খাটের নিচে তার গোপন বাক্সটা বের করলো যেটাতে সে তার ব্যাক্তিগত জিনিসপত্র যেমন স্টিকার, টাকা, ইলেকট্রিক যন্ত্রের ভগ্নাংশ ইত্যাদি লুকিয়ে রাখে। ছবিটাও সে এখানেই রেখেছিল।

(৫)
ছবিটার দিকে তাকিয়ে অমি স্মৃতিকাতর হয়ে গেল। তাদের নিচেরতলায় একটা ঘর হল তার বাবার চেম্বার। সেদিন ব্যারিস্টার গনি চৌধুরী চেম্বারে বসে সিগরেট ফুঁকছিলেন। এমন সময় হঠাৎ অমিকে ডেকে বললেন, “উপরতলার আমার স্টাডিরুম থেকে জুডিসিয়াল ল বইটা নিয়ে এসো তো!” অমি উপরতলায় বাবার স্টাডিরুমে গেল, এ ঘরটাতে সচরাচর সে আসে না। ডেস্কের উপরে বইটা পেল সে। বইটার পাশেই একটা সুন্দর চকচকে চাবির রিং দেখে তার চোখ সেখানে আটকে গেল। রিঙটাতে একটা নীল পাথর বসানো এবং ১ টি চাবি আছে। চাবিটা সামনের ডেস্কেরই একটা লকারের চাবি হবে বলেই অমির মনে হল। নিতান্তই কৌতুহলবশত সে চাবিটা দিয়ে সে লকারটা খুলে ফেলে। লকারের ভেতর তেমন কিছু নেই ২ টা ইসলামিক বই, আর ১ টা ছবির অ্যালবাম। অ্যালবামটা সে উল্টিয়ে দেখতে লাগলো। বেশির ভাগ ছবিই তার আব্বুর কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ছবি যেগুলো সে আগে কখনো দেখেনি। এগুলোর মাঝে ১ টা ছবি দেখে অবাক হল। ছবিটাতে সামনে দাঁড়ানো পাঁচজন মানুষ যাদের হাত ও চোখ বাঁধা, লাইনে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের সামনে রাইফেল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক নওজওয়ান সৈনিক। নওজওয়ান সৈনিকটির পাশে একটা টেবিলে বসে আছে আরেকজন সৈন্য। কিছুটা বয়স্ক, কিন্তু দেহ সুঠাম, দেখে মনে হয় কোন অফিসার হবে। আর সেই অফিসার মতন লোকটার সাথে বসে আছে যে লোকটা সে কি তার আব্বু? হ্যাঁ আব্বুই তো, বয়স কম ছিল বলে চিনতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু এ ছবিটা কি কোন সত্যি ঘটনার সাক্ষী নাকি কোন নাটক কিংবা অভিনয়ের সময় তোলা ছবি? কিছুই না বুঝে অমি ছবিটা সেখান থেকে সরিয়ে নেয়, ভেবেছিল তার আব্বুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেবে। অমি নিচে নেমে এসে দেখল তার আব্বু কোন এক মক্কেলের সাথে আলচনায় ব্যাস্ত। অতএব সে বইটা রেখে চলে গেল। পরদিন দুপুরবেলা গনিসাহেব তুলকালাম শুরু করে দিলেন-“আমার অ্যালবাম থেকে ১ টা ছবি কে সরিয়েছে?”
কেউ কিছু বলছে না দেখে উনি আরও রেগে গেলেন। শেষে অমি ভয়ে ভয়ে বলল-
“আ আ আমি নিয়েছিলাম আব্বু”
কিছু বুঝে উঠার আগেই অমির গালে ঠাস করে ১ টা চড় মেরে গনিসাহেব বলে উঠলেন –
“এতো বড়ো স্পর্ধা তুমি না বলে ছবিটা সরিয়ে নিলে? কোথায় রেখেছ ছবিটা?”
এবার যেন ভয়ে কাঁপছে অমি। তার এতটুকু বয়সে কোনদিন তার আব্বুকে এতটা উত্তেজিত হতে দেখে নি। সে কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছে না কারন ইতিমধ্যে সে ছবিটা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছে।
গনি চৌধুরী আবার হুঙ্কার দিলেন-“কি হল বোবা হয়ে গেলে নাকি? কোথায় রেখেছ ছবিটা?”
কিংকর্তব্যবিমূড় অমি ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে, মাথাটা নিচের দিকে নুইয়ে বলল-“আঙ্গিনায় মশা মারার জন্যে আগুন জ্বেলেছিলাম, হাত থেকে পড়ে ছবিটা পুড়ে গেছে আব্বু”।
মিথ্যে উত্তরটা দিয়ে অমি আরও ক’টা চপেটাঘাত সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি মোটামুটি নিয়েই রেখেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে গনিসাহেব আর তেমন কিছুই করলেন না। বরং মনে হল যেন তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন। সেদিনই রাতে যখন অমি হোমওয়ার্ক করতে বসে, গণিত বইয়ের পাতা উল্টিয়ে সে ছবিটা আরেকবার ঘেঁটে দেখে। একবার তার মনে হয়েছিল সে ছবিটা সত্যি পুড়ে ফেলবে, তা নাহলে যদি বাবার হাতে পড়ে তবে আর নিস্তার পাবে না। পরক্ষনেই তার মনে হল- এটা যদি এতই মুল্যাবান ছবি হয় তাহলে তার আব্বু তাকে আরও মারলোনা কেন? ছবিটা পুড়িয়ে ফেলেছে বলার পরই কেন তিনি শান্ত হয়ে গেলেন? নানাবিধ চিন্তা করে অবশেষে ছবিটা সে তার খাটের তলায় গোপন বাক্সে রেখে দিল।

আজ এতদিন পর ছবিটার দিকে তাকিয়ে যেন সে সবকিছুর হিসেব মিলিয়ে ফেলতে পারল। ছবিটাতে যে পাঁচজনের চোখবাঁধা, তাদের সবার সামনে যিনি তিনিই যে আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রফুল্ল রায় এ বিষয়ে অমির আর সন্দেহ রইল না। একটা তীব্র ঘৃণা, রাগ, ক্ষোভ, আর গ্লানিতে তেরো বছরের তার এই ছোট্ট দেহখানি যেন মাটিতে মিশে যেতে চাইছে।

(৬)
আজ যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত আসামি ব্যারিস্টার গনি চৌধুরীর রায়ের দিন। সুপ্রীম কোর্টে মামলা বিচারাধীন। আসামী ও সরকার উভয়পক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত। উপস্থিত শহীদদের পরিবারও, যারা বুকের ভেতর অনেক আশা নিয়ে বেঁচে আছেন যে অন্তত মৃত্যুর আগে তারা দেখে যাবেন তাদের স্বজনদের হন্তারক রাজাকারদের বিচার বাংলার মাটিতে হয়েছে। উপস্থিত আছেন গনি সাহেবের পরিবার-পরিজনও, অমিও এসেছে সবার সাথে। ছোট মানুষ বলে কেউ তাকে আনতে চায় নি। অনেক কান্নাকাটির পরে একরকম জোর করেই সে চলে এসেছে সবার সাথে। তাকে যে আসতেই হবে। ইতিমধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আসামীপক্ষের আইনজীবী তার মক্কেলের উপর আনীত অভিযোগ একের পর এক শানিত যুক্তিতে মিথ্যা প্রতীয়মান করে যাচ্ছেন। বাদী পক্ষের সকল সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহন শেষ হলে যখন রায় মোটামুটি অনুমিত যে উপযুক্ত প্রমানের অভাবে গনি চৌধুরী নির্দোষ প্রমানিত হতে যাচ্ছেন, আসামীর কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান গনি চৌধুরীর মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেল। ওপাশে শহীদ পরিবারের স্বজনদের চাপা ফোঁপানোর আওয়াজও একটু-একটু করে বাড়তে লাগলো। এমনি সময়ে অমি কোর্টের মুল মঞ্চের সামনে ছুটে চলে এল। নিতান্তই কিশোরশুলভ আচরণ ভেবে পুলিশ তাকে বাঁধা দিয়ে যখন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসতে লাগলো, অমি তখন চিৎকার করে বলল- “মাননীয় আদালত, আমি কিছু বলতে চাই”! অতঃপর মাননীয় আদালতের নির্দেশে অমিকে অনুমতি দেয়া হল। সরকার পক্ষের আইনজীবী মাহমুদুন্নবী অমিকে সাক্ষ্য মঞ্চের দিকে এগিয়ে দিলেন। আদালতে উপস্তিত সকলের চোখ এখন অমির দিকে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অমির পরিবার। সবচেয়ে অবাক হয়েছেন গনি চৌধুরী, তার চোখে রাজ্যের বিস্ময়- কি বলতে চায় অমি? সাক্ষ্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে শপথবাক্য পাঠ করার পর অমির গলাটা একটু থেমে গেল। কেঁপে কেঁপে উঠছে সে। মাননীয় বিচারপতি তাকে অভয় দিয়ে বললেন- “তোমার কোন ভয় নেই, যা বলার নির্দ্বধায় বলো।”

ভয়-দ্বিধাহীন কণ্ঠে অমি এবার বলে যেতে থাকল- “মাননীয় আদালত। ব্যারিস্টার গনি চৌধুরী আমার আব্বু। উনি যদি সত্যিই যুদ্ধাপরাধী হন, আমি চাই উনার যথোপযোক্ত শাস্তি হোক। আমার ধারনা আমার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমান আছে যা আমি পেশ করতে চাই।”

একথা বলেই অমি তার পকেট থেকে ছবিটা বের করে আদালতে পেশ করলো। তারপর আরও কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ধীর পায়ে অমি মঞ্চ থেকে নেমে এলো। ওদিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো গনি চৌধুরী আদালতের সুশীতল পরিবেশেও যেন ঘেমে যাচ্ছেন। তার নিজের ছেলে আজ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে, যাতে তার মৃত্যুদণ্ড হয়ে যেতে পারে। আজ শুধুই মনে মনে আফসোস কেন তিনি আরও আগেই ছবিটা নষ্ট করলেন না। সত্যি বলতে কি তিনি কখনো ভাবেননি যে এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। ছবিটা নষ্ট না করার আরও একটা কারন আছে। ছবিটাতে তার পাশে যে জেনারেলকে দেখা যাচ্ছে তিনি অখণ্ড পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ইয়াহিয়া খান। তখন ইয়াহিয়া খানের মত বীরের বাহবা পাওয়া চাট্টিখানি কথা ছিল না। কেবল তার বুদ্ধির জোরেই সেদিন পাকবাহিনী নেত্রকোনার মুক্তিসেনাদের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, খুলি উড়িয়ে দিতে পেরেছিল প্রফুল্ল মাস্টার, আব্দুল আজিজ, পাশা, কাইসার, মৃদুল ঘোষের মতো বেকুব মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা শেখ মুজিবের মতো ভারতের চরের কথায় লাফিয়ে মুসলিম ব্রাদারহুডে ফাটল ধরাতে চেয়েছিল। ইয়াহিয়া খানের সাথে তার এ ছবিটা যে অনেক গর্বের। এ ছবিটার দিকে তাকালেই যে তার সেই অখণ্ড পাকিস্তানকে মনে পড়ে যেত আর মনের আনন্দে গুনগুন করে উঠতেন “পাক সারজমিন সাদবাদ”। এমন একটা ছবি তিনি নষ্ট করতেনই বা কিভাবে?

(৬)
ছবিটি বিশ্লেষন করার পর আসামীপক্ষের কোন যুক্তিতর্কই আর ধোপে টেকেনি। মাননীয় আদালত আসামীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেন। রায় শুনে অমির আম্মু মূর্ছা গেলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা অমির দিকে যেন বিষাক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তেড়ে আসছে। অমি দু’চোখের জল মুছতে মুছতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মাঝখানের সরু পথটা দিয়ে দৌড়ে আদালতের বাইরে চলে গেল, যেতে যেতে তার কানে ভেসে আসলো শহীদ পরিবারের স্বজনদের হর্ষধ্বনি। আজকের রায়ের মধ্যদিয়ে তার ছোট্ট বুকটা থেকে যেন একটা পাষাণ ভার নেমে গেল, যেন কিছুটা গ্লানিমুক্ত হল তার বাংলাদেশ।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top