ইতিহাস

কার্ট কোবেইন, আমার অভিমানী ঈশ্বর

কার্ট কোবেইন নিয়ন আলোয় neon aloy

অনুবাদকের কথাঃ বয়স তখন বাইশের মত, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া প্রায় শেষ অথচ নিজের দিকে তাকালেই বুঝি আমাকে দিয়ে হয়নি, হবে না। এই সময়টা প্রায়ই ছুরি নিয়ে বসে থাকতাম, হাত মুঠি করার পর যখন সবুজ একটা শিরা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতো আমি সম্মোহিতের মত ওকে ছুরি দিয়ে চুমু দিতে চেয়েছি, তবে সাহসের অভাবে পারিনি। আমার নৈরাশ্যের কারণ ছিল একটাই, প্রচলিত সমাজের প্রতিটি দক্ষ এবং গতিশীল মানুষের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার ভয়, পরাজয়ের তিক্ত বেদনার স্বাদ নিতে বড় অনীহা ছিল। আমাকে আমার পরিচিত মানুষেরা বিভিন্ন উপায়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় দক্ষ জনশক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশের জন্য অনুপ্রেরণা যোগাত, অথচ প্রতিটি বারই এই অনুপ্রেরণারা আমাকে আরও বেশি ভীত করে তুলত। খুব গভীরে যেখান থেকে মানব শরীর কোন একটা সিস্টেম এক্সিকিউট করার প্ল্যান অথবা সাহস নেয় সেই জায়গাটা আমার নড়ে গিয়েছিল, শুধু ভয় আর আঁধার দেখতাম। মানুষের সাথে কথা বলতেও আমার প্রচন্ড অনীহা আর ভয় দেখা দিয়েছিল কেননা খুব পরিচিত মানুষেরাও আমাকে আর নিতে পারছিল না। আমি আমার ভেতরের সকল অন্ধকার, নৈরাশ্য, হতাশার কথা কখনই কাওকে বুঝাতে পারি নি, আমি দেখেছি অনুভব আর দায়িত্বের মধ্যকার সেই তীব্র সরু সুতাটা কতটা শক্তিশালী এবং জরুরী। যেমন আপনি যদি কাউকে ভালোবাসেন তবে সেই ভালোবাসার প্রমাণস্বরূপ আপনাকে উক্ত ব্যক্তির কাছে অজস্র অনুভূতির ইশতেহার পেশ করতে হয় যা মূলত অর্থ এবং দায়িত্ব সংবলিত একটা দলিলের বাইরে কিছু নয়। এরকম অজস্র মতবাদ আমি নিজের মত করে বুঝে গুলিয়ে যাচ্ছিলাম, পরে কোবেইনের ছোট্ট একটা লাইন সত্যিকার অর্থে আত্মস্থ করে জীবনে ফিরেছি।

কার্ট কোবেইন, ভালোবাসার এই মানুষকে আমি চিনেছি তার সেই অমর বাণী “আই উড র‍্যাদার বি হেটেড ফর হু আই এম দ্যান লাভড হু আই এম নট।” আমার ভালোবাসা খুবই খাপছাড়া প্রকৃতির, গান নয় বরং কোবেইনের খামখেয়ালীপূর্ণ আচরণ, কথাবার্তা আমাকে আবিষ্ট করেছিল, সন্দেহ নেই। একটা অনিয়ন্ত্রিত জীবন, অনুভূতিজনিত অসমতার বিস্ফোরণ, সাতাশে আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত কোন হত্যাকান্ডের স্বীকার জানি না, ভালোবাসি এতটুকুই জানি।

আমি আমার মত করে কথা বলা শুরু করি, আশেপাশের মানুষ আমাকে আর নিতে পারে না, আমি ধীরে ধীরে একা হয়ে যাই। এই একাকীত্ব আমাকে ভোগায় না বরং সময়ে সময়ে নিজেকে ঈশ্বর মনে হয়, অভিমানী ঈশ্বর।
সে সময়কার ভাবনাগুলো থেকেই অনুবাদ করতে বসে পড়ি কার্ট কোবেইনের সুইসাইড নোটটিঃ

“প্রিয় বোদ্দাহ,
অভিজ্ঞ আহাম্মকের জিহবা থেকে উচ্চারিত হচ্ছি যাকে বরং বলা যেতে পারে পৌরুষত্ববর্জিত, বালকীয় বাদী। এই নোটটা হওয়া উচিত সহজবোধ্য, বাতাসের মত সাবলীল।

পাংক রক ১০১ কোর্স (শিল্পীদের মাঝে গড়ে ওঠা ষড়যন্ত্রের জাল, অনুমান) এর সাথে প্রথম পরিচয়ের পর থেকে বিগত বছরগুলোতে যতগুলো সতর্কবাণী পেয়েছি বরং বলা যেতে পারে স্বাধীনতা এবং তোমার সমাজের সাথে জড়িত নীতিশাস্ত্র প্রচণ্ড সত্যে প্রমাণিত হয়েছে। বহু বছর হয়ে গেল, আমি আর আগের মত শুনতে শুনতে ভেসে যেতে পারি না, একই সাথে হারিয়েছি সুর সৃষ্টির ঈশ্বরত্ব, পড়া আর লেখার আদিম সুখ। আর এসবের জন্য প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগতে হয় আমায়।

যেমনটা, যখন আমরা স্টেজে যাই, আলোগুলো নিভে যায় এবং ভীড়ের মাঝে উন্মত্ত গর্জন শুরু হয় তা আমাকে ফ্রেডি মারকারির মত আকর্ষণ করেনা যিনি ভালবাসতে জানতেন, ভালোবাসায় ভাসতেন আর পেতেন জনতার আরাধনা যা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ আর ঈর্ষান্বিত করে। সত্য এতটুকুই, আমি তোমাকে বোকা বানাতে চাই না, তোমাদের একজনকেও না। এটা তোমার অথবা আমার কারোর জন্যই স্বস্তিকর নয়। সবচেয়ে বাজে যে অপরাধের কথা আমি ভাবতে পারি তা হল জনতার ভালো লাগার সুযোগ নিয়ে জাল করা, ভান করা যে আমি একশ পারসেন্ট মজাতে আছি। মাঝে মাঝে ধুম করে স্টেজ থেকে হারিয়ে যাবার আগে আমার মনে হয় আমার যেন একটা পাঞ্চ ইন ঘড়ি থাকার দরকার ছিল, ঘড়ি বেঁধে রোবটের মত অভিনয় করে যেতাম। আমি আমার সাধ্যের মধ্যে প্রতিটি চেষ্টা করেছি একে মেনে নিতে ( আমি জানি আমার একাগ্রতা, ঈশ্বরও জানে তবে তা যথেষ্ট নয়)। আমি এই সত্যটাকে উপলব্ধি করি যে আমি এবং আমরা বহু মানুষকে আক্রান্ত এবং আনন্দিত করেছি। আমি অবশ্যই ঐসব স্বকামী (নারসিসিস্ট) মানুষদের মধ্যে একজন যারা শুধুমাত্র সব হারানোর পর মূল্য বোঝে। আমি আসলেই অতিরিক্ত রকমের সংবেদনশীল। একটা সময় শিশুর মত যে প্রবল উৎসাহ আমার মধ্যে ছিল তাকে পুনর্জীবিত করতে আমার খানিকটা অসাড় হওয়া প্রয়োজন।

আমাদের শেষ তিনটি ট্যুরে আমি আমার ভক্ত এবং যাদেরক ব্যক্তিগতভাবে চিনি তাদের কাছ থেকে অনেক বাহবা পেয়েছি কিন্তু তারপরও নৈরাশ্যের শহর ছেড়ে বের হয়ে আসতে পারছি না, হয়ত প্রত্যেকের জন্য যে অপরাধবোধ আর সহানুভূতি অনুভব করি তার জন্য। আমাদের সবার মধ্যেই ভালো দিক আছে এবং আমার মনে হয় আমি আসলেই মানুষকে অনেক বেশি ভালোবাসি, এতটাই বাসি যা আমাকে প্রচণ্ড দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত করে। সেই ছোট দুঃখের সংবেদনশীলতা, বাহবার অভাব, মিনরাশি, যীশু। কেন তুমি এটাকে স্রেফ উপভোগ করো না? আমি আসলেই জানি না!

আমার একজন দেবীতুল্য স্ত্রী আছে যে কিনা উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর সহানুভূতির আধার আর একটি কন্যা যে আমাকে আমার কথাই সবচেয়ে বেশি মনে করিয়ে দেয়, যেমনটা আমি ছিলাম, আনন্দ আর ভালবাসায় পূর্ণ, যার সাথে তার দেখা হয় তাকেই সে চুমু খায় কারণ সে বিশ্বাস করে প্রত্যেকেই ভালো এবং কেউ কখনই তার ক্ষতি করবে না। এবং সেটাই আমাকে ভীত করে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যায় যে আমি কোনমতে শ্বাস নিতে পারি। আমি কখনই ভাবতে পারি না যে ফ্রান্সেস আমার মতই নিঃস্ব, স্বধ্বংসাত্মক, মৃত রকারে পরিণত হচ্ছে।

আমি ভালোভাবেই বেঁচেছি, বেশ ভালোভাবেই এবং আমি কৃতজ্ঞ তবে সতেরো বছর বয়স থেকেই আমি গোটা মানবজাতির প্রতি ঘৃণা অনুভব করতে শুরু করি। হতে পারে শুধু এজন্যই যে মানুষ খুব সহজে মানিয়ে নেয়ার অভিনয় করতে পারে আর তাদের আছে সহানুভূতি নামক মারণাস্ত্র। হয়ত শুধু এজন্যই যে আমি মানুষকে খুব বেশি ভালোবাসি আর তাদের জন্য দুঃখ অনুভব করি।

ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে আমার জ্বলন্ত কয়লার পক্ষ থেকে, বমনেচ্ছাপূর্ণ অক্ষরের জঞ্জাল, এবং বিগত কয়েক বছরের অস্বস্তিকর উদ্বেগের জন্য। আমি আসলেই অনেক বেশি অনিশ্চিত, খেয়ালী, বেইবি! আমার আসলেই সেই আসক্তিটা আর নেই আর জানোই তো ফিকে হয়ে যাবার চেয়ে জ্বলে যাওয়াই শ্রেয় (নীল ইয়াং থেকে কোট করা)।

শান্তি, ভালোবাসা, সহানুভূতি।
কার্ট কোবেইন

ফ্রান্সেস এবং কোর্টনি, আমি জানি আমি তোমাদের বেদিতে থাকব। ফ্রান্সেসের জন্য হলেও চালিয়ে যেও। আমাকে ছাড়াই তার জীবন অনেক বেশি সুখের আরো সুন্দর হবে।

আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমাদের ভালোবাসি!

(বোদ্দাহ কোবেইনের কাল্পনিক বন্ধু, ফ্রান্সেস তার একমাত্র কন্যা এবং কোর্টনি তার স্ত্রী)।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top