শিল্প ও সংস্কৃতি

“ফ্যাসিবাদী দর্শন”, মূল: মানবেন্দ্রনাথ রায়

[ফ্যাসিবাদ সমগ্র পৃথিবীতেই একটি অত্যন্ত আলোচনা, সমালোচনা ও দুশ্চিন্তার ডিসকোর্স। এটি মানুষের বিকাশের জন্য হুমকি স্বরুপ। কিন্তু ফ্যাসিবাদের চরিত্র, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; কিভাবে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বত্র বিরাজ করে তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারার দরুণ ব্যর্থ হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম। সমাজ ও ব্যক্তিপরিসরে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে ফ্যাসিবাদের শর্ত ও বীজ। ফ্যাসিবাদ একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনকে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের মতবাদ। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে – সামরিক স্বৈরতন্ত্রের কোন জনসমর্থন থাকেনা, অপরদিকে ফ্যাসিবাদের বৈধতা চেতন কিংবা অবচেতনভাবে জনগণের কাছ থেকেই আসে। ফলে,একটি চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় দমন-পীড়ণ-নিপীড়ণ-শোষণে সর্বসাধারণের জীবন অতিষ্ঠ হলেও ঠিক কী উপায়ে আন্দোলন সংগঠন ও মুক্তি অর্জন সম্ভব সেই ব্যাপারে জনগণ সম্পূর্ণভাবে থাকে অন্ধকারে।এমনকি দার্শনিক ভিত্তি ছাড়াও ফ্যাসিবাদ টিকতে পারেনা। জার্মানীতিতে হিটলারের আবির্ভাবের পূর্বে শোপেনহাওয়ার-নীৎসে প্রমুখ দার্শনিকরা এই মতবাদের পক্ষে সমর্থন ও প্রচারণা চালান। শোপেনহাওয়ার খুঁজছিলেন একজন ‘জিনিয়াস’; নীৎসে খুঁজছিলেন একজন ‘সুপারম্যান’। পরবর্তীতে হিটলারের মত একজন ফ্যাসিস্ট শাসক জার্মানীর রাষ্ট্র ক্ষমতায় কিভাবে আবির্ভূত হয় তা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়না। মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁর ‘ফ্যাসিজম’ বইটিতে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সমাজ-রাষ্ট্রকাঠামোয় এর বিস্তারের প্রকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এটি পাঠ করা আবশ্যক কারণ এই আজকে পর্যন্ত পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ফ্যাসিবাদ বিরাজ করছে দোর্দন্ড প্রতাপে। ফ্যাসিবাদের শর্ত ও বীজ এবং জনগণ ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে তা অনুধাবনের মধ্যেই রয়েছে ভবিষ্যতের মানবমুক্তির পথ। আমেরিকা বর্তমান পৃথিবীর ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্র এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই কেন্দ্রের মধ্যমণি। সুতরাং, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবের পেছনে সমগ্র বিশ্বের মানুষ কোন প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে তার নির্মোহ স্বরুপ অন্বেষণ করাই মুক্তিকামী মানুষের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য।]

তুলনামুলকভাবে ফ্যাসিবাদ একটি নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ। এটি ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম ইতালিতে আবির্ভূত হয়। তখন থেকেই এটি ইউরোপের সকল দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বেশ কয়েকটিতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সহসা আবির্ভাব এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব স্বাভাবিকভাবেই একে বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য বিষয়ে পরিণত করছে। তবে ফ্যাসিবাদ কর্তৃক সংঘটিত নৃশংসতা সমগ্র প্রগতিশীল ও মুক্তিকামী পৃথিবীকে মর্মাহত করতেও সময় নেয়নি। এর পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক লেখালেখি হচ্ছে এবং হয়েছে। যুক্তিপ্রদর্শনকারী এবং স্তুতিকারী কোনটিরই অভাব না থাকার পরেও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে পশ্চাদগামী এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল পরিবর্তন বলে আখ্যায়িত করা যায়, ক্ষয়প্রাপ্ত পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার চরম প্রচেষ্টা হিশেবে একে চিহ্নিত করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধবংসাত্মক প্রভাব কর্তৃক সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের উৎস। জার্মানিতে এর সাফল্যের পেছনে নানা আপাতযুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা গিয়েছিলো।

তথাপি আমাদের সময়ের এই বিকট অস্বাভাবিকতাকে নিয়ে সেই অর্থে তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে এটি যুদ্ধোত্তর কোন আবির্ভাব নয়। এমন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন হঠাৎ করেই ঘটতে পারেনা। ইতিহাসে বেশ দীর্ঘকালব্যাপী ঘটতে থাকা দার্শনিক ভাবনা বিকাশের অবধারিত ফলাফল হচ্ছে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। যদি ফ্যাসিবাদ একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে তবে এর মতাদর্শগত ভিত্তি নিহিত রয়েছে দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয়ে থাকে ফ্যাসিবাদের কোন দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা এই প্রপঞ্চটিকে বুঝতে বাধা দেয়। সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিশেবে আবির্ভাবের পূর্বেই ফ্যাসিবাদ একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন অর্জন করে এবং তা আঠারো-ঊনিশ শতকের নানা বৈপ্লবিক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের রসদ যোগানো বৈপ্লবিক দর্শনের বিপরীত। ফ্যাসিবাদী দর্শন উত্তর-হেগেলিয়ান আদর্শের যৌক্তিক পরিণতি। অত্যাধুনিক দৃষ্টবাদ (বৈজ্ঞানিক তথ্যই জ্ঞানের ভিত্তি ও সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র নিশ্চত পথ- অগাস্ট কোঁৎ এর মতবাদ-অনুবাদক), নব্য বস্তুবাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের সেই ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ঘরানাসমূহ যা ভাববাদকে বাতিল করার দাবি করে নতুন একপ্রকারের দার্শনিক অতীন্দ্রিয়বাদের অন্বেষণ করে। সেইসব ছদ্মবেশী বা অসৎ ভাবাদর্শ সমূহ প্রয়োগবাদ ও নব্য-হেগেলিয়ানবাদে গিয়ে শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে। প্রথমটি হীন বস্তুবাদের ইন্দ্রিয়সর্বস্ব উদরপূর্তিকরণ দর্শনের সাথে ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সমন্বয় করে এবং পরেরটি জঙ্গিবাদী প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে হেগেলিয়ান যুক্তিশাস্ত্রের বৈপ্লবিক বিকৃতি ঘটায়।
ফ্যাসিবাদ নৈতিকতা, ন্যায়, স্বাধীনতার সকল পার্থিব মানকে লঙ্ঘন করে ঐশ্বরিক অনুমোদন দাবি করে। ইতালীয় ফ্যাসিবাদের আনুষ্ঠানিক দার্শনিক জিওভানি জেন্টাইল প্রথম এই দাবিটিকে ত্বরান্বিত করেন। তিনি বলেন, “মানুষ প্রকৃতিগত দিক থেকেই ধার্মিক। চিন্তার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। যে যত চিন্তা করবে সে তত ঈশ্বরের সান্নিধ্যে নিজেকে অনুভব করবে। যেহেতু মানুষের তুলনায় ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক পশ্চাৎপদতাকে ন্যায়সঙ্গত করার লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদী দার্শনিক আধুনিক ইউরোপের একেবারে গোড়ার মৈলিকসত্য মানবতাবাদকে উপেক্ষা করেছেন।
পার্থিব মুক্তির জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হবার পূর্বে মানুষকে পরলৌকিক অভিভাবকত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হয়েছে। তাই এই কষ্টার্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক সুবিধাদি থেকে মানুষকে বঞ্চিত করতে নবজাগরণের সময়কাল থেকে প্রাপ্ত আধ্যাত্মিক মুক্তি হতে তাকে প্রবঞ্চিত করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।ফ্যাসিবাদী দর্শন কর্তৃক প্রচারিত মানুষের অতি-ধার্মিক আত্মবিলোপ হচ্ছে ঘৃণ্য বস্তুবাদের বহি:প্রকাশ যা বৈপ্লবিক দার্শনিক বস্তুবাদকে বিরোধীতার লক্ষ্যে উত্থিত হয়। ফ্যাসিবাদী বিশ্বাস মেনে নেয়া নশ্বর মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের ধর্মতত্ত্বের সকল বশ্যতা স্বীকার করা সত্তায় পরিণত করে শুধুমাত্র ঈশ্বরের ক্রীড়ানক হিশেবে পুনরুজ্জীবিত হয়, ঈশ্বরের সংকল্প এবং কর্মপ্রক্রিয়া সকল প্রকার পার্থিব অনুশাসনের ঊর্ধে বলে ধরে নেয়। স্বর্গীয় উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কৃত এহেন বর্বরতা ও সহিংসতামূলক কর্মকান্ড যাতে করে বৈধতা পায়, মহাবিশ্বে অনুপ্রবেশ করতে পারে। চিন্তার প্রক্রিয়াকে যাতে করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাই প্রতারণামূলকভাবে এদের “ঈশ্বরের ধ্যান” হিসেবে হাজির করা হয়। এইসব কর্মকান্ড ঐশ্বরিকপন্থায় অনুপ্রাণিত করা হয়। ঈশ্বর অধ:পতিত ও দুর্দশাগ্রস্ত পুঁজিবাদের ঢাল হয়ে ওঠেন এবং কুরুচিপূর্ণ বস্তুবাদের জরাগ্রস্ত ব্যবস্থার প্রত্যেক গোঁড়া ঠিকাদার স্বর্গীয় ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ক্রীড়ানকে পরিণত হয়। এই চাতুর্যপূর্ণ কৌশলের মাধ্যমে ঈশ্বরের ক্রীড়ানকেরা অন্যদের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের জন্য একচ্ছত্র স্বেচ্ছাচারিতা বহাল রাখে। ফ্যাসিস্ট শাসক পরিণত হয় অতিমানবে।
যাইহোক, আত্মপ্রত্যাখানের এই অতি-ধর্মীয় মতবাদ ফ্যাসিবাদের সর্বগ্রাহী দার্শনিক জেন্টাইলকে “মানুষের অন্তহীন ও অবিনশ্বর অস্তিত্ব ” আবিষ্কার করা থেকে নিরুৎসাহিত করেনা। একটি জরাগ্রস্ত সামাজিক ব্যবস্থাকে সংরক্ষণের ঐতিহাসিক অসম্ভব কাজে নিযুক্ত মানুষের এই ‘পবিত্র’ উদ্দেশ্য অবশ্যই “অন্তহীন, নি:শর্ত ও স্বার্থহীন” হতে হবে। জেন্টাইল আত্মপ্রত্যাখান ও ফ্যাসিস্ট শাসকের সর্বেসর্বাত্বের বন্দনার মতো চূড়ান্ত পরস্পর-বিরোধী দুটি মতবাদকে “দার্শনিক” ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কোন অসুবিধাবোধ করেননি। তিনি একজন নব্য-হেগেলিয়ান এবং তিনি জানেন উদ্দেশ্য চরিতার্থের লক্ষ্যে কিভাবে তর্কশাস্ত্রের বিকৃতি ঘটাতে হয়। “আধ্যাত্মবাদী” সুবিধাজনক দর্শন ও প্রয়োগবাদও এক্ষেত্রে তাঁকে সহায়তা করেছে। “ভাবনা হচ্ছে ঈশ্বরের ধ্যান” এই মতবাদে দীক্ষিত করে তিনি মূলত এমন একটি ভূমিকা পালন করেন যেটিকে তিনি যুক্তিশাস্ত্রের একটি অনবদ্য কৌশলগত অনুষঙ্গ বলে বিশ্বাস করেন।
“ঈশ্বর এবং ভাবনা জীবনের দুই বিপরীত প্রান্তের প্রতিনিধিত্ব করে। দুটোই আবশ্যকীয় এবং অপরিহার্য তথাপি একে অন্যের বিপরীত ও পরস্পর বিরোধী” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)।
উপরন্তু, ঈশ্বর এবং মানুষকে জেন্টাইল ঘোষণা করেন, “আত্মউপলব্ধির একটি শ্বাশ্বত গতির নমনীয় ঐক্য; একটি জীবন্ত এবং সেইসূত্রে নিরন্তর ঐক্য যা সবসময় আত্মসত্তার প্রতি অসন্তুষ্ট” (পূর্বোক্ত)। হেগেলিয়ান তর্কশাস্ত্রের করুণ ব্যঙ্গাত্মক বর্ণনা এই নব্য-পান্ডিত্যচর্চা বেশ অদ্ভূতভাবেই হিন্দু অতীন্দ্রিয়বাদেরসাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অতীন্দ্রিয়বাদ কী? এটা কি এমন কোন মানসিক আত্মসংযমহীন অবস্থা যা তমসাচ্ছন্ন জ্ঞান-সংস্কৃতির উপর আস্থাশীল করে এবং পরীক্ষালব্ধভাবে প্রতিপাদ্য বৈজ্ঞানিক সত্যও যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোন দার্শনিক ধারণাকে প্রত্যাখান করে দেয়? জেন্টাইল কর্তৃক ব্যাখ্যাত ফ্যাসিবাদী দর্শন মূলত অতীন্দ্রিয়বাদেরই সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা। ভাবনার অর্থ হচ্ছে ঈশ্বরের উপাসনা করা। তবুও তাঁর সাথে ভাবনার সম্পর্ক বৈপরীত্য, সাংঘর্ষিক!লক্ষ্য একই হবার পরেও কিভাবে সক্রিয় বৈপরীত্যের কর্মসম্পাদনকে নিষ্ক্রিয় ধ্যানের জগতের সাথে সনাক্ত করা যেতে পারে তা বোঝা যুক্তিবাদী মনের আয়ত্তের বাইরে। কিন্তু আধ্যাত্মবাদী ধারণাও যুক্তির সীমারবাইরে। সুতরাং ভাবনাকে গভীর ধ্যানের দ্বারা চিহ্নিত করা একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্ভাবন। কোন একটি বিষয়কে নিয়ে ভেবে আমরা জ্ঞানপ্রাপ্ত হই। ধ্যান এমন কোন ফললাভের দিকে পরিচালিত করেনা। এর মানে হচ্ছে ইতোমধ্যে জ্ঞাত বিষয়ের মধ্যেই বিরাজ করা। কেউ যদি ধর্মীয় পূর্বানুমান গুলো দিয়ে শুরু করে তবে সে কেবলমাত্র ঈশ্বরের উপর আরোপিত গুণগুলোই ধ্যান করতে পারে। কিন্তু পূর্বানুমান তার ধ্যানের উদ্দেশ্যকে ভাবনা নামক মানসিক কাজ থেকে দূরে স্থাপন করে। তাই এটা স্রেফ চিন্তার একটি সম্পূর্ণ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যা ভাবনাকে ধ্যান কর্তৃক চিহ্নিত হতে দেয়না অথবা জ্ঞানতত্ত্বের মূলনীতির একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি সাধন।
যাইহোক, এই অতীন্দ্রিয়বাদ যতই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ এবং তমসাচ্ছন্ন হোক না কেন এর প্রায়োগিক উপপাদন খুবই স্পষ্ট।এগুলো সম্পূর্ণ চূড়ান্ত কদর্যভাবে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী। হেগেলিয়ান রাষ্ট্রতত্ত্ব অনুপ্রেরণা নিয়ে জেন্টাইল ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে দার্শনিক অনুমোদন হাজির করেন, “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র আলিঙ্গন ও অন্তর্ভূক্ত করে সকল আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ যার মধ্যে ধর্মও রয়েছে। … …. যে রাষ্ট্র অন্য কোন সার্বভৌম ক্ষমতাকে মেনে নেয় সেই রাষ্ট্র আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। যা আধ্যাত্মিক তাই স্বাধীন কিন্তু রাষ্ট্রের – (যা নিজেই আধ্যাত্মিক) ক্ষমতার চূড়ান্ত সীমার মধ্যে” (পূর্বোক্ত)। আধ্যাত্মিক ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের স্বর্গারোহিত ক্ষমতা কোন হীন বস্তুবাদী উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত তা “ফ্যাসিবাদী চর্চা” শীর্ষক অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। বুর্জোয়ারা ফ্যাসিবাদী স্বৈরতন্ত্রের নিষ্ঠুর অনুষঙ্গ দ্বারা তাদের হ্রাসমান ক্ষমতাকে রক্ষা করতে “রাজার ঐশ্বরিক অধিকার” এই দাবির উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিতে চায়। রাজার ধারণা অতীত হতে পারে কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত হেগেলিয়ান দার্শনিক মতবাদ অনুযায়ী বিমূর্তভাবে লব্ধ রাষ্ট্রের স্বর্গীয় অনুমোদনের বিশেষ সুবিধা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধভাবে না হলেও যৌক্তিকভাবে গত হওয়া রাজার ধারণা নতুন মোড়কে রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণী দাবি করতেই পারে। “রাজা কোন ভুল করতে পারেনা”- এই মধ্যযুগীয় প্রভুত্বব্যঞ্জক উক্তিকে ফ্যাসিবাদী দার্শনিকেরা “রাষ্ট্র কোন ভুল করতে পারেনা”- এই অনুশাসনমূলক উক্তিতে রুপান্তর করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের শেকড় গীতার স্বর্গীয় দর্শনে খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে বলা হয়েছে পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষমতা (বিভূতি) হচ্ছে ভগবানের ক্ষমতা। তাই দার্শনিকভাবে ফ্যাসিবাদ নতুন কোন প্রপঞ্চ নয় অথবা এটা বলাও ভুল হবে যে এর কোন দর্শন নেই। ফ্যাসিবাদ জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির অনিবার্য পরিণতি। গীতা প্রচারিত মতবাদ এবং নব্য-হেগেলিয়ান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের দার্শনিকতত্ত্বের ধারণার মধ্যে সঙ্গত যোগসূত্র খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিস্ট স্বৈরতন্ত্রের দর্শন আধুনিক অতীন্দ্রিয়বাদ ও আধ্যাত্মবাদ থেকেই উৎসারিত যা জীবনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া পর্দশন করে। এর ভারতীয় পূর্বপুরুষদের শোপেনহাওয়ারের মধ্যদিয়ে চিহ্নিত করা যায় যাঁর শিষ্য নীটশে ছিলেন ফ্যাসিবাদী দর্শনের জনক। আরও তলিয়ে দেখার পূর্বে, এই বিকট আবির্ভাবের আধ্যাত্মবাদী অবিবেচনার সাথে কিছুটা পরিচিত হওয়া যাক। “ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের একটি গভীর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য ও যথার্থতা রয়েছে।ফ্যাসিবাদী মতবাদ নিহিত রয়েছে তার কর্মপ্রবাহে। এটা কোন বদ্ধ মতাদর্শিক ব্যবস্থা নয়। এটা একটা নতুন ধরণের ভাবনা, নতুন ধরণের জীবনব্যবস্থা।ধর্মানুভূতি হচ্ছে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য” (জি.জে-পূর্বোক্ত)। ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য তার কর্মপ্রবাহে পরিস্কারভাবে ব্যক্ত হয়েছে যা এর দার্শনিকের মতে একটু মতবাদ হিশেবে আত্মপ্রকাশ করে। ফ্যাসিবাদী আন্দোলন মোহমুক্ত পাতি-বুর্জোয়া জনতাকে একটি ধর্মোন্মাদ বাহিনী হিসেবে একত্রিত করে এবং তাদেরকে একটি কূট ধর্মযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় যা জনসাধারণের পুরনো দাসত্বের শেকলেই নতুন প্রলেপ দিয়ে থাকে। ফ্যাসিবাদী শক্তি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দাসদের বিদ্রোহকে সহিংস উপায়ে দমিয়ে রাখে এবং ঘৃণ্য ভূমিকা পালনে একে পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াতন্ত্র। ফলে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচারী ক্ষমতা লাভে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। ফ্যাসিবাদের “দৃঢ়মূল আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য” প্রত্যক্ষ করা যায় বহু বছর ধরে সংঘটিত অসংখ্য সহিংসতার মধ্যে। এর সবটাই প্রয়োগের দিক থেকে কুরুচিপূর্ণ বস্তুবাদ তথা পুঁজিবাদকে রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব হিশেবে কৃত। এই ধরণের কাজ কিভাবে “দৃঢ় আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যের” সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়? ফ্যাসিস্ট দার্শনিক এর জবাব দেন: ফ্যাসিবাদের কোন নীতি নেই। এটি কোন যৌক্তিক মতাদর্শের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আধ্যাত্মবাদের কোন কারণ জানা নেই; এর মধ্যে যুক্তির কোন স্থান নেই। ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের বহি:প্রকাশ ঘটে এর স্বেচ্ছাচারিতায়। পুঁজিবাদী আধিপত্যের উপযোগিতা এই আধ্যাত্মবাদের উন্মত্ত আবির্ভাবের একমাত্র নীতি। ফ্যাসিবাদ নিজেকে প্রকৃত দার্শনিক তত্ত্ব ও যৌক্তিক নীতির বলয়ে জড়াতে চায়না।
এটি পুঁজিবাদী সভ্যতার হীন বস্তুবাদ থেকে সমাজের মুক্তির চেষ্টায় রত শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত ধর্মযুদ্ধে যেকোন বর্ম ব্যবহারের ইচ্ছাপোষণ করে। একটি রহস্যজনক স্বর্গীয় ইচ্ছা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য, ধর্মানুভূতির মতবাদ পার্থিব ক্ষমতার অবাধ স্বেচ্ছাচারিতায় খুবই কাজে আসে যেন একটি অতিমানবিক উদ্দেশ্যের নির্দেশ পালন করা যার কোন অনুশাসন নেই; যার কাছে মানবসৃষ্ট বিধি-বিধানের কোন বৈধতা নেই। তথাপি,জেন্টাইলের মতে, ফ্যাসিবাদ “প্রত্যেকটি বিমূর্ত, যৌক্তিক, অধর্মীয় চিন্তা, এমনকি অপ্রকৃত উদারনীতিবাদ এবং প্রকৃত বস্তুবাদী বন্ধনহীন নির্মাণশৈলীর প্রথা ও ব্যবস্থার” ঘোষিত শত্রু। এখানে আমরা আধ্যাত্মবাদকে তার প্রকৃত তাৎপর্য সমেত নগ্নরুপে পাই। ফ্যাসিবাদ ধর্মসম্বন্ধীয়; তাই এটি যুক্তিবাদকে অনিষ্ট এবং উদারনীতিবাদকে অপ্রকৃত ঘোষণা করে। এটি দার্শনিক বস্তুবাদের বিরুদ্ধে কারণ তা ঘৃণ্য বস্তুবাদী চর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত তত্ত্ব। এটি ধর্মের রক্ষাকারী কারণ বিশ্বাস অজ্ঞতার পারিতোষিক বরাদ্দ করে যা গণমানুষকে সহজেই শোষণ উপযোগী করে তোলে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top