ফ্লাডলাইট

ঐতিহাসিক টেস্ট ও কিছু পুরনো প্রশ্ন

bangladesh india test 2017 neon aloy নিয়ন আলোয়

২০০০ সালের নভেম্বরের দশ তারিখ, টেস্ট ক্রিকেটের কৌলিন সাদা পোশাক ও লাল বলের দুনিয়ায় বাংলাদেশের হাতেখড়ির দিন।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ব্লেজার পরে নাইমুর রহমান দুর্জয় যখন সৌরভ গাঙ্গুলীর সাথে টস করতে নামছিলেন, হয়তো ভাবেন নি ৫ বছরের মাথায় বাংলাদেশ এই কুলীন দুনিয়ায় প্রথম জয় তুলে নেবে, ১২ বছরের মাথায় তুলে নেবে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি এবং ১৬ বছরের মাথায় এই কুলীন দুনিয়ার সবচেয়ে পুরোনো বাসিন্দা ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেবে, তাও তিনদিনে।

খুবই অযৌক্তিক হলেও ধরে নিলাম এসবের সবকিছুই তিনি ভেবেছিলেন। কিন্তু এটা হয়ত ঘুণাক্ষরেও ভাবেন নি যে, টেস্ট দুনিয়ায় হাতে খড়ি ধরাতে সাহায্য করলেও নিজেদের মাটিতে টেস্ট খেলতে আমন্ত্রণ জানাতে জানাতে ভারত লাগিয়ে দেবে ১৬ বছর ৪ মাস।

ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৭। অবশেষে ঐতিহাসিক হায়দ্রাবাদ টেস্টে মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। 
ফলাফলটাও এসেছে প্রত্যাশিতই, দু’দলের দিক থেকেই। তবে আরেকটু হলেই অপ্রত্যাশিত ফলাফল আসতে পারত। এই ‘আরেকটু’ গুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক তবে।

মুশফিকুর রহিম মিতু, লর্ডসের অভিষেকের পর থেকে আজ পর্যন্ত ক্যারিয়ারের বয়স হয়ে গেছে প্রায় ১২ বছর। গ্লাভস ছাড়া খুব বেশি সময় থাকেন নি। তবে এখন থাকা দরকার হয়ে পড়েছে। ব্যাটসম্যানের ব্যাট ছুঁয়ে আসা বল ফার্স্ট স্লিপ পর্যন্ত ক্যারি করবে কি করবে না- সেটা বোঝার মত আন্দাজ ১২ বছরেও যদি না আসে, কিংবা ব্যাটসম্যান উইকেট থেকে কয়েক ফুট বাইরে চলে যাবার পরে দুই-তিন বারের চেষ্টায়ও হাতের লাল বলটি দিয়ে স্টাম্পের ওপরে থাকা বদমাশ বেলগুলোকে নামাতে না পারলে আদৌ উইকেটকিপিং গ্লাভসেরই কোন দরকার আছে কিনা, সে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। এছাড়া অধিনায়ক হিসেবে অজস্র ভুল সিদ্ধান্তের কথা বাদ দিলাম। ৬২ তম ওভারে তাইজুলের বলে কোহলি ফ্রন্টফুটে ডিফেন্স করলেন, খালি চোখে দেখা গেল বল লেগেছে ব্যাটের ঠিক মাঝ বরাবর। সেটিকেও রিভিউ নিয়েছিলেন তিনি,সেটাও বাদ দিলাম।

মেহেদী হাসান মিরাজ টেস্ট ক্রিকেটে নতুন, তাই ধরে নিলাম সহজতম রানআউট চান্সটি এমনিতেই মিস হতেই পারত। তাছাড়া পরে উইকেট নিয়ে ঠিকই পুষিয়েছেন মিরাজ। সাব্বির মিস করেছেন হাফ চান্স, তামিম ইকবাল মিস করলেন সহজ ক্যাচ। সব মিলে ভারত করে ফেলল ৬৮৭ রানের পাহাড়। বিরাট তুললেন আরো একটা ডাবল সেঞ্চুরি।

৬৮৭ তে পাহাড়ে চাপা পড়ে ১০৯ রানেই নেই ৪ উইকেট। এর মধ্যে সাকিব আল হাসান স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে খেলে করলেন ৮২, এরপরে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতেই আউট হলেন, পরে স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে বললেন, “এমন করেই সফল হয়েছি, এমনটা না খেললে তো আর সাকিব থাকব না।” ওয়ানডেতে দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিক এবি ডি ভিলিয়ার্স ১১ স্ট্রাইক রেটেও রান করেছেন দলের স্বার্থে। তিনি এবি ডি ভিলিয়ার্স থেকে জাভেদ ওমর বেলিম বা অ্যালিস্টার কুক হয়ে যাননি। তবে হ্যাঁ, সাকিব-বিহীন সাকিবের আমাদের দরকার নেই, শুধু চাই আপনি গ্রেট হোন। আর দলের স্বার্থে গিয়ার পরিবর্তন করতে না পারলে গ্রেট হওয়াটা কঠিনই বটে।

বাকিটা মুশফিক শো। গিয়ার বদলে খোলসে ঢুকে গেলেন। প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও খেলা টেনে নিয়ে গেলেন ৪র্থ দিনের প্রথম সেশন পর্যন্ত। বিরাট কোহলি বাধ্য হলেন এক সেশনের জন্য দলকে আবার ব্যাটিং এ নামাতে। ৪র্থ দিনের ২য় সেশন ব্যাট করে বাংলাদেশকে দিলেন ৪ সেশনে ৪৫৯ রানের টার্গেট। 

এবারও টপ অর্ডারের ধস, ৪ উইকেট নেই এবার ১০৬ রানে। সাকিব অবশেষে ভালো বলে আউট হলেন, তবে মুশফিকুর রহিম বীভৎস শট খেলে আউট হলেন। বাকিটা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির, মিরাজ আর রাব্বিদের লড়াই এর গল্প। শেষমেষ ২৫০ রানেই অলআউট হয়ে শেষ হল ঐতিহাসিক টেস্ট। প্রাপ্তি বলতে দুটো, এক হল ভারতের মাটিতে সফরকারী হিসেবে ৪র্থ সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড আর দুই হল ৯ নম্বরে একজন কামরুল হাসান রাব্বি। রাব্বির সমান ধৈর্যটা ওপরের ব্যাটসম্যানরা দেখালেই ফলাফল অন্যরকম হতে পারত। কিংবা ১৭ বছর আগে অভিষেক টেস্টে ১৪৫ রান করতে আমিনুল ইসলাম বুলবুল খেলেছিয়েন ৩৮০ বল,খালেদ মাসুদ পাইলট ৩২ রান করেছিলেন ১২১ বলে। তেমনটা হলেও মন্দ হত না।

অবশেষে দিন ফুরোল,নটে গাছটি মুড়লো,
আরো একটি টেস্ট শেষ হলো।

বরাবরের মতই আমরা প্রশ্ন করছি, তবে প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোই বাদ দিয়ে ফেলছি। সবকটা প্রশ্নই পুরনো।

আমরা প্রশ্ন করছি, ভারত আমাদের আমন্ত্রণ জানাতে ১৭ বছর লাগিয়ে দিল কেন?
প্রশ্ন করছিনা আমরা কেন তাদের বাধ্য করতে পারিনি।

আমরা প্রশ্ন করছি, ১৭ বছরে মাত্র ৯৮টা টেস্ট কেন?
আমরা প্রশ্ন করছিনা, এখনো ২ টেস্টের সিরিজ আয়োজন করে যাচ্ছি কেন?

আমরা প্রশ্ন করছি, নিয়মিত ১২-১৩ কিংবা ১৪-১৫ মাস টেস্ট ম্যাচ খেলা ছাড়া থাকতে হয় কেন?
আমরা প্রশ্ন করছিনা, বিসিবির কূটনীতি এত দূর্বল কেন?

প্রশ্ন করছি, খেলোয়াড়দের টেম্পারমেন্ট কই?
প্রশ্ন করছিনা, টেম্পারমেন্ট আসবে কোথা থেকে?
প্রশ্ন করছিনা, ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো এমন হাস্যকর কেন? পাড়ার বা গলির খেলার সিরিয়াসনেসও এতে পাওয়া যায় না কেন?
প্রশ্ন করছিনা, এতগুলো স্টেডিয়াম থাকার পরেও হোম এন্ড অ্যাওয়ে ভিত্তিতে ঘরোয়া ক্রিকেট হয়না কেন?
প্রশ্ন করছিনা, বিভাগীয় স্বায়ত্বশাসিত ক্রিকেট এসোসিয়েশন নেই কেন?
প্রশ্ন করছিনা, জাতীয় দলের বাইরে গেলেই খেলোয়াড়দের পথে বসে যাবার অবস্থা হয় কেন?
প্রশ্ন করছিনা, ৪ দিনের ম্যাচের ভালো পারফর্মারকে টি২০ বা ওয়ানডে খেলিয়ে খেলিয়ে ছুঁড়ে ফেলা হয় কেন? 

এ না করা প্রশ্ন অর্থাৎ এড়িয়ে যাওয়া প্রশ্নগুলো যতদিন থাকবে, ১৭ হবে ২৭, ২৭ হবে ১২৭… আর টেস্ট ক্রিকেটে আমরা ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ই থেকে যাব। আর ৫ দিনে টেস্ট গিয়েছে এমনটা দেখে আর ‘দলটি হৃদয়,পাকস্থলি ও কিডনি জিতে নিয়েছে’ এমনটা শুনেই খুশি হয়ে থাকতে হবে। 

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top