ইতিহাস

একজন সক্রেটিস (প্রথম পর্ব)

সক্রেটিস নিয়ন আলোয় neon aloy

খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সাল ।
এথেন্সের এক সন্ধ্যাবেলা । সক্রেটিস তার মৃত্যুর পর যে পোশাকটি পড়বেন, সেটি যত্ন করে ভাঁজ করলেন । তিনি চান না এটা নিয়ে পরে কোন ঝামেলা হোক, এমনকি তার মৃতদেহ কেউ স্পর্শ না-করারই পক্ষে তিনি । ঘণ্টাখানেকের মাঝেই তার মৃত্যু কার্যকর করা হবে । অথচ তিনি নিরুত্তাপ হাসি-মুখেই প্রিয়জনদের সাথে শেষ কুশল বিনিময় করছেন । সক্রেটিস তার শিশু পুত্রকে সাবলীল ভাবেই বললেন-‘তুমি যাও- গিয়ে শুয়ে পড়’ ।

অবশেষে জেল কর্মকর্তার ডাক পড়ল । সক্রেটিস অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পোশাকটি পরে নিলেন । জল্লাদের সম্মুখেও তিনি স্বভাবগত ধীর-স্থির । জল্লাদ তাঁকে সাবধান করে দিল- ‘এক ফোটা হেমলকও যেন না পড়ে’ । সাথে আরও বলে দিল- ‘খাওয়া শেষ হলে কিছুক্ষণ পায়চারি করবে’ । বিষ দ্রুত সারা শরীরে পৌঁছে যাওয়ার জন্যই এই আদেশ । হেমলক ভর্তি গ্লাস হাতে তুলে নেয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে সক্রেটিস তার বন্ধু ক্রিটোকে ডেকে বললেন- “ক্রিটো, অ্যাসক্লেপিয়াস আমাদের কাছে একটি মোরগ পায়, তার ঋণ পরিশোধ করতে ভুলো না যেন।” এরপর তিনি আর কোন কথা বলেন নি, মৃত্যুর আগে এটিই ছিল সক্রেটিসের শেষ উক্তি । অ্যাসক্লেপিয়াস হলেন আরোগ্য লাভের দেবতা; মৃত্যু- দেহ থেকে আত্মার মুক্তি বলেই কিনা শেষ মুহূর্তেও তিনি নিজেকে এভাবে মহিমান্বিত করে গেলেন কে জানে ! অথচ তার বিরুদ্ধে যে তিনটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয় এর প্রথমটিই ছিল- প্রচলিত দেবতাদের প্রতি অবমাননা । তাছাড়া তিনি নিজেও একসময় ঈশ্বরের কৃপা চিহ্নিতকারী মূর্তি তৈরি করেই পেট চালাতেন । প্রহসনের বিচারে তার বিরুদ্ধে বাকী দুটো অভিযোগ ছিল- নতুন নতুন দেবতা প্রবর্তন এবং নৈতিক চরিত্র কলুষিত করে যুবকদের বিপথগামী করার চেষ্টা । সক্রেটিস যখন এক ঢোকে তিক্ত বিষের সবটুকু গিলে ফেললেন- মুখের এতটুকু বিকৃতি ছাড়া, তখন সারা হল রুম জুড়ে বিষাদের ছায়া নেমে আসে, এক লোক মৃগী রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে অজ্ঞান হয়ে যায় । এমনকি জেল কর্মকর্তার দুচোখও তখন অশ্রুতে টলমল করছিল । সক্রেটিস জল্লাদের কথা মতই উঠে কিছুক্ষণ হাঁটার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার পা দুটো দ্রুতই অবশ হয়ে আসে, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন ।

কে এই সক্রেটিস, কি এমন আহামরি কাজ করেছেন তিনি ? তিনি সাহিত্য বা তত্ত্বকথা লিখে যান নি । এমনকি শিক্ষার স্বাস্থ্যকর পরিবেশেও গড়পড়তা এথেন্সবাসীর চেয়ে সক্রেটিস ছিলেন বেশ পিছিয়ে । আর্থিক অবস্থাও ভাল ছিল না তার, সংসার জীবনেও ছিলেন অসুখী । বাঁকা কথা বলার কারণে অনেকের কাছেই ছিলেন চক্ষুশূল । তিনি প্লেটোর মত সুদর্শনও ছিলেন না, ছিলেন খর্বাকার ভুঁড়িওয়ালা, তার মাথায় ছিল টাক, নাক চ্যাপ্টা, চোখ ছোট ছোট, গ্রিক হয়েও তার চেহারা ছিল মঙ্গলোয়েড ধাঁচের । অবশ্য তিনি খুব রসিক প্রকৃতির ছিলেন, নিজের নাক নিয়েও একবার রসিকতা করে বলেছিলেন- “নাসারন্ধ্রটি বড় থাকায় ঘ্রাণ নিতে বিশেষ সুবিধা, আর নাকটা চ্যাপ্টা হওয়াতে দৃষ্টিও কোথাও বাঁধা পায় না !” সক্রেটিসের আরেকটি গুণ ছিল, সবাই তাঁকে ‘ভাল মানুষ’ হিসেবে চিনত । তবে ভাঁড় বা ভাল মানুষীর জোরে কেউ দীর্ঘ ২০০০ বছর ধরে পশ্চিমা সংস্কৃতি, দর্শন ও সভ্যতাকে প্রভাবিত করে যাবে- এমনটা দিবাস্বপ্নেও চিন্তা করা অসম্ভব । হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এরও এক হাজার বছরেরও অধিক কাল পূর্বে জন্ম নেয়া এই মানুষটি এখনও যে আমাদের অন্তরাত্মাকে নাড়া দেন, সেটি কেবলমাত্র জীবনকে বুঝার মৌলতম সূত্র ‘নিজেকে জানা’র সহজ রাস্তা তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে প্রকাশ করে যাওয়ার কারণে । জ্ঞান অর্জনে সক্রেটিস ছিলেন আপোষহীন, তাঁর সমস্ত বক্তব্যের সারকথাও তাই- জ্ঞান অর্জনের তরেই জীবনের স্বর্গীয় সার্থকতা ।

জ্ঞান বিষয়ে তাঁর মন্তব্যগুলো –

The unexamined life is not worth living.

The only good is knowledge and the only evil is ignorance.

সক্রেটিস যে জ্ঞানের কথা বলেছেন সেটি প্রথাগত শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নয় । তাঁর কথায়- “টাকার বিনিময়ে শিক্ষা অর্জনের চেয়ে অশিক্ষিত থাকা ভাল” । সক্রেটিস কোনদিন জ্ঞান বিতরণের জন্য একটা পয়সাও নেন নি । শিক্ষকদের সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল- “জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল” ।

এর জন্যই জ্ঞান বলতে সক্রেটিস তাই একটা কথাই বারবার বলে গেছেন- “প্রকৃত জ্ঞান নিজেকে জানার মধ্যে, অন্য কিছু জানার মধ্যে নয়” । তবে প্রত্যেকের নিজেকে জানার বিষয়টি সহজতর করতে আমৃত্যু তিনি চেষ্টা করে গেছেন । তিনি বলতেন- “আমি কাউকে কিছু শিক্ষা দিতে পারব না, আমি শুধু তাদের চিন্তা করাতে পারব” । এই ইচ্ছার তীব্রতা বুঝাতে একবার তিনি বলেছিলেন- “নিজেকে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেয়াই আমার অভ্যাস; আর এজন্যই এমনিতে না পেলে পয়সাকড়ি দিয়েও আমি দার্শনিক আলোচনার সাথী সংগ্রহ করতাম” । জ্ঞানের প্রতি এমন অন্তঃপ্রাণ মানুষের কখনো মৃত্যু নেই, সক্রেটিস তাই আজও আমাদের জীবন অনুশীলনের শিক্ষাগুরু । মৃত্যু নিয়ে তাঁর মহান উক্তির কথা মনে পড়ে- “আমরা যা জানি না- তা ভাল না খারাপ, সেটা মূল্যায়ন করাই বোকামি” । আমরা এই জানার অভাবেই নানাভাবে আজো এই জীবন যাতনা বয়ে চলেছি ।

জ্ঞান শব্দটি জটিল, ব্যাপক আর বহুমুখী । তবে জ্ঞান অর্জনের রাস্তাটি কিভাবে আর কোথা হতে শুরু করতে হয়- সেটিও সক্রেটিসের জীবন পর্যালোচনা করলে সত্যিকার বোধগম্য হয়ে উঠে । বর্তমান সময়েও সেটি সমভাবে কার্যকর বলেই “সক্রেটিসীয় শিক্ষা” বিষয়ে ধারাবাহিক বর্ণনা ২য় পর্বে তুলে দেয়ার চেষ্টা থাকবে ।

একজন সক্রেটিস (দ্বিতীয় পর্ব)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top