গল্প-সল্প

কোন এক ভালোবাসা দিবসে…

ভালবাসা দিবস নিয়ন আলোয় neon aloy

গার্লফ্রেন্ড না থাকাটা মনে হয় অনেক বড় ধরণের একটা অপরাধ । চারপাশের মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আজকে অন্তত তাই মনে হচ্ছে । বিকেলের মিষ্টি পরিবেশে চা খেতে এসে মেজাজটাই বিগড়ে গেল । দোষটা আসলে আমারই । প্রেমিক-প্রেমিকাদের ডেটিং প্লেসে এসে পরগাছার মতো রেস্টুরেন্টের একটা টেবিল দখল করে বসাটা নিশ্চয়ই অমূলক । কিন্তু , কি আর করা …… সিঙ্গেল মানুষ বলে তো আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়া যায়না ।

অন্যদিনের তুলনায় আজকে কপোত–কপোতীদের ভিড়টা একটু বেশি । এই রেস্টুরেন্টে আগেও খেতে এসেছি , কিন্তু আজকের পরিবেশটা একটু অন্যরকম । ভিড়ের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কিছুক্ষণ পরেই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম । আজকে যে ভ্যালেন্টাইন ডে , সেটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম । সিঙ্গেল থাকলে যা হয় আর কি!

চারপাশের এত এত প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের মাঝে আমাকে একটু বেমানানই লাগছিলো । সবাই কেমন করে জানি আমার দিকে তাকাচ্ছে । একটু লজ্জাবোধও হচ্ছিলো । তবুও , লজ্জাটাকে পাত্তা না দিয়ে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে রেস্টুরেন্টের কাঁচের ফাঁক দিয়ে বাইরের রাস্তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম । একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছুক্ষণের জন্য একটা ঘোরের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম । ঘোর ভাঙল মিষ্টি একটা ডাকের মাধ্যমে ।

-এই যে শুনছেন ?
তাকিয়ে দেখি অতীব সুন্দরী এক রমণী আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে ।
-জী , বলুন ।
-আপনি মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন । সরি । আসলে রাস্তায় এত জ্যাম , তাই আসতে একটু লেট হয়ে গেলো ।

কিছুক্ষণ চিন্তা করলাম , আমি কি স্বপ্নের দেশে আছি নাকি বাস্তবে আছি …… চারপাশের পরিবেশটা আবার ভালো করে খেয়াল করলাম । নাহ , বাস্তবেই তো আছি । তাহলে , এটা কিভাবে সম্ভব ? আমি এই সুন্দরী মেয়েটির জন্য অপেক্ষা করছি , আর আমিই তা জানিনা …… স্বপ্ন আর বাস্তবের হিসেব মেলাতে যখন আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি , ঠিক তখনই আবার একটা মিষ্টি বুলিতে মেয়েটির দিকে ফিরে তাকালাম ।

-আমি কি বসতে পারি ?

কি করবো , বুঝতে পারছিলাম না । কিন্তু , ভদ্রতার খাতিরে বসতে তো বলতেই হয় ।

-হ্যাঁ , অবশ্যই । বসুন ।
-কিছু মনে করবেন না । আসলে আপনাকে দেখে বোঝাই যায় না যে আপনি এত সুন্দর করে রোমান্টিক গল্প লিখতে পারেন ।

(সেই সময়টাতেই আমি লেখালেখি শুরু করেছিলাম । মেয়েটার সাথে দেখা হওয়ার প্রায় কয়েকদিন আগেই ‘ভালবাসার ডাকপিয়ন’ এ আমার একটা লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো । মোটামুটি ভালোই সাড়া পেয়েছিলাম সেই সময়টাতে । ভাবলাম , মেয়েটা হয়তো সেই লেখাটার কথাই বলছে । কিন্তু , আমাকে কিভাবে চিনলো ? আর , কিভাবেই বা জানলো যে আমি আজ বিকালে এখানে আসবো ? এইসব ব্যাপারে একটা বড় ধরনের খটকা মনের মধ্যে রয়েই গেলো । রহস্যটা খোলাসা করার জন্য মেয়েটার সাথে আরও কথা বলতে হবে । এই চিন্তা করে আমি আবার কথা বলা শুরু করি)

-নাহ । আমি কিছু মনে করি নাই । By The Way, Thanks……..
-আপনি কি ফটোগ্রাফার ?
(আমার বাম হাতে চেপে ধরে রাখা ক্যামেরার ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করার যৌক্তিকতা খুঁজে পেলাম)
-জী ।
-কখনও তো এই ব্যাপারে বলেন নাই ……
(আরে আজব তো …… আপনাকে জীবনে আজই প্রথমবারের মতো দেখলাম । আগে কখনও দেখা হয়েছে বলে তো মনে হয় না । তাহলে , বলবো কিভাবে ? আপনি কি পাগল ?)

মনে মনে কথাগুলো চিন্তা করছিলাম । কিন্তু , ভদ্রতা দেখিয়ে কিছু না বলে বোকার মতো একটা মুচকি হাসি দিলাম ।
-ভালোই হল । এখন থেকে আমার সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিবেন ।
(আরে , ভালো পাগলের পাল্লায় পড়লাম । আমি আপনার ছবি তুলতে যাবো কেন ? আমার কি আর কোন কাজ নেই ?)

অবচেতন মনের কথাগুলোকে দূরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে আবারও মিষ্টি করে হাসি দিয়ে কথা বলা শুরু করলাম :
-জী , অবশ্যই । আচ্ছা , আপনি কি আমাকে সত্যিই চেনেন ? আর , চিনলেও কিভাবে বুঝলেন যে আজকে বিকালে আমি এই রেস্টুরেন্টে থাকবো ?
-আরে , আপনি এসব কি বলছেন ? চিনবো না কেন ? খুব ভালো করেই চিনি …… গতকালকেই তো আপনি আর আমি মিলে আজ এই রেস্টুরেন্টে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । এত তাড়াতাড়ি সব ভুলে গেলেন কিভাবে ? (মুখে একটা মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে)
আমার মনে হচ্ছিলো কিছুক্ষণের মাঝেই আমি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবো । এই মেয়েটাকে আমি চিনি , গতকাল তার সাথে কথা বলে এই রেস্টুরেন্টে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি …… কিন্তু , আমিই কিছু জানি না । আমি কি পাগল হয়ে গিয়েছি ?

গোলকধাঁধার আবর্তে পড়ে যখন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না , তখন আরেকটা ব্যাপার দেখে মেজাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলো । পাশের টেবিলে বসা একটি ছেলে আমার সামনে বসে থাকা অপূর্ব রমণীটির দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে । কিছুক্ষণ পরপরই তার এই বিরক্তিকর চাহনি দেখে মেজাজটা আর ঠিক রাখতে পারলাম না । এগিয়ে গেলাম ছেলেটির দিকে ……
-কি ব্যাপার , ভাই ? সুন্দরী মেয়ে দেখলে কি হুঁশ থাকে না ? ওই মেয়েটার দিকে কিছুক্ষণ পর পর এমন ড্যাবড্যাব করে তাকাচ্ছেন কেন ?
হঠাৎ এমন পাল্টা আক্রমণে ছেলেটা কিছুক্ষণ বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । নায়কের মতো ডায়ালগগুলো বলে আমি আবার আমার টেবিলে এসে বসলাম ।
-কি ব্যাপার ? উনি আপনার বন্ধু নাকি ? হঠাৎ করে উঠে গিয়ে উনাকে কি বলে আসলেন ?
মুখে একটু ভাব এনে বললাম :
-নাহ । বন্ধু না । এলাকার ছোট ভাই । তাই , একটু কথা বলে আসলাম ।

এমন সময় ক্রিং ক্রিং শব্দে মেয়েটির মোবাইল ফোন বেজে উঠলো । মেয়েটা মোবাইল হাতে নিয়েই মোটামুটি চিৎকার করে বলে উঠলো :
-আপনি কে ?
মৃদু চিৎকারে চমকে ওঠা আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠলাম :
-আমি কে মানে ? নিজে থেকে এসে আমার সাথে কথা বলছেন , আবার জিজ্ঞেস করেন ‘আমি কে’?

মেয়েটা আমার উত্তর শোনার অপেক্ষা না করে মোবাইল ফোন রিসিভ করে আবারও মৃদু স্বরে চিৎকার করে উঠলো :
-আপনি কোথায় ?

হঠাৎ খেয়াল করলাম , পাশের টেবিলে বসে থাকা ছেলেটা মোবাইলে কথা বলতে বলতে আমাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসছে (ইনি হলেন সেই ছেলেটি , যাকে আমি কিছুক্ষণ আগে নায়কী ডায়ালগে ঝাড়ি দিয়ে এসেছি)।

ছেলেটি আমাদের টেবিলের সামনে আসতেই সেই সুন্দরী রমণী প্রায় লাফিয়ে উঠলো ।
-আপনিই কি সার্থক ?
-হ্যাঁ ।
-ওহ শিট । আপনার না এই কোণার টেবিলটাতে বসার কথা ছিল ? আপনি এই টেবিলে না বসে অন্য টেবিলে বসলেন কেন ? তাহলে তো এই ভুলটা হত না……

তারপর মেয়েটির কাছ থেকে যে কাহিনী শুনলাম , সেটি শুনে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ । কাহিনীর সারমর্ম হল :
মেয়েটির সাথে ছেলেটির অপরিচিত ফোনকলের মাধ্যমে পরিচয় । আস্তে আস্তে মোবাইলে কথা বলার মাধ্যমে তাদের মাঝে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে । ছেলেটা অনেক সুন্দর গল্প লিখতে পারতো । মেয়েটার সাথে মোবাইলে কথা বলার সময় মাঝে মাঝেই সেই গল্পগুলো সে পড়ে শোনাত । গল্পগুলো শুনতে শুনতে মেয়েটা ছেলেটির প্রতি আরও আকৃষ্ট হয়ে পড়ে । এক সময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় , ভ্যালেন্টাইন ডে তে তারা সরাসরি দেখা করবে । দেখা করার জায়গা হিসেবে বেঁছে নেয়া হয় , এই রেস্টুরেন্টটি । কথা ছিল , ছেলেটা আগে এসে একেবারে শেষের কোণার টেবিলটাতে বসবে । কিন্তু , জ্যামে আঁটকে পড়ার কারণে ছেলেটার আসতে লেট হয়ে যায় । আর , সেই সময় এই টেবিলটাতে আমি বসে পড়ি । যার ফলে এই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি ……

কাহিনী শোনার পর ছেলেটার দিকে তাকালাম । একবার ‘সরি’ বলতে গিয়েও আবার থেমে গেলাম । কারণ , সে আমার দিকে যে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাতে ভস্ম হওয়ার আগেই পালিয়ে গেলে ভালো হয় । মেয়েটাকে মিষ্টি করে ‘সরি’ বলে চলে আসছিলাম । কিন্তু , আবার পেছন থেকে ডাকার কারণে ফিরে তাকালাম ।

-আমাদের একটা ছবি তুলে দিয়ে যাবেন ?
দেখলাম মেয়েটা হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
ঠিক তখনই ছেলেটা বলে উঠলো:
-আরে নাহ । যান আপনি । ছবি তোলার দরকার নেই ।
মনে হচ্ছিলো , ছেলেটা আমাকে ইচ্ছেমত গালি দিতে পারলে খুশি হতো । কিন্তু , মেয়েটা থাকার কারণে তা পারছে না ।

কি আর করা …… আমিও আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে হাঁটা শুরু করলাম । মনে মনে হাঁসতে হাঁসতে একটা কথাই অস্ফুটস্বরে বের হয়ে আসলো , ‘হায়রে প্রেম , হায়রে ভালোবাসা’……………

 

(অবচেতন মনের কল্পনা , মানুষের সত্য কাহিনী নিয়ে তো অনেক গল্পই লিখলাম। কিন্তু , নিজের কোন কাহিনী নিয়ে কোন গল্প লেখা হয়নি । আজ ‘ভালোবাসা দিবস’ । গত বছরের ‘ভালোবাসা দিবস’ এর কাহিনীটা মনে পড়ে গেলো । তাই ভাবলাম , এবার নিজের জীবনের একটা কাহিনী নিয়ে গল্প লিখলে খুব বেশি মন্দ হয় না । লিখে ফেললাম)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top