নাগরিক কথা

অত্যাচারের নামান্তর পরীক্ষাব্যবস্থার সমূহ সংস্কার কেন দরকার? (শিক্ষাব্যবস্থাঃ ২য় পর্ব)

সহযোগিতার পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ন আলোয় neon aloy

সহযোগীতা বনাম প্রতিযোগীতা (আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাঃ প্রথম পর্ব)

 

“ফার্স্ট হও!”

এটা বাঙ্গালী পোলাপানের বেশির ভাগের ছোট্টবেলা থেকে পাওয়া প্রথম কমান্ড। এমন অনেক কম বাচ্চাকাচ্চাই আছে যাদের ছোট বেলায় বাবা-মা’র “ওর মতো-তার মতো, ফার্স্ট হও, বৃত্তি পাও, আগে যাও, আআআরওওও আগাও যেন তোমাকে ছুঁতে না পারে” মার্কা কথাবার্তা শুনার সৌভাগ্য হয় না। সন্তানও বোঝে, বুঝে অবুঝের মতো ছোটে সবাইকে পেছনে ফেলবার গতির আশায়। পোলাপান থ্রি ইডিয়টস দ্যাখে ঠিকি। দেখা শেষে চোথা মুখস্তে বসে। নইলে জিআরই কিনতে ৩ এর পরে মোটাসোটা দশমিক কম পড়ে যাবে।

ফার্স্ট হওয়া জিনিসটা আমাদের মজ্জায় ঢুকে গিয়েছে বলে লোকাল বাস থেকে শুরু করে বিমানে পর্যন্ত বাঙ্গালী ধাকাধাক্কি করে হলেও আগে উঠতে চায়। এমনকি প্রার্থনায় মসজিদে সবার আগে গেলেও উটের সওয়াব মেলে! :/

তো ফার্স্ট হলে কি লাভ?
কি লাভ মানে!?
ফার্স্ট হলে নিদেন পক্ষে ভার্সিটির টিচার! (রাজনীতি প্লাস পয়েন্ট)
সমাজে সম্মান!
বাপ-মা’র মুখ উজ্জ্বল!
বিয়েতে সুপাত্র!
সব পথঘাট খোলা!
শুধু মাত্র ফার্স্ট কিংবা তার কাছাকাছি বলে!

আচ্ছা ফার্স্ট বয়, তুমি ফেল করেছো?
কখনোই না?
কিন্তু মানুষ মাত্রই তো ভুলশীল, ভুল সে করবেই।
তখন?
গর্তে পড়লে কি করে ওঠো?
রবার্ট ব্রুস তাও সাতবারে পার পেয়েছেন।
আমি সাতবারেরও বেশি চেষ্টা করে হারতে দেখেছি!
এই আশেপাশেই থাকে তারা!
তবুও কি চেষ্টা অনিচ্ছায় সার্টিফিকেটটা নেবার।

হ্যাঁ। আমরা নকল করি। পড়ি না সারা সেমিস্টার! দেখে লিখে পাস করার ধান্দা করি। কেন করি?
“যেভাবে আপনারা পড়ান, তাতে আগ্রহ জাগে না।”

ভাত হয়েছে কিনা সেটা জানার জন্য কয়েকটা ভ্যারিয়েবল দেখলেই হয়। দেশের আপামর শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি দেখতে চান?
র‍্যাঙ্কিং দেখতে পারেন। টপচার্টে পঁচে গলে যেতে বসা পাকি দেশের লাহোর ইউনিভার্সিটিও আছে, কিন্তু তার ধারে কাছের তফাতেও আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকিটিও নেই! রিসার্চ? ও আমাদের ছেলেরাও করে। বাইরে গিয়ে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে। এদেশে হয়না।

তার মানে আপনারা বলেন আর না-ইবা বলেন, গলদ আছে।
আলবৎ আছে!
স্বীকার করেন আর না-ই করেন শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা ঠিক রাস্তায় নেই! বরং সম্পূর্ণ উল্টা রাস্তায় যাচ্ছি।

-গলদ। ডাক্তার একলা অপারেশন করে? ইঞ্জিনিয়ার কোনো কোম্পানীতে একলাই সব মেশিন বানায়? বড় হোটেলে একলাই সব রাঁধে একজন বাবুর্চি?
না!
টিমওয়ার্ক!
সব খানে লাগে!
তাহলে?
সেই ছোট্টবেলা থেকেই আত্মকেন্দ্রিক হবার শিক্ষা কেন? কেন এই প্রতিযোগিতার শিক্ষা? “এটা জেনে গেলে তো আমার থেকে এগিয়ে যাবে”- এরকম দীক্ষা আর মানসিকতা দিয়ে একা একা ঠিক কতটুকু যাওয়া যায়??

সহযোগিতার শিক্ষাটা কেউ সহজে দিতে চান না। যেসব শিক্ষক জ্ঞানের ভারে গাছের মতো নুয়ে পড়েছেন, তাঁরা বুঝেন সত্যিটা। বদলাতে চান আশেপাশের ব্যবস্থা।
কিন্তু তাঁরা সংখ্যায় বাদবাকি চাকরিজীবী শিক্ষকদের (যারা কিনা শিক্ষকতাকে আর দশটা-পাঁচটা চাকরির মতো নিয়েছেন) তুলনায় খুব নগণ্য। তাঁরা নিজেরা তো কিছু করেনই না, বরং অন্যে কিছু করতে গেলে সাগ্রহে বাধা দেন!

আরও একটা টাইপ থাকে এনাদের মধ্যে, যারা কিনা নিজ ক্ষমতাবলে শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট আটকে দেন, ফেল করান, বিপক্ষে আন্দোলন করতে দেখলে দেখে নেবেন বলে হুমকি দেন। এদের শিক্ষক বলতে ঘৃণা হয়। মাফ করবেন, বাই ডিফল্ট সব শিক্ষকের জন্যই ছাত্রর সম্মান বরাদ্দ থাকে, ঘৃণা ব্যপারটা স্পন্টেনিয়াস। হয়তো ফেল করাবেন কিংবা বাসা থেকে শিখে আসা আমাদের নিছক ভদ্রতাবোধ থেকে আপনারা আমাদের এই মুনাফেকি সম্মানটা পান। এ নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবার কিছু নেই।

প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জঃ

“আমরা দেখে লিখবো। সবার সাথে আলোচনা করে চা-বিড়ি-আড্ডাসহ পরীক্ষা দেবো। যা শিখবো সেটায় আনন্দ থাকবে এবং আসলেই তাতে শিখবো! শেখার মতো শিখবো! কিচ্ছু না পড়ে গেলেও হবে, না জানলেও চলবে! যে বন্ধু আপনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পরীক্ষার হলে আমাকে থিওরি বুঝিয়ে দিতে পারে খাতা দেখিয়ে কিংবা একটু সহযোগীতা করে, সে ইন্টারনেট আর আড্ডা পেলে আপনার চেয়েও ভাল পড়াতে জানে হয়তো স্যার”

পাইলট প্রজেক্টঃ

২৬ টা ডিপার্টমেন্ট থেকে যাদের শেখার আগ্রহ আছে তাদের মধ্য থেকে ২৬ জন কে নেয়া হবে প্রথম কর্মশালায়। সময় আপাতত ৩ ঘন্টা। সবার কাছে ইন্টারনেট থাকবে, চা-নাস্তার ব্যবস্থা থাকবে। আপাতত এত এত যখন কথা বললাম আমার ৫ বছর কেটেছে CSE Department-এ। তো আমি এলগোরিদম BFS ও DFS এই ২৬ জনকে ( সে ড্রপার হলেও কোনো আপত্তি নাই, পড়ে আসারও দরকার নাই, ভাল ছাত্রছাত্রী চাই না, ভালো আগ্রহী চাই) আমার perspective নিয়ে আড্ডার সমন্বয় করবো যত তাড়াতাড়ি প্রজেক্টে জড়িত সবাই চায়। শেষ আধা ঘন্টা একটা পরীক্ষা নেয়া হবে। কোনো পাশ ফেল নম্বর নাই। তবে এটুকু বলতে পারি যা শিখবে তারা ভবিষ্যতে তারা এপ্লাইও করতে পারবে।

এর পরের কোনো কর্মশালায় আমার anthropology’তে পড়া বন্ধুটা লালন নিয়ে হয়তো গল্প শেখাবে, গণিতের বন্ধু শেখাবে দেখ তারারাও কতো আলোকবর্ষ দূরে!

পরীক্ষা দেবো হৈ-হুল্লোড় আর আড্ডা দিয়ে। খাতা চুরি করে। আমরা একজন আরেক জনের ভুল ধরিয়ে দেবো। শিখিয়ে দেবো কোনটা ঠিক। আপনাদের মতো অবশ্য খাতা বছরখানেক তোশকের তলে গুঁজে রাখবো না। যখন পাশ-ফেলের রেজাল্ট দেন, তখন মনেই পরে না কি লিখেছিলাম খাতায়! ভুল কি ঠিক, কিংবা শোধরাতে হবে কি, সেটা জানা নাকি আপনাদের সিস্টেমে মানা। প্রাইভেট ভার্সিটির চেয়ে নাকি ভালো শিক্ষা দেন পাব্লিক ভার্সিটিতে তো রেজাল্ট সিস্টেমই চেঞ্জ করতে পারেন না তো আগাবেন কিভাবে। আমাদের শিক্ষকেরা দেখিয়ে দিয়েছেন যে ৭ দিনেও ইভাল্যুশন সম্ভব, ৭ দিনেও রেজাল্ট দেয়া যায়! কিন্তু, সবাই মিলে আগাতে হবে তো! শুধু একটা ডিপার্টমেন্ট তাও আবার এক সেমিস্টার করেই শেষ। কেন? ঐ যে, বাধা দেয়ার অলস মানুষদের যে অভাব নেই।

তো প্রোজেক্ট!

“দশে মিলে পরীক্ষা দেবো, দেখে লিখবো, ভুলটা শুধানোর রাস্তাও বলে দেবো আমার সহপরীক্ষার্থীকে! এটাকে বলে সহযোগীতার পরীক্ষা! যেটা আসলেই বাস্তব জীবনে লাগে! সবাই মিলে ফার্স্ট হবো। একা একা ফার্স্ট হবার তোমাদের সিস্টেম ভুয়া”

আগ্রহীরা যোগাযোগ করুন। সবার সিদ্ধান্ত কাম্য।

MIT, Stanford, Waterloo এরা এলিট। তাই ওদের ফলো করেন। পুরাটা পারলে তাও কথা ছিলো, আধা খ্যাচড়া করে জগাখিচুরি পাকান বেশির ভাগই! নতুন কিছু কেউ করে দিয়ে যাবেনা, কিংবা টুপ করে নাজিলও হবেনা। যদি মনে করেন পরিবর্তন দরকার, তো Do it ASAP! তবে দেখবেন ওরাও পিঠ চাপড়ে বলবে, “বাচ্চে আব বাচ্চে নেহি র‍্যাহে”, ফলো করবে আপনাকে। যদি আসলেই কিছু করার না থাকে তো অন্তত শুধু ভালো রেজাল্ট নিয়ে শিক্ষক হতে আইসেন না। এটা মহৎ একটা পেশা। চাকরি দুনিয়ায় বহুত আছে!

অফটপিকঃ কয়দিন আগে বন্ধু শিব্বির ফোন দিয়ে বললো দুই ঘন্টা দূরে একটা থানায় ICT মামলায় থানা পুলিশকে আইটি হেল্প দিতে হবে। গাড়ি দিয়ে নিয়ে, আবার দিয়েও যাবে। আমি আর মাম্বো গেলাম। গিয়ে দেখি স্থানীয় প্রভাবশালী কমবয়সী কলেজ প্রিন্সিপাল পরিমলগিরি করেছেন। আমাদের তার এবং ব্ল্যাকমেইলের শিকার মেয়েটার ছবি ও ভিডিও সেফ ডিলিট করতে হবে যেন রিকভার না করা যায়। শেষমেষ ল্যাপ্টপ দুইটার হার্ড ডিস্ক খুলে দিলাম। গুড়া হইলো, তারা শান্তি পাইলো। জীবনে প্রথম পুলিশের টাকা খাইলাম আমি আর মাম্বো!

শিক্ষা জাতির নাকি মেরুদন্ড।
জাতি তোমার মেরুদন্ড কবে জানি হুড়মুড় কইরা ভাইঙ্গা পড়ে!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top