নাগরিক কথা

সহযোগীতা বনাম প্রতিযোগীতা (আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাঃ প্রথম পর্ব)

জিপিএ ফাইভ neon aloy নিয়ন আলোয়

বিঃদ্রঃ লিখা অনেক বড়। আপনার যদি সময় অনেক কম থাকে তো এখান থেকেই বিদায় নেন। আপনার ব্যস্ততার সাথে আমার বিরোধ নেই, আপনার মুল্যবান সময় নষ্ট করার অভিপ্রায়ও নেই আমার। ধন্যবাদ।

ঘটনা তেমন কিছু না। আমার এক মাত্র ছোটবোন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়ে। সেটা নাকি রেজাল্টের দিক দিয়ে দেশ সেরাও হয়। ওদিকে আমার গ্রামে চাচাতো বোন পড়ে অজপাড়াগাঁয়ের একটা কলেজে। বোন দু’টি আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে কয়েক মাস পর। ফর্ম ফিলাপ করাতে হবে। হ্যাঁ, আমরাও করেছি। এসএসসি’তে, এবং এইচএসসি’তেও। এত কথা বলার কারণ যে আমার বোনের লাগবে প্রায় বিশ হাজার টাকা আর গ্রামের ঐ বোনটির লাগবে দুই হাজার টাকা। এবার আম্মুকে ধরলাম। এত টাকা কেনো লাগবে?

ছয় মাসের অগ্রিম বেতন, মডেল টেস্ট, স্পেশাল কোচিং ইত্যাদি মিলিয়ে নাকি টাকার অঙ্কটা বিশ হাজারের বেশি-ই হবে। পড়াশুনা করি সিলেটে, আর বাপ মা যথেষ্ট দৌড়ের উপর রাখে বলে ওকে আমি পড়াশুনার জন্য কখনোই তেমন প্যারা দেই নাই। শুনলাম ওর মাসে বেতনই ২০০০ টাকা করে!

আমি ঢাকা সিটি কলেজ থেকে ২০১১ সালে এইচএসসি পাস করেছি। আমাদের সময় বেতন ছিলো ৬০০ টাকা (যদিও সেটাও আমার কাছে বেশী মনে হতো) এখন নাকি সিটি কলেজে মাসিক বেতন ২৪০০ টাকা!

আমরা বলতে গেলে মধ্যবিত্তের চেয়েও গরীব। তাই এই টাকার হিসেব করতে বসেছি অনেকেরই হয়তো এই অল্প টাকা গায়েও লাগবে না। কিন্তু আমি জানি অনেকেরই রীতিমত হাঁসফাঁস লেগে যাবে হঠাৎ করে এত টাকা বের করতে! শিক্ষা কি তাহলে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেলো?
মানে যার টাকা আছে সে পড়ো, নইলে ভাগো! দেশসেরা কলেজে পড়তে এসেছো, টাকা দিবা না??

খোঁজ নিয়ে জানলাম এক্সট্রা কোচিং, অপ্রয়োজনীয় কোচিং ইত্যাদি মিলিয়ে সব তথাকথিত কলেজই এরকম টাকা নিচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে। তারপর এত্তো এত্তো জিপিএ ফাইভ নিয়ে কি উল্লাস তাদের! তাদেরকে দেখিয়ে অন্য বাবা-মারা তাদের সন্তানকে বলবে – ওর মতো হতে পারো না????

কিন্তু তার সন্তান কিভাবে অন্যের মতো হবে?? তার জিপিএ ফাইভের সার্টিফিকেটে কোন কালিতে লিখা থাকবে যে ছেলেটা/মেয়েটা জিপিএ ফাইভ না পেলেও অসম্ভব সুন্দর গান গায়, নইলে ছবি আঁকে, খুব ভালো ক্রিকেট খেলে নয়তো ক্রিয়েটিভ কিছু?

আগে ফেল করার অভিমানে অনেকেই বাড়ি ছেড়েছে, একটু অভিমান হলে দুনিয়াও ছেড়েছে! এখন নাকি সেটা জিপিএ ফাইভ না পেলে হয়!
জিপিএ ফাইভ না পাওয়াতে আত্মহত্যা! এটা কি খুন নয়?

আমার সার্টিফিকেটগুলোর দিকে এখন তাকালে আর গোল্ডেন এ প্লাস দেখতে পাই না! দেখতে পাই অসংখ্য হত্যা, রক্ত আর হতাশার ছাপ! যাদের কিনা আমাদের সমাজের সিস্টেম অজান্তেই জিপিএ’র রেসে নামিয়ে দিয়েছে এবং গুটিকয়েক সেই রেস রপ্ত করতে না পেরে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে নইলে সমাজ তাকে মেরে ফেলেছে!

ভর্তি পরীক্ষায় একটা সিটে ৫৫ জন ফাইট দিলে একজনের মুখে হাসি ফোটে! সবাই তাকে সফল বলে!! বাপ-মা’র মুখ উজ্জ্বল হয় নাকি এতে!
কিন্তু বাকি ৫৪ জন? মেয়ে হলে আত্নীয় স্বজন বসেই থাকে এরে দিয়ে কিছু হবে না, বিয়ে দিয়ে দাও! কেউ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাচুমাচু মুখ নিয়ে পরিবারের এতগুলো টাকা খসাচ্ছে ভেবে অপরাধবোধ নিয়ে পড়তে থাকে। মাঝে মধ্যে ঐ একজন পাবলিক-প্রাইভেট নিয়ে ঝগড়াও বাধায় (আমিও করেছি শুরুর দিকে যখন বুঝতাম না)! কিন্তু কোনো দিন শুনলাম না যে কোনো বাবা মা বলেছেন “এতগুলা ছেলেমেয়ে কে কষ্ট দিয়ে ভার্সিটিতে ঢুকলি, একটু মন দিয়ে জ্ঞান অর্জন করিস”। সেটা তো বলেই না বরং সেখানেও সিজিপিএ ৪ চাই!

আমার কাছের এক বন্ধু পাগল হয়ে গিয়েছে কারণ তার রেজাল্ট ভালো না, পাস হয় না। কিন্তু তার আপন বড়ভাই তার ডিপার্টমেন্টেরই শিক্ষক! তার এতে অপরাধবোধ বাড়তে বাড়তে আজ তাকে সবাই পাগল বলে! আমি জানি ও পাগল না! তোমরা সবাই মিলে ওকে পাগল বানিয়েছো! পরীক্ষার আগের রাতে রাট্টা মেরে আমিও এ+ বাগিয়েছি! কিন্তু জ্ঞান যে সেখান থেকে কিছুই আসেনি কেও না জানলেও আমি জানি! ঐ প্রশ্নে অনেকেই এ+ পেয়েছে কিন্তু আমি শিওর যে ঐ প্রশ্নপত্র এখন বিনা প্রস্তুতিতে দিলে দুই/এক জন ছাড়া কেউ পাসও করতে পারবে না!

শিক্ষা!
কোন পথে যাচ্ছো তুমি?
ভুল বললাম। শিক্ষাকে কোন দিকে নিচ্ছি আমরা??

যে শিক্ষার সার্টিফিকেটে আত্মহত্যার দাগ লেগে থাকে, হতাশার দাগ লেগে থাকে তাকে কিভাবে শিক্ষা বলবো। শিক্ষা নাকি জাতির মেরুদন্ড! সেখানে আমাদের একটাও টপ র‍্যাংকড ভার্সিটি নেই। কারণ আমি দেখেছি জ্ঞানার্জনে যদি একজনও বিদ্যালয়ে পা দেয় তার পা তো আমরা ভেঙ্গে দেই বটে, তারপর আমরা খুঁজি কোন সাবজেক্টে ঢুকতে পারলে চাকরী বেশী! এই একমাত্র কারণে এখন আমাদের দেশে সিএসই’এর এত চাহিদা। ঠিক যে হাইপটা কয়েক বছর আগে ইইই’এর ছিলো! ডাক্তারই বা কয়জন মন থেকে হতে চায়??

ছোট বেলা থেকে এই সমাজ আমাদের প্রতিযোগীতা শেখালো, কেও সহযোগীতা শেখালো না! আমি পরীক্ষার হলে না পড়ে গিয়ে অন্যের দেখে লিখতে গিয়েও অনেক থিওরী শিখে ফেলেছি! আমি জানি, আমার ভার্সিটির প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টের একজন করে নিয়ে যে কোনো ডিপার্টমেন্টের ফাইনালের প্রশ্ন দিয়ে ঐ পরীক্ষা হলে যদি ইন্টারনেট আর সবার মধ্যে আড্ডা বসিয়ে দেয়া যায়। দিন শেষে আলোচনা করে সবাই সেই পরীক্ষার উত্তর তো লিখতে পারবেই বরং নতুন অনেক জ্ঞানের ডালপালা গজাবে!

আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কিভাবে বুঝাবো যে মানুষ একা কিছুই পারে না! আমরা প্রতিযোগীতা চাই না! সহযোগীতা চাই!!!!!!!

যাই হোক অনেক ক্ষোভের কথা বলে ফেললাম। আমি আপনি পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে পারবো না। কিন্তু সবার সহযোগীতায় সব সম্ভব! রেভ্যুলুশন এভাবেই হয়!!

আম্মুকে বললাম এই অন্যায়ে প্রতিবাদ কেন করেন না! বলে ওরা তো আর্মি! ওদের সামনে কেউ আগায় না! সবাই ভয় পায়! আমি একা কি করবো বাপ?! আমিও তাই বলি একা আপনি কিছুই করতে পারবেন না। কারণ আমরা খালি গালি-ই দিতে পারবো, নিজে করতে গেলেই আমাদের যত সমস্যা!

কেনো জানেন?
তাহলে আবারো বলি!
“এই সমাজ আমাদের প্রতিযোগীতা খুব ভালো ভাবে শিখিয়েছে,সহযোগীতা নয়”

নইলে কি বিমান থেকে শুরু করে লোকাল বাস সব যায়গায় অন্যকে ঠেলে নিজে আগে উঠতে চায়?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top