ইতিহাস

যেভাবে “আইউব গেট” হলো আজকের “আসাদ গেট”

আসাদ গেট নিয়ন আলোয় neon aloy

আসাদ গেট ।
ঢাকাবাসীর সুপরিচিত ।
আসাদ গেট দাঁড়িয়ে আছে মোহাম্মদপুরের প্রবেশ পথে আসাদ অ্যাভিনিউ এবং মিরপুর সড়কের সংযোগস্থলে ।
কিন্তু ঢাকার এই সুপরিচিত সড়কস্তম্ভ এবং এভিনিউটি কি সবসময়ই এই নামে পরিচিত ছিলো? না!

২০ জানুয়ারি ।
১৯৬৯ সন।
আইউব গেট নামে নির্মিত সেই গেটটি আমাদের আসাদ গেটে পরিণত হল ।

পাকিস্তানের মসনদে তখন বসা স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইউব খান ।
১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নূনকে সরিয়ে আর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জাকে ইংল্যণ্ডের এক হোটেলের ম্যানেজার করে নির্বাসনে পাঠিয়ে ক্ষমতা দখল করেন । ১৯৬৮ সালে তার ক্ষমতার দশ বছর পূর্ণ হয় । আউয়ুব খানের একান্ত বংশবদ তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খানের ( ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকার বনানীর নিজ বাসভবনে মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় নিহত ) সহায়তায় পূর্ব বাংলায় চালান অত্যাচারের স্টিম রোলার । বাক স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা , সংবাদপত্রের স্বাধীনতা , জীবনের নিরাপত্তা কিছুই ছিল না । আর চলছিল পূর্ববাংলার সম্পদের অবাধ লুন্ঠন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদের পুঞ্জিভূতকরণ ।

এরই মাঝে ১৯৬২ সালে আইউবের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে পূর্ব বাংলার সংগ্রামী ছাত্র সমাজ । ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করেন ৬ দফা । ১৯৬৮ সালে একদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিকামী বাঙ্গালীদের নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র শুরু হয় , অন্যদিকে ক্ষমতার দশম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে পালন করা শুরু হয় “ উন্নয়নের এক দশক” । এই পরিস্থিতিতে পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ ১১ দফা প্রণয়ন করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আইউব বিরোধী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান ।

আসাদ গেট নিয়ন আলোয় neon aloy

শহীদ আসাদ

২০ জানুয়ারি । ১৯৬৯ সাল ।
পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইউব খানের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র- গণ আন্দোলন ।২০ শে জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র । সেই আন্দোলন ২৪ জানুয়ারি রূপান্তরিত হয় গণ অভ্যুথ্থানে । সে আর এক ইতিহাস, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য মাইল ফলক । সেই গণআন্দোলনে ২৫ মার্চ, ১৯৬৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন আইউব আর পাকিস্তানের সিংহাসন দখল করেন জেনারেল ইয়াহিয়া ।

আসাদ শহীদ হলে তার রক্তমাখা শার্ট নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মিছিল করেন তার সংগ্রামী সাথীরা । আর সেই মিছিল থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে আইউব গেটের নামকরণ করা হয় আসাদ গেট ।

কে ছিলেন শহীদ আসাদ?

শহীদ আসাদের পুরো নাম আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান। তিনি ১৯৪২ সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার ধানুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ও মুরারী চাঁদ মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ১৯৬৬ সালে বি.এ এবং ১৯৬৭ সালে এম.এ ডিগ্রী অর্জন করেন। এই বৎসরেই আসাদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং কৃষক সমিতির সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষাণী’র নির্দেশনায় কৃষক সমিতিকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে শিবপুর, মনোহরদী, রায়পুরা এবং নরসিংদী এলাকায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন।

ঢাকা’র সিটি ল কলেজে তিনি ১৯৬৮ সালে আরো ভালো ফলাফলের জন্যে দ্বিতীয়বারের মতো এম.এ বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের জন্য চেষ্টা করছিলেন। ১৯৬৯ সালে মৃত্যুকালীন সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে এম.এ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। শহীদ আসাদ তৎকালীন ঢাকা হল (বতর্মান শহীদুল্লাহ হল) শাখার পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে এবং পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (ইপসু-মেনন গ্রুপ), ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিত প্রাণ আসাদুজ্জামান গরিব ও অসহায় ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার বিষয়ে সর্বদাই সজাগ ছিলেন। তিনি শিবপুর নৈশ বিদ্যালয় নামে একটি নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিবপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদেরকে সাথে নিয়ে আর্থিক তহবিল গড়ে তোলেন।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৬৮ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানী’র ডাকে হরতাল আহ্বানের ফলে ব্যবসায়ীরা তাতে পূর্ণ সমর্থন জানায়। এ প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংগঠনগুলো পূর্ব থেকেই নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছিল।

৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯ইং তারিখে ছাত্রদের ১১ দফা এবং বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবীর সাথে একাত্মতা পোষণ করে ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। ১৭ জানুয়ারি, ১৯৬৯ইং সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ছাত্ররা দেশব্যাপী সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ডাক দেয়। ফলে গভর্নর হিসেবে মোনেম খান ১৪৪ ধারা আইন জারী করেন যাতে করে চার জনের বেশি লোক একত্রিত হতে না পারে।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ২০ জানুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখ দুপুরে ছাত্রদেরকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পার্শ্বে চাঁন খাঁ’র পুল এলাকায় মিছিল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন আসাদুজ্জামান। পুলিশ তাদেরকে চাঁন খাঁ’র ব্রীজে বাধা দেয় ও চলে যেতে বলে। কিন্তু বিক্ষোভকারী ছাত্ররা সেখানে প্রায় এক ঘন্টা অবস্থান নেয় এবং আসাদ ও তার সহযোগীরা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে। ঐ অবস্থায় খুব কাছ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে এক পুলিশ অফিসার গুলিবর্ষণ করে। তৎক্ষণাৎ গুরুতর আহত অবস্থায় আসাদকে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা দাবীর স্বপক্ষে এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যান্য আসামীদের মুক্তি দাবীর আন্দোলনে আসাদের মৃত্যু পরিবেশকে আরো ঘোলাটে করে তুলে ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় রূপান্তরিত হয়।

 

আসাদ গেট নিয়ন আলোয় neon aloy

আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে সতীর্থদের মিছিল। এই মিছিলই চিরতরে পাল্টে দিয়েছিলো আইউব গেটের নাম।

 

আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমান আসাদ শহীদ হওয়ার পর লিখেছিলেন তার অন্যতম বিখ্যাত কবিতা “ আসাদের শার্ট” ।

আসাদের শার্ট
কবি শামসুর রহমান

গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।

বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সুক্ষ্মতায়
বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।

ডালিম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট
শহরের প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চুড়োয়
গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে
উড়ছে, উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।

আমাদের দূর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।

লেখকঃ ডঃ রানা চৌধুরী, পদার্থবিজ্ঞানের প্রাক্তন শিক্ষক।

[শহীদ আসাদের পরিচিতির অংশটুকু বাংলা উইকিপিডিয়া হতে উদ্ধৃত]

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top