নাগরিক কথা

এভাবে আর কত মানুষ অকারণে খরচ হয়ে যাবে?

ছিনতাই নিয়ন আলোয় neon aloy

মানুষটার নাম ছিলো সানিন হাশেম। ২০০৪ ব্যাচে শাবিপ্রবি’র সিএসই ডিপার্টমেন্ট থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ব্র্যাক ব্যাংকের চাকরি করছিলেন। আমার ভার্সিটির সিনিয়র, যদিও ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ছিলো না। ফেসবুকে এক জুনিয়রের লেখা পড়ে জানলাম তিনি নাকি গেমস খেলতে পছন্দ করতেন। প্রোফাইলে ঢুকে দেখলাম ফুটবলে বেলজিয়ামের সাপোর্টার। বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার বাইরে যারা অন্য কোন ফুটবল দল সাপোর্ট করেন, তারা সাধারণত খেলাটা ভালভাবে বুঝে চিন্তাভাবনা করেই সাপোর্ট করেন। এ থেকে মোটামুটি বলা যায়, সানিন ভাই ছিলেন একজন ফুটবল-পাগল একজন মানুষ। গতকাল তার থাকার কথা ছিলো কক্সবাজার। ২০১৭’র ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসেই নাকি ভাইয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।

এই সবগুলো কথাই পাস্ট টেন্সে বলতে হচ্ছে। কারণ ভাই মারা গেছেন সেই ২০১৬ সালের ডিসেম্বরেই! সন্ধ্যায় নিকেতনের অফিস থেকে রিকশায় চেপে নিজের বেইলি রোডের বাসায় ফেরার সময় ওনার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয় মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীর দল। ব্যাগের স্ট্র্যাপ হাতের সাথে প্যাঁচানো থাকায় সানিন ভাই পড়ে যান রিকশা থেকে, মাথা ঠুকে যায় পিচঢালা কঠিন রাস্তায়। তবুও হাত থেকে ব্যাগটি ছুটেনি তার, হাল ছেড়ে দিয়ে ছিনতাইকারীরা বাইক টেনে চলে যায়। হাসপাতালে আনার পর কোমায় ছিলেন, শেষ পর্যন্ত মারা যান। অনলাইন একটা নিউজপেপারে পড়লাম, রাস্তায় নাকি অনেকক্ষণ তার রিকশাচালক আশেপাশের মানুষের সাহায্য চেয়েছিলেন, কেউ এগিয়ে আসেনি।

সানিন ভাই আমার ভার্সিটির সিনিয়র, তাই ওনার খবরটা চোখে পড়েছে। অন্য কেউ হলে হয়তো চোখে পড়তো না, কিংবা চোখে পড়লেও অতটা গায়ে লাগতো না। ভণিতা না করে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, বাংলাদেশ প্রতিদিন কত মানুষই তো ছিনতাইকারী, ডাকাত, অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পরে, কয়জনের কথা আপনি জানেন বা জানলেও খুব একটা গায়ে মাখান? আর গায়ে মাখানো তো দুরের কথা, নিজের চোখের সামনে এরকম কোন দুর্ঘটনা ঘটলেও আমরা কেউ যে এগিয়ে আসবো না ভিক্টিমের সাহায্যে, সেটা তো পরিষ্কার সানিন ভাইয়ের ঘটনাটি থেকেই! রিকশা থেকে পড়ে যাওয়া সানিন ভাইয়ের পাশ দিয়ে হয়তো হেঁটে গিয়েছিলো আপনার-আমার মত মানুষরাই, ঝামেলা এড়ানোর জন্য কেউ রিকশাচালকের সাহায্যের আবেদনে সাড়া দেননি।

ছিনতাই নিয়ন আলোয় neon aloy

সানিন হাশেমের ফেসবুক প্রোফাইল

 

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ভাইয়ের কথা বললাম। এবার তাহলে জুনিয়রের কথাও বলি! মাহিদ আল সালাম, ইকোনমিক্স ২০০৮-০৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী। ওই যে কিছু মানুষ আছে না, যারা সারাজীবন ছোট বাচ্চার মত সহজসরল থেকে যায়? মাহিদ ছেলেটা ছিল ওইরকমই। বয়স দুইবছর পর ৩০ হতো, কিন্তু এই বয়সেও রক্ত দেখলে সহ্য করতে পারতো না। কিন্তু বাচ্চা-বাচ্চা এই ছেলেটা আবার একগুঁয়েও ছিল। ক্যাম্পাসে কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে, বইমেলা হচ্ছে, আবৃত্তির আসর কিংবা বিতর্ক হচ্ছে, কিংবা তুখোড় কোন আন্দোলন; মাহিদকে বাসায় আটকে রাখা যেত না। এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে ভাল কোন কাজে ৭০-৮০% কৃতিত্বই মাহিদের, কিন্তু কেউ কখনো জানতো না। মাহিদ নিজে যেমন আগ বাড়িয়ে ক্রেডিট নিতে যেতো না, সাথের ছেলেমেয়েদেরও হয়তো মানা করতো। শুধু দেখা যেতো ছেলেটা একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছে সবকিছু, মাঝে মধ্যে কাউকে ডেকে কানে কানে বলছে কিছু একটা নিচু স্বরে।

মাসকয়েক আগে সিলেটে যখন ছিনতাইকারীদের উৎপাত খুব বেড়ে গেল, সাস্টনিউজ পোর্টালে সাস্টের সবাইকে সতর্ক করে সাবধানে চলাফেরা করার জন্য কি কি করা যেতে পারে- তা নিয়ে একটা আর্টিকেলও লিখেছিল।

পড়াশোনা শেষ হয়ে গিয়েছে, একটা মাল্টিন্যাশনাল টেলিকম কোম্পানিতে চাকরিও শুরু করেছিল। এর মাঝে ওর আম্মার শরীর খারাপ হলো, আন্টিকে নিয়ে ঢাকায় দৌড়াদৌড়ি করলো ছেলেটা। ২৩ মার্চ ছিল ওর জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমরা কতজন কত প্ল্যান করি, আর মাহিদ প্ল্যান করেছিলো একটু অন্যরকম। ফেসবুকে নিজের রক্তের গ্রুপ জানিয়ে পোস্ট করেছিল কারো ওই গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন হলে জানাতে। মাঝে সিলেটে এসেছিলো, নিজের শহরে। যেই সিলেট শহরের হাওয়া-বাতাসে ছেলেটার বেড়ে ওঠা। সেটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো তার জন্য।

২৫ মার্চ রাতে আমরা যখন পরদিনের স্বাধীনতা দিবসের ছুটি কিভাবে কাটাবো চিন্তা করছি, চিড়ামুড়ি মাখিয়ে অনেকে সারারাত মুভি দেখার প্ল্যান করে বসেছি, মাহিদ ছেলেটা তখন রওনা দিচ্ছিল ঢাকার উদ্দেশ্যে। বাসস্ট্যান্ড নদীর ওপাড়ে, কদমতলী। কিন্তু তার আর ঢাকা যাওয়া হলো না। পথিমধ্যে ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়লো, তার মোবাইল ফোন আর ব্যাগ নেওয়ার জন্য তার পায়ে ছুরি চালাল শয়তানগুলো। কিছুক্ষণ পড়ে থাকলো রক্তাক্ত মাহিদ। এরপর হাসপাতালে আসার পর মৃত্যু।

ভাবা যায়? যে ছেলেটা ছিনতাইয়ের বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছিল, তার মৃত্যু হলো ছিনতাইকারীদের হাতে! যেই ছেলেটা রক্তদান করতো মনের খুশিতে, সে মারা গেল রক্তশূন্যতায়!!

ছিনতাই নিয়ন আলোয় neon aloy

চিরতরে হারিয়ে যাওয়া নিষ্কলুষ হাসির মানুষটা…

আসলে, এসব ঘটনা আমাদের ছুঁয়ে যায় না কারণ আমরা সবাই অনেক ব্যস্ত। আর কাউকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশী জেরার শিকার হতে কে চায়, বলেন? গায়ে ঠিক তখনই মাখি, যখন আমার-আপনার খুব কাছের কোন মানুষ এরকম অঘটনের শিকার হয়, এর আগে না। এটাই সত্য, কারণ আমার নিজের খুব আপনজনের সাথে এরকম দুর্ঘটনা ঘটার আগে পর্যন্ত আমার মাথায়ও কখনো এই ছিনতাই সমস্যার উৎস কিংবা পরিণাম কিরকম হতে পারে তা নিয়ে কোন ধারণা ছিলো না।

কয়েকদিন আগেই একটা কাজে আমার আম্মা ছোটভাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন চট্টগ্রামে একদিনের জন্য। তিনি খুবই সাবধানী মহিলা। ভোরে বাস থেকে গরীবুল্লাহ শাহ’র মাজার কাউন্টারে নেমে সকাল সাতটার আগে কাউন্টার থেকে বের হননি ছিনতাইকারীদের উৎপাতের কথা চিন্তা করেই। তো আশেপাশে মানুষজনের চলাচল একটু বাড়ার পর তারা একটা রিকশা নিলেন চকবাজার যাওয়ার উদ্দেশ্যে। আম্মা বসলেন রিকশার বামপাশে, ওনার হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ। রিকশাটা গ্রীনলাইন কাউন্টার থেকে রওনা দিয়ে কয়েক গজ যেতেই আচমকা বামদিক থেকে একটা সিএনজি থেকে একজন আমার আম্মার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়, ঠিক যেভাবে টান দিয়েছিলো সানিন ভাইয়ের ব্যাগটা। আম্মার কপাল ভালো বলতে হবে, ব্যাগের স্ট্র্যাপটা হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ব্যাগটা চলে গিয়েছিলো ছিনতাইকারীর সাথে, নাহলে কি হতে পারতো সেটা চিন্তা করাও কষ্টকর আমার জন্য। তো যেই ব্যাগের জন্য আমার আম্মার জীবননাশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিলো, সেটায় কি ছিলো জানেন? আমার ছোটভাইয়ের দুইটা গেঞ্জি, একটা প্যান্ট, আর একটা বডি স্প্রে’র বোতল।

এর আগের ঘটনাটা আজ থেকে দুই বছর আগের। আমার ছোট দুই ভাই একই বছর অফিসার ক্যাডেট হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং নৌবাহিনীর অ্যাকাডেমিতে জয়েন করেছিলো। তো যেদিন আমরা সবাই তাদের অ্যাকাডেমিতে রেখে আসতে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা, তার ঠিক আগের সন্ধ্যায় আমার ছোটভাই তার জয়েনিং লেটারের ফটোকপি করতে বাসা থেকে ৩-৪মিনিট দূরত্বের দোকানে রওনা দিলো। ১৫মিনিট পর যখন সে ফেরত আসলো, তখন তার শার্টের এক পাশে রক্ত, আরেক পাশ সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, ডানহাত দিয়ে কিছু ধরতে পারছে না। বাসার গেট থেকে কয়েক কদম সামনে যেতেই এক অন্ধকার গলি থেকে টান দিয়ে তাকে ইচ্ছামত একজন ছুরি দিয়ে পোঁচায়, আর দুইজন কিল-ঘুষি দেওয়ার সাথে সাথে তার পকেটে যা ছিলো তা নিয়ে নেয়। তার পকেটে ছিলো ২০-৩০ টাকা, ৪-৫ বছরের পুরনো একটা নোকিয়া-১১০০ ধাঁচের ফোন। আর ছিনতাইকারীরা যাওয়ার সময় তার হাতে থাকা ডকুমেন্টসগুলোও নিয়ে যায়। নিজে অনেক সময় অনেক বাজে পরিস্থিতিতে পরেছি, কিন্তু নিজের ভাইয়ের জীবনের একটা মূল্যবান সময়ে তাকে এরকম রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে যতটা অসহায় বোধ করেছি, ততটা আর কখনো অনুভব করিনি। যাই হোক, সেদিন সন্ধ্যায় তার হাত ভেঙে গিয়েছিলো। যার কারণে পরবর্তীতে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে যোগ দিতে পারলেও সে তিনমাস পিছিয়ে গিয়েছিলো তার ব্যাচমেটদের চেয়ে এবং পরবর্তীতে এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে না পেরে অ্যাকাডেমি ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়। আমার ভাইয়ের সারাজীবনের সব সম্ভাবনা কেড়ে নিয়ে ছিনতাইকারীদের মনে হয় না ৩০০-৪০০ টাকাও লাভ হয়েছিলো সেদিন।

এরকম ঘটনা কিন্তু অভাব নেই আমাদের আশেপাশে। পত্রিকায়ই চোখে পড়ে নিয়মিত। আর পত্রিকায় যতগুলো খবর আসে, তার চেয়ে অন্তত ১০-১৫গুণ বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে প্রতিদিন। প্রায় সময়ই দেখা যায় অফিসের কাজে এক শহর থেকে রাতের ট্রেনে চেপে রওনা দিয়েছেন কেউ, মাঝরাত থেকে তার ফোন বন্ধ, এবং তিন-চারদিন নিখোঁজ থাকার পর তার লাশের খোঁজ মিলে কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামের রেললাইনের পাশে, যে রেললাইন ধরে তার ট্রেনটি ছুটে গিয়েছিলো গন্তব্যের দিকে। রাস্তাঘাটে ছিনতাই করলে অপরাধীর পালানোর অনেক পথ থাকে। কিন্তু ট্রেনে ভিক্টিমকে ছেড়ে দিলে পরের স্টেশনে নামা পর্যন্ত ভিক্টিম রেলপুলিশ ডেকে ছিনতাইকারীকে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় থেকে যায়। তাই ভিক্টিমের টাকা-পয়সা-মোবাইল কেড়ে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের দরজা দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকে না ছিনতাইকারীদের সামনে।

ডাক্তার বন্ধুবান্ধবদের কাছে এক আপুর ঘটনা শুনেছিলাম। তার নাম ডাঃ সানজানা জেরিন। মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে ব্যাচমেট ডাঃ মুনতাহিদ আহসানের সাথেই প্রেম করে বিয়ে হয়েছিলো ওনার। বিয়ের পর বেশ ভালই দিন কাটছিলো টোনাটুনির সংসারে। ৩৩তম বিসিএসে পাশ করে ফেনী সরকারী মেডিকেলে যোগদান করতে যেদিন বাসা থেকে বের হলেন, সেদিন প্রাইভেট কারে চড়ে আসা ছিনতাইকারীর দল তার হাতব্যাগ ধরে টান দেয়। সানিন ভাই হয়তো মারা গিয়ে বেঁচে গিয়েছেন, কথাটা নিষ্ঠুর হলেও সত্য। কারণ ডাঃ সানজানা জেরিন আর কখনোই স্বাভাবিক হতে পারেননি। মস্তিষ্কের আঘাতে জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে আছেন। নড়তে-চড়তে পারেন না, কাউকে চিনতে পারেন না। তার ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন নিচের ভিডিওটিতে অথবা প্রথম আলো’র এই রিপোর্টটিতে

 

 

ছোটভাইয়ের ছিনতাই হবার ২-৩দিন পরে হাসপাতাল-ডাক্তারখানা দৌড়াদৌড়ি শেষে একদিন সকালে বাসার পাশের চায়ের দোকানে বসে প্রথম আমার মাথায় পুরো বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করার ফুরসত মিলেছিলো। ওই চায়ের দোকানে এলাকার ছেলেপেলেরাই বসতো। কথাবার্তা না হলেও চেহারা চিনতাম এবং কে কিসের নেশা করে সব মোটামুটি জানা ছিলো কারণ তারা এসব নিয়ে একরকম ওপেন আলোচনাই করতো। কে কবে কোত্থেকে ফেন্সিডিল কিনেছে কম দামে, মোহাম্মদপুর বিহারী পল্লীর ওইদিকে আনসারকে টাকা দিলে কিভাবে ভাল গাঁজা পাওয়া যায় বা কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে পুলিশ চেকআপ ফাঁকি দিয়ে ইয়াবা আনার কাহিনী বেশ কিছু ছেলেপেলে বেশ গর্বের সাথে বন্ধুদেরকে বলতো। তখন হঠাৎ একটা ধাক্কা খেলাম, এদের মধ্যে কেউ আমার ভাইয়ের হাইজ্যাকিং এর সাথে জড়িত না তো? থাকলেও অবশ্য কিছু করার ছিলো না, কারণ অন্ধকারে আমার ভাই কারো চেহারাই দেখতে পারে নাই যে তার ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে পারবে।

তো এই যে একটার পর একটা জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পরিবারগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে- এর জন্য কাকে দায়ী করবো? সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় ব্যার্থতার দাবী করে মানববন্ধন করবো? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর আদালতের কাছে বিচার চাবো? নাকি আঙ্গুল তুলবো নিজেদের দিকে?

এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে নেশার টাকা যোগাড় করতেই কম বয়সী ছেলেপুলেরা চুরিচামারি বা ছিনতাইয়ের মত অপরাধে জড়িয়ে পরে। এর মধ্যে বস্তিবাসী নিম্নশ্রেণীর ছেলেরা যেমন আছে, তেমনি আছে ধনী পরিবারের গাড়ি হাঁকানো পশ ছেলেরাও! কারণ হাতে লাখ টাকা থাকলেও সেটা কখনো নেশার টাকা যোগানোর জন্য যথেষ্ঠ হবে না, নেশার জগৎটাই এরকম। আর এদেরকেই বা দোষ দিয়ে লাভ কি? এরা পাচ্ছে না পরিবারের পর্যাপ্ত অনুশাসন। কোন কোন বাবা-মা নিজেরা সন্তানদের সময় দিতে না পেরে ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দিচ্ছেন কাঁচা টাকা, দামী গাড়ি, ঝাঁ-চকচকে মোটরসাইকেল, যেগুলো আসলে তাদের সন্তানদের বিগড়ানোর প্রসেসটা আরো ত্বরান্বিত করছে। পুলিশ অফিসারের মেয়ে ঐশী যেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, নেশার বিকারে নিজের বাবা-মাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করতে দ্বিধাবোধ করেনি যে কিশোরী।

পুলিশ কিংবা র‍্যাবের কাজ আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু আমাদের কি কোন দায়িত্ব নেই? ইউটিউবে একটা ভিডিওতে দেখেছিলাম রামপুরায় কিভাবে শতশত মানুষের সামনেই পিস্তল বের করে গুলি করে একজন বিকাশ এজেন্টের ব্যাগ ছিনতাই করেছিলো তিন যুবক। কেউ এগিয়ে আসেনি ভিক্টিমের সাহায্য করতে। যদিও এর বিপরীত ঘটনা আছে, চট্টগ্রামে গত বছর এক জুয়েলারির দোকানে ডাকাতি থামাতে গিয়ে অপরাধীদের হাতবোমায় প্রাণ হারান এক যুবক। তবে সিংহভাগ সময়ই উপস্থিত জনতার নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে অপরাধ ঘটানোর সাহস এবং অপরাধ ঘটানোর পরে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় অপরাধীরা। কারণ আমরা সবাই ঝুট-ঝামেলামুক্ত থাকতে চাই। অপরাধীর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে প্রতিবাদ করার বা প্রতিরোধ করার শিরদাঁড়াটুকু লোপ পেয়েছে আমাদের অনেক আগেই! তবে এইটা ভেবে দেখি না যে আজকে ভুক্তভোগী সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ হলেও আগামীকাল আমারই কোন এক আপনজন একই অঘটনের শিকার হতে পারে। নিজেদের কোন বন্ধু-স্বজনের সাথে এরকম কিছু হলে আমরা সমাজের মানবতাকে গালি দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না, সমাজ থেকে মানুষ হারিয়ে সব অমানুষে ভরে গেছে এই ক্ষেদ জানাতে কসুর করি না, কিন্তু নিজে সুযোগ পেলে ঠিকই চামে দিয়ে বামে কেটে দায়িত্ব এড়াই!

রামপুরার সেই বিকাশ এজেন্টের ছিনতাইয়ের ঘটনার দুই নাটের গুরু জেনেছিলাম তার কয়দিন পরেই র‍্যাবের ক্রসফায়ারে পরে মারা গিয়েছিলো। ঘটনার সত্যাসত্য জানি না, অনলাইনে পড়া খবর। তবে যদি তা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে বিনাবিচারে দুইজনকে মেরে ফেলার পরেও র‍্যাবকে বাহবা দিবো পৃথিবী থেকে দুইটা কীট সরিয়ে দেওয়ার জন্য। নাহলে এই দুইটা কীটের কারণে আরো কত জীবন আর কত পরিবার নষ্ট হতো কে জানে? তবে এভাবে একটা-দুইটা ছিঁচকে চোর-পকেটমার-হাইজ্যাকার মেরে কি লাভ যদি আমি তাদের গডফাদারদেরই সরকারী প্রোটোকল দেই? দেশের সম্ভবত সবচেয়ে বড় ইয়াবা-ব্যবসায়ী কক্সবাজারের এমপি বদি আদালতে জামিন নিয়ে দেড়শো-দুইশো গাড়ির বহর নিয়ে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শতাধিক তোরণ পেরিয়ে তামিল সিনেমার ভিলেনের মত এন্ট্রি মারে নিজের রাজত্বে, তাকে আমরা আটকাতে পারিনা গারদের পিছনে। কেন পারি না, কেউ জানে না।

দিনশেষে যাকেই দোষারোপ করি না কেন, সমস্যাটা আমাদেরই। আমাদের পুলিশ, আমাদের রাজনীতি, আমাদের মাদকব্যবসা, আমাদের পরিবারগুলোর ভাঙন, নাগরিকদের গা বাঁচিয়ে চলার প্রবণতা- সব মিলিয়ে আমরাই এই সমস্যাগুলো সৃষ্টি করেছি, আমাদেরকেই এর ফল ভোগ করতে হবে। তবে এর মধ্যে আমার-আপনার যা করণীয়, তা হলো অন্তত নিজের চোখের সামনে কোন অপরাধ ঘটতে দেখলে ভিক্টিমের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া। উপরে সানিন ভাইয়ের ফেসবুক কভার ফটোটাতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে আসুন। মানুষটা বাঁচতে চেয়েছিলো, তার রিকশাচালকও তাকে বাঁচানোর জন্য রাস্তার লোকজনের কাছে বারবার সাহায্য চেয়েছিলো – কিন্তু কেউ এগিয়ে আসে নাই। হয়তো তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নেওয়ার পরেও সানিন ভাইকে বাঁচানো যেতো না, কিন্তু তার মৃত্যু যে তখনি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো- সেটাই বা নিশ্চয়তার সাথে বলবেন কিভাবে?

কিংবা সানিন ভাই, ডাঃ সানজানা জেরিনের দুর্ঘটনাগুলো থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতাম, তাহলে হয়তো আজ মাহিদেকে লাশ হতে হতো না। আমাদের কি আসলেই কিছু করার নেই? কিংবা কি করার আছে আপনার-আমার জায়গা থেকে, কখনো ভেবে দেখেছেন কি? এলাকার পরিচিত মাদকাসক্ত বখাটেগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশে নালিশ দিয়েছেন কখনো? নাকি সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেননি, কিংবা অযথা ঝামেলা ভেবে এড়িয়ে গেছেন?

সানিন ভাই, ডাঃ সানজানা জেরিন কিংবা মাহিদের জায়গায় নিজের পরিচিত কারো মুখ কল্পনা করে দেখুন, এবার কি পারছেন নিজের দায়িত্বটা এড়িয়ে যেতে?

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top