টুকিটাকি

ফিনল্যান্ডের স্কুলগুলো পুরো পৃথিবীকে শিখাচ্ছে কিভাবে স্কুল চালাতে হয়!

ফিনল্যান্ড স্কুল নিয়ন আলোয় neon aloy

মনে করুন আপনি এমন একটি স্কুলে পড়ছেন, যেখানে আপনার শিক্ষক আপনাকে ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞান শিখানোর বদলে শিখাচ্ছে কিভাবে লাভজনকভাবে মুদি দোকান চালানো যায়। আপনাকে কিছুক্ষণ সময় দিয়ে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে তিনি গেলেন আপনার পাশের বেঞ্চে বসা সহপাঠীর কাছে। তাকে দোকানদারী না শিখিয়ে তিনি হাতে তুলে দিলেন কম্পিউটার গেমস- নে বাবা, মন ভরে গেমস খেল, কেউ তোকে বকা দিবে না! এই ধরণের স্কুলের আইডিয়া কোন পাগলের মাথা থেকে বের হয়েছে ভাবছেন? মন খুলে হাসুন, সমস্যা নেই, হাসলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। তবে হাসার আগে এটা জেনে নিন, এই শিক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করেই ফিনল্যান্ড গত কয় বছর ধরে বিশ্বব্যাপী স্কুল সিস্টেমগুলোর মধ্যে প্রথম তিনটি স্থানের একটি দখল করে আছে, যেখানে আমেরিকার স্কুল সিস্টেম পরে আছে ৩৭তম অবস্থানে! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? আচ্ছা, পুরো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করার আগে একটু অতীত থেকে ঘুরে আসি।

দক্ষিন ইউরোপের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ফিনল্যন্ড। এস্পো শহরের কিরক্কোজারভি কম্প্রিহেন্সিভ  স্কুলের একটি একাডেমিক বছর শেষ হতে চলেছে। এই সময়টাতেই প্রিন্সিপাল ক্যারি লৌহিভুরি একটি সিধান্ত নেন যেটা ফিনিশ ধ্যান ধারনায় খুবই বেখাপ্পা। ষষ্ঠ শ্রেনীর এক ছাত্র শিখন প্রক্রিয়াটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্লাস টিচারের শত চেষ্টায়ও কিছু করা যায় নি কসোভো যুদ্ধের শরণার্থী ছেলেটির শিক্ষায় আগ্রহ তৈরি করার। এই প্রেক্ষিতে একজন সমাজকর্মী, একজন নার্স ও একজন মনোবিজ্ঞানী নিয়ে একটি প্যানেল গঠিত হয় কিরক্কোজারভিতে। ছেলেটির তথ্য দেখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এটি কেবল অলসতা, অনীহা বা অনাগ্রহ নয়। সিদ্ধান্ত হয় প্রমোশন না দিয়ে এক ক্লাসে ছেলেটিকে আরেক বছর রেখে দেওয়ার, এই সময়টাতে ছেলেটি প্রিন্সিপালের ব্যক্তিগত ছাত্র হিসেবে থাকবে। এই ধরনের পদক্ষেপ ফিনল্যান্ডে বিরল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাধারণ ইতিহাস, ভূগোল, গণিত পড়ার পাশাপাশি একে একে বই পড়তে দেওয়া হয় প্রিন্সিপালের করুনাসিক্ত ছেলেটিকে। এভাবে বছর ঘুরে আসতেই ছেলেটি তার গৃহীত রাষ্ট্রের ভাষা রপ্ত করে শিক্ষিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়।

অনেক বছর পর বিশ বছর বয়সী এক তরুণ কিরক্কোজারভি’র বড়দিনের উৎসবে উপস্থিত হয়। মুখে চওড়া একটি হাসি নিয়ে ছেলেটি প্রিন্সিপালের কাছে যায়, তার হাতে এক বোতল কনিয়াক। ছেলেটি প্রিন্সিপাল ক্যারি কে বলে “আজ আমি যা কিছু তার পুরো কৃতিত্বই আপনার।” এর উত্তরে প্রিন্সিপাল বলেন “এ আর এমন কি? অপ্রাপ্তবয়স্কদের জীবনের জন্য তৈরি করা আমার দৈনন্দিন কাজ।” ছেলেটির নাম ছিল বেসারট কাবাশি। তার এখন নিজের ক্লিনিং কোম্পানী আর একটি কার রিপেয়ারিং ফার্ম আছে। ফিনিশ শিক্ষা ব্যবস্থার সার্থকতার একটি সাধারন নিদর্শন এমন ব্যক্তিগত ঘটনা গুলো।

২০১০ এ মুক্তি পাওয়া একটি প্রামান্য চিত্রে ফিনিশ শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বের সকল প্রান্তে মনযোগ আকর্ষন করে। পাশ্চাত্যের অনেক দেশ এই সফল ব্যবস্থার মডেল বের করার জন্য ব্যাকুল। তবে আসলে কোন ধরনের সার্থকতার কথা বলা হচ্ছে সেটা পরিষ্কার করা দরকার। Pisa একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা যার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও শতাধিক দেশে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান ও পাঠ দক্ষতার মূল্যায়ন করা হয়। এই গবেষণার ২০০৯ সালের রিপোর্ট অনুসারে ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান চর্চায় দ্বিতীয়, পাঠ দক্ষতায় দ্বিতীয় আর গণিতে ষষ্ঠ স্থান পায়। ৫০ লক্ষ শিক্ষার্থী নিয়ে চালানো গবেষণায় এমন ফলাফল আসায় হেলসিনকি কম্প্রিহেন্সিভ স্কুলের প্রিন্সিপাল আরজারিতা হেইক্কিনেন বলেন “আমার কোন ধারনাই ছিল না আমাদের অবস্থা আসলে এতটা ভালো।”

এই সার্থকতার রহস্য সাধারণ একজন ফিনিশ নাগরিকের কাছে খুবই সহজ। শিক্ষকদের আন্তরিকতা আর “যা করা দরকার তাই” মনোভাব। এই মনোভাব দেশ জুড়ে ৬২,০০০ শিক্ষক ও ৩,৫০০ স্কুলের পরিবেশে স্পষ্ট। স্কুলগুলো বানানো হয়ছে ছোট করে যেন শিক্ষক সকল ছাত্র ছাত্রীদের নাম ধরে চিনতে পারে। কোন ক্ষেত্রে প্রচলিত পন্থা কাজ না করলে তা নিয়ে বৈঠক করে সমাধান খোঁজেন শিক্ষকরা। প্রত্যেকটি বাধা নতুন সমাধান সন্ধানের স্পৃহার যোগান দিয়ে থাকে বলে দাবী করেন ক্যারি লৌহিভুরি। তার মতে ঊচ্চবিত্ত ঘরের ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ অনেক আছে তাই তাদের একজন অপটু শিক্ষক হলেও চলে যাবে। আমরা অগ্রাধিকার দেই যারা দূর্বল তাদেরকে। আমাদের শিক্ষা বিষয়ক মাস্টার্স করার সময় এটাই আমাদের প্রধান শিক্ষা। তবে এটাই একমাত্র রহস্য নয়। ফিনিশ শিক্ষা ব্যবস্থা আমুল পরিবর্তন হয় ৪৫ বছর আগে। সেখান থেকে শুরু জয়যাত্রার। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন বাধ্যতামূলক পরীক্ষা ছিল না। হাই স্কূল পাশ করতে একটি মাত্র পরীক্ষা দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। কোন প্রকার প্রতিযোগীতা মুলক মনোভাব তৈরি করা হয় না শিক্ষার্থীদদের মধ্যে। সকল স্কুল সরকারচালিত। যে সকল সরকারী কর্মকর্তা স্কুল পরিচালনা করেন তারা কেউই ব্যবসায়ী, সামরিক বা রাজনৈতিক মনোভাব রাখেন না। প্রত্যেকটি স্কুল একটাই জাতীয় লক্ষ্যপূরণের চেষ্টা করছে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে একজন শিক্ষার্থী গ্রামে থাকুক আর রাজধানীতে থাকুক একই মানের শিক্ষা পাবে। এর প্রমাণ হিসেবে রয়েছে OECD এর একটি সার্ভে যার মতে দূর্বল আর সবল ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে দূরত্ব ফিনল্যান্ডে সব চেয়ে কম। ৯৩% সাধারন মানুষ একাডেমিক/কারিগরী ব্যবস্থায় গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ করে। সে সাথে ৬৬% মানুষ উচ্চ শিক্ষা নিয়ে থাকে। ইউরোপিয়ন ইউনিওনের আর কোন দেশে উচ্চ শিক্ষার হার এর কাছাকাছিও আসে না। বাধ্যতামূলক শিক্ষা শুরু হয় ৭ বছর থেকে। টাকার অভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া অসম্ভব ফিনল্যান্ডে। ১৭ বছর পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীদদের অভিভাবকদের ১৭০ ইউরো ভাতা হিসেবে দেয়া হয়। আমাদের উপমহাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে আসলে শিক্ষার সহজলভ্যতা একরকম অকল্পনীয়। তবে উল্লেখ  ৪০ বছর ব্যপি পরিচালিত এই শিক্ষা ব্যবস্থা এখন অনেকের মতেই যুগের উপযুক্ত নয়। এই ধারনা পোষণ করে ফিনল্যান্ড সরকার একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার মূল প্রতিপাদ্য হল প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয় ভিত্তিক পড়াশুনার পরিবর্তে ঘটনা ভিত্তিক সিলেবাস প্রনয়ন।

এই ঘটনাভিত্তিক সিলেবাসটা আসলে প্রচলিত শিক্ষাব্যাবস্থার পুরো বিপরীত। আমরা যেমন সারাজীবন বীজগণিত করি আর ভাবি এই x-y-z এর অংক কোনদিন আমার কি কাজে আসবে, ফিনিশ শিশুদের এই দ্বিধায় পড়তে হয় না। তাদেরকে হাতে-কলমে কাজ শিখানোর মাঝেই একটু একটু করে প্রায়োগিকভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয় গণিত-বিজ্ঞান-সাহিত্য-দর্শন এবং সেইসাথে নীতিবোধ এবং সবাই মিলে একসাথে কাজ করার সুফলগুলো। এবং এটিই ফিনিশ শিক্ষাব্যবস্থাকে অনন্য করেছে বাকি পুরো বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে।

হেলসিংকি স্কুল ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপক প্যাসি সিলান্ডারস বলেন “মানুষদের চাকুরী জীবনের জন্য আমাদের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রনয়ণ করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম অনেক উন্নত ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করছে যার ফলে ব্যাংকের কাগজ টুকে রাখা আর হিসাব লেখার চাকরী গুলো দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। চাকরীর বাজারে এমন পরিবর্তন দেখে আধুনিক সামাজিক ও শিল্পের অগ্রগতির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের কোন বিকল্প নেই।”

এই ব্যবস্থার পদক্ষেপ স্বরুপ ঘন্টাব্যাপী বিষয়ভিত্তিক ক্লাস উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সকাল থেকে বিকাল অবধি এমন ক্লাস এখন কার্যকর নয়। এর পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের একটি বাস্তব সম্মত কর্ম ক্ষেত্রে যে সকল বিষয় প্র‍য়োজন হবে তা দিয়ে তৈরি হবে সিলেবাস। সেই ক্ষেত্রে ধরা হোক, একজন শিক্ষার্থী কারিগরী ব্যবস্থায় হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়তে গেলে তার গণিত, ভাষা, এবং সাধারন বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখা পড়া করতে হবে। তবে এখানেই পার্থক্য তৈরি হবে কারন উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের পাঠ্যসূচি আরো বিষদ ভাবে তৈরি করা হবে। উক্ত পদক্ষেপগুলো শুধুমাত্র রাজধানী হেলসিঙ্কিতেই কার্যকর হয়েছে। চলতি মাসের শেষে দেশব্যাপী এই নতুন পথ প্রণয়নের প্রস্তাবনা পেশ করবেন শিক্ষা ব্যবস্থাপক ম্যারয়ো কিলোনেন।

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই এরকম আমূল পরিবর্তন এখনও অকল্পনীয়। এমনকি ফিনল্যান্ডেও মতনৈক্য রয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। অনেকের ক্ষেত্রেই ঘটনাটি এমন যে আজীবন আস্থা রেখে আসা পাঠদান প্রক্রিয়াটি এখন অগ্রহণযোগ্য। একাধিক অনুষদের দক্ষতা একীভূত করে পাঠসূচি প্রনয়নের মাধ্যমে পাঠদান যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিলোনেন শিক্ষকদের আগ্রহ বাড়াতে ঘোষণা দিয়েছেন “নতুন পদ্ধতি চর্চাকারী শিক্ষকগণ অর্থগত কিছু সুবিধা পাবেন। এই সুবাদে ৭০% শিক্ষক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছেন। যে সকল শিক্ষক নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করেছেন তারা আগের অবস্থায় ফিরতে চান না বলে দাবী করছেন।

শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের মডেল হিসেবে ফিনল্যান্ড এখন স্পটলাইটে। হেলসিংকির স্কুল গুলোর শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কর্মক্ষমতা আশাবাদী করে তুলেছে শিক্ষা কর্মকর্তাদের। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলিত প্রচেষ্টা ও সহায়তা প্রবণ মনোভাব নতুন পদ্ধতির উপজীব্য। আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারলে হয়তো ফিনল্যান্ড তার PISA প্রতিযোগী সিংগাপুর ও চীনের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ছাপিয়ে উঠে আসবে শীর্ষে।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top