ইতিহাস

রইস উদ্দিন ভুঁইয়া, একজন সত্যিকারের বাংলাদেশী নায়ক!

রইস উদ্দিন ভুঁইয়া নিয়ন আলোয় neon aloy

ডালাস, টেক্সাস। সেপ্টেম্বর ২১, ২০০১। টেক্সাকো এর একটি ফুয়েলিং স্টেশনে সহকর্মীর শিফটে কাজ করছিলেন রইস উদ্দিন ভুঁইয়া । দুপুর ১২টার কিছু সময় পরই একজন ক্রেতা প্রবেশ করেন স্টেশনে। তার মুখে ব্যান্ডানা প্যাঁচানো, চোখে সানগ্লাস আর হাতে একটি ডাবল ব্যারেল শটগান। টাক মাথার আমেরিকান তার শটগানটি রইসের দিক তাক করে আছেন। এভাবে বন্দুকের মুখে আগেও পড়েছেন রইস। সাধারণত কোন ঝামেলা না করে ক্যাশের টাকা দিয়ে দিলে এদের থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় বলেই তিনি জেনে এসেছেন এতদিন। সে অভিজ্ঞতা থেকেই, ক্যাশ রেজিস্টার খুলে দিয়ে আমেরিকানের দিক তাকিয়ে “এখানে যা টাকাপয়সা আছে নিয়ে যেতে পারো তুমি” বলেন রইস। এর পর মুহূর্তে আমেরিকান যে প্রশ্নটি করেন তা রইসের মেরুদন্ডে শিহরণ সৃষ্টি করে, এক মুহুর্তেই তিনি বুঝে যান তার মুখের সামনে অস্ত্র ধরা মানুষটি টাকা-পয়সার লোভে আসেনি, রইসের জীবন নিতে এসেছে।

“কোন দেশ থেকে এসেছো তুমি?” অস্ফুট কন্ঠে হুংকার করে শটগান হাতে আমেরিকান। জবাবের অপেক্ষা না করেই চাপ দেয় সে ট্রিগারে। অর্ধশতাধিক পেলেট সম্বলিত শটগানের একটি রাউন্ড বাতাসের ৪ ফুট দূরত্ব অতিক্রম করে লক্ষ্যভেদ করে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে “মা” বলে আর্তনাদ করেন রইস। শটগানের পেলেট গুলো গেঁথে আছে তার মুখমন্ডলের ডান পাশে আর কপালে। রক্তাক্ত হয়ে আছে কাউন্টারের পেছনের মোজাইক করা ফ্লোর। এই অবস্থায় তাকে ফেলে বের হয়ে যায় আমেরিকান, নতুন শিকারের খোজে। রইস উদ্দিন জ্ঞান হারাননি তখনও। স্রষ্টার সাথে জীবনের দেনদরবার করছেন। কোনরকমে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি সঞ্চার করেই ছুটে গেলেন পাশের সেলনের দোকানে। সাহায্য পেলেন সে দোকানের মালিকের কাছে। ইমার্জেন্সি নাম্বার ৯১১-এ কল করা হয়েছে, অপেক্ষা এখন অ্যাম্বুলেন্সের। মুখ ভর্তি শটগান পেলেট নিয়ে পার্কিং লটে রইস উদ্দিন ভুঁইয়া দাঁড়িয়ে আছেন, নিজের চেহারায় শটগানের গুলি লাগার পর অ্যাম্বুলেন্সের জন্য দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করছেন কেউ এমন দৃশ্য কখনো দেখেনি অ্যাম্বুলেন্সে আসা ইমার্জেন্সি প্যারামেডিক দলের লোকজন।

সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও জীবন খুব একটা সহজ হয় নি রইসের। মুখমন্ডল থেকে শটগানের পেলেট সরানোর জন্য সার্জারী করাতে হয়েছে ৪ বার। এখনো ৩৫টির মত পেলেট তার মুখের পেশীতে আটকে আছে। ডান চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই। চিকিৎসার খরচ যোগাতে ঋণে পড়েছেন অনেক। কর্মক্ষমতা হারিয়ে বোঝা হয়ে পড়েছিলেন আশ্রয়দাতা বন্ধুদের উপর। বিয়ের প্রতিশ্রুতিও রাখতে পারেননি প্রিয়তমার কাছে। “হয়তো ওই দিন মরে গেলেই বেঁচে যেতাম” – একটা সময় এমন চিন্তাও গ্রাস করেছে রইস উদ্দিনকে।

মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরে আসা রইস উদ্দিন ভুঁইয়ার জন্ম বাংলাদেশে ১৯৭৩ সনে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছেন সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে। এর পরপরই যোগ দেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে। বিএমএ ট্রেনিং শেষ করে চাকুরী শুরু করার কিছু দিনের মধ্যেই গ্রীন কার্ড লটারী জিতে আমেরিকা গমনের সুযোগ হয় তার। ছোটবেলায় ভাই-বোনদের সাথে দেখা ওয়েস্টার্ন চলচিত্রের পটভূমি যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে তাকে। দেশের নিশ্চিন্ত আরামপ্রদ জীবন ছেড়ে রইস উদ্দিন ভুঁইয়া পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। পড়াশুনা শুরু করেন কম্পিউটার টেকনোলজি নিয়ে। বিয়ের কথাবার্তাও ঠিক হয়ে ছিল।  নিউইয়র্কের খরচবহুল জীবনযাত্রা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে পাড়ি জমান ডালাসে। এক বন্ধুর সাথে চাকরী নেন টেক্সাকো এর একটি ফিলিং স্টেশনে। পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ আর জীবিকার নিশ্চয়তা নিয়ে তিনি দেশে ফিরে বিবাহ সম্পন্ন করে স্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু তার আগেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা হয়ে যায় টাক মাথার আমেরিকান মার্ক স্ট্রোম্যানের সাথে।

মার্ক স্ট্রোম্যান একজন নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন যার মাদকাসক্তি ও হিংস্র মনোভাবের ইতিহাস ছিল। ৯/১১ জঙ্গি আক্রমনের দিন পাঁচেক পর মার্ক তার শটগান নিয়ে বের হন।  ডালাস শহরের বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দোকানদারদের প্রশ্ন করেন “কোথা থেকে এসেছো?”। প্রথম দিন তার এই ক্ষোভ আর হিংস্রতার শিকার হন ওয়াকার হাসান নামে ৪৬ বছর বয়সী এক পাকিস্তানী অভিবাসী। তার কয়দিনের মধ্যে স্ট্রোম্যানের জিঘাংসার শিকার হন রইস সহ আরো ২ জন প্রবাসী আমেরিকান। রইস বাদে বাকি দুজন মারা যান। এর মধ্যে রইস উদ্দিন ও ওয়াকার ছাড়া হামলার শিকার হওয়া অপরজন ছিলেন বাসুদেব প্যাটেল নামের একজন ভারতীয়। ওয়াকার এবং বাসুদেব দুজনই বিবাহিত ছিলেন ও মিলিত ভাবে তাদের ৬ জন সন্তান-সন্ততি আছে।

২০০২ সালে অস্টিনের আদালত মার্ক স্ট্রোম্যানকে দোষী সাব্যস্ত করে। ১০ বছর সশ্রম কারাদন্ডসহ তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। শুনানীর সময় এক রকম নিশ্চিন্তই ছিলেন মার্ক। তার মতে তিনি যে কাজটি করেছেন তা লক্ষাধিক আমেরিকানও করতে চেয়েছিলো। নিজেকে “আরব ঘাতক” বলে দাবী করেন তিনি। তার উকিল মামলার যুক্তি খন্ডনের সময় মার্কের কৈশরে সৎবাবার হাতে নির্যাতন, মাদকাসক্তি ও ৯/১১ এর টুইন টাওয়ার হামলায় মারা যাওয়া একমাত্র বোনের প্রতিশোধ প্রবনতা কে দায়ী করেন। ২০১১ সালের ২০ জুলাই তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

মুখে শটগানের গুলি নিয়ে বেঁচে যাওয়ার জন্য নয়, বরং সম্পূর্ন ভিন্ন এক চিন্তাধারার জন্য মিডিয়ার আলোতে উঠে আসেন রইস উদ্দিন ভুঁইয়া। ২০০৯ সালে মায়ের সাথে হজ্জ করে ফেরার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার ঘাতকের মৃত্যুদন্ড লাঘবের চেষ্টা করবেন তিনি। উদারপন্থী ইসলামের নীতিতে বিশ্বাসী রইস উদ্দিন মিডিয়ায় বক্তব্য দেন “আমি তাকে ক্ষমা করেছি। তার প্রতি কোন ক্ষোভ নেই আমার। আমি মনে করি সে একজন মানুষ যে জীবনে মর্মান্তিক একটা ভুল করে ফেলেছে। তবে সেটার জন্য শুধু সে শাস্তি পেলে সত্যিকার অর্থে জাতিগত ঘৃণা থামানো সম্ভব না। আমি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাব, আমার যত পরিশ্রমই করা লাগুক না কেন। ইসলাম আমাকে শিখিয়েছে কেউ যদি কারো জীবন রক্ষা করে তবে সে সমগ্র মানব জাতিকে রক্ষা করবে। আমি এই আদর্শেই বাঁচাতে চাচ্ছি মার্ককে। আমি যেহেতু ক্ষমা করেছি তাকে, তবে অহেতুক তার প্রাণনাশের কি মর্ম?”।

ঘাতকের মৃত্যুদন্ড লাঘবে রইস উদ্দিন ভুঁইয়া ২টি রিট আবেদন করেন। শেষমেশ না পেরে গভর্নর অফিস এর বিরুদ্ধে ভিক্টিম রাইটস আইনে মামলা করেন তিনি। শাস্তি কমাতে না পারায় রইস উদ্দিন মার্ক স্ট্রোম্যানের সাথে কথা বলার অনুমতি চান। সে অনুমতিও পাননি, শেষ মুহূর্তে একজন সাংবাদিক মার্কের সাথে কথা বলতে কারাগারে গিয়েছিলেন, যার ফোন দিয়ে রইস উদ্দিন মার্কের সাথে ২০০১ এর ২১ সেপ্টেম্বরের পর প্রথম কথা বলেন। মার্ক তার ব্যাক্তিগত কিছু কথা শেয়ার করেন রইসের সাথে এবং রইসের ব্যবহারে অভিভূত হয়ে এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরে মার্ক তাকে ভাই বলে সম্বোধন করেন। মার্ক স্ট্রোম্যান একটি চিঠি পাঠান রইসের কাছে। এই প্রচেষ্টার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে রইস উদ্দিন একটি ওয়েবসাইট চালু করেন, যার নাম World Without Hate। সেখান থেকে এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে পরিনত হয়। সহমর্মিতা, সমবেদনা আর ক্ষমাশীল মনোভাব কে পুঁজি করে এগিয়ে চলছে সংগঠনটি। বিভিন্ন ধরনের কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম দিয়ে “হেট ক্রাইমের” প্রকোপ কমাতে এবং মানুষের সচেতনতা বাড়াতেও কাজ করছে সংগঠনটি। শুধুমাত্র তা-ই নয়, রইস উদ্দিন তার মত অপরাধের শিকার ভারতীয় ও পাকিস্তানী পরিবারের সহযোগিতা করছেন।

রইস উদ্দিন ভুঁইয়া বর্তমানে ডালাসে টেক উপদেষ্টা হিসেবে চাকরী করছেন একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে। তার ঘটনা নিয়ে আনন্দ গিরীধর দাশ একটি বই প্রকাশ করেন যার নাম “The True American: Murder and Mercy in Texas”। তার ঘটনাটি উপজীব্য করে চলচিত্র নির্মানের ব্যাপারে চিন্তা করছেন “দা হার্ট লকার” চলচ্চিত্রের জন্য ২০১০ সালে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের অস্কার জয়ী নির্দেশক ক্যাথরিন বিগোলো।

রইস উদ্দিন ভুঁইয়া বাংলাদেশের সন্তান হিসেবে মাথা উঁচু করে নিজেকে বাংলাদেশী পরিচয় দেয়ার পরিবেশ তৈরি করেছেন তার ক্ষমাশীলতার দৃষ্টান্তে। তবে বাংলাদেশে তাকে নিয়ে চোখে পরার মত কোন সংবাদই আসেনি মিডিয়ায়। তার নিঃস্বার্থ পদক্ষেপগুলোর জন্য দেশে মানুষের কাছে কোন ধরনের পৃষ্ঠোপোষতা পেয়েছেন বলেও জানা যায়নি। ২০০৯ সালে মার্কের মৃত্যুদন্ড লাঘবের চেষ্টা শুরু করার সময় থেকেই তিনি আমেরিকান মিডিয়ায় একজন কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন। সেই তুলনায় নিজের দেশ থেকে পৃষ্ঠপোষকতা তো দূরে থাক, স্বীকৃতিটুকুও পান নি রইস। লজ্জাজনক হলেও কিছুটা নিশ্চয়তার সাথে বলা যায়, রইস উদ্দিন ভুঁইয়ার ঘটনাটি এই প্রথম বারের মত বাংলায় সঙ্কলিত হয়েছে।

তবে এখানেও মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন রইস। তিনি আমেরিকায় বসবাসরত শুধু বাঙ্গালী বা মুসলিমদের জন্য কাজ করেননি। তিনি আমেরিকায় আসা সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতিসত্ত্বার অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবং তার এই চেষ্টা পৃথিবী জুড়ে প্রভাব ফেলছে তার নিজের হাতে গড়া সংগঠন World Without Hate এর মাধ্যমে। দেশীয় মিডিয়াকে এই তথ্যগুলো দেশের মানুষের কাছে পেশ না করার জন্য দোষারোপ করা আসলে কতটা যৌক্তিক হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। তবে তার সংগ্রাম শুরুর মূহুর্তটুকু যেহেতু মিডিয়া হারিয়ে ফেলেছে, তাই তাদের আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আফসোসটুকু শুধু আমাদের মিডিয়ার না, বাংলাদেশী হিসেবে আমাদের সবারই। বাংলাদেশী একজনের মহত্বের গান যখন পুরো বিশ্ব গাইছিলো, তখন বাংলাদেশেই তার কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। দেশীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রচার দিয়ে সাহায্য করলে হয়তো World Without Hate এর কাজ একটু সহজ করা সম্ভব। দেশীয় মিডিয়ায় প্রচার সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সংগঠনটির লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে, সে সাথে রইস উদ্দিন ভুঁইয়ার মহানুভব আদর্শের চর্চা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে উগ্রপন্থী ধর্মীয় চিন্তাচেতনা লালন করা অনেকের জন্যই।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top