নাগরিক কথা

সংবাদমাধ্যম, সংবাদের রসালোকরণ, এবং ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা

সংবাদমাধ্যম নিয়ন আলোয় neon aloy

আপনি যদি মিলেনিয়াল প্রজন্মের অংশ হয়ে থাকেন (১৯৭০- এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ‘৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম), তাহলে আপনার অবশ্যই মনে থাকার কথা যে পুরো পরিবার একসাথে বসে বিটিভি’তে খুব মজার কোন অনুষ্ঠান দেখার মাঝখানে বেরসিকভাবে সংবাদ বুলেটিন প্রচারের সময়টা কি পরিমাণ বিরক্তির উদ্রেক করতো সবার মনে। এমনকি, পরিবারের ছোটদের সাধারণ জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যে রাশভারী মুরুব্বীরা সারাদিন লেকচার দিতেন নিয়মিত সংবাদপত্র পড়ার জন্য এবং ইংরেজিতে পাকা হওয়ার জন্য বাসার সবারই রাত ১০টার নীরস ইংরেজি সংবাদ শুনা উচিৎ, তারা পর্যন্ত বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকাতেন শুক্রবার ইত্যাদি’র সম্প্রচারের মাঝখানে সংবাদবিরতিতে যাওয়ামাত্র। এ থেকে এরকম মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে সংবাদ বিষয়টাই খুব বোরিং এবং একঘেয়ে একটা বিষয়, যদিও ব্যাপারটা আসলে সেরকম না। বাস্তবতা সবসময়ই কল্পকাহিনীর চেয়ে রসালো, তাহলে বাস্তব ঘটনার খবর শুনার চেয়ে আমাদের কল্পকাহিনীর নাটক-সিনেমা কেন বেশি আকৃষ্ট করতো? জবাবটা খুবই সিম্পল- উপস্থাপনা! নাটক-সিনেমা যতটা গ্ল্যামারাসভাবে টিভি’তে উপস্থাপন করা হতো, ঠিক ততটাই নীরসভাবে উপস্থাপন করা হতো সংবাদ।

বিনোদনের চেয়ে সংবাদ নিঃসন্দেহে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ন। তাহলে যারা টিভি অনুষ্ঠান পরিকল্পনা এবং পরিচালনার দায়িত্বে থাকতেন, তারা কেন জেনে-বুঝে সংবাদপাঠের বিষয়টা এত নন-গ্ল্যামারাস এবং নীরস রাখতেন? তারা নিশ্চয়ই আপনার-আমার চেয়ে হাজারগুণে ভালভাবে বুঝতেন দর্শককে একটা প্যাকেজ নাটক দেখানোর চেয়ে আধাঘণ্টার সংবাদ পরিবেশন কত বেশি জরুরী! আমি সাংবাদিকতার ছাত্র না, তবে কমন সেন্স যা বলে, নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের জন্য নিষ্কলুষ ও নিরাবেগ থাকাটা খুবই জরুরী! কেননা, আবেগমাত্রই সংক্রামক। একই খবর আপনি একই ট্রান্সক্রিপ্ট পড়ে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারেন শুধুমাত্র উপস্থাপকের ভাবাবেগের ভিন্নতার মাধ্যমে। এবং এর উপরই নির্ভর করবে সংবাদের দর্শক ও শ্রোতা সংবাদটি পজিটিভলি নিবে, নাকি নেগেটিভলি? কিন্তু দর্শকের মনে একটা ঘটনাকে পজিটিভ বা নেগেটিভভাবে উপস্থাপন করা কি একজন সংবাদকর্মীর কাজ? সম্ভবত না। যদি জনমত গঠন করা সংবাদমাধ্যমের কাজ হতো, তাহলে কিন্তু শীর্ষস্থানীয় প্রেস সংস্থাগুলোর প্রত্যেকটির শিরোনামে নিরপেক্ষতার বুলি ঝুলতো না। যেই সংবাদমাধ্যম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে জনমত গঠনের কাজ করতো, তাদের সরাসরি “প্রোপাগান্ডাবাজ” আখ্যা দেওয়া হতো একটা সময়।

সংবাদমাধ্যম এখন শুধুমাত্র খবরই পরিবেশন করে না, সত্যি কথা বলতে মানুষের একরকমের বিনোদনমাধ্যমে পরিণত হয়ে উঠেছে!

সংবাদমাধ্যমের এই প্রাচীন সংজ্ঞায়নের মধ্যে আবার উঠে আসে পুরনো একটি প্রশ্ন। একটি সংবাদমাধ্যম কি তবে ভালকে ভাল, আর খারাপকে খারাপ বলার অধিকার রাখে না? আধুনিক সংবাদমাধ্যম এই ডিলেমা কাটিয়ে উঠেছে প্রায় দেড়-দুই দশক আগেই। সত্তর-আশি’র দশকের সংবাদ পরিবেশনা আর আধুনিক সংবাদ পরিবেশনার মধ্যে এখন যোজন-যোজন ফারাক। সংবাদমাধ্যম এখন শুধুমাত্র খবরই পরিবেশন করে না, সত্যি কথা বলতে মানুষের একরকমের বিনোদনমাধ্যমে পরিণত হয়ে উঠেছে! আর প্রোপাগান্ডা? সম্ভবত কোন সংবাদমাধ্যমই এখন আর প্রোপাগান্ডাবাজের সিল গায়ে লাগানোকে খুব একটা ভয়ের চোখে দেখে না, বরং কোন পত্রিকা আর কোন সংবাদ চ্যানেল কার নুন খেয়ে কার গীত গায়- তা মোটামুটি সচেতন সমাজে ওপেন সিক্রেটই বলা চলে।

সংবাদের রসালোকরণঃ

আলোচনা ভিন্নপথে মোড় নেওয়ার আগেই কক্ষপথে ফেরত আসা জরুরী। একটু আগেই বলছিলাম যে আধুনিক সংবাদমাধ্যম এখন শুধুমাত্র মানুষকে সংবাদই পরিবেশন করে না, মানুষের বিনোদনেরও একটা বড় চাহিদা ইদানীং পূরণ করে। তবে এই বিনোদনটা ঠিক কতটা নিষ্কলুষ, সে আলোচনা একটু পরে করা হবে। তার আগে জেনে নেওয়া যাক কেন এই পটপরিবর্তন?

সত্যি কথা বলতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ আমাদের জীবন ও সভ্যতা হিসেবে আমাদের সামগ্রিক মানসিকতা এতটাই দ্রুত পরিবর্তন করছে যে আমরা নিজেরাই তার সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারছি না। আর সংবাদ পরিবেশন করা হয় কাদের জন্য? – আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য। সেই অডিয়েন্সের চাহিদা এত দ্রুত আর এত অদ্ভুতভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে যে সংবাদমাধ্যমগুলোর আসলে সুস্থ কোন উপায় থাকছে না এই চাহিদাকে অগ্রাহ্য করার।

হাজার বছর আগে থেকে চলে আসা সংবাদপত্রের একাধিপত্যে গত শতাব্দীর শুরু থেকে অল্প-অল্প করে ভাগ বসিয়েছে টেলিভিশন সংবাদ। আর নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে ইন্টারনেটের জয়জয়কার বলতে গেলে পথে বসিয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন বেশ কিছু পত্রিকাকে, যারা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক হতে পারেনি। আর এই ইন্টারনেটের যুগে কাগজের পত্রিকা চলবেই বা কিভাবে? এতে না আছে সার্চ ফাংশনালিটি, একটা খবর অনেক সময় পুরো পত্রিকা আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও পাওয়া যায় না। পত্রিকার খবরগুলো অন্তত একদিনের বাসি খবর, যে খবর আমরা ইন্টারনেটে ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছি প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, এমনকি ছবি বা ভিডিওসহ! তাছাড়া পত্রিকাগুলোর রেভিনিউর বড় উৎস বিজ্ঞাপন, সে বিজ্ঞাপনের বাজারটাও খেয়ে ফেলছে বিক্রয় ডটকম, বিডিজবস এর মত ক্লাসিফাইড ওয়েবসাইট। তাই এই পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে অফলাইনে কাগজের পত্রিকার পাশাপাশি অনলাইন ভার্সন প্রকাশ করা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রত্যেকটি পত্রিকার জন্য। আর শুধু যে পত্রিকাগুলোকেই অনলাইন হতে হচ্ছে তা না, টিভি চ্যানেলগুলোকেও পাল্লা দিতে হচ্ছে ইউটিউব এবং অন্যান্য অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং এর সাথে বাজারে টিকে থাকতে।

ইদানীং মানুষ ইন্টারনেট ব্যয় করা সময়ের প্রায় পুরোটাই কাটায় ফেসবুক-টুইটারের মত সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েবসাইটগুলোতে, যেখানে ক্রমাগত স্ক্রলিং এ একটা খবরের শিরোনাম সর্বোচ্চ দেড়-দুই সেকেন্ড সময় পায় পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করার।

তো এখন অফলাইন থেকে অনলাইনে এসে কি কি প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলোকে? প্রথমত, তাদের মানিয়ে নিতে হয়েছে ইন্টারনেট ট্রেন্ডের সাথে। বাইরের দেশগুলোতে একটি কথা খুবই প্রচলিত যে- Everyone is an asshole on the internet, ইন্টারনেটে সবাই একেকটা আহাম্মক। ইন্টারনেটের শুরুর দিককার বেনামী নিকনেমগুলো যে অনলাইন আহাম্মকির হুজুগ শুরু করেছিলো, প্রায় ২০-২৫ বছর পর এসে মানুষ নিজের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে সেই আহাম্মকিগুলো করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছে না! এই ভার্চুয়াল জগতে মানুষের অ্যাটেনশন স্প্যান গড়ে ৮ সেকেন্ড। আর ইদানীং মানুষ ইন্টারনেট ব্যয় করা সময়ের প্রায় পুরোটাই কাটায় ফেসবুক-টুইটারের মত সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েবসাইটগুলোতে, যেখানে ক্রমাগত স্ক্রলিং এ একটা খবরের শিরোনাম সর্বোচ্চ দেড়-দুই সেকেন্ড সময় পায় পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করার। তাই, একটা নীরস-নিরাবেগ অবস্থা থেকে এই অধীর-অস্থির এবং আনপ্রেডিক্টেবল নতুন সিনারিও’তে খাপ খাইয়ে নিতে সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজেদের একটা বাজার এবং চাহিদা তৈরি করে নিতে হয়েছে।

আর এই বাজার তৈরির প্রক্রিয়াটাতেই বলা যায় সংবাদমাধ্যমগুলোর অধঃপতন সূত্রপাত। যেখানে সংবাদমাধ্যমগুলো কাজ করতে পারতো ইন্টারনেটে নতুন একটা সুস্থ ধারা শুরু করার, সেখানে মূলধারার অনেক সংবাদমাধ্যমকেই দেখা যায় গড়পড়তা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে নিজেদের ওয়েবসাইটের ট্রাফিক বাড়ানোর ধান্ধায় নামতে। সব মূলধারার সংবাদমাধ্যমই যে এই অসুখে ভুগছে তা কিন্তু না, কিন্তু যারা জেনেশুনে এই রোগকে নিজের শরীরে জায়গা দিয়েছেন, তাদের কাছে মার খেয়ে যাচ্ছেন সুস্থধারার প্রকাশকরা। এই সমস্যাটা বাইরের দেশগুলোতে যতটা প্রকট, তারচেয়েও ভয়াবহ আমাদের দেশে। সবাই প্রতিযোগিতায় নামে কিভাবে একটা সাধারণ সংবাদকে রসালো করা যায়, কিভাবে মানুষকে লিঙ্কে ক্লিক করিয়ে নিজের ওয়েবসাইটে ঢুকানো যায়। আর এভাবেই শুরু হয় সংবাদের অশ্লীল রসালোকরণ, যা জন্ম দিচ্ছে ক্লিকবেইট সাংবাদিকতার।

ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা

ইন্টারনেটের ইতিহাসের প্রায় সমান বয়স এই ক্লিকবেইট টার্মটার। একজন ওয়েবপেইজ ভিজিটরকে কিভাবে টোপ ফেলে নিজের লিঙ্কে ক্লিক করানো যায়- সেটাকেই ইন্টারনেট মার্কেটাররা নাম দিয়েছেন ক্লিকবেইট। এই টোপ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। পর্নসাইটের ক্লিকবেইট হয় অশ্লীল ছবি দিয়ে, একজন লাইফকোচ কিংবা সাইকোথেরাপিস্টের ক্লিকবেইট হয় মোটিভেশনাল কোন উদ্ধৃতি দিয়ে। এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠতি সেলিব্রিটিরা নিজেদের যে ছবি-ভিডিও-লাইভ আপলোড করেন, সেগুলোও এক ধরণের ক্লিকবেইট বলা যায়। কারণ প্রতিটা ক্লিক মানেই নিজের ওয়েবসাইটের আরেকটু ট্রাফিক বেড়ে যাওয়া, আর সেইসাথে অবধারিতভাবে ব্যবসায়ে প্রসার। এখানে সংবাদমাধ্যমের ক্লিকবেইটের উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রথমেই মাথায় পর্নসাইটের ক্লিকবেইটের উদাহরণ আসলো কারণ এই দুইটার মধ্যে আমি তেমন কোন পার্থক্য খুঁজে পাই না। পার্থক্য এইটুকুই, পর্নের ক্লিকবেইট চটুল ছবি ব্যবহার করে, আর সংবাদমাধ্যমেরগুলো চটুল-রগরগে-যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া ভাষার শিরোনাম দিয়ে চটুল ছবির কাজটা সেরে নেয়। এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ সস্তা অনলাইন পোর্টালের সাথে সাথে জাতীয় দৈনিকের ফেসবুক পেইজ থেকেও নায়লা নাইম, কিম কারদাশিয়ানের চটুল স্ক্যান্ডালের “ব্রেকিং নিউজ” শিরোনামের পোস্টগুলো। মানুষের যৌনানুভুতিকে পুঁজি করে ট্রাফিক কামানো সাইটগুলোকে একসময় বেশ ঘৃণা করলেও এখন মনেহয় এগুলোই সবচেয়ে নির্দোষ। বরং মানুষের মানবিকতা, সুস্থচিন্তাকে পুঁজি করে যারা ব্যবসা করছে, সেগুলো আরো বেশি নোংরা। যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া ক্লিকবেইটগুলো এড়িয়ে যাওয়া বরং অনেক সহজ এগুলোর চেয়ে। যেমন বিবিসি’র আজকে সকালের ফেসবুক পোস্টগুলি দেখুনঃ

সংবাদমাধ্যম নিয়ন আলোয় neon aloy

পোস্ট ১

সংবাদমাধ্যম নিয়ন আলোয় neon aloy

পোস্ট ২

 

প্রথম “ব্রেকিং নিউজ”টি আমার হিসাবে ক্লিকবেইট হিসাবেই ধরবো, কারণ এর শিরোনামের ৭টি শব্দের বাক্যাংশটুকু যথেষ্ঠ পরিমাণে মিসলিডিং। কারণঃ

  • শিরোনাম পড়ে যে কারো মাথায় প্রথমেই আসবে ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের বিমান দুর্ঘটনার কবলে পরেছে, যা আসলে সত্য নয়।
  • ফুটবল দল, হোক সেটা ব্রাজিলের জাতীয় দল অথবা কোন লোকাল ক্লাব- সেটার আড়ালে চাপা পরে গিয়েছে দুর্ঘটনায় পরা বিমানের বাকি যাত্রীদের কথা। (বিমানটিতে মোট ৮১ জন ছিলেন যাত্রী এবং ক্রু মিলিয়ে, এর মধ্যে ৭৬ জন্মের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এখন পর্যন্ত)

এখন আসুন আলোচনা করি “ক্লিকবেইটের চমৎকার”! প্রথম শিরোনামের খবরটি যখন বিবিসি’র ফেসবুক পেইজে পোস্ট করা হয়েছে, তখন ইউরোপে ভোর, এবং ল্যাটিন আমেরিকায় মাঝরাত। এই চরম অফপিক আওয়ারে পাবলিশ হওয়া এই বিভ্রান্তিকর শিরোনামের ফেসবুক পোস্টটি এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি শেয়ার এবং প্রায় ৬০ হাজারের মত রিএকশন পেয়েছে। অথচ তার কিছুক্ষণ পরেই পাবলিশ হওয়া বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত পোস্টটি পেয়েছে মাত্র সোয়া চার হাজার শেয়ার এবং ১০ হাজার রিএকশন! দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য হচ্ছে যে মানুষ সত্যের চেয়ে গুজব বা ভ্রান্ত ধারণায় বেশি বিশ্বাস রাখে এবং পুরো খবরের চেয়ে অর্ধেক খবরই বেশি চলে বাজারে।

এখন সংবাদমাধ্যমগুলো এই অজুহাত দিতেই পারে যে বাজারে টিকে থাকার জন্য তারা কোয়ালিটি এবং সাংবাদিকতার পবিত্রতার সাথে আপোষ করেছেন, এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না – কিন্তু আসলেই কি তাই? এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, আমাদের দেশেই সংবাদপত্রের জোরে সরকার গদি থেকে নেমেছে, আবার গদিতে বসেছে। যেই দেশে সংবাদপত্রের এত ক্ষমতা, সেই দেশে আমার মনে হয় না রুচিশীল সংবাদ পরিবেশন করে বাজারে টিকে থাকা খুব একটা কঠিন কাজ। আর একটা আধুনিক রাষ্ট্রে প্রেসকে রাষ্ট্রের চতুর্থ শক্তিশালী সত্ত্বা হিসাবে ধরা হয়। এর তাৎপর্য কিন্তু অপরিসীম। এই প্রেস পারে রাষ্ট্রের নাগরিকদের রুচি গড়তে, ধ্বংস করতে, পাঠকদের সামনে সত্য তুলে ধরতে, আবার পুরো একটা জাতিকে অন্ধকারে রাখতে। তবে শুধু মুনাফা লোটাই যদি আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলোর মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে অবশ্য এসব কথা বলে লাভ নাই।

সবশেষে কিছু কথা না বললেই নয়। আমরা বাইরের একটা যাই বা না যাই, সেই দেশটা সম্বন্ধে কিছুটা আন্দাজ করতে পারি তাদের নাগরিকরা কতটুকু সভ্য- সেটা হিসাব করে। ছোটবেলায় বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার সময় রচনায় পড়েছিলাম – “সংবাদপত্র জাতির বিবেকস্বরূপ”। এখন বাইরের দেশের কেউ যদি আমাদের দেশের সভ্যতা পর্যালোচনা করতে এসে দেখে আমাদের অন্যতম প্রধান দৈনিকের ফেসবুক পেজে ঝুলছে বলিউডের কোন অভিনেত্রী কোন ক্রিকেটারের সাথে অভিসারে বেরিয়েছিলেন অন্তর্বাস না পরেই সে বিষয়ক খবর- তাহলে আমাদের “বিবেক” এর কোন রুপটা ধরা পরে, সেটা আসলে না বললেই ভাল। শুধু বাংলাদেশেই না, আমেরিকার মত দেশেও কিন্তু অনেক পত্রিকার লিড নিউজ হয় প্যারিস হিলটনের স্ক্যান্ডালের খবর। কিন্তু কোন পত্রিকাগুলোতে এই খবর আসে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে সেগুলো TMZ এর মত সস্তা গসিপ ম্যাগাজিন; ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস না। “পাবলিক যা খেতে চায়, তা-ই খাওয়াও” – এটা একটা ভাল রেস্টুরেন্টের বিজনেস পলিসি হতে পারে, একটা নিউজ এজেন্সির পাবলিশিং পলিসি কখনোই না! বাংলাদেশের মানুষ কেন জানি ভায়োলেন্স পছন্দ করে, তারপরেও কিন্তু বাংলাদেশের বেশিরভাগ পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল মরদেহের ছবি অস্পষ্ট করে দেখায়। পাঠকের এই অসুস্থ চাহিদায় যদি আপনারা পানি ঢালতে পারেন, অন্যান্য অনেক আশাতেও ঢালতে পারার কথা। ভাল খবরের পাঠকশ্রেণী তৈরি হতে হয়তো সময় লাগবে, তবে এরাই আপনার লয়াল ভোক্তা হবে দীর্ঘসময়ের জন্য। এই পাঠকশ্রেণীটাকে সম্মান করতে শিখুন। আপনারা নিজের অজান্তেই মার্কেট যখন খারাপের দিকে নিতে পেরেছেন, চেষ্টা করলে ভালোর দিকেও নিতে পারবেন। মার্কেট যেটা চায় সেটা ফলো না করে নিজের সুস্থ মার্কেটের পায়োনিয়ার হওয়াটাই ভাল না? নাহলে দেখা যাবে যেখানে একটা নিউজ এজেন্সির সক্ষমতা ছিলো টাইমস ম্যাগাজিনের মত বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড হওয়ার, সেই এজেন্সি মার্কেট ফলো করতে গিয়ে রেডিওমুন্না হয়ে বসে আছে!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top