নাগরিক কথা

কেমন আছেন “থ্রি ইডিয়টস” এর র‍্যাঞ্চো, বাস্তবের সোনম ওয়াংচুক

সোনম ওয়াংচুক Sonam Wangchuk নিওন আলোয় neon aloy

বলিউডের থ্রি ইডিয়টস মুভির শেষাংশে বিজ্ঞানী ফুংসুখ ওয়াংড়ুর আবিষ্কারগুলো দেখে অবাক হননি এমন দর্শক কমই আছেন। আমির খান অভিনীত এই চরিত্রটি মূলত লাদাখের বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুক এর অনুপ্রেরণায় তৈরী।

সোনম ওয়াংচুক, আপনার আমার কাছে নামটা অপরিচিত হলেও কিন্তু লাদাখবাসীর জন্য মোটেও অপরিচিত নয়। ১৯৬৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর লাদাখের উলে তকপোতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মূলত লাদাখে সোনম একজন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও শিক্ষা সংস্কারক হিসেবে জনপ্রিয়।

সোনম ওয়াংচুকের বাবা সোনম ওয়াংগ্যাল ভারত সরকারের মন্ত্রী হওয়ায় তার ছোটকাল কাটে শ্রীনগরে। ওইখানেই তিনি স্কুল শুরু করেন, কিন্তু সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাষার স্কুল হওয়ায় তিনি কিছুই বুঝতে পারতেন না। তাছাড়া আর দশটা ছেলের তুলনায় একটু ভিন্ন হওয়ায় তার স্কুলের শিক্ষকরা তাকে নির্বোধ ভাবতো! কাশ্মীরের দুঃসহ স্মৃতি থেকে মুক্তি দিতে তাকে দিল্লীতে সরকারি আবাসিক স্কুলে পাঠানো হয়। সেখানকার শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসেন বিজ্ঞানী ওয়াংচুক।

১৯৮৭ সালে তিনি শ্রীনগর ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ব্যচেলর ডিগ্রি অর্জন করে চলে যান জন্মস্থান লাদাখে। সেখানে শিক্ষা সংস্কারের উদ্দেশ্যে তিনি Students’ Educational and Cultural Movement of Ladakh (SECMOL) প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৮৮ সালে। এরপর থেকেই সোনম ওয়াংচুক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন লাদাখের শিক্ষা ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা। ২০১৩ সাল থেকে তিনি তার Ice Stupas প্রজেক্ট এর কাজ শুরু করেন।

সেই সোনম ওয়াংচুক তার উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্প্রতি পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ Rolex Awards for Enterprise 2016। মুলত “Who have reshaped the world with their innovative thinking and dynamism” এই স্লোগানের উপর ভিত্তি করেই এই পুরষ্কার প্রদান করা হয়। সোনম ওয়াংচুক তার “Ice Stupas” প্রজেক্ট এর মাধ্যমে এবছরের সেরা পাঁচজন উদ্ভাবকের একজন নির্বাচিত হয়েছেন।

সোনম ওয়াংচুক Sonam Wangchuk নিওন আলোয় neon aloy

রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড ফর এটারপ্রাইজ এর অনুষ্ঠানে সোনম ওয়াংচুক

সোনম ওয়াংচুক পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের খরা এলাকার চাষাবাদের পানির সমস্যা দূর করার চেষ্টা করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। এরই ফসল এই “Ice Stupas” প্রজেক্ট।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫০০ মিটার উচ্চতায় লাদাখ অঞ্চলে, বিশেষ করে কুনলুন থেকে বৃহত্তর হিমালয় পার্বত্য এলাকায় এপ্রিল-মে মাসে তীব্র পানির সংকট থাকে, আর এই সময়টাই মূলত ফসল ফলানোর সময়। লাদাখের অপর এক প্রকৌশলী চেভাং নোরফেল এর একটি পরীক্ষামূলক কাজ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে সোনম ওয়াংচুক তার “Ice Stupas” প্রজেক্ট এর ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বুঝতে পারেন হিমালয় অঞ্চলের উচ্চ খরাপ্রবন মালভূমি এলাকায় পানির সমস্যা অতি সহজেই মেটানো যাবে যদি শীতের সময়কার জমাটবাধা পানিকে কোনভাবে বরফে পরিণত করে সংরক্ষণ করা যায়। তার পদ্ধতি ছিলো অতিসাধারণ কিন্তু কার্যকরী। তিনি দেখলেন যে, জমাট পানিকে কোণক আকৃতিতে সাজিয়ে ছোট-ছোট জমাট পানির টিলায় পরিণত করে রাখলে তা খরার সময় ধিরে ধিরে পানির আকারে ক্ষয় হয়ে পানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখে। তিনি এর নাম দেন “Ice Stupas” বা বরফ-স্তুপ।

রোলেক্সের কাছে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোনম ওয়াংচুক বলেন, রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড থেকে পাওয়া ফান্ড তার “Ice Stupas” প্রজেক্ট এর অনেক সহায়তা করবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে খরা অঞ্চলে পূনরায় সবুজ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

সম্প্রতি এই উদ্ভাবক রোলেক্সে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করার জন্য ঘুরে এসেছেন হলিউড থেকে। আর এ সময়কার একটি মজার ঘটনা তুলে ধরেছেন নিজের ফেসবুক পেজের অ্যালবামে- “পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আয়োজকরা আমাকে একটি হলরুমে ভাষণ দিতে বলেন স্থানীয় লোকজনের উদ্দেশ্যে। আমি যখন ভাষণ শেষ করে স্টেজ থেকে নেমে আসি, তখন আমাকে জানানো হয় আমার সামনের দর্শকসারিতে বসে ছিলেন হলিউডের নামকরা সব পরিচালক-অভিনেতা-অভিনেত্রীরা, যাদের মধ্যে ছিলেন টাইটানিকের পরিচালক জেমস ক্যামেরন, অভিনেতা ক্রিস পাইন, ডন শিয়াডলের মত সুপারস্টাররা। তাদের ধারণা ছিলো মঞ্চে ভাষণ দিতে উঠে আমি এত-এত হলিউড সেলিব্রিটি দেখে সারপ্রাইজড হবো। কিন্তু তারা তো জানে না আমি প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা এক ‘ক্ষ্যাতমার্কা’ বিজ্ঞানীমাত্র! তারা ভাবতেও পারেনি যে আমি বাঘা-বাঘা এতসব সুপারস্টারকে চিনতে পারবো না।”

সোনম ওয়াংচুক চেষ্টা করছেন ৩০মিটার উচ্চতার এরকম ২০–২৫ টি “Ice Stupas” তৈরি করতে যা থেকে কয়েক মিলিয়ন লিটার পানির সরবরাহ করা সম্ভব। যা থেকে তিনি আশা প্রকাশ করছেন পার্বত্য লাদাখের খরা এলাকার পানির অভাব অনেকাংশেই পূরণ করা সম্ভব। শুধুমাত্র প্রত্যন্ত লাদাখে না, তার উদ্ভাবিত Ice Stupas কাজে লাগানো হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের মত উন্নত দেশেও।

সোনম ওয়াংচুক Sonam Wangchuk নিওন আলোয় neon aloy

সুইজারল্যান্ডে নির্মীয়মান একটি Ice Stupas

এছাড়াও বর্তমানে তিনি যুবকদের পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলার লক্ষে লাদাখে ৬৫ হেক্টর জমির উপর একটি বিকল্প বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজস্ব প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহার করে হিমালয় ও তার আশেপাশের পার্বত্য এলাকাসহ পৃথিবীর সকল পার্বত্য ও মালভূমি এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন জনিত উদ্ভূত সমস্যার সমাধান বের করা।

শুধু রোলেক্স অ্যাওয়ার্ড নয়, শিক্ষা খাতে অবদানের জন্য ভারত সরকারের সম্মাননা অর্জন করেন ১৯৯৬ সালে, ২০১৪ সালে অর্জন করেন UNESCO Chair for Earth Architecture, ২০০৮ সালে India-CNN Real Hero পদকসহ আরো অনেক সম্মাননা অর্জন করেন।

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top