ইতিহাস

আইকনিক ছবি – একজন ফটোগ্রাফারের “হলি গ্রেইল”

আইকনিক ছবি নিয়ন আলোয় neon aloy

বেইজিং, ১৯৮৯। তিয়ানামেন স্কয়ারে একটি ট্যাঙ্ক বহরের পথরোধ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন অজ্ঞাতনামা এক পুরুষ। পরণে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে বাজারের ব্যাগ। ফটোগ্রাফটি তোলা হয়েছিল বেইজিং হোটেলের বারান্দা থেকে। বর্তমান দিনের অন্যতম একটি “আইকনিক” ছবি। আরো অনেক উদাহরণ আছে। চে গুয়েভারা’র পোরট্রেট, জন লেননের হাতে গীটার, সবুজ চোখের আফগান বালিকা, জাপানের ইউ জিমা দ্বীপে প্রবল যুদ্ধের মাঝে পতাকা উত্তোলনরত  আমেরিকান সৈন্যদল, নাপাম বোমার আগ্রাসন থেকে ছুটে পালানো ভিয়েতনামিজ গ্রামবাসী কিংবা সাইগনের রাস্তায় ভিয়েতনামিজ জেনারেলের হাতে সন্দেহভাজন ভিয়েতকং নেতা নগুয়েন ভ্যান ল্যামের হত্যার ঠিক আগমূহুর্তের ছবি – এরকম অসংখ্য কালজয়ী কিছু মুহূর্ত বন্দী হয়ে আছে ফটোগ্রাফিক ফিল্মে। আর অগণিত ফটোগ্রাফের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি হয়ে উঠেছে আইকনিক ছবি। কিভাবে একটি ছবি আরো অজস্র ছবির ভিড়ে আইকনিক ছবির তকমা গায়ে লাগিয়ে নেয়- সেটা জানার কোন বাঁধাধরা গাইডবুক আসলে নেই| তারপরও চে গুয়েভারার সে পোরট্রেট এর গল্পটি দিয়ে চেষ্টা করা যেতে পারে আইকনিক ছবির জন্ম রহস্য উপলব্ধি করার।

 

আইকনিক ছবি নিয়ন আলোয় neon aloy

Guerrillero Heroico- পৃথিবীর সবচেয়ে “ব্যবসাসফল” আলোকচিত্র

 

এটুকু বলা যায় যে, একটি  ছবি তোলার পিছনের গল্পের উপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছবিটির “আইকনিক” হয়ে ওঠা। ফটোগ্রাফার আ্যলবারটো কোরদা চে গুয়েভারার ছবিটি তুলে ছিলেন কিউবান সংবাদপত্র “Revolucion” এর জন্য। যদিও সংবাদপত্রটি চে’র ছবিটি তাদের প্রকাশনায় ব্যবহার করে নি। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ইটালিয়ান প্রকাশক ছবিটি নিয়ে যান কোরডা’র কাছ থেকে। ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে ছবিটির কয়েক লক্ষ কপি ছাপানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল চে হত্যার প্রতিবাদ। সেখান থেকে শুরু ছবিটির উর্ধগতি। বারংবার যে কারণেই হোক না কেন, চে এর সে ছবিটি কফি মগ থেকে শুরু করে সিনেমার পোস্টার- সব জায়গাতেই দেখা যেতে থাকে। ছবিটির নাম হয়ে ওঠে “Guerrillero Heroico”।  প্রায় ৫০ বছর পর এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যারা চে গুয়েভারা’র সেই আইকনিক ছবি ছাপানো টি-শার্ট পরে নি। তরুণদের ঘরে ঘরে ১৯৬০ সালে তোলা ছবিটির কালার পোস্টার। দু:খজনক হলেও, এই বিপ্লবিক ছবি ও তার বর্ণনা দিতে গেলে শেষ কথা বলার সময় এটাও বলতে হয় যে ছবিটির মর্মার্থ, পেছনের বিপ্লব ও ক্যামেরায় বন্দী বিপ্লবীর গল্প জানে এমন মানুষও বিরল। মর্মার্থ হারিয়ে গেলেও আইকনিক বলেই ছবিটি হারায়নি কালের অতলে। চে গুয়েভারার স্বত্বাকে মানুষের চোখের আড়াল হতে দেয়নি এই একটি ফটোগ্রাফ, যদিও এই বিপ্লবীকে একটি ছবিটি বাঁচিয়ে রেখেছে তার বিপ্লবকে ব্যর্থ প্রমাণিত করে প্রতিনিয়ত লাখো টি-শার্ট আর হাজারো জোড়া জুতা বিক্রির ধান্ধা হিসেবে!

সত্যিকার অর্থে ফটোগ্রাফি’তে “আইকনিক” বিশেষণ ব্যবহারের মাহাত্ম্য কোথায়? সে বিষয় নিয়ে কথা বলছেন তিয়ানামেন স্কয়ারের সেই ফটোগ্রাফার স্টুয়ার্ট ফ্র্যাংকলিন। তিনি নিজের সে ছবিটি তোলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এবং সেই সাথে বলেছেন তার ছবিটির আইকনিক হয়ে ওঠার কথা। তবে তার অভিমতে আইকনিক ছবি শুধুমাত্র একটি ভাষাগত ত্রুটি। সহজ ভাষায় দ্বিরুক্তি। কারন “আইকন” হল ছবির গ্রীক প্রতিশব্দ।

এই দ্বিরুক্তি নিয়ে মত বিভেদ রয়েছে বাইজেন্টাইন গির্জার সময় থেকে। পোপ গ্রেগোরী (১ম) চেয়েছিলেন গির্জার অলঙ্করণ হবে বাইবেলে বর্ণিত ঘটনাগুলোর ছবি দিয়ে, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ স্পষ্ট ধারণা পেতে পারে। পূর্ব দিকের গ্রীকভাষী খ্রীষ্টানদের এতে দ্বিমত ছিল। তাদের মতে ধর্মীয় যাজকদের ছবি বা “আইকন” হওয়া উচিৎ গির্জার অলংকরণ। সে সময় থেকে ১২০০ বছর অবধি প্রখ্যাত যাজকগণ সাধারণ মানুষের প্রার্থনার একটি বড় অংশ ধরে রেখেছেন তাদের সে “আইকন” গুলোর সুবাদে।

সাম্প্রতিক সময়কার “আইকনিক” ছবি বলতে আগেই বলা হয়েছে আলবার্তো কোরডা’র ক্যামেরায় বন্দী চে গুয়েভারা। ১৯৬৩ সালে রেনে বুরি’র তোলা চে গুয়েভারা’র হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ছবিটিও একই বিশেষণ পেয়েছে। আইকনিক শব্দটি এই ক্ষেত্রে কাকে বিশেষায়িত করছে সেটা এখন ভাবনার বিষয়। দুটি আলাদা ছবি যেহেতু একই ভাববস্তু তুলে ধরছে, তাই চে নিজেই যে এই ছবিগুলোর মাধ্যমে আইকনিক উপাধিটি অর্জন করেছেন সেটা বুঝে ওঠা খুব কঠিন নয়। উপরন্তু ফটোগ্রাফির শিল্পগুন বিচার করে আইকনিক বিশেষণটি অর্জন করা যায় না, তা স্পষ্ট হয়ে আছে একটি সাধারন বিষয়ে। অ্যাডলফ হিটলারের অনেক স্থিরচিত্র পাওয়া গেলেও তার কোনটিই আইকনিক বিশেষণে বিশেষায়িত হতে পারেনি কখনো।

১৯৭৯ সাল। টাইমস ম্যাগাজিন তাদের কভারে আইকন ও ছবি (ইমেজ) কে পুনর্মিলিত করে। সে বছর নিলাম ঘর গুলোতে ফটোগ্রাফের মূল্য বেড়ে যায় কয়েক গুণ। “ফটোবুম” বলে অভিহিত সে ঘটনা দিয়ে আইকনিক শব্দটি সাধারন মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। সাংস্কৃতিক সাংবাদিকদের প্রভাবে গায়ে মাখার সাবান থেকে শুরু করে বাকিংহ্যাম প্যালেসও আইকনিক হয়ে ওঠে। বক্সার মোহাম্মদ আলী থেকে শুরু করে জনপ্রিয় ব্যান্ড Nirvana হয়ে ওঠে পপ কালচারের “আইকন”।

আইকনিক ছবি নিয়ন আলোয় neon aloy

১৯৭৩ সালে পুলিৎজার পুরষ্কার জিতে নেওয়া এই ছবিটি বিশ্ববিবেকের সামনে তুলে ধরে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা

১৯৮৩ সালে শুরু হয় নতুন প্রথার প্রবর্তন হয়। যুদ্ধের মুহুর্তগুলো আইকনিক ছবি হিসেবে উঠে আসে সাধারণ মানুষের কাছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সবটুকুই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে কিছু ছবির সাথে। নিজের গায়ে আগুন দেয়া বৌদ্ধ সন্নাস্যী, নেপাম বোমায় ঝলসে যাওয়া গ্রাম থেকে পলায়নরত আতঙ্কবিহবল শিশু – এসবেরই উদাহরণ। এই ছবি গুলোর কথা বলেই স্টুয়ার্ট ফ্র্যাংকলিন আরো বলেন, “ফটোসাংবাদিকতার বড় সমস্যা এটা যে, যখন একটি মুহুর্ত আইকনিক ছবি হয়ে যায় তখন সেটি আরো অর্থবহ মুহুর্তগুলোকে এক রকম ধামাচাপা দিয়ে দিতে পারে”। তিয়ানামেন স্কয়ারের ট্যাংকম্যানের কথা দিয়েই ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এই মন্তব্যের। ট্যাংকের পথ সাদা শার্টের লোকটি একা অবরোধ করেননি, আরো অনেকেই ছিল। তবে তিনি একাই বন্দী হয়েছিলেন ক্যামেরায়। তার সে ছবিটিতে আগের দিনের সামরিক উৎখাত কিংবা আমরণ অনশনের দৃশ্য ফুটে ওঠেনি। তাও ট্যাংকম্যান এখনও শোষণের বিরুদ্ধে সাধারন মানুষের জেগে ওঠার আইকন হিসেবেই খ্যাত।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, যেসব ফটোগ্রাফকে আমরা আইকনিক ছবি হিসাবে ধরে নিচ্ছি সেগুলোর প্রায় সবই ১৯৪০ থেকে ‘৮০র দশকের মধ্যে সীমাবদ্ধ কেন? গত কয়েক দশকে কি আইকনের তকমা পাওয়ার মত যোগ্য ছবি আসেনি? অবশ্যই এসেছে। সত্যি বলতে, উপরে আমরা যে ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, তার থেকে ফটোগ্রাফিকালি গ্রামাটিকাল এবং মর্মস্পর্শী অনেক ছবি-ই এসেছে। তবে এই কয়েক দশকে যা হয়েছে, তা হলো ক্যামেরার সহজলভ্যতার সাথে সাথে মানুষের সামনে আসা ছবির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। যার কারণে একটা ছবি মানুষের মাথায় গেঁথে যাওয়ার আগেই আরেকটি ভাল ছবি সামনে পরে গিয়েছে, যেটা আগে হতো না। চে গুয়েভারা কিংবা ভিয়েতনামের ছবিগুলো মানুষকে বছরের পর বছর চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে, পৃথিবীটাকে নতুন করে বুঝতে-চিনতে-উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। পরের দিকে এসে এই চিন্তা করার সময়টা আর পায়নি মানুষ। আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোর বিস্তারের সাথে সাথে এই অ্যাটেনশন স্প্যানটা আরো কমেছে মানুষের। শত শত ছবি আসছে প্রতিদিন যার প্রত্যেকটিই আইকনিক বিশেষণের জন্য প্রতিদ্বন্দীতা করে। লিবিয়া, মিশর, আফগানিস্তান, সিরিয়ায় ঘটে যাওয়া বর্বর হামলাগুলোর ছবি নাড়া দিয়েছে সাম্প্রতিককালের মানুষদের। কিন্তু তবুও আইকনিক হয়ে চিরঞ্জীবী হতে পারে নি কোন ছবিই। একটির ব্যপকতা আর মাহাত্ম্য ছাপিয়ে গেছে আগের ছবিটিকে। যেমন ধরে নিন সমুদ্র সৈকতে নিথর পরে থাকা আয়লান কুর্দির ছবিটিকে। প্রচণ্ড মর্মান্তিক এই মুহুর্তটি কয় মাস পরেই মানুষ ভুলে গিয়েছে, ততদিনে মানুষের সামনে হাজির হয়েছে বোমা হামলায় আহত হয়ে অ্যাম্বুলেন্সে হতবিহবল বসে থাকা ওমরান দাকনিশের ছবি।

তবে এটা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, “আইকনিক” বিশেষণটি তার মূল্য হারিয়ে তলিয়ে গেছে মার্কেটিং পন্থার গোলকধাঁধায়। ট্যাংকম্যান ছবিটির মত অর্থবহ ছবিকে আলাদা ভাবে বিশেষায়িত করার ক্ষমতা নেই শব্দটির। ছবির পেছনের ঘটনা, মানুষ আর পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রত্যয়কে আইকনিক বলা যেতে পারে। কিন্তু তার সাথে ছবির শিল্প মূল্য জড়িয়ে গেলে নিছক প্রপঞ্চ করা হবে ছবিটির অন্তর্নিহিত অর্থ আর তার ফটোগ্রাফারের সাথে।

(দা গার্ডিয়ান অবলম্বনে লেখা)

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top