ক্ষমতা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেহাত বিপ্লব!

যুক্তরাষ্ট্র বেহাত বিপ্লব নিয়ন আলোয় neon aloy

মার্কিন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ঝামেলা হল – এতে ভোট দেয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা, কিন্তু নির্বাচনের ফল ভোগ করে সারা পৃথিবীর মানুষ। মার্কিন বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত জনপদ, মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির গ্রাসে দুমড়ে যাওয়া অর্থনীতির দেশগুলো এই সত্যটি হাড়ে হাড়ে বোঝে। সুতরাং ওই দেশের জনরায়কে বাইরের মানুষের শ্রদ্ধা করা উচিৎ, এটা বলে পার পাওয়া যায়না। রায় কতটা বিবেকপ্রসূত, বিচক্ষণ; বাইরের মানুষ সেই আলোচনা করতেই পারে। বিশেষ করে মিস্টার প্রেসিডেন্টের নাম যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প – সেই আলোচনা অনেক বেশি গরম হওয়াই উচিৎ। সাদাচোখে যে রায়কে ত্রুটিপূর্ণ মনে হচ্ছে তা আসলেও ত্রুটিপূর্ণ কিনা সেটি নিরূপণ করা এই লেখার উদ্দেশ্য।

প্রাইমারি ইলেকশনের শুরুর দিকে চলে যাওয়া যাক। মার্কিন জনগণ স্পষ্টতই একটা পরিবর্তন চাচ্ছিলো, সেই পরিবর্তনটা হলো তারা অস্পষ্ট মুখচোরা রাষ্ট্রনীতির মধ্যে তারা আর থাকতে চায়না। তারা স্পষ্ট কথা চায়, কঠোর নীতি চায়। জনগণের এই চাওয়া প্রতিফলিত হয় রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক দলের মুখচোরা নীতি বর্জনকারী দুই প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বার্নি স্যান্ডার্সের উত্থানে।

যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ থেকে চিন্তা করলে এই দুজনই চরম বিতর্কিত প্রার্থী। যুক্তরাষ্ট্র একটা বহুজাতিক দেশ। নানা দেশের নানা জাতির মানুষ সেখানে বাস করে। যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নে এদের সবারই আছে মেধা-শ্রম-পুঁজির অবদান। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত কট্টোর ডানপন্থীর উত্থান, যার বৈচিত্র‍্যে বিশ্বাস নাই – সত্যিই বিস্ময় জাগানিয়া।

আবার, যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদের প্রধান পতাকাবাহী। তারা যতটা পুঁজিবাদী, তারচেয়ে বেশি সমাজতন্ত্রবিদ্বেষী। স্নায়ুযুদ্ধের কঠিন সময় পার করে এসে তারা যে বিজয় পেয়েছে, তাতে এটি খুব স্বাভাবিক। সেই যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্সের মত স্বঘোষিত সোশ্যালিস্টের উত্থান ট্রাম্পের উত্থানের চেয়েও আশ্চর্যজনক!

তাহলে এই ধারাবদলের পেছনের কাহিনী কী? কাহিনী হলো নিয়ন্ত্রণহীন পুঁজিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে অন্ত:সারশূন্য করে ফেলেছে। কীভাবে করলো তা বুঝতে হলে পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর বুলাতে হবে।

পুঁজিবাদে ধনী আরো ধনী হয়- এটি সত্য। তাই বলে গরীব কিন্তু সবসময় আরো গরীব হয়না। এর কারণ হলো পুঁজিবাদের বাজার শুধু একটি দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনা। পুঁজিবাদকে চলতে হলে বাজার বড় করতেই হবে, নইলে পুঁজিবাদ টিকবে না। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সারাবিশ্বে তাদের বাজার প্রতিষ্ঠা করেছে। সারাবিশ্ব থেকে টাকা নিয়ে এসেছে নিজের দেশে। সেই টাকার ভাগ দেশের সাধারণ মানুষও পেয়েছে নানাভাবে। ফলে ধনী আরো ধনী হলেও দেশের গরীব আরো গরীব হয়নি। দেশ ঠিকভাবেই চলেছে।

কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো কয়েকটি ঘটনায়। রাশিয়ার সুপার পাওয়ার হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন বাইরের দেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রকে বড় একটা ধাক্কা দিলো। এদিকে বছরের পর বছর বিশ্বে চীনের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে সংকুচিত করে ফেলছে। সাথে আছে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষ্ফলা সব যুদ্ধের খরচের চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে দেখা দিলো ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ দুর্নীতি। এসবের প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনে ধাক্কা লাগলো। কিন্তু যেদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ীরা সেদেশের সরকারের পক্ষে কঠোর কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে অবস্থা সামাল দেয়ার সুযোগ নেই। ফলে জনগণ লাগামহীন পুঁজিবাদের ফাঁকি ধরে ফেললো। হতাশা গ্রাস করলো তাদের। শিক্ষিত যুবসমাজ খুঁজলো গঠনমূলক উত্তরণের পথ। তারা বার্নি স্যান্ডার্সের পেছনে দাঁড়ালো। আর একদল দেখলো ভিনদেশী মানুষ এসে তাদের ভাগের চাকরি, ভাগের সম্পদ ভোগ করছে। তারা ভাবলো ভিনজাতিগুলোকে দূর করতে পারলেই ভাগ্য ফিরবে। তারা ভীড় করলো ট্রাম্পের পেছনে। রিপাবলিকান প্রার্থীরা ঘুরেফিরে ট্রম্পের কাছাকাছি নীতিই পোষণ করে, কিন্তু স্পষ্ট করে বলার সাহস তাদের ছিলোনা। ফলে রিপাবলিকান সমর্থকেরা স্পষ্টভাষী ট্রাম্পকে লুফে নিলো।

অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক শিবিরে লাগলো প্যাঁচ। মিডিয়া, সুপার ডেলিগেটরা হিলারি ক্লিনটনের পক্ষে। তার জনসমর্থনও ভালো, এই সমর্থকদের অধিকাংশই প্রথাগত আমেরিকান বা আমেরিকায় রুজিরোজগার করা অভিবাসীরা। যারা ভালোই আছে। কিন্তু বার্নি স্যান্ডার্সের পেছনে দাঁড়ালো বিপুল সংখ্যক উদ্যমী মানুষ, যারা প্রকৃতপক্ষে আমেরিকার গঠনমূলক পরিবর্তন চাচ্ছিলো। স্যান্ডার্সের জনপ্রিয়তা যখন হু হু করে বাড়ছে তখন সুপারডেলিগেটরা আইনসিদ্ধ অথচ অন্যায্যভাবে স্যান্ডার্সকে ছিটকে ফেলে দিলো।

লক্ষ্য করুন, এখানে তিন ধরণের ভোটার ছিলো:
– হিলারির পেছনে কারো সাতেপাঁচে না থাকা নিরীহ ভোটার
– ট্রাম্পের পেছনে উগ্র ডানপন্থী ভোটার
– স্যান্ডার্সের পেছনে কিছুটা বামপন্থী উদ্যমী চিন্তাশীল ভোটার

বোঝাই যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন তৃতীয় শ্রেণির মানুষেরাই আনতে পারতো। স্যান্ডার্সের বিদায়ে এই মানুষগুলির পছন্দকেই অস্বীকার করা হলো। এই সিদ্ধান্তটি ট্রাম্পকে অনেকখানি এগিয়ে দিলো। কারণ ট্রম্পের সমর্থকেরা উগ্রপন্থী হলেও উদ্যমী; অন্যদিকে সমর্থকেরা নেহায়েতই প্রথাগত, যারা মার্কিন সংকটকে ঠিকভাবে বুঝতে অক্ষম।

এরপরে হিলারির প্রেসিডেন্ট হওয়া নিয়ে যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হলো তার পেছনে মিডিয়ার প্রচারণার অবদানই প্রধান। এই প্রচারণাই বরং নীরব, নিরপেক্ষ ভোটারদেরকে ট্রাম্পের দিকে ঠেলে দিলো। প্রকাশিত সংবাদের ধরণ দেখলেই তা বোঝা যায়। ট্রাম্প শুরু থেকেই বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনায় ছিলেন। তার এমন একটা ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো যে তার দোষ-গুণ যেকোন কিছুর প্রচারই তার পক্ষে চলে যায়। তাকে হাইলাইট না করাই ডেমোক্রেটিক মিডিয়ার কৌশল হওয়া উচিৎ ছিলো। কিন্তু তারা হিলারির ভালো দিক তুলে ধরার চেয়ে ট্রাম্পের বিষেদাগারের দিকেই বেশি মনোযোগ দিলো। ট্রাম্পের প্রচারণা ডেমোক্রেটিক মিডিয়ার হাতে! আবার মেক্সিকো সীমান্তে বেড়া দেয়া, কঠোর অভিবাসন নীতি ইত্যাদি সুস্পষ্ট এজেন্ডা দিয়ে ট্রাম্প নিজের অবস্থানকে সবসময়ই শক্তিশালী রেখেছেন। অন্যদিকে ওবামার স্বাস্থ্যনীতি পুনর্বহাল রাখা ছাড়া হিলারির আলোচিত কোন এজেন্ডা ছিলোনা। ফলে হিলারির এজেন্ডা নিয়ে আলোচনার চেয়ে মিডিয়া ট্রাম্পের এজেন্ডার বিরোধিতাকেই বেছে নিয়েছে।

রিপাবলিকান বড় বড় নেতাদের ট্রাম্প-বিরোধিতাও হিলারিকে আশা যুগিয়েছে। কিন্তু অভিজাত রাজনীতি হিলারিকে প্রাইমারি ইলেকশনে জেতালেও জনগণের চূড়ান্ত বিচারকে নিজের পক্ষে আনার মত ক্যারিশমা তার ছিলোনা, বর্তমান মার্কিন প্রেক্ষাপটে তো নয়ই।

সূক্ষ্ণভাবে চিন্তা করলে ট্রাম্প-স্যান্ডার্স আসলে একই জিনিস প্রচার করেছেন, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কীভাবে মৌলিক পরিবর্তন আনা যায়, যদিও তাদের পদ্ধতি ভিন্ন ছিলো। আরো সূক্ষ্মভাবে ভাবলে যুক্তরাষ্ট্রে একটা বিপ্লবের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো। বারাক ওবামা সেটি ধরতে পেরেছিলেন। কিউবার সাথে সম্পর্ক স্থাপনসহ প্রায় একক প্রচেষ্টায় নেয়া বেশকিছু প্রথাবিরোধী সিদ্ধান্ত সেই ইঙ্গিতই দেয়। তার পরিকল্পনা ছিলো, কিন্তু তা এগিয়ে নেয়ার মত সাহস বা সরকারের ভেতর থেকে যথেষ্ঠ সমর্থন তার ছিলোনা। বার্নি স্যান্ডার্স এই জায়গায় উপযুক্ত একজন নেতা হয়ে উঠতে পারতেন। কিন্তু অভিজাত ডেমোক্রেটিকরা তাকে সেই সুযোগ দিলোনা। বরং ক্ষয়ে যাওয়া ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার প্রবল ইচ্ছা মার্কিন সমাজে যে সংকট তৈরি করলো তা পুরোপুরি লুফে নিলেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ব্যক্তি ট্রাম্প আমাদেরকে যতটুকু ধারণা দেয়, তাতে মৌলিক কোন পরিবর্তন আনার মত ব্যক্তিত্ব তার নেই। ব্যবসায়ী শাসিত যুক্তরাষ্ট্রে তার মত একজন নিখাদ ব্যবসায়ী চলমান উপায়েই পরিস্থিতিকে হয়তো আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাবেন। নতুবা চমকপ্রদ কোন উপায় গ্রহণ করতে গিয়ে সংকটকে নতুনভাবে ঘনীভূত করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সামনে হয়তো স্যান্ডার্সের মত লোকের উঠে আসার সুযোগ আরো বাড়বে। ব্যর্থ সমাজতন্ত্র ও মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ পুঁজিবাদ মিলে বিশ্বে যে অশান্তি সৃষ্টি করেছে, তাতে দীর্ঘদিন ধরে একটা বিকল্প ব্যবস্থার জন্য সারাবিশ্ব অধীর আশায় বসে আছে। স্যান্ডার্স যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তাতে নতুন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিলো। ডেমোক্রেটিকদের হঠকারিতায়, সেই সম্ভাবনা ভেস্তে গিয়েছে। এখন দেখা যাক, ভবিষ্যতের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীর জন্য কী চমক নিয়ে অপেক্ষা করছে!

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top