ক্ষমতা

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনঃ শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের ফিরে আসা?

পৃথিবীজুড়ে প্রগতিশীলরা ভয় ফেরী করে। “আমরা না জিতলে কি হবে” এই ভয় বিক্রি করে তারা ব্যাবসা করে। আর ডানপন্থীরা ঘেন্না বিক্রি করে, মাইনরিটির প্রতি ঘেন্না, অপরের প্রতি ঘেন্না। আমেরিকায় ঘেন্না জয়ী হয়েছে। হিলারীর লেবাস ধরা খেয়ে গেছে। আপনি প্রগতি বিক্রি করেন, লিবারেলিজম বিক্রি করেন, করতে পারেন। কিন্তু দিন শেষে আপনার কি আইডিয়োলজি সেইটা গুরুত্বপূর্ন না, আপনি কি কাজ করছেন সেইটা গুরুত্বপূর্ন। আফসোসের ব্যাপার হলো, লিবারেলরা শব্দ দিয়ে জিতে যেতে চায়। আমরা যেহেতু প্রগতিশীলতার পক্ষে, আমরা যেহেতু স্বাধীনতার পক্ষে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তাদের চাইতে মোরালি সুপেরিয়র? ভুল। আপনি কি কাজ করছেন, সেইটা গুরুত্বপূর্ন। আপনি ভালো কাজ করবেন, তারপর বলবেন – দেখো এইটা আমার আইডিয়োলজি। কিন্তু উল্টাটা ঘটে। লিবারেলদের প্রতি মানুষের ঘেন্না আসে এইখান থেকে। আমি তোমার থেকে খারাপ এইটা সারাক্ষন মানুষ শুনতে চায় না। লিবারেল মিডিয়া সারাক্ষণই এইটা জপে। এর ফলে সহানুভূতিও কিন্তু তৈরী হয়। অল্টারনেটিভ রাইট ওইটা ক্যাপিটালাইজ করে। বলে – দেখো দেখো, ওরা ট্রাম্পকে কোনভাবেই জিততে দিবে না। কন্সপিরেসি থিয়োরী বানায়।

বার্নি স্যান্ডার্স কয়েকশত কোটি গুন ভালো ছিলো হিলারির চেয়ে। কিন্তু ডেমোক্রেটিক এস্টাব্লিশ্মেন্ট তাকে জিততে দেয়নাই। বার্নি থাকলে কনফার্ম জিততো। পরিষ্কার ইমেজ, জনবান্ধব আইডিয়োলজি। ক্রুকেড হিলারির মত ওয়ারমঙ্গার না। এস্টাব্লিশ্মেন্টের পোষা না। কর্পোরেট নেক্সাসের পাপেট না। ওয়াল স্ট্রিটের পাপেট না। ট্রাম্পকে মানুষ ঘেন্না করে, হিলারিকেও করে। কিন্তু যখন একমাত্র অপশন হিলারি, তখন সব লাইকলি ভোটাররা ভোট দিতে যাবেনা। অনেকেই রিলাক্টেন্ট থাকবে। বার্নি এন্টি এস্টাব্লিশ্মেন্ট, ট্রাম্পও। আমেরিকায় ভোটার টার্ন আউট সবসময় কম। আপনি কি আপনার সমস্ত ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে নিতে পারছেন নাকি সেইটা গুরুত্বপূর্ন। হিলারি এনারজাইজ করতে পারেনাই। বার্নি পেরেছিলো, ট্রাম্প পারে। ট্রাম্পের ভোটাররা তার জন্য এক্সট্রা মাইল যেতে রাজি, হিলারির ভোটাররা না। ট্রাম্প রিপাবলিকান প্রাইমারির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ভোট পেয়েছিলো। এইটা অনেক বড় ঘটনা। এরা সবাই আজকে ভোট দিয়েছে। সিনিয়র, জুনিয়র বুশ, রিগান কেউ প্রাইমারিতে এত ভোট পায়নাই, এত বড়ভাবে জিতেনাই। আপনি যদি সবার জন্য ভোট বাধ্যতামূলক করেন, ট্রাম্প জিততে পারবেনা। কিন্তু ঘটনা তো ওইভাবে ঘটে না। এইটা ডিফারেন্ট টাইম, ইন্টারেস্টিং টাইম। এইখানে কনভেনশনাল উইজডম দিয়ে কাজ হবেনা। এইটা তিরিশের দশকের মতন, ওই মহামন্দার পরের সময়ের মতন, ফ্যাসিজমের উত্থানের সময়। আর জরিপ-ফরিপ ব্রেক্সিটের পর থেকে আর বিশ্বাসযোগ্য না। এইটা নয়া মিডিয়ার যুগ, ক্লিক বেইট জার্নালিজমের যুগ। পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার জন্য মানুষ মুখে বলে ট্রাম্পকে ভোট দিবেনা, কিন্তু ঠিকই দেয়। তাকে পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার জন্য লিবারেল মিডিয়া যে জোর করে, ভোটকেন্দ্রে সে ওইটার প্রতিশোধ নেয়। একজাক্টলি সেইম ঘটনা ব্রেক্সিট নিয়ে ঘটেছে। ঘুম থেকে উঠে ব্রিটরা দেখে তারা ইইউ’র বাইরে! আরে, মিডিয়া তো এইরকম বলেনাই ব্লাহ ব্লাহ ব্লাহ। ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন পুরোটা ব্রেক্সিটের নকল। সেন্সেশনালিজম মেইন জিনিষ। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ইইউ’র জন্য, খরচ বাড়ছে – এইধরনের পিউর প্রপাগান্ডা মানুষ বিশ্বাস করে, কারণ সে এইটা বিশ্বাস করতে চায়। ট্রাম্পের ক্যাম্পেইনও এইরকম। একটা পাঞ্চিং ব্যাগ খুঁজে বের করে মারতে থাক। ব্লেইম দেম ফর অল আউয়ার ফল্টস। মানুষজন ভেরিফাই করতেও যাবেনা। খেয়াল করে দেখবেন, ট্রাম্প কাউকে আক্রমণ করার আগে বলে যে, “এ লট অফ পিপল আর সেয়িং দ্যাট…” – বলেই একদম ধুয়ে দেয়। কোন লট অফ পিপল, কে বলছে… এইগুলো কেউ আর জিজ্ঞেস করে না। সবই মোমেন্টারি। জাস্ট গ্রাব দ্যা টেম্পো এন্ড ফরগেট। এইটাই নয়া প্রোপাগান্ডা স্টাইল।

ট্রাম্পের উত্থান অবশ্যম্ভাবী ছিলো। পুরা ইউরোপ জুড়ে ডানপন্থী উত্থান ঘটছে। মানুষ আরো জেনোফোবিক হচ্ছে, রেইসিস্ট হচ্ছে। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, ফ্রান্সের লা পেইন, ইংল্যান্ডের নাইজেল ফারাজ, স্পেইনে, ইভেন নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেনের মতন দেশেও আছে। প্রাক্তন কলোনি থেকে মিসকিনেরা ভিড় করছে। এইসব রিপারকেশন খুব নরমাল কিন্তু। মানুষ তো টেরিটরিয়াল প্রানী, তার এইগুলো ভাল্লাগেনা। কিন্তু এইগুলো সে বলতেও পারেনা। যে তার এই ডিসকমফোর্টকে ভাষা দেয়, তাকে সে ভোট দেয়। এরা কিন্তু একই সাথে এন্টি গ্লোবালাইযেশন ফোর্সও। জাতীয়তাবাদী। ট্রাম্পের ভোটাররাও এন্টি-গ্লোবালাইজেশন পিপল। সত্তরের দশকে নিওলিবারেল ইকোনমির রমরমা যখন শুরু হয় রিগান ও থ্যাচারের হাত ধরে, এর কুফল উন্নত বিশ্বের সাধারন মানুষও ভোগ করছে। সত্তরের পর থেকে মার্কিন মিডল ক্লাসের “রিয়েল ইনকাম’ বাড়েনাই। উন্নয়ন ঠিক চুঁয়ে চুঁয়ে পড়েনা। এইটা ভুয়া হাইপোথিসিস। উন্নয়নের বিশ্বে ফড়িয়ারা বড়লোক হয়, একটা সুবিধাভোগী ছোট মধ্যবিত্ত জন্ম নেয়, আর উন্নত বিশ্বে বিখ্যাত এক শতাংশ আরো বড়লোক হয়। অকুপাই আন্দোলনের মতন আন্দোলন এইকারনে জনপ্রিয় হয়। ২০০৮ এর ফিন্যানশিয়াল ক্রাইসিস নাইন ইলেভেনের চাইতে কম গুরুত্বপূর্ন না। এবং এইটার পিছনে রিগান থেকে শুরু করে ক্লিনটন প্রশাসনের দায় কম না। ফিন্যানশিয়াল ডিরেগুলেশন ক্লিনটন শুরু করেছে। মেল্টডাউন হয়েছে পরে। এবং এইসবের বিরুদ্ধে বলার কথা ডেমোক্র্যাটদের, লেবার পার্টিগুলার। কিন্তু তারা কি করছে? লেবারদের মুখপাত্র হচ্ছে টনি ব্লেয়ারের মতন একটা যুদ্ধবাজ চামচিকা আর ডেমোক্র্যাটদের হচ্ছেন গোল্ডম্যান সাকসের পোষা হিলারি। এইগুলা নিও-ডেমোক্র্যাট আর নিও-লেবার। বার্নি এদের বিরুদ্ধে ছিলো, অকুপাই মুভমেন্ট এদের বিরুদ্ধে ছিলো। এবং এরাই এখন বিলাতে করবিনের পিছে লেগেছে। করবিন তৃনমূল থেকে উঠে আসা, স্যান্ডার্সেরই মতন। তারা করবিনকে আনইলেক্টেবল প্রমান করার জন্য একপায়ে খাঁড়া। আমেরিকান পলিটিক্যাল এস্টাব্লিশ্মেন্টের উপর মানুষ খ্যাপা, রিপাব্লিকান, ডেমোক্র্যাট সবাই। এইসব অনিয়ন্ত্রিত লবিইস্টরা তাদের লাইফ নিয়ন্ত্রন করে। ট্রাম্পও কিন্তু এন্টি এস্টাব্লিশ্মেন্ট। রিপাব্লিকান এলিটরা কেউ তাকে পছন্দ করেনাই। এমন কি নিওকন নিষ্ঠুর বেহায়া পল ওলফভিচ পর্যন্ত তাকে সবক দিচ্ছিলো। রিপাব্লিকান ভোটাররা তাদের দলের এস্টাব্লিশ্মেন্টের উপর অসন্তুস্ট, ওয়াশিংটনের উপর অসন্তুস্ট। ট্রাম্পের এন্টি এস্টাব্লিশ্মেন্ট ভেক তারা পছন্দ করেছে। পলিটিক্যাল দল এবং তাদের সাপোর্টারদের মাঝে এই গ্যাপটা আমাদের সময়ের সিগ্নেচার, একারনেই কমপ্লিট আউটসাইডাররা আসতেছে। পলিটিক্যাল দলগুলো মিলে যে এস্টাব্লিশ্মেন্ট বানাচ্ছে, তাতে নিজেদের পার্টি মেম্বারদের ভয়েজও ইকো হচ্ছেনা।

নোবেল বিজয়ী মারিও ভার্গাস বলছিলেন যে এইটা হচ্ছে সিভিলাইজেশন অফ স্পেক্টাকল। আমরা খালি দেখি। চোখ সবচেয়ে ব্যাবহৃত ইন্দ্রিয়। আমেরিকান টিভি, মিডিয়া, সোপ অপেরা যেই দৃশ্যজগত পছন্দ করে, ট্রাম্প সেইখান থেকে এসেছে। পিউর এন্টারটেইন্মেন্ট। রিয়েল ব্রেইনলেস গারবেজ। কোন ভাবেই “হাই কালচার” এর অংশী না। এমন কিছু যা দেখতে ভাল্লাগে, আপনার মতই কথা বলে। পলিটিক্যাল ইঙ্কারেক্ট। সহজ বাংলায় কাউকে ট্রাম্প গোনায় ধরে না। আমেরিকা একটা অথরোটোরিয়ান লিডারের জন্য অবচেতনভাবেই প্রার্থনা করছিলো, এবং তাদের প্রার্থনার জবাব দিছে ট্রাম্প। এইখানে ইকোনমি আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশী আছে আইডেন্টিটি পলিটিক্স এবং পানিশ্মেন্ট ভোট। ভোট ছাড়া আর কোনভাবে তো তারা আর অনাস্থা জ্ঞাপন করতে পারেনা এই সিস্টেমের প্রতি। এইখানে এন্টি গ্লোবালাইজেশন ফোর্সের সাথে মিলে গেছে জেনোফোবিয়া… ভয়লা! ক্লাস পলিটিক্স স্ট্রং থাকলে, লেবার ইউনিয়নগুলান ডিসফাংশনাল না হলে এমন হতোনা। যতটুকু হতো, সেটা ম্যানেজেবল থাকতো। সাথে যোগ করেন হোয়াইট ন্যাশ্নালিজমের উত্থান। তিরিশের দশকে আমেরিকা ভেবেছিলো যে সে “হোয়াইট ক্রিশ্চিয়ান মেইল” কে পরাজিত করতে পেরেছে, কিন্তু আসলে পারেনাই। টিভি ইভাঞ্জেলিস্ট হয়ে সে ফেরত এসেছে, ক্রিশ্চিয়ান বেল্টে সে বড় হয়েছে। এরা আগেও ছিলো, কিন্তু এখন কালো চামড়ার প্রেসিডেন্টের নীচে দুই টার্ম এবং আবার একটা মহিলার নীচে আরো এক টার্ম থাকার চোট তার ম্যাসকুলিনিটি নিতে রাজি হয়নাই। র‍্যাগেড ওয়েস্টার্ন হিরো কামস ব্যাক টু আমেরিকা। এর আগে মিডিয়া থেকে আসছিলো রিগান। তারও প্রমিজ ছিলো যে হি উইল মেইক আমেরিকা গ্রেইট। এই নয়া হিরো নিশ্চিতভাবেই সব আম্রিকানকে রিপ্রেজেন্ট করে না। আমেরিকান জনগন পৃথিবীর সবচাইতে ওভাররেটেড জনগন। কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এত সলিড যে ভয়ঙ্কর রাবিশ কিছু কারো পক্ষে করা সম্ভব না। প্রতিষ্ঠানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার একটা নজির হলো এফবিআইয়ের ইন্টারভেনশন। এই সিকিউরিটিটা আমেরিকান সিস্টেম প্রভাইড করতে পারে। আমার ধারনা ট্রাম্প এক টার্মের জন্য আসছে, হিলারি জিতলে সে-ও এক টার্মই থাকতো। মন্দের ভালো হলো, এর রিপার্কেশনে রিয়েল চেইঞ্জ কিছু আসতে পারে। স্যুডো-লিবারেলদের থেকে মুক্তি পেতে পারে ভবিষ্যতে। শেষ কথা হলো, এই যে আমেরিকান তথাকথিত প্রগ্রেসিভদের তাড়া খেতে দেখছি, তাতে মনে পরছে হামিদ দাবাশির একটা কথা-

“আমেরিকানরা ভয় পাচ্ছে যে তারা বাকি দুনিয়ার সাথে যা করে, ট্রাম্প এখন তাদের সাথে সেইটা করবে……”

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top