ক্ষমতা

সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন নিয়ে চারটা কথা

সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন নিয়ন আলোয় neon aloy
পৃথিবীর মানচিত্র খুলে একেক দেশের সাম্প্রদায়িক সুখ-শান্তির তুলনা করতে গেলে “সংখ্যালঘু” একটা কাজের শব্দ। বাংলাদেশের হিন্দু, ভারতের মুসলমান, সৌদি আরবের শিয়া, ইরানের সুন্নিকে এই শব্দ দিয়ে একসাথে করে আলোচনা করা যায়। তবে জাতীয় মানচিত্র খুলে বসলে এই শব্দের মানে বদলে যায়, শব্দটা আপত্তিকর হয়ে ওঠে। দেশের রাজনীতিবিদদের মুখে, পত্রিকায়, টিভিতে; এই শব্দ যত বেশি ব্যবহৃত হবে বুঝতে হবে দেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ততটাই খারাপ এবং সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন সে দেশে উপস্থিত। বুঝতে হবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যে একই ধরণের নিরাপত্তা সুযোগ সুবিধার দাবিদার, দেশে এই বিশ্বাসটাই নাই, চর্চা তো অনেক পরের ব্যাপার। জাতীয়তাবাদের স্পিরিট সেই দেশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

 

জাতীয়তাবাদের স্পিরিট দিয়েই আলোচনা শুরু করি। দেশপ্রেমের সহজাত উপলব্ধি মানুষের থাকে। অভিজ্ঞতার সাথে সাথে তাতে কম-বেশি হয়। আশেপাশের মানুষজন, সরকার, প্রশাসন যদি একটা মানুষের সাথে ক্রমাগত বৈষম্যমূলক আচরণ করে সেই মানুষটির দেশপ্রেম কমতে থাকে। দেশের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়াও স্বাভাবিক। ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় মুসলিমদের ভেতর এই মানসিকতা তৈরি হয়েছিলো। ব্রিটিশ আমলে মুসলমানদের যত আন্দোলন ছিল তা ছিল প্রধানত ধর্মভিত্তিক, দেশ স্বাধীন করার জন্য না। কারণ ব্রিটিশ আমলে অত্যাচারিত হতে হতে অখণ্ড ভারতের প্রতি তাদের বিশ্বাসই উঠে গিয়েছিল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ মুখ থুবড়ে পড়েছিল। একইভাবে আমরা বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যাত হতে দেখেছি। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম এগুলো কোন নি:শর্ত বিষয় না। প্রেরণা না থাকলে এসব টেকে না।

 

বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, আদিবাসীদের ওপর যে প্রতিনিয়ত মানসিক এবং মাঝেমধ্যেই জানমালের ওপর অত্যাচার চলছে, এর কোন পাল্টা প্রতিক্রিয়া থাকবেনা? কিছু বাঙালির অভিযোগ, পাহাড়িরা বাঙালিদেরকে দেখতে পারেনা, দেশকে ভালোবাসেনা। এসব কি এমনি এমনি হয়েছে? হিন্দুদের মন্দির ভাঙ্গা হয়, কোনদিন কোন বিচার হলোনা। অথচ পান থেকে চুন খসলে দেশে মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে। সাংবাদিক বহিষ্কৃত হয়, পত্রিকার সম্পাদক ক্ষমা চায়, ৫৭ ধারায় মানুষ জেলে যায়, যাদের জেল হয়না তারা খুন হয় জখম হয়। এই যে বৈষম্য, সেই বৈষম্যের প্রতিফল থাকবে- ইতিহাস তাই বলে।

 

তবে প্রতিফলের কিছু শর্ত থাকে। অত্যাচারিতের মাথা নত থাকলে তার ওপর অত্যাচার বাড়তেই থাকে। ইতিহাসের প্রতিফল এখানে আর খাটেনা। বাংলাদেশের হিন্দুরা হলো সেই মাথানত অত্যাচারিত। অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাদের শক্ত কোন অবস্থান নেই। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী নেতাদের কর্মকান্ডে এই অত্যাচার থেকে মুক্তিলাভের কোন স্পৃহা নেই। হিন্দুরা শক্ত অবস্থান নিলে অনেক মুসলিম যে পাশে এসে দাঁড়াতো সেটা নি:সন্দেহে বলা যায়। হিন্দুদের নমনীয়তায় উদার মুসলিমদের প্রতিবাদও খুব দুর্বল। স্বীকার করি, হিন্দুদের শক্ত অবস্থান নেয়ায় কিছু অসুবিধা আছে। হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিগোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তবে সেই কারণে কোন পদক্ষেপ না নেয়ার কোন কারণ নেই। অমন গোষ্ঠীর উদ্ভব হলে তাকে দমন করা খুব কঠিন কিছু না

 

সুতরাং পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রথমে প্রয়োজন হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ অহিংস অথচ দৃঢ় প্রতিবাদ, তাতে উদার মুসলমানদের জোরালো সমর্থন। মিডিয়াকে সংখ্যালঘু শব্দ পরিত্যাগ করে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ব্যবহার করতে হবে। সংখ্যালঘু শব্দ যে একটি অসম্মানজনক বিভাজন তৈরি করে এবং মুসলমানদেরকে মানসিকভাবে এই দেশে সুপিরিয়র নাগরিক হিসেবে ভাবতে শেখায় এটা বুঝতে হবে। সরকারের কল জনতায় নড়ে। জনদাবি গড়ে উঠলে সরকার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

আর দশটি নিউজপোর্টালের মত যাচ্ছেতাই জগাখিচুড়ি না, "নিয়ন আলোয়" আমাদের সবার লেখা নিয়ে আমাদের জন্যই প্রকাশিত হওয়া বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন।

আজকের আলোচিত

Copyright © 2016 Neon Aloy Magazine

To Top